ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদির দাফন শেষে শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল শনিবার বিকাল ৪টা থেকে তারা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। হাদি হত্যার প্রতিবাদে ও দায়ীদের গ্রেফতার-বিচারের দাবিতে তারা সেখানে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। তাদের একের পর এক স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো শাহবাগ এলাকা। শাহবাগের কিছুটা দূরে নিউ এলিফ্যান্ট রোড থেকেও মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যেতে দেখা গেছে অনেনকে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘দিল্লী না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’, ‘মোদি না হাদি? হাদি হাদি’ স্লোগানে এলাকা প্রকম্পিত করেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পদত্যাগ না করলে শিক্ষার্থী-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দুই দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। একটা হলো- ওসমান হাদিকে হত্যাকারী, হত্যার পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারীসহ সবাইকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আরেকটা হলো- সিভিল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে আওয়ামী দোসরদের অতিদ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, ‘ওসমান হাদীর খুনিদের গ্রেপ্তারে আমরা দুইটা ঘোষণা আমরা দিচ্ছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীকে জনতার সামনে আইসা বলতে হবে যে, এই এক সপ্তাহে সে কী অগ্রগতি করেছে। যদি সে এর জবাব দিতে না পারে, তাহলে তাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে জাবের বলেন, ‘যখন এই গুলির কথা বলা হয় তখন আপনি পেঁয়াজ-রসুনের আলুর আলাপ দেন। আপনি কীসের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মিয়া? একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার যেই ধরনের ভারিক্কি দরকার ওইটা কি তার মধ্যে আছে? আমরা জুলাই পরবর্তী যারা আসছে প্রত্যেককেই সম্মান করতে চাই কিন্তু সম্মান করায় আমাদের কঅ উপকার হইছে? আমরা উসমান হাদিরে হারাইছি।’

আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওসমান হাদিকে যারা খুন করেছে, খুনের পরিকল্পনা করেছে, খুনিদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, খুনের সহায়তা করেছে, প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আর বিগত ১৭২ ঘণ্টায় সরকারের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আমরা জানতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে সরকারকে রক্ষা করা কিন্তু এমন দায়িত্বও নেই যে, আমার ভাই চলে যাবে এরপরেও আমি সরকারকে ধইরা রাখব। এই দায়িত্ব আমরা নেই নাই। আপনারা অতি দ্রুত খুনিকে গ্রেপ্তার করুন এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করুন।’

ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতা আরও বলেন, ‘মিলিটারি-সিভিল, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীদেরকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করুন। এরা যদি বেঁচে থাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব থাকবে না। এরা যদি বেঁচে থাকে বাংলাদেশে কোনোদিন ইনসাফ আসবে না। এরা যদি বেঁচে থাকে বাংলাদেশে কোনোদিন জুলাই সফল হবে না।’

তিনি আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘এখন ৫টা ১৫ বাজে, আগামীকাল ৫টা ১৫ মিনিটের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো জবাব না আসে আমরা আবার এইখানে আসব। কোনো ছাড় চলবে না। রক্তের সঙ্গে আমরা আর কোনো গাদ্দারি হইতে দেবো না।’

জাবের আরও বলেন, ‘আপনাদেরকে তো আমরা আলটিমেটাম জানাজার মাঠ থেকে দিয়ে আসছি ২৪ ঘণ্টা। এই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনারা যদি খুনি এবং খুনের যারা সহযোগী তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম না হন, এই জনতার ওপরে আমরা আর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেব না।’

জনতাকে কোনো কিছু না ভাঙার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের আবেগ আমি বুঝতে পারি, আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। কেউ যদি আপনাদের বুঝাই দেয় যে, অমুক জায়গা দিয়া ভাইঙ্গা ফেল, এই ভাইঙ্গা ফেলা যাবে না। আপনারা যা কিছু করছেন, এতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হইছে।’

নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী সামনে নির্বাচন রয়েছে। সামনে নির্বাচনকে যাতে বাধাগ্রস্ত করা যায় এই জন্য বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যাতে নির্বাচন না হয়, আওয়ামী লীগ যাতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে তার জন্য সবগুলো ষড়যন্ত্র।’

তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আরো বলেন, ‘যারা সরকার গঠন করছে এই জনতা তো অত্যন্ত আশা নিয়া তাদের কাছে আসছিল। কিন্তু সারাদিন সরকারের মধ্য দিয়ে তার কোনো প্রতিফলন তারা দেখতে পায় নাই। আগামী দুই-একদিন পরে গুম কমিশনের একটা রিপোর্ট প্রকাশ হবে। সুতরাং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্যই আমাদের সবাইকে শান্ত থাকতে হবে।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শাহবাগ এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশ, এপিবিএন ও বিজিবি সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল জলকামান ও এপিসি। এছাড়া হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে মিন্টো রোড অভিমুখী সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে শাহবাগ ছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির শেষ বিদায়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠেছিল পুরো রাজধানী। ওসমান হাদিকে গুলি করার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সরকার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি। বিগত এক সপ্তাহে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।

এদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় ওসমান হাদিকে দাফনের পর জনসাধারণকে শাহবাগে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানায় ইনকিলাব মঞ্চ। এরপর থেকে ‘হাদি, হাদি’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শাহবাগে জড়ো হওয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ হাদির স্মরণে শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। স্লোগান, ব্যানার ও ফেস্টুনে উঠে আসে হাদির সংগ্রামী জীবনের নানান বার্তা।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশে শরিফ ওসমান হাদিকে সমহিত করা হয়। এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ডাকসুর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাসহ হাদির পরিবার-পরিজন উপস্থিত ছিলেন দাফন শেষে হাদীর আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। আবদুল্লাহ আল জাবের আরও বলেন, ‘জীবন দিয়ে দেব, তবুও ইনসাফের লড়াই ছাড়ব না। হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব থাকবে, ইনসাফ কায়েম হবে; নয়তো আমরা রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। এসময় তিনি নারায়ে তাকবির ধ্বনি দেন আর মাঠ থেকে লাখো কন্ঠে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারিত হয়। সেইসাথে গোলামি না আজাদি ধ্বনির প্রতি উত্তরে আজাদি আজাদি প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয়।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন ওসমান হাদি। এরপর ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার সার্জারি হয়। পরে পরিবারের ইচ্ছায় তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর গত ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।