যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর বাংলাদেশী পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির লাশ শনাক্ত হওয়ার খবর দেন হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ। গত ১৬ এপ্রিল ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী বৃষ্টি নিখোঁজ হন। একই দিন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন নিখোঁজ হন। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় সাত দিন পর হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর একটি আবর্জনা ফেলার কালো রঙের পলিথিনের ভেতর লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ খুঁজে পায় পুলিশ। শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার বলেন, কালো পলিথিনটি এমনভাবে মহাসড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল, ঠিক যেভাবে মানুষ আবর্জনা ভর্তি কালো পলিথিন ফেলে রাখে। গালফ নিউজ এএফপি, মিডল ইস্ট মনিটর টাম্প বে-২৮।

যেদিন লিমনের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়, সেদিনই সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে তার রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু বৃষ্টির কোনো হদিস মিলছিল না, যদিও পুলিশ আবুঘরবেহর গাড়ির ভেতর বৃষ্টির রক্তের দাগ খুঁজে পেয়েছিল। বৃষ্টির বেঁচে না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও লাশ কিছুতেই মিলছিল না। ২৪ এপ্রিল লিমনের লাশ খুঁজে পওয়ার দুদিন পর ২৬ এপ্রিল ম্যানগ্রোভ এলাকায় কয়েকজন মাছশিকারি কায়াক চালানোর সময় একটি কালো রঙের পলিথিন দেখতে পান। হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে যেখানে লিমনের লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে, এলাকাটি এর কাছেই। পুলিশে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিনের ভেতর মরদেহের খণ্ডিত অংশ দেখতে পায়। তবে খণ্ডিত অংশগুলো এমন অবস্থায় ছিল যে পুলিশ সেগুলো শনাক্ত করতে পারছিল না। এমনকি খণ্ডিত অংশগুলো নারী নাকি পুরুষের, সেটাও বোঝা যাচ্ছিল না। পরে আদালতে জমা দেওয়া একটি ফৌজদারি মামলার হলফনামায় বলা হয়, ২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণে একটি লাশ (খণ্ডিত অংশ) উদ্ধার করা হয়। ওই মরদেহের খণ্ডিত অংশে জড়ানো পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে শেষবার নাহিদা বৃষ্টিকে দেখা যাওয়ার সময় তার পরনে থাকা পোশাকের মিল রয়েছে। অবশেষে ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে এসে হিসলবরো কাউন্টি শেরিফ নিশ্চিত করেন, রোববার উদ্ধার খণ্ডিত লাশটি বৃষ্টির। শেরিফ ক্রোনিস্টার জানান, বৃষ্টির লাশের অবস্থার কারণে তাকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পুলিশকে ডেন্টাল রেকর্ড ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল তা সম্পন্ন হয়েছে। লিমনের পাশাপাশি বৃষ্টির লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী মার্কিন তরুণ আবুঘরবেহকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। আদালত তাকে জামিন দেননি। তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

২৩ এপ্রিল তদন্তে বড় অগ্রগতি

লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে বলে জানান শেরিফ ক্রোনিস্টার। তিনি বলেন, গত ২৩ এপ্রিল গোয়েন্দারা লিমনের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কাছের একটি বড় ডাস্টবিনের ভেতর রক্তমাখা কিছু জিনিসপত্র খুঁজে পান। এরপরই হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয় লিমন ও বৃষ্টিকে ‘নিখোঁজ ও বিপদাপন্ন ব্যক্তি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। সেখান থেকে গোয়েন্দারা আরও তদন্তের জন্য ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ বের করেন এবং লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে তার রান্নাঘর ও আবুঘরবেহর শোবার ঘরের ভেতর রক্তের চিহ্ন খুঁজে পান।

শেরিফ বলেন, ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিছানার পাশের মেঝেতে আমরা একটি মানুষের দেহের ছাপ দেখতে পাই, যেটি ভ্রূণের মতো গুটিয়ে থাকা অবস্থায় ছিল।’ আবুঘরবেহর গাড়ি তল্লাশি করে সেখানে বৃষ্টির রক্ত পাওয়া যায় বলেও জানান শেরিফ।

