স্টাফ রিপোর্টার
জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হলে তা জনগণের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করবে।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’
তিনি বলেন, নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ বিষয়ে জনগণের সামনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন চট্টগ্রামে জরুরি সভা করে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রয় ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ‘পাঁয়তারা’ চলছে বলে অভিযোগ করেছে। ফেডারেশনের নেতারা এ উদ্যোগকে সরকারের জন্য আত্মঘাতী এবং দেশের জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল অর্থের ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে এ সক্ষমতা হাতেগোনা কয়েকটি গোষ্ঠীর রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান খারাপ চললে তাকে সংস্কার করা যায়। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানি দাম বাড়ালে জনগণের হাতে কিছুই থাকে না।
বিপিসিকে অদক্ষ বা লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় দাবি করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
তিনি বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিপিসির লোকসান ছিল ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। তবে পরবর্তী দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি আবারও হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। চলমান সংকটকে ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা না বলে ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি দাবি করেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরও ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করে দেশে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসিকে দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন বলেন, ‘এই ভর্তুকির বোঝা কি বেসরকারি কোম্পানি বহন করবে? নাকি প্রথম দিনেই লিটারে টাকা বাড়াবে?’
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটকে বেসরকারিকরণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ।
তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র জমার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সংকটকালে দ্রুততা প্রয়োজন আমরা তা অস্বীকার করি না। কিন্তু ৪২ দিনের দরপত্র ১০ দিনে নামালে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীরা অংশ নেওয়ার সুযোগই পায় না। এর ফলে কম দরদাতা, বেশি দাম এবং সিন্ডিকেটের জন্য দুর্নীতির প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হতে পারে। এ সময় জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিমান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র কাকে নির্দেশ দেবে? কোনো কোম্পানি যদি বলে লাভ হচ্ছে না, তেল আনব না তখন কী হবে? প্রত্যন্ত চর, হাওর ও পাহাড়ি এলাকায় অলাভজনক রুটে তেল পৌঁছাবে কে?’
তিনি বলেন, বিপিসি যে কাজ লোকসান দিয়েও করে, বেসরকারি কোম্পানি কেন তা করবে, এ প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। এ সময় জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার উদ্যোগের অভিযোগও তোলেন তিনি। তার দাবি, শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের কাছে ছয়টি প্রশ্ন তুলে ধরে জামায়াত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের কোনো খসড়া নীতিমালা প্রক্রিয়াধীন আছে কি না, থাকলে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে কি না, সিদ্ধান্তের পেছনে কী সমীক্ষা ও খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করা হবে কি না।
এ ছাড়া দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে ১০ দিনে কমানোর কারিগরি ভিত্তি, বেসরকারি আমদানিকারক এলে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম কে নির্ধারণ করবে এবং আগের সরকারের সময়ে কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে জ্বালানি তেল বিপণনের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না এসব প্রশ্নেরও জবাব চেয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটিকে মুনাফার পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সীমিত মুনাফার মধ্যে সরকারের অধীনে জ্বালানি খাত পরিচালনা করাই বেশি কার্যকর বলে তিনি মত দিয়েছেন।
এ ছাড়া কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের বক্তব্য তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানিকে মুনাফার খাত নয়, সেবা খাত হিসেবে ঘোষণা করে কস্ট-প্রাইস ভিত্তিতে সরবরাহ করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখনো এমন বেসরকারি ব্যবস্থায় যাওয়ার সময় হয়নি। কোনো বেসরকারি কোম্পানির হাতে জ্বালানি খাত ছেড়ে দিলে এলপিজি খাতে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, পরিশোধিত জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ।
জামায়াতের ছয় দাবি
প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানায় জামায়াত। একই সঙ্গে খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি আয়োজন এবং বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বেসরকারিকরণের পরিবর্তে বিপিসি সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে দলটি স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি তিন মাসে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এ ছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা বাজার অর্থনীতির বিরোধী নই। আমরা বেসরকারি বিনিয়োগেরও বিরোধী নই। আমরা বিরোধী জবাবদিহিহীন হস্তান্তরের এবং দুর্নীতির সুযোগ বিস্তারের। প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আ ন ম শামছুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন, ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন উপস্থিত ছিলেন।