প্রতিবছরের মতো এবারও মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক (ডিসি)রা বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের কাছে। জাতীয়, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উন্নয়নে উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন জেলার ডিসিরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে পৃথক পৃথক প্রস্তাব দিয়েছেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করার লক্ষ্যে প্রস্তাবনায় বিভিন্ন যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন তারা।

গতকাল রোববার চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিনের জেলা প্রশাসকরা এসব প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রতিবছর জেলা প্রশাসন সম্মেলন তিন দিন হলেও এবার আরও একদিন বৃদ্ধি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জেলা প্রশাসক সম্মেলন উদ্বোধন করেন। এরপর যথারীতি অনির্ধারিত মুক্ত আলোচনা শুরু হয়। এ সময় বিভাগীয় কমিণার ও কয়েকজন জেলা প্রশাসক বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা মেলা আলোচনা করার সুযোগ নিয়ে মাঠ প্রশাসনে কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন অসুবিধার কথা তুলে ধরেন। রাজনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিত উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি খাতের উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। এরপরও নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক কায অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রীদের সাথে মতবিনিময় করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের নেতেৃত্বে রাজনৈতিক নতুন সরকার গঠন হয়। একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সরকারের সময় জেলা প্রশাসক সম্মেলন হতে যাওয়ায় মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্রই নতুন মাত্রা ও কৌতূহল জেগেছে।

সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার থাকার ফলে সংসদ সদস্য (এমপি) ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণ অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অতীতের এমন ঘটনা বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলে এমনটি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে কোন কোন জেলা প্রশাসক সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত চেয়েছেন মাঠ প্রশাসনে কর্মরত থাকা কোন কোন ডিসি।

প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গত ২০১২ সাল থেকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দলীয় ভাবে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা ডিসি-ইউএনওদের নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিলো। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কথা না শুনলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হুমকিসহ বদলি এবং বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকরের মতো ঘটনা চাপিয়ে দেয়া হতো। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বারোপ করেন।

এছাড়াও জেলা প্রশাসকরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মঅধিবেশনে মাঠ পর্যায়ে কর্মসম্পাদনকালে যে সকল আইনগত, প্রশাসনিক, আর্থিক কিংবা অন্যবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন তা উত্তরণের জন্য মন্ত্রী উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব ও সচিবদের সরাসরি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এছাড়াও স্ব স্ব জেলায় যে সকল সম্ভাবনা বিদ্যমান সেসব বিষয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে সরাসরি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগের, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, সিনিয়র সচিব, সচিবগণের উপস্থিতিতে আলোচনা করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পন্থা নির্ধারণ করা হয়। পাশপাশি বিদ্যমান সম্ভাবনা সমূহকে কাজে লাগানোর উপায় নির্ধারণ করা হবে। মন্ত্রণালয়-বিভাগসমূহের নীতি-কৌশল ও গৃহীত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে ডিসিদের ধারণা দেওয়া হবে। পর্যটন বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসেবা বৃদ্ধি এবং পন্থায় সরকারের নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে নির্দশনা থাকবে।

গাজীপুর জেলা মো. প্রশাসক নুরুল করিম ভুঁইয়া জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাাপন করে শিল্পকারখানা সমূহ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানান্তর করতে সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছেন। পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করে পরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে শিল্প বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে। কৃষি জমি সুরক্ষিত থাকবে, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। শিল্প কারখানা মনিটরিং সহজ হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর লক্ষ্য পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মিজ সোহানা নাসরিন প্রস্তাবনায় বলেন, দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় সরকারি হাসপাতালে প্রবীনদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছেন। স্বপক্ষে বলেন, বর্তমান হাসপাতাল ব্যব¯’াপনায় দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভিড়ের কারণে প্রবীনরা যথাযথ সেবা পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হন। প্রবীন রোগীদের সাধারণত একাধিক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগ থাকে, যা বিশেষ মনোযোগ ও পৃথক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। আলাদা বা অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করলে রোগী প্রবাহ ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিদিন নানা গুজব রুখতে জেলা পর্যায়ে ফ্যাক্ট চেকিং সেন্টার স্থাপন করার প্রস্তাবও দিয়েছেন ডিসিরা। সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আইসিটি বিভাগ এটি বাস্তবায়ন করবে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) অনলাইনে প্রদান করার প্রস্তাব এসেছে জনপ্রশাসনের কাছে। সৈয়দপুরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা, কারাগারের নিরাপত্তায় ওয়াচ টাওয়ার স্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছেন ডিসিরা।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মোঃ নোমান হোসেন প্রস্তাবনায় বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিগত সময় এ সম্মেলনের উদ্বোধনী হতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। আর কার্য-অধিবেশন হতো ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। সম্মেলনে ডিসিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাবেন। তুলে ধরবেন সংশ্লিষ্ট জেলার উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কিত নানা সমস্যার বিষয়েও।

সূত্র জানায়, মুক্ত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কথা শুনেন এবং দিকনির্দেশনা দেন। এ বছর জেলা, বিভাগ ও মন্ত্রণালয় থেকে ১৭২৯টি প্রস্তাব আসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে ৪৯৮ প্রস্তাব উঠেছে সম্মেলনে।