আবুঘরবেহর সাম্প্রতিক কেনাকাটার ইতিহাসও হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের গোয়েন্দাদের নজরে আসে। আবুঘরবেহ সম্প্রতি আবর্জনা ফেলার বড় আকারের কালো রঙের পলিথিন ব্যাগ, ওয়াইপস, দাহ্য তরল ও একটি লাইটার কিনেছিলেন। দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার আগে সন্দেহভাজন নিজের ফোনে উদ্বেগজনক নানা বিষয় নিয়ে খোঁজখবর করেছেন বলেও তদন্তকারী কর্মকর্তারা দেখতে পান। শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘তিনি এমন কিছু খোঁজ করেন যেমন-একটি ছুরি কি মাথার খুলি ভেদ করতে পারে? প্রতিবেশী কি বন্দুকের শব্দ শুনতে পায়?ৃ একটি লাশ কি ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে (বড় ডাস্টবিন) ফেলে দেওয়া যায়?’ ডেপুটিরা জানিয়েছেন, আবুঘরবেহর ফোনের ‘লোকেশন হিস্টোরি’ থেকেও তথ্য পাওয়া যায়, যা শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দাদের লিমনের লাশের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

২৪ এপ্রিল লিমনের লাশ উদ্ধার

পরের দিন ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর একটি কালো ব্যাগের ভেতর লিমনের লাশ পাওয়া যায়। শেরিফ জানান, তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে এবং তার হাত ও পা বাঁধা অবস্থায় ছিল। আঙুলের ছাপ মিলিয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চিত করেন, লাশটি লিমনেরই। শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘লিমনের পা নিতম্বের দিকে ভাঁজ করা ছিল এবং প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল, যাতে লাশ ভাঁজ করে একবারে আবর্জনার ব্যাগে ভরা সহজ হয়। একটি হত্যাকাণ্ড যতা ভয়াবহ হতে পারে, এটা ঠিক তাই ছিল। লিমনের লাশ এমনভাবে মহাসড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল, ঠিক যেভাবে আবর্জনা ভর্তি ব্যাগ ফেলে রাখা হয়।’ একই দিনে লাটজ এলাকা থেকে একটি পারিবারিক সহিংস ঘটনার জন্য সন্দেহভাজনের পরিবার ৯১১ নম্বরে ফোন করেন। পরে সেখানে গিয়ে পুলিশ আবুঘরবেহকে হেফাজতে নেয়।

২৬ এপ্রিল লাশের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে আরও বলা হয়, দুদিন পর রোববার কায়াক চালানোর সময় কয়েকজন ব্যক্তি ম্যানগ্রোভ এলাকায় কালো ব্যাগের ভেতর মানবদেহের খণ্ডিত অংশ খুঁজে পান। যেখানে লিমনের লাশ পাওয়া যায়, এই জায়গাটি তার কাছাকাছি। একটি ফৌজদারি রিপোর্টের হলফনামায় বলা হয়েছে, ২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণে যে মরদেহের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে, সেটিতে মোড়ানো পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজে নাহিদা বৃষ্টির পরনে শেষবার দেখা পোশাকের মিল রয়েছে। গত শুক্রবার শেরিফ ক্রোনিস্টার জানান, বৃষ্টির মরদেহের অবস্থার কারণে তাকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পুলিশকে ডেন্টাল রেকর্ড ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, ‘তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথমে জানাতে হয়েছে, তাদের প্রিয়জন নিখোঁজ। পরে আবার কল করে জানাতে হয়েছে, তাদের খুঁজে পাওয়া গেছে, কিন্তু তারা মারা গেছেন। এরপর আরও কিছু বিস্তারিত জানাতে হয়েছে—কীভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তাদের বহুবার ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। এটি মার্কিনদের যেসব মূল্যবোধ রয়েছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’ তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, লিমন ও বৃষ্টিকে একই সময়ে হত্যা করা হয়েছিল কিনা।

একজন সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন, কীভাবে বৃষ্টি লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছায়, শেরিফ ক্রোনিস্টার উত্তর দেন, ‘তারা ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করছিল।’ পুলিশের কাছে তাদের মধ্যে হওয়া বার্তা রয়েছে জানিয়ে শেরিফ আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে তাদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া সেই বার্তাগুলো রয়েছে, যেগুলো থেকে আমরা বিশ্বাস করি, কোনো এক পর্যায়ে তারা একসঙ্গে ছিলেন।’ শেরিফ জানিয়েছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো হত্যাকাণ্ডের ‘মোটিভ’ নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। লিমন ও বৃষ্টির লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহকে করাবন্দী করে রাখা হয়েছে। আদালত তাকে জামিন দেননি। তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।