সরদার আবদুর রহমান, রাজশাহী ব্যুরো
চলতি সপ্তাহে নেপালে সংঘটিত বিপর্যয়ের জেরে পাহাড়ি ঢলের বিপুল প্রবাহ গঙ্গা নদীতে প্রবেশ করছে। বর্ষা মওসুমে এমনিতেই নদী পানিতে ভরপুর থাকে। এর মধ্যে নতুন করে আসা পানির তোড়ের চাপ বাড়াচ্ছে ফারাক্কা ব্যারেজের মুখে। এরমধ্যে নেপালে আবারো পাহাড়ি ঢল নামার পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে।
এদিকে ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ার দাবি করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গেট খোলার ব্যাপার আগেও ঘটেছে। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আগাম সতর্ক করতে দেখা যায় না ভারতের পক্ষ থেকে। ভারতের একটা নির্মম নীতি হলো, পুরো শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারেজের গেটগুলো বন্ধ রাখা হয় এবং কোনো চুক্তি অনুযায়ী কিংবা প্রতিবেশির প্রতি সাধারণ সহমর্মিতার পরিবর্তে কুটিল বুদ্ধি প্রয়োগ করে যতোটা সম্ভব কম পরিমাণ পানি নিষ্কাশন করা হয়। অন্যদিকে ভরা বর্ষায় অধিকাংশ গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশের ভরাট হয়ে থাকা নদীতে প্লাবন সৃষ্টি করা হয়।
বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন, নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট পানির পাহাড়ি ঢল ভারতের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে এবং দেশের মধ্যাঞ্চলের নদনদীর পানি বৃদ্ধি করতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের ভোতি কোশি ও ত্রিশুলি নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট এই প্রবাহ ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ হয়ে বাংলাদেশের নদীপ্রবাহকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট পানি ভোতি কোশি ও ত্রিশুলি নদী হয়ে নারায়নি-গন্ধক নদীব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের বিহারের দিকে নামছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের পক্ষ থেকে গন্ধক বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়ায় সেই পানি গঙ্গা নদী হয়ে ফারাক্কা পয়েন্ট অতিক্রম করে পরবর্তীতে বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই দূরবর্তী পাহাড়ি ঢলের কারণে বাংলাদেশের নিচু অঞ্চলে পানি বাড়লেও তা বড় ধরনের আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি করবে কি না, তা নির্ভর করছে স্থানীয় নদ-নদীর বর্তমান পানির স্তরের ওপর। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, উজানের কোনো পরিবর্তন এখানে সরাসরি একই রূপে না এলেও নদীর প্রবাহ, বন্যার ধরন এবং পানির মৌসুমি বণ্টনে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ঘটনাটিকে বর্ণনা করছেন ‘মাটির সুনামি’ হিসেবে। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবাহটি শুধু পানি ছিল না- এর সঙ্গে ছিল বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে এগুতে থাকায় এই প্রবাহ ক্রমে আরো বড় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ভাটির জনপদ, সড়ক ও অবকাঠামোর ওপর আছড়ে পড়ে।
কোশী থেকে বিপদের শঙ্কা
‘কোশী’ নদী গঙ্গার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ উৎস হিসেবে পরিচিত। নেপাল থেকে আসা হিমালয়ান এই নদীর নেপালী নাম ‘সপ্তকোশী’। নদীটির প্রধান জলধারাগুলো তিব্বতের হিমালয় অঞ্চল ও মাউন্ট এভারেস্টের আশেপাশের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। নেপালে প্রবেশ করার পর কোশীর প্রধান সাতটি উপনদীÑ অরুণ, তামর, সুনকোশি, দুধকোশী ইত্যাদি একত্রে মিলিত হয়, যে কারণে একে ‘সপ্তকোশী’ বলা হয়। নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে নদীটি ভারতের বিহার রাজ্যের হনুমাননগর ও ভীমনগর হয়ে প্রবেশ করে। দীর্ঘ প্রায় ৭২৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কোশী নদী ভারতের বিহারের কুরসেলা বা পূর্ণিয়ার কাছে গঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। ফলে এই নদী চীন, নেপাল ও ভারতের নদী হলেও গঙ্গার প্রধান প্রদায়ক হবার কারণে এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থও সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। কোশীর প্রবাহ ব্যাহত হলে অথবা উপচে পড়লে গঙ্গাতেও তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এবার বেশ কয়েকটি নদীর বর্ধিত প্রবাহের চাপ পড়ছে এই কোশীর উপর।
ফারাক্কার গেটগুলো
খুলে দেয়ার দাবি
সপ্তকোশীসহ কোশী নদীর চাপ ছাড়াও একই সঙ্গে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বাড়তে থাকায় ভারতের বিহারে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ব্যারেজের সব গেট খুলে দিলে ভাটিতে পানির প্রবাহ বাড়বে এবং বিহারে গঙ্গার পানির চাপ কিছুটা কমতে পারে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে এ অনুরোধ জানান সম্রাট। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি জানান তিনি। তবে সূত্রমতে, বিষয়টি দুই রাজ্য বা মুখ্যমন্ত্রীর বিষয় নয়। তারা এই বিষয়ে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের। উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত এই ব্যারেজে ১০৯টি কপাট বা গেট রয়েছে। গেটগুলো খুলে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশে এর কী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে নানা আশংকা বিরাজ করছে।
আগাম সতর্কীকরণ নেই
ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ার আগে বাংলাদেশকে কি সতর্ক করা হয়? এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়ে থাকে, সাধারণত বর্ষাকালে ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট প্রাকৃতিকভাবেই খোলা থাকে। বর্ষার মৌসুমে (জুলাই থেকে অক্টোবর) অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে আলাদা করে কোনো বিশেষ আগাম সতর্কবার্তা বা নোটিশ দিয়ে গেট খোলার রেওয়াজ নেই, কারণ এ সময় গেটগুলো খোলাটাই স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা। তবে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিত পানিপ্রবাহের তথ্য ও উপাত্ত আদান-প্রদান করা হয়। জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধের সবগুলো গেট এখন পর্যন্ত খুলে দেয়া হয়নি।
এবিষয়ে বিশিষ্ট নদী গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া কোশী নদী নেপাল হয়ে ভারতের বিহারে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ কোশী হলো গঙ্গার অন্যতম প্রদায়ক নদী। নেপালে যে বিপর্যয় হলো তার বিপুল জলধারা এসব উপনদী হয়ে কোশীতে পতিত হচ্ছে। আর কোশীর প্রবাহে ফুলে ফেঁপে উঠছে গঙ্গা। এখন এর চাপ ফারাক্কা ব্যারেজ কতোটা নিতে পারবে তার উপর পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করছে। এ অবস্থায় ফারাক্কার গেটগুলো খুলে দেয়ার সম্ভাবনা আছে। ইতোমধ্যে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী গেটগুলো খুলে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন। মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, এরই মধ্যে গেটগুলো খুলে দেয়া হবে কিনা তাও এখনই বলা যাচ্ছে না। আর এমন কাজ ভারত অতীতেও করে এসেছে। কিন্তু এবিষয়ে বাংলাদেশকে আগাম সতর্কও করে না ভারত। ২০২৪ সালেও এমন ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন হলেও তাতে পাত্তা দেয়া হয়নি।