গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম ভিত্তি। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরিবেশ অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও পেশাদার গণমাধ্যমই তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা নিশ্চিত করে।

গতকাল রোববার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারের মেঘমালা কনফারেন্স রুমে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৬। দিনটি উপলক্ষে ইউনেস্কো এবং টিআইবি এই সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

এছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারক, সম্পাদক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জার্মানির রাষ্ট্রদূত এইচ. ই. ড. রুডিগার লোটজ এবং সুইডেন দূতাবাসের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জেন্ডার সমতাবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি পাওলা কাস্ত্রো নিডারস্টাম। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, জ্যেষ্ঠ টেলিভিশন সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি এবং ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টস সেন্টারের চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ।

প্রধান অতিথি হিসেবে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জনআস্থা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা জোরদারে গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরিবেশ অপরিহার্য। পেশাদার সাংবাদিকতা জোরদার, সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় সরকার, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

গণমাধ্যমকে শক্তভাবে সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রত্যেকে খুব স্ট্রংলি সরকারের যেকোনো ধরনের সমালোচনা, যৌক্তিক সমালোচনা কন্টিনিউ করবেন।ৃ এই দেশে একটা দুর্দান্ত ভাইব্রান্ট মিডিয়া আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই।’

তথ্য উপদেষ্টা মনে করেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গণমাধ্যমের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো বোকামি। এ কারণে বর্তমান সরকার এমন কিছু করতে চায় না, যা গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ডের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি নাকি বলেছি, জনগণের কল্যাণের জন্যই বেশি বেশি লোডশেডিং দিচ্ছে সরকার। একটা ফটোকার্ড আমার বন্ধুরা পাঠিয়ে বলছে, আমার মাথা কি গেল?’ এই ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার সময় তাঁকে ট্যাগ করে গালিও দেওয়া হয় বলে জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের ‘মিস ইনফরমেশন’ বা ‘ডিজইনফরমেশন’–সংবলিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।

এর পাশাপাশি একটি মূলধারার গণমাধ্যম তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ‘ফেক নিউজ’ তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ফেক নিউজ’ করা অন্যায়। এর বিরুদ্ধে সরকার আইনি পথে ও ন্যায্যতার সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে এবং গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।

আলোচনায় ৫ আগস্টের পর আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, নোয়াবের (নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এই বিষয় উঠে আসে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন।

নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে এই সেল কাজ করবে বলে জানান তিনি।

উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘নারীদের প্রতি সাইবারের ক্ষেত্রে আমরা জেনুইন গ্রাউন্ডে খুবই টাফ হতে যাচ্ছি।’ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, বিটিভির বার্ষিক বাজেট ৩২০ কোটি টাকার বেশি, অথচ প্রতিষ্ঠানটি আয় করে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা। বেসরকারি গণমাধ্যমের বিকাশের এই সময়ে বিটিভি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, সরকার বিটিভিকে এমনভাবে গড়ে তুলবে যেন তা জনগণের কল্যাণে আসে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম ভিত্তি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের(টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩৮৯ জন সাংবাদিককে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যারা বিজয়ী হয়েছেন বা তাদের প্রতিনিধিদের দিয়ে এসব হয়রানির শিকার হয়েছে

তিনি আরো বলেন, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হয়েছিলো। এরমধ্যে কমপক্ষে ৪৫০ এর বেশি ছিলো মিডিয়া প্রফেশনাল। সেখানে ২৫০ জনকে আলাদাভাবে তাদের প্রফেশনাল কাজের জন্য টার্গেট করা হয়েছিল এবং তাদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল।

ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ বলেন, একটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও পেশাদার গণমাধ্যমই তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা নিশ্চিত করে। বর্তমান তথ্যপ্রবাহের জটিল বাস্তবতায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও সীমাবদ্ধতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারকে গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আলোচনায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের বিরাজমান বিভিন্ন কাঠামোগত ও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের দ্রুত বিস্তার বিশেষভাবে উঠে আসে।

ইউনেসকোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের আলোকে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা জোরদার, পেশাগত মানোন্নয়ন, মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যম, সরকার, সুশীল সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ঘোষিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস প্রতি বছর ৩ মে পালন করা হয়। দিবসটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের অবদান স্মরণ করার একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ।