জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জ্বালানি খাতকে মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিক খাত নয়, বরং ‘সেবাখাত’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি সংকটের কারণ ও প্রভাব এবং সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ দাবি জানান।
এতে আলোচনায় অংশ নেন বায়ো-এনার্জি ও বিকল্প জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন, ভাইস চ্যান্সেলর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইসমাইল, মার্কেটিং ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোঃ আবদুল মোমেন ও প্রফেসর ড. বদরুল ঈমাম প্রমূখ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সিআইপিজির চেয়ারম্যান ড. মোজাম্মেল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব (অব.) মু. আবদুল কাইয়ূম।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিগত সরকারের আমলে বিশেষ আইন ও বিইআরসি আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে জ্বালানি খাতে অলিগার্ক বা অসাধু ব্যবসায়ীদের উত্থান ঘটে । রাষ্ট্র এই খাতকে ‘সেবাখাত’ থেকে ‘বাণিজ্যিক খাতে’ রূপান্তর করায় এটি এখন লুণ্ঠন ও দুর্নীতির চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে । বর্তমান সরকার নানা সংস্কারের কথা বললেও জ্বালানি খাতের এই লুণ্ঠনমূলক কাঠামোকে এখনো অক্ষত রেখেছে । তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিরোধীদল কেন জনস্বার্থ বিরোধী জ্বালানি আইনের ধারাগুলো সম্পর্কে সংসদে প্রশ্ন তোলছে না। তিনি আরও বলেন জ্বালানি সার্বভৌমত্ব আজ বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠিত জ্বালানি ব্যবস্থা ভাঙতে হবে । বিদ্যূৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তানের তোলনায় বেশি খরচ করেও প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই বর্তমান সরকারকে তেল-গ্যাসের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক আলম জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে পুনরায় ‘সেবা খাতে’ ফিরিয়ে আনা, মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা কমিয়ে ভর্তুকি ও ঘাটতি সমন্বয় করা, বিইআরসি-কে সক্ষম ও কার্যকর করা, মন্ত্রণালয়কে কোম্পানিগুলোর পরিচালনা বোর্ড থেকে সরিয়ে দিয়ে স্বার্থ সংঘাতমুক্ত করা এবং জ্বালানি অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে গণবিরোধী চুক্তি ও আইন বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন এই সেমিনারে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে এই কমিটি দীর্ঘসময় কাজ করবে এবং জ্বালানি সমাধানে টেকসই সমাধান উপস্থাপন করবে।
ড. মো ইসমাইল বলেন, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সরকার স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি উদ্যোগ নিলে এর সমাধান করতে পারবে। কুইক রেন্টালে যে ভর্তুকি সরকার দেয় তা যদি রিনিউবল এনার্জিতে ভর্তুকি দেয় তাহলে বিকল্প জ্বালানি প্রসারিত হবে। আমাদের দেশে মসজিদ, স্কুল, সরকারি ভবনগুলোতে যদি সোলারের আন্ডারে আনা যায়, তাহলেও তো বিদ্যুতের অনেক চাহিদা মিটানো সম্ভব। তিনি বলেন, বাপেক্সকে শক্তিশালী করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং সমন্বিত জ্বালানি পলিসি গঠন করতে হবে।
বুয়েটের বিকল্প জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ আহমেদ বলেন, ১ পার্সেন্ট কৃষি জমি যদি সোলারের জন্য নেওয়া হয়, তাহলে বছরে ৫০ হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তাই সরকারকে বিকল্প জ্বালানির সাথে বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
অধ্যাপক মো: আব্দুল মোমেন বলেন, ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। তারা বিশেষজ্ঞদের কথা শুনেছে। এর মাধ্যমে জাতীয় ভাবে জ্বালানি সমস্যার তারা সমাধান করেছে।
অধ্যাপক একেএম ওয়েরিসুল করিম বলেন, জ্বালানি বিষয়ে সরকার বা পলিসি লেভেলে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চিন্তা ও নলেজ গ্যাপ আছে। আবার দূর্নীতির কারনে আমাদেরকে সঠিক তথ্য জানতে দেওয়া হয়না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আমরা জানি না। সুতরাং এখানেও কাজ করার সুযোগ আছে।
সাবেক সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের জন্য জ্বালানি খাত হলো সোনার খনি । অতীত সরকারের সময় জ্বালানি খাতের প্রজেক্ট প্রস্তুতই করা হতো প্রকৃত ব্যয় থেকে প্রায় ৪/৫ গুন বাড়িয়ে যাতে লুটপাট করা যায়। সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা এসব পরিকল্পনার সাথে একমত হতো না তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি মূলক ব্যবস্থা নেয়া হতো। বিপিসির লাভের টাকা এমনসব দূর্বল ব্যাংকে রাখা হয়েছে, যেখান থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার আশা খুবই কম।
ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ বলেন, উন্নত দেশ তাদের স্বার্থে অনেক কিছু আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়। সুতরাং সতর্কভাবে সরকার, বিরোধী দল ও বিশেষজ্ঞরা একসাথে সমন্বিত জ্বালানি পলিসি নিতে হবে।
ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন বলেন, রাস্ট্রীয় ন্যায়পাল নিয়োগরে ব্যাপারে সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও কোন সরকার এটি বাস্তবায়ন করে নি। এটি করলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জবাবদিহির আওতায় আসবে।
সেমিনারে উত্থাপিত বিশেষ সুপারিশসমূহ: ১. জ্বালানি খাতকে পুনরায় ‘সেবাখাত’ হিসেবে ঘোষণা করা। ২. মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও অযৌক্তিক মুনাফা কমিয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করা। ৩. বিইআরসি-কে শক্তিশালী ও কার্যকর করা এবং জ্বালানি অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ৪. স্বার্থের সংঘাত এড়াতে মন্ত্রণালয়কে কোম্পানিগুলোর পরিচালনা বোর্ড থেকে সরিয়ে আনা। ৫. বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।