একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকা সেই হাম ফিরে এসেছে ভয়ঙ্কর রূপে। দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠছে হাম। যেন কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না শিশু মৃত্যু। চোখের সামনে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ছে শিশু সন্তান। প্রতিদিনই খালি করছে কোনো না কোনো মায়ের কোল। আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতাল চত্বর কিংবা বাড়ির আঙিনা। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলো এখন কান্না আর উদ্বেগে ভরা। একদিকে শয্যার সংকট, অন্যদিকে অভিভাবকদের আতঙ্ক। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৫৪ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৩ জনে।

এদিকে সময় যত গড়াচ্ছে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু মৃত্যুর সংখ্যাও। এর জন্য টিকা না দেওয়াকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর থেকে উপসর্গ নিয়ে বেশি মারা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না নেওয়া বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অনেক জায়গায় এখনো টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, ভয় কিংবা অবহেলা রয়েছে। ফলে শিশুরা সুরক্ষার বৃত্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জরুরি হয়ে উঠেছে সমন্বিত উদ্যোগ। তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর শিশুর শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগবে। সেই সময়ের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, শিশুরা আক্রান্ত হলে বাসায় না রেখে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বাসায় থেকে জটিল হয়ে হাসপাতালে এলে তখন আর কিছু করার থাকে না।

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে গত ২৪ ঘন্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয় শিশু মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ৫৪ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৩। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৮৫টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর ৫৮টি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এই হিসাব গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ের।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩ শিশু সিলেট বিভাগের। এ ছাড়া ঢাকায় ২টি এং খুলনা বরিশালে বিভাগে ১টি করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২১২, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৫০টি শিশু। এ সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৮২টি শিশুর। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, এরপর আছে চট্টগ্রাম (৪৬)। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৯১৪ জন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত হাম সন্দেহে পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৪১ হাজার ৭৯৩ জন, এ সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনের।

গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৮৪২ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৫ হাজার ১৫১ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়; একটি স্বপ্নের মৃত্যু, যেন একটি পরিবারে বিরাট ক্ষত আর অনেক বড় শূন্যতা, যা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। চিকিৎসকরা বলছেন, এই মৃত্যু শুধু একটি ভাইরাসজনিত কারণে নয়; অবহেলা, টিকা-ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের সম্মিলিত ফল।

বলা হচ্ছে বাংলাদেশে ও বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে এবং এটি জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন টিকাদান হার, অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কারণে হাম একটি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে ফিরে এসেছে, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো- কম টিকাদান হার, অনেক শিশু হামের টিকা না পাওয়ায় এই ভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে বায়ুবাহিত হয়ে দ্রুত ছড়ায়। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হাম অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।

কেবল বাংলাদেশে নয়; বিশ্বজুড়ে অনেক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) উদ্বেগের কারণ। হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (যেমন: গগজ টিকা) নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য সর্দি-জ্বর বা হামের লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এগুলো তো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের অকার্যকারিতায় হামের মহামারী হয়েছে। এখন জরুরি অবস্থা ও মহামারী ঘোষণা করা এবং একই সঙ্গে আপদকালীন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে কার্যক্রম চালানো দরকার। কেননা, আমি বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞদের যে বিভিন্ন পরামর্শ দেখছি, সেগুলো সারা দেশজুড়ে যদি ভালোমতো প্রশিক্ষণ না দেওয়া যায়, একটা ন্যাশনাল গাইডলাইন তৈরি না করা হয়, তাহলে সব ডাক্তার এই মানের সেবা দিতে পারবেন না। তা যদি না পারে, তাহলে শিশুর অবস্থা যদি বেশি খারাপ হয়ে যায়, বাইরে থেকে যখন ঢাকায় আসবে, তখন আর তেমন কিছু করার থাকে না। সেই ঘটনাটা ঘটছে। ঠিক তো ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এখন এটা নিয়ে জোরেশোরে নামা উচিত, যেন আর কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়। যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে যতদিন আক্রান্ত হতে থাকবে, ততদিন মৃত্যুও হতে থাকবে।