২০২৪ ইং সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন বিপ্লব এবং ১৮ মাসের অন্তবর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নির্বাচন এবং ক্ষমতার পালা বদলের পর হাঁটি হাঁটি পা পা করে তিন মাস পার করলো তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকার। এই সময়টুকুকে শিশু অবস্থা আখ্যায়িত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এই সময়ে বিরোধীদলসহ বিভিন্ন মহল থেকে যে সুযোগ এবং সহযোগিতা পেয়েছে তার সদ্বব্যবহার করতে পারেনি তারেক রহমানের সরকার। বলতে গেলে তিন মাসে হ য ব র ল পরিস্থিতি থেকেই বের হতে পারলো না। উল্টো জ¦ালানি তেল কেলেঙ্কারি, দলীয়করণসহ দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসনসহ নানা বিতর্কে জড়িয়েছে সরকার। নানা প্রশ্ন সরকারকে ঘিরে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য উন্নয়নের নানা ফিরিস্থি তুলে ধরা হচ্ছে। দুই মাসের পূর্তিতে সরকারের পক্ষে ৬০টি কর্মসূচির কথা জাতির সামনে তুলে ধরা হয়এগুলো হলো- ১. ফ্যামিলি কার্ড: নারীর ক্ষমতায়নে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার কার্ড দেওয়া। ২. কৃষক কার্ড: প্রান্তিক কৃষকদের ১০টি সুবিধা সংবলিত কার্ড বিতরণ শুরু। ৩. ঋণ মওকুফ: ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ। ৪. সংসদীয় গণতন্ত্র: রেকর্ড সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি এবং গুম প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান। ৫. নদী খনন: ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও জলাশয় খননের কাজ শুরু। ৬. জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ও ভর্তুকি বৃদ্ধি। ৭. সৌরশক্তি: জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য। ৮. ফুয়েল কার্ড: জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ফুয়েল কার্ডের পাইলটিং শুরু। ৯. দ্রব্যমূল্য: প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রমযান ও পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। ১০. ধর্মীয় সম্প্রীতি: ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক সম্মানী দেওয়া এবং সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ। ১১. জাকাত আধুনিকায়ন: দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক আধুনিকায়ন। ১২. প্রবাসী কার্ড: প্রবাসীদের জন্য বিশেষ কার্ড চালুর উদ্যোগ। ১৩. হজ খরচ হ্রাস: হজ¦যাত্রার খরচ ১২ হাজার টাকা কমানো ও নুসুক হজ¦ কার্ড দেওয়া। ১৪. নিয়োগ পরিকল্পনা: সরকারি অফিসের ৪ লাখ ৬৮ হাজার শূন্যপদ পূরণে ৩ মেয়াদি পরিকল্পনা। ১৫. বন্ধ কারখানা: চিনিকল, রেশম ও পাটকলসহ বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ। ১৬. ইন্ডাস্ট্রি ইকোসিস্টেম: হাই-টেক পার্ক ও ইপিজেডে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইকোসিস্টেম তৈরি। ১৭. ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি: ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। ১৮. জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা: ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার কৌশল। ১৯. বিদেশি বিনিয়োগ: বিনিয়োগ সহজীকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল। ২০. শ্রমিক অধিকার: মালিক-শ্রমিক সমন্বয়ে ঈদুল ফিতরে শতভাগ বেতন-বোনাস নিশ্চিতকরণ। ২১. মালয়েশিয়া শ্রমবাজার: অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু। ২২. ইউরোপে শ্রমবাজার: সার্বিয়া, গ্রিস ও রোমানিয়াসহ ৭টি দেশের সঙ্গে শ্রম চুক্তি। ২৩. দক্ষতা বৃদ্ধি: বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে টিটিসি ও কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। ২৪. উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন: উত্তরবঙ্গকে ‘অ্যাগ্রো প্রসেসিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ। ২৫. পে-পাল: বাংলাদেশে পে-পাল ও গ্লোবাল পেমেন্ট গেটওয়ে আনার কাজ শুরু। ২৬. স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ: ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা, যেখানে ৮০ শতাংশই নারী। ২৭. ই-হেলথ কার্ড: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় ই-হেলথ কার্ড ও হাসপাতালের নিরাপত্তা বৃদ্ধি। ২৮. শিক্ষা ফি বাতিল: প্রতিবছর পুনরায় ভর্তি ফি নেওয়া বাতিল ও বৃত্তি দ্বিগুণ করা। ২৯. উচ্চশিক্ষায় ঋণ: বিদেশে পড়তে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি। ৩০. শিক্ষক নিয়োগ: মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্তরে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ।

৩১. বাধ্যতামূলক খেলাধুলা: চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক ও নতুন ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ। ৩২. নতুন কুঁড়ি: শিশুদের প্রতিভা অন্বেষণে আবারও ‘নতুন কুঁড়ি’র যাত্রা শুরু। ৩৩. স্কুল কিট: ২ লাখ শিশুর মাঝে ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ বিতরণ এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’। ৩৪. মাদরাসা আধুনিকায়ন: মাদরাসায় স্মার্ট ক্লাসরুম ও কারিগরি কোর্স চালু। ৩৫. স্পোর্টস কার্ড: ক্রীড়াবিদদের জন্য স্পোর্টস কার্ড ও মাসিক ভাতা চালুর উদ্যোগ। ৩৬. সবুজ বনায়ন: ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু। ৩৭. মিতব্যয়িতা: যমুনার বদলে প্রধানমন্ত্রীর নিজের বাড়িতে অবস্থান ও নিজের গাড়ি ব্যবহার। ৩৮. প্রটোকল সংস্কার: ট্রাফিক জট এড়াতে ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিতকরণ ও শনিবারও অফিস। ৩৯. ডিজিটাল ভূমি সেবা: ই-নামজারি ও অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর বাধ্যতামূলক করা। ৪০. পদ্মা ব্যারেজ: উত্তরবঙ্গকে মরুকরণ থেকে বাঁচাতে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ।

