মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী

বৃষ্টির পানি জমে আছে নগরীর বিভিন্ন বাড়ির ছাদে, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে, পরিত্যক্ত পাত্রে ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রীতে। সেই জমে থাকা পানিতেই নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। নগরীতে মশার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহীর ব্রেটো সূচক ৬১ দশমিক ৩৩। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উচ্চ ঝুঁকির সীমা ২০-এর তিন গুণেরও বেশি। মাত্র দুই মাস আগে গত মে মাসে এই সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬।

অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৮ জন। গত ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২১ জন। হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, ১৩ জুন চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী ছিলেন মাত্র একজন। ৩০ জুলাই এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ জনে। এরপর আগস্টে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। অর্থাৎ আড়াই মাসেরও কম সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের ফলাফল ও হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা দুই দিকের এই পরিসংখ্যান রাজশাহীতে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে চলতি আগস্টে নগরীর কাজিহাটা, চন্ডীপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হয়। ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এতে বাড়ির সূচক দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশ। একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতে মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পাত্রের সূচক দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ জরিপে পরীক্ষা করা প্রায় প্রতি তিনটি পানি ধারণকারী পাত্রের দুটিতেই এডিসের লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ৬৮৫টি মশার লার্ভা। এর মধ্যে ৫০৫টি এডিস অ্যালবোপিকটাস, ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি এবং ৯৪টি অন্যান্য প্রজাতির মশার লার্ভা। এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টি উভয়ই ডেঙ্গু সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত বাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু মশার সংখ্যা নয়, কোন প্রজাতির মশা কোথায় এবং কী ধরনের পরিবেশে বংশবিস্তার করছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এডিস মশার জন্য বড় কোনো জলাশয় প্রয়োজন হয় না। সামান্য পরিমাণ পরিষ্কার বা জমে থাকা পানিও তাদের প্রজননের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। ফলে নগরীর বাসাবাড়িতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাত্র, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, বোতল, নির্মাণসামগ্রী কিংবা ছাদে জমে থাকা পানিই সম্ভাব্য প্রজননস্থল।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রাজশাহীর সর্বশেষ ব্রেটো সূচক ৬১ দশমিক ৩৩, যা উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণেরও বেশি। তিনি জানান, গত মে মাসের জরিপেও নগরীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। তখন ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। দুই মাসের ব্যবধানে সূচক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের এই তথ্যকে শুধু একটি কীটতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণ দুটি প্রবণতার মধ্যে সময়গত মিলও দেখা যাচ্ছে।

রাজশাহী সিটি করর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার গণমাধ্যমকে বলেন, সিটি করর্পোরেশনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে সিটি করর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম চললেও মশার ঘনত্ব কমার পরিবর্তে বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, মশকনিধন কার্যক্রমের ধরন, নিয়মিততা ও কার্যকারিতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?

এদিকে রামেক হাসপাতালের পরিস্থিতি ডেঙ্গুর বর্তমান বিস্তারের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র। গত ১৩ জুন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন একজন ডেঙ্গু রোগী। ৩০ জুলাই সেই সংখ্যা হয় ৯। আর ২৮ আগস্ট এসে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের ভর্তি। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ২১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি কয়েক ঘণ্টায় নতুন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসছেন। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালের প্রস্তুতি রয়েছে। এখন বৃষ্টির সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। রাজশাহীতে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী দিনগুলো নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একদিকে বর্ষাকাল অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।