এশিয়ান গেমস বাছাই হকিতে ব্যর্থ হয়েই দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশ হকির ইতিহাসে যা আগে কখনও ঘটেনি, এবার সেটাই ঘটছে। এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সে স্পষ্ট অবনতি দেখা যাচ্ছে। শুরুতে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে কষ্টসাধ্য জয়, এরপর ২০ বছর পর শ্রীলঙ্কার কাছে পরাজয়, আর সর্বশেষ উজবেকিস্তানের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের সঙ্গে কোনোমতে ১-১ গোলে ড্রÑসব মিলিয়ে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে পুরো হকি অঙ্গনে। অনেকেই এই ফলাফলকে লজ্জাজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই বাছাইপর্বে কোচ আশিকুজ্জামানের অধীনে খেলছে বাংলাদেশ। দল ঘোষণার শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। তবে ফেডারেশন কিংবা কোচ কেউই এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি। সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত স্বার্থই যেন প্রাধান্য পেয়েছে, যার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে মাঠের পারফরম্যান্সে। অতীতে বাংলাদেশ অধিকাংশ সময় বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন কিংবা অন্তত শেষ চারে থেকে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথমবারের মতো মূল পর্বে খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জাতীয় দলের এমন হতাশাজনক অবস্থায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাবেক কোচ মাহবুব হারুন। তিনি বলেন, ‘এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে আমরা সবসময় দাপট দেখাতাম। প্রতিপক্ষ দলগুলো আমাদের সমীহ করতো। চ্যাম্পিয়ন ছাড়া অন্য কিছু ভাবতাম না এবং অনেকবার হয়েছিও। অন্তত রানার্সআপ তো হয়েছি। কিন্তু এবার যা হচ্ছে, তা ভাবতেও খারাপ লাগছে। এটা আমাদের জন্য বড় লজ্জা।’ এই ব্যর্থতার পেছনে দল গঠন ও কোচিং স্টাফের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবাহনী লিমিটেডের উপদেষ্টা কোচও। তিনি বলেছেন, ‘যতটুকু শুনেছি, দল গঠন ঠিকভাবে হয়নি। অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়কে বাদ দেয়া হয়েছে। নির্বাচকরা নিজেরাও এই দল নিয়ে একমত ছিলেন না। মনগড়া একটি দল থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। আমার মনে হয়, কোচের দায়ও কম নয়। দেশের স্বার্থে সবসময় সেরা দল নিয়েই আন্তর্জাতিক ম্যাচে যেতে হয়। শুধু নির্বাচকদের দেওয়া তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। মাঠে তো কোচই খেলাবেনÑসুতরাং শেষ সিদ্ধান্ত তারই। সেখানে কোচ কতটা ভূমিকা রেখেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া ম্যাচে তার কৌশলও দলের নেতিবাচক পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি মনে করি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’ বর্তমানে ফেডারেশন একটি অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে চলছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে নিয়মিত ঘরোয়া হকি কার্যক্রম নেই। কেবল জাতীয় দলের কার্যক্রমই কোনোমতে চালানো হচ্ছে। অথচ এ বিষয়েও ফেডারেশনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। জাতীয় দলের আরেক কোচ মওদুদুর রহমান শুভও হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বাস্তবতা হলো, থাইল্যান্ডে আমাদের পারফরম্যান্স একেবারেই কাম্য নয়। আমরা তো শ্রীলঙ্কা বা উজবেকিস্তানের সমমানের দল নই। প্রতিপক্ষ খুব বেশি এগিয়ে গেছে, এমনও নয়। উজবেকিস্তান আমাদের রুখে দেবে বা শ্রীলঙ্কা হারাবেÑএটা মেনে নেয়া কঠিন। তাই পারফরম্যান্স কেন খারাপ হলো, সেটা সবারই খতিয়ে দেখা উচিত।’ উল্লেখ্য, এশিয়ান গেমসের হকি বাছাই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এবারও শিরোপা লক্ষ্য নিয়েই দল অংশ নেয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এশিয়ান গেমসে খেলা নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ-উজবেকিস্তান ম্যাচ ড্র হওয়ায় শ্রীলঙ্কা ৬ পয়েন্ট নিয়ে ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তান দু’দলেরই সমান ৪ পয়েন্ট থাকলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে উজবেকিস্তান রানার্সআপ হয়ে সেমিফাইনালের পাশাপাশি এশিয়ান গেমসের টিকিট নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ ‘বি’ গ্রুপে তৃতীয় স্থানে থেকে গেছে। নিয়মিত ফাইনাল খেলা দলটিকে এবার এশিয়ান গেমসে খেলতে হলে খেলতে হবে স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে জয় পেলে তারা এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। পরবর্তী ম্যাচটি হবে পঞ্চম স্থান নির্ধারণের জন্য। সজাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুর রহমান চয়ন বলেছেন,‘উজবেকিস্তান কখনোই আমাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। এবার তারা আমাদের রুখে দিয়ে প্রথম পয়েন্ট পেয়েছে এবং মূল পর্বে উঠে গেছে। আর আমরা এখনো অপেক্ষায়Ñএটা খুবই উদ্বেগজনক, মেনে নেয়া কঠিন।’