- প্রথম দিনে উপচেপড়া ভিড়
- ১০ আগস্ট পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি শেষ
সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি। কখনো ঝিরিঝিরি, আবার কখনো ভারী বর্ষণ। তবু ছাতা, রেইনকোট কিংবা ভেজা পোশাকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মানুষ। বৃষ্টির কারণে কিছুটা ভোগান্তি হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখার আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি দর্শনার্থীদের। উদ্বোধনের পর প্রথম দিনেই রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবনে অবস্থিত জাদুঘরটিতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রথম দিনের জন্য নির্ধারিত ৯০০টি টিকিট অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। এতে অনেকেই জাদুঘরে প্রবেশ করতে না পেরে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকে টিকিটের সংখ্যা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
এদিকে রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া শেখ হাসিনার ব্যবহৃত কক্ষ ও জিনিসপত্রের ওপরই এখন স্থান পেয়েছে আন্দোলনে শহীদদের জামাকাপড় ও ব্যবহৃত সামগ্রী। জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় শেখ হাসিনার শোবার ঘরের যে খাটে তিনি ঘুমাতেন, সেখানেই এখন প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রবাস ফেরত শহীদ রাজিবের স্মৃতিচিহ্নসহ অন্যান্য শহীদদের ব্যবহার্য সামগ্রী। ঘরের চেয়ার, টেবিল, র্যাক ও আলমারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে আন্দোলনে নিহতদের ব্যবহৃত রক্তাক্ত জামাকাপড়, ঘড়ি, টাই, কোট এবং জুতা-স্যান্ডেল। শেখ হাসিনার ঘরের সামনের দক্ষিণ বারান্দায় পরিবারের শিশুদের খেলাধুলার জন্য যে দোলনাটি ছিল, সেটি এখনো আগের মতোই রয়েছে। তবে এখন সেই দোলনায় স্থান পেয়েছে জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিশুদের প্রতিকৃতি, যেন অবিকল দোল খাচ্ছে।
পাশেই রাখা হয়েছে আন্দোলন জুড়ে রিকশায় চড়ে সালাম দিয়ে গণমানুষের আইকন হয়ে ওঠা সেই আলোচিত রিকশাটি। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত বাথটাবে স্থান পেয়েছে শহীদদের ছবি এবং তারা কোথায়, কীভাবে শহীদ হয়েছেনÑতার বিস্তারিত বিবরণ। জাদুঘরটিতে ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা ও চিত্র ফুটে ওঠার পাশাপাশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগের নানা স্মৃতি।
বিগত সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের স্বাক্ষর বয়ে বেড়াচ্ছে শেখ হাসিনার শোবার ঘরের দেওয়ালগুলো। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দিন মানুষ যে কতটা ক্ষুব্ধ ছিল, তার প্রমাণ মেলে ঘরের দেওয়ালে লাগানো খোলা ও ভাঙা কাঠের বোর্ডের আঘাতের চিহ্নে।
পরিবার, বন্ধু কিংবা স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বয়সি মানুষ এদিন জাদুঘরে এসে জুলাইয়ের স্মৃতি, আন্দোলনের নানা আলোকচিত্র, দলিল, নিদর্শন ও শহীদদের স্মরণে সংরক্ষিত বিভিন্ন উপকরণ ঘুরে দেখেন দর্শনার্থীরা। জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশের পর দর্শনার্থীরা একে একে বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখেন। আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র, ব্যবহৃত সামগ্রী, ভিডিওচিত্র ও সংরক্ষিত নথি মনোযোগ দিয়ে দেখেন অনেকে। প্রদর্শনীগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেও দেখা যায়। কেউ ছবি তুলেছেন, আবার কেউ নীরবে পুরো পরিবেশ অনুভব করার চেষ্টা করেন।
পরিবার নিয়ে জাদুঘরে আসা মাহমুদুল হাসান নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে আসা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু পরে মনে হয়েছে, এমন একটি জায়গা দেখার জন্য আবহাওয়া বাধা হতে পারে না। এখানে এসে অনেক কিছু কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে।’ আরেক দর্শনার্থী ফাহিম জানান, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে অনেক শুনেছেন। তাই জাদুঘরটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। বৃষ্টি হলেও সেই পরিকল্পনা বদলাননি। বরং মনে হয়েছে, ইতিহাসকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
মুঞ্জেরিন তাবাসসুম ঊর্মি নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বই বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখা যায়, বাস্তবে এখানে এসে তার চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করা যায়। প্রতিটি গ্যালারি ঘুরে দেখতে গিয়ে আন্দোলনের নানা মুহূর্ত যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।’
দর্শনার্থীদের অনেকেই বলেন, ‘এমন জাদুঘর শুধু স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নয়, নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আবহাওয়া যেমনই হোক, সুযোগ পেলেই এখানে আসা উচিত।’
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টির কারণে কিছু সময় দর্শনার্থীদের চলাচলে ধীরগতি দেখা গেলেও সকাল থেকেই মানুষের আগমণ অব্যাহত ছিল। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন, আবার অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ দলবেঁধে জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন।
প্রদর্শনী ঘুরে গভীর আবেগ ও শোক প্রকাশ করেন শরিফুল ইসলাম নামের আরেক দর্শনার্থী। আন্দোলনের নির্মম চিত্র এবং নিহতদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে স্তম্ভিত এই দর্শনার্থী বলেন, এখানে অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের রক্তমাখা শার্ট, গেঞ্জি ও কাপড়-চোপড় দেখলাম। এগুলো দেখে খুব কষ্ট লাগছে, অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
ক্ষমতার স্থায়িত্ব ও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পেশায় ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, যিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হন না কেন, কারও পরিস্থিতি যেন এমন না হয়। ক্ষমতায় কেউ চিরকাল থাকে না, একসময় থাকে, আবার থাকে না। কিন্তু দেশ ছেড়ে যেন কাউকে এভাবে পালাতে না হয়। শাসকদের উচিত দেশের জন্য ও জনগণের জন্য ভালো কাজ করা।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের টিকিট নিয়ে দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহের মধ্যে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। উদ্বোধনের পর থেকেই রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবনে অবস্থিত এ জাদুঘরে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। জাদুঘরে প্রতিদিন তিনটি নির্ধারিত সময়সূচিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। সময়সূচিগুলো হলো- বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জাদুঘরের অনলাইন টিকিটিং ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা যায়, ৭ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিনটি সময়সূচির সব টিকিট ‘সোল্ড আউট’ দেখানো হচ্ছে। একইভাবে ১৪ ও ১৫ আগস্টের সব টিকিটও বিক্রি শেষ হয়েছে। এছাড়া ১১, ১২ ও ১৩ আগস্টের বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার সময়সূচির টিকিটও আর পাওয়া যাচ্ছে না।