বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এখন টিভির চার সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব, মুজাহিদ শুভ, বেলায়েত হোসেন ও আজহার লিমনকে আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে স্বপদে বহাল না করা হলে এখন টিভি কার্যালয়ে তালা লাগানোর আলটিমেটাম দিয়েছেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম। গতকাল সোমবার দুপুরে এখন টিভির সামনে চার সাংবাদিককে প্রায় ৩ মাস ধরে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রাখার প্রতিবাদে সংগঠনটি আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন ডিইউজে সভাপতি।

এই অনুষ্ঠানে ডিইউজে ছাড়াও বিএফইউজে, ডিআরইউ, জুলাই রেভ্যুলেশনারী অ্যালায়েন্স, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতি, ঢাকা কলেজ সাংবাদিক সমিতি, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন অংশ নেয়। ডিইউজে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন নির্যাতনের শিকার চার সাংবাদিকের সহকর্মীসহ মাঠের সংবাদকর্মীরা। একাত্নতা জানিয়ে ডিইউজের এ কর্মসূচিতে হাজির হন মানবাধিকার কর্মী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ডিইউজের সভাপতি শহিদুল ইসলাম আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্েয বাধ্যতামূলকভাবে ছুটিতে রাখা চার সাংবাদিককে তাদের স্বপদে পুনর্বহালের আহবান জানান। তা করা না হলে আগামী শনিবার সাংবাদিক সমাজ এখন টেলিভিশন কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেব বলেও জানান তিনি। এসময় ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, বারবার এখন টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ও তাদের মালিক সিটি গ্রুপের সাথে বৈঠক ও স্মারকলিপি দিলেও তারা তাতে কোন কর্নপাত না করায় এই অবস্থান কর্মসূচি দিতে ডিইউজে বাধ্য হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্েয চার সাংবাদিককে কাজে না ফেরালে তারা আরো কঠোর হতে বাধ্য হবেন বলেও জানান খোরশেদ আলম।

সাংবাদিক নেতা খন্দকার আলমগীর হোসেনের ও গাযী আনোয়ারের পরিচালনায় প্রায় তিন ঘন্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, নির্যাতনের শিকার চার সাংবাদিককে এখন টিভি ফিরিয়ে না নিলে লাগাতার কর্মসূচি চলবে। এখন টিভির সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আব্দুল্লাহর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে এই সম্পাদক যেভাবে নীতি বহির্ভূত দলীয় ভূমিকা নিয়েছেন ঠিকই একইভাবে বিএনপির আমলেও সেভাবে তোষামোদি করছেন।

তিনি আরো বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত কিছু ‘পা-চাটা’ ও ‘অশিক্ষিত’ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কারণে মেধাবী সাংবাদিকরা অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত ও বেকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, সংবাদপত্রের মালিকরা প্রতিষ্ঠানের শত্রু নন, বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের চেয়ার রক্ষায় মেধাবীদের ছাঁটাই করছে।

কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অংশ নেন আমার বাংলাদেশ-এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য স্বাধীন প্রেস কাউন্সিল গঠন করার নানা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করে নি। বলেন, আগের আমলের মতই ফ্যাসিবাদের ভূত মিডিয়াগুলোর ঘাড়ে চেপে বসছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, আজকে মিডিয়া একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যেখানে আদর্শের বালাই নেই। স্বাধীনভাবে কাজ করার বদলে এসব মিডিয়া দালাল তৈরির কারখানায় রূপ নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, যারা মানুষের জন্য সত্যটি বলেন তাদের জন্যই আজ আমাদের রাস্তায় দাড়াতে হচ্ছে। তারা নির্যাতিতি হচ্ছেন।

অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার আল মামুন রাসেল বলেন, গণমাধ্যমে সত্য কথা বলার স্বাধীনতা না থাকলে দেশে কখনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। অতি দ্রুত চার সাংবাদিককে কাজে পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।

সংহতি জানাতে আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের এজিএস মাসুদ রানা।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টেই পরবর্তী সময়েও পেশাদার সাংবাদিকদের এভাবে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে ফ্যাসিবাদের দোসরা নিউজরুমে এখনও বিদ্যমান। তথ্যমন্ত্রীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব সাংবাদিককে ফিরিয়ে নেবার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। এসময় জুলাই ঐক্যের নেতা ইসরাফিল ফরাজি এখন টেলিভিশনের সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আবদুল্লাহকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানান। এছাড়া সংহতি জানাতে আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব এসএমএস সাইফ মোস্তাফিজ, গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর, মিডিয়া সেল সদস্য ইয়াসির আরাফাত। আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারের সাংবাদিক ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক আবু বকর, নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবু হানিফ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী পরিষদ সদস্য রাজু আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জবি সমন্বয়ক ও জবি সংসদের এজিএস মাসুদ রানা, জুলাই রেভলুশনারি জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ইসরাফিল ফরাজী, মুক্ত গণমাধ্যম মঞ্চের আহ্বায়ক শিমুল পারভেজ, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ফখরুল ইসলাম, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক রেফায়েত শাকিল।

উল্লেখ্য বিএনপি সরকার গঠনের দিনে গণভোটে পক্ষে ফেইসবুক স্টাটাস দেয়ার কারণে এসব সাংবাদিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং ৭ দিন কর্মস্থলে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দেয়া কয়। এরপর ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা এসবের ব্যাখ্যা প্রদান করলেও গেল প্রায় ৩ মাস ধরে এসব সাংবাদিককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রাখা হয়েছে।