৪১. মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি বাতিল: এমপি-মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। ৪২. পাটের ব্যবহার: সরকারি-বেসরকারি খাতে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলককরণ। ৪৩. ডেঙ্গু প্রতিরোধ: সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার। ৪৪. টিকাদান কর্মসূচি: বন্ধ থাকা হামের টিকা পুনরায় সারাদেশে চালু। ৪৫. চাঁদাবাজিবিরোধী অভিযান: চাঁদাবাজি বন্ধে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশের সংস্কার। ৪৬. ইলেকট্রিক বাস: ঢাকায় পরিবেশবান্ধব বাস ও নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সার্ভিস। ৪৭. নদী রক্ষা আইন: নদী দখলকারীদের ৫ বছরের জেল ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান। ৪৮. জ্বালানি সাশ্রয়: সরকারি অফিসে এসি ও লাইট ব্যবহারে কঠোর ১১ নির্দেশনা। ৪৯. মেধাভিত্তিক নিয়োগ: এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগ। ৫০. জ্বালানি নিরাপত্তা: ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ।

৫১. ফুটপাত পুনর্বাসন: ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্বাসনের কাজ। ৫২. বাকস্বাধীনতা: প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনার পরও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া। ৫৩. থার্ড টার্মিনাল: শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর পদক্ষেপ। ৫৪. ফ্রি ইন্টারনেট: দেশের বড় সব বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় ফ্রি ওয়াই-ফাই। ৫৫. ট্রেনে ইন্টারনেট: চলন্ত ট্রেন ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ইন্টারনেট সংযোগ। ৫৬. অর্থনৈতিক কূটনীতি: বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগ আকর্ষণকে দূতাবাসের অগ্রাধিকার। ৫৭. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: প্রতিবেশী ও বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে পানি ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানে জোর। ৫৮. অর্থ পাচার রোধ: ১০টি দেশের সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ শনাক্ত ও ফেরত আনার চুক্তি। ৫৯. উপকূল রক্ষা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ৬০. মানবাধিকার রক্ষা: গত দুই মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো নজির না থাকা ও আইনি সুরক্ষা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খাল খনন আর কার্ডের যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে তাতে দেশের পরিস্থিতি আর সরকারের কার্যক্রম মিলছে না। দিন দিন দেশের পরিস্থিতি এবং ভারসাম্য অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিএনপি ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

কারণ ক্ষমতা আরোহনের পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়াচ্ছে সরকার। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণ রায় বাস্থবায়নে অনিহা এবং জ¦ালানি তেল নিয়ে তেলেসমাতি, প্রশাসনের মেধাবীদের বাদ দিয়ে নগ্ন দলীয়করণ সরকারকে বিতর্কের মূখে ফেলে দিয়েছে।

বলা হচ্ছে ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকেই সরকার জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার। যাদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলো তাদের সাথে বেঈমানি করা হয়েছে। দেশের অধিকাংশ জনগণ জুলাই সনদ বাস্থবায়নের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা থেকে সরে আসায় বিরোধী দলগুলো দাবি আদায়ে আন্দোলনে মাঠে রয়েছে।

বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কোদাল দিয়ে একের পর এক খাল খনন উদ্বোধন করছেন। কিন্তু এর ব্যয় এবং এর সুফল প্রাপ্তি নিয়ে রয়েছে সন্দেহ সংশয়। দুর্নীতিমুক্তভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে মাঠ পর্যায়ে আলোচনা।

এরমধ্যে ফ্যামেলি কার্ডসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কার্ড বিতরণ প্রাথমিকভাবে শুরু করলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন কিভাবে হবে তার কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথা থেকে টাকা আসবে এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ সংশয়। এর মধ্যে প্রশাসনে দলীয় করণে সমালোচনার আগুনে ঘি ঢালার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে প্রশাসনের সবখানে দলীয়করণ করে ফ্যাসিবাদকেই ধারণ করছে বিএনপি সরকার। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিতে মানুষ ইতিমধ্যেই হাফিয়ে উঠেছে। জুলাই বিপ্লবের পরও চাঁদাবাজি মুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। এরমধ্যে জ¦ালানি তেল নিয়ে তেলেসমাতি সামগ্রিকভাবে জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জ¦ালানি তেল ছাড়াও সবচেয়ে বেশি হিমসিম খাচ্ছে হাম পরিস্থিতি সামলাতে। সামগ্রিক বিবেচনায় জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর মানুষের মধ্যে সুশাসনের যে প্রত্যাশা এবং বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল; তা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে সরকার। জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়নে আগামী দিনে সরকারের অবস্থান কি হবে সে দিকে তাকিয়ে আছে দেশবাসী।