শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে: ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটিকস ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে নতুন প্রায় ৫০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও সেই কাজের জন্য দেশের তরুণরা প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। যে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে, তার জন্য আমাদের যুবসমাজ প্রস্তুত নয় বলেই আশঙ্কা করছি।
তারা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে নো কম্প্রোমাইজ। এমপিদের সন্তানদের নিজ এলাকার স্কুলে পড়াতে হবে। তাদের এলাকায় চিকিৎসা নিতে হবে। এটি হলে এমপি হওয়ার জন্য যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে ঘুরছে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না । গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত : বাজেট ও বাস্তবতা শীর্ষক সংলাপে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আয়োজনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।
সংলাপে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটিকস ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে নতুন প্রায় ৫০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও সেই কাজের জন্য দেশের তরুণরা প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। যে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে, তার জন্য আমাদের যুবসমাজ প্রস্তুত নয় বলেই আশঙ্কা করছি। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক বলেন, এখন শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলেই হবে না, শিক্ষার মান ও ফলাফল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগে আমরা শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন করেছি। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিয়ে আন্দোলন করার। শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সে মান নিয়ে বের হচ্ছে কিনা সেটাই এখন বড় বিষয়। তিনি জানান, নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি জোট গড়ে শিক্ষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। শুধু কারিগরি মতামত দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়; এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দেবপ্রিয় আরও বলেন, শিক্ষা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে আমরা যে পরিবর্তন চাই তা অর্জন করা কঠিন হবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকে পরবর্তী ধাপে যেতে হলে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন না হলে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা দূর করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষা খাত নিয়ে ছয় ধরনের প্রচলিত বয়ান বা ব্যাখ্যা রয়েছে, যেগুলোকে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের গবেষণায় চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দের পরিমাণ ও তার কার্যকর ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
দেবপ্রিয় আরও বলেন, আমরা অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে প্রাধিকার বুঝি বরাদ্দ দিয়ে। বরাদ্দ কত দেওয়া হচ্ছে, কোথায় দেওয়া হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, শিক্ষকদের মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু উপবৃত্তি দিয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষাব্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়। একটি পরিবারের আরও নানা ধরনের ব্যয় রয়েছে, যেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
শিক্ষা খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ও তলানির দিকে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললেই সরকারের টাকা থাকে না। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, অন্যান্য দেশ শিক্ষা খাতে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারলে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? এটা একবারে হবে না ঠিক, কিন্তু এক বছর পরিকল্পনা নিয়ে করতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রজেক্ট অনুযায়ী অর্থায়নে শিক্ষা খাত চলতে পারে না। ট্যাব কেনার মতো সিদ্ধান্ত, কারিকুলাম পরিবর্তন, সৃজনশীল আসা- হঠাৎ করে এসবের উদয় হওয়ার কারণ কমপ্রিহেনসিভ শিক্ষা কমিশন নেই। মান ঠিক রাখতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্যদের শিক্ষকতায় আনার মতো বেতনকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘সরকারকে বারবার টেনে জবাবদিহির আওতায় আনবেন আপনারা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেটির মেরামত শুরু করছি। নতুন প্রাইমারি কারিকুলাম তৈরির কাজ শুরু করছি। প্রাথমিকের শিক্ষকদের জন্য নতুন একটি নীতিমালা হচ্ছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি, পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠান পলিটিসাইজ করলে চলবে না।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা বাজেটে আনুষঙ্গিক বিষয় ঢোকানো হয়, যার ফলে অনেক সময় আকার বড় দেখায়। পরীক্ষার বদলে প্রাথমিকে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন থাকতে হবে। আমাদের স্থায়ী একটি শিক্ষা কমিশন দরকার। তবে সেই কমিশন যেন ঠুঁটো জগন্নাথের মতো না হয়।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে নো কম্প্রোমাইজ। এমপিদের সন্তানদের নিজ এলাকার স্কুলে পড়াতে হবে। তাদের এলাকায় চিকিৎসা নিতে হবে। এটি হলে এমপি হওয়ার জন্য যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে ঘুরছে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। প্রত্যেক স্কুলে নতুন বিল্ডিংয়ের আগে পুরোনো বিল্ডিংয়ের অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা মাহমুদা মিতু অতীতে শিক্ষা খাতে হওয়া দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ইউনেস্কো বাংলাদেশের হেড অব এডুকেশন নোরিহিদে ফুরুকাওয়া, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মো. নূরুল হক, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান, ইয়ুথ পলিসি ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আমের মোস্তাক আহমেদ প্রমুখ।