এক যুগ আগে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ঢাকাতেই ৩২ জনের প্রাণহানির তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। এ ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে।

গতকাল রোববার এ তথ্য জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ ঘটনায় এরইমধ্যে আমরা ৩২ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা পেয়েছি। তারা শাপলা চত্বরেই নিহত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া সে সময়কার সরকারের ঊর্ধ্বতনদের বা পুলিশের যারা জড়িত রয়েছেন, কিংবা অর্থের জোগান দিয়েছেন; তাদেরও আসামি করা হবে।

তিনি আরও বলেন, শাপলা চত্বরের এ মামলায় ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে। বাকি কাজও শিগগির সম্পন্ন করতে পারবো। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে যাচাই-বাছাই শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আকারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।

এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।

গত ৫ এপ্রিল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময় চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন। পরে আগামী ৭ জুন প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল।

শাপলা চত্বরের এ মামলায় আসামীর তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের নেতক আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে। এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা অবরোধ এবং মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয় সংগঠনটি। সেদিন দুপুর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে এবং পল্টন-মতিঝিল এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে হেফাজত কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিকেলের দিকে হেফাজত কর্মীরা শাপলা চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। ৫ মে দিবাগত গভীর রাতে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে এক যৌথ অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের নাম ছিল 'অপারেশন ফ্ল্যাশআউট'। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে চত্বরটি খালি করা হয়।

এঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, ওই রাতে ৬১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, নিহতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। তবে নিহতের সুনির্দিষ্ট তালিকা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে।