যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ যেকোনো সময় আবারও শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ‘দুঃসাহসিকতা বা বোকামির’ কড়া জবাব দিতে তেহরান ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ রয়েছে বলেও ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। ইরানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’

কারণ হিসেবে ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। তেহরানের মূল্যায়ন হলো, যুদ্ধ শুরুর আগের আলোচনা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই ইরান যথেষ্ট নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। গালফ নিউজ, এএফপি, মিউল ইস্ট মনিটর, আনাদুলো এজেন্সি, আল জাজিরা।

ইরানের দাবি, তারা যখনই তাদের দাবি কিছুটা শিথিল করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ততবারই আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।

কিছু অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান করা শান্তি প্রস্তাবটিতে ইরান তাদের কিছু দাবি বাদ দিয়েছিল। এর মধ্যে অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিও ছিল। এখন ইরান বলছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বড় বিষয় নিয়ে আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা ও ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার’ বিষয়গুলোর সুরাহা করতে হবে। তবে বর্তমানে দুপক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। ইরান বলছে, আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তাদের ‘আত্মসমর্পণ’ করতে বলছে, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে তেহরানের ধারণা, যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেই অনুযায়ীই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে আরও কড়াকড়ি বিশেষ বলয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা

নিজেদের দক্ষিণ উপকূলীয় জলসীমায় নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণে ‘নতুন নিয়ম’ ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতেই মূলত এ পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরজিসি নৌ শাখার কমান্ড থেকে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আরব উপসাগর থেকে শুরু করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত ইরানের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বলয় গড়ে তোলা হবে।

বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো, এ জলসীমাকে ‘ইরানের মানুষের জন্য গর্ব ও শক্তির উৎস’ এবং ‘এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা। প্রেস টিভি জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেওয়া এক নির্দেশনার পরদিন এই ঘোষণা এল। ওই নির্দেশনায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা আরব উপসাগরকে লক্ষ্য করে নীলনকশা সাজাচ্ছে, সেসব বিদেশিদের জন্য এই অঞ্চলে কোনো জায়গা নেই, একমাত্র সমুদ্রের তলদেশ ছাড়া তাদের আর কোথাও ঠাঁই হবে না।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট করেছে ফ্রান্স। গতকাল শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো এ ঘোষণা দেন। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এক সাক্ষাৎকারে জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘এই সংকট শুরুর পর থেকেই ফ্রান্স যুদ্ধে জড়ায়নি। আমরা আগেই বলেছি, যুদ্ধের লক্ষ্য পরিষ্কার না হওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই অভিযান চলায় ফ্রান্সের পক্ষে এতে অংশ নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’ আলোচনার মাধ্যমে শত্রুতা নিরসনের ওপর জোর দিয়ে জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা এ যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলাম। সবাই দেখছে, যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি কতটা বেশি। বিশ্ব অর্থনীতি ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।’ ইরান উপকূলে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আবার খুলে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, ওই এলাকায় নৌচলাচল স্বাভাবিক করতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।বারো আরও বলেন, ‘ কোনো প্রণালিতেই কোনো ধরনের বাধা, ব্ল্যাকমেইল বা টোল আদায় সহ্য করা হবে না। আন্তর্জাতিক জলসীমায় কেউ কোনোভাবেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে না।’ উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করে। জবাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ হয়ে যায়।

শি-ট্রাম্পের বৈঠকে যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ অন্যতম প্রসঙ্গ হবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আলোচনায় হরমুজ প্রণালির বন্ধ থাকার প্রসঙ্গ প্রাধান্য পাবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের দূত ফু কং এ কথা জানিয়েছেন। চীনের দূত ফু কং বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রসঙ্গ আলোচনায় ‘জরুরি’ অগ্রাধিকার হবে। তিনি আরও বলেছেন, যদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বেইজিং সফরের সময় প্রণালিটি বন্ধ থাকে, তবে এই বিষয়টি আলোচনার উপরের দিকে থাকবে।

ট্রাম্প ১৪ মে দুই দিনের সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছার কথা। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

ইয়েমেন উপকূল থেকে তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই

ইয়েমেন উপকূল থেকে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই করে নিয়ে গেছে সশস্ত্র ব্যক্তিরা। ইয়েমেনের উপকূলরক্ষী বাহিনী (কোস্টগার্ড) এ কথা জানিয়েছে। কে বা কারা এই ছিনতাইয়ে জড়িত তা নিশ্চিত করতে পারেনি তারা।

কোস্টগার্ড জানায়, একদল অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তি শাবওয়া প্রদেশ সংলগ্ন উপকূলে ‘এম/টি ইউরেকা’ নামের তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। আক্রমণকারীরা ট্যাংকারে উঠে সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, পরে সেটি এডেন উপসাগর হয়ে সোমালিয়া পানিসীমার দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে।

এর আগে, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছিল, মুকাল্লা বন্দর থেকে ৮৪ নটিক্যাল মাইল (১৫৫ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি ‘বাল্ক ক্যারিয়ার’ জাহাজ থেকে তাদের কাছে একটি বার্তা আসে। ওই বার্তায় জানানো হয়, সন্দেহভাজন একটি সবুজ রঙের ছোট নৌকা এবং একটি মাছ ধরার ট্রলার ওই জাহাজের দিকে ধেয়ে আসছে।