নির্ধারিত ৯০ মিনিট কিংবা অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধ—বিশ্বকাপ ফাইনালের চরম উত্তেজনাকর ম্যাচটিতে গোলের দেখা পাচ্ছিল না কোনো দলই। পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ আর আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের কঠিন প্রতিরোধে খেলা ছড়ায় চরম রোমাঞ্চ। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্থের প্রথম মিনিটে (১০৬ মিনিট) ভাঙল সেই ডেডলক। নিকো উইলিয়ামসের চমৎকার এক পাস থেকে চোখ ধাঁধানো শটে গোল করে স্পেনকে উল্লাসে ভাসান ফেরান তোরেস। এই এক গোলেই নির্ধারিত হয়ে যায় বিশ্বফুটবলের নতুন রাজার নাম।

প্রথমার্ধের খরা ও দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের তাণ্ডব

ম্যাচের প্রথমার্ধে গোল না হলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ম্যাচ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় স্প্যানিশরা। ৪৬ মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের এক ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে আক্রমণে ওঠেন আলেক্স বায়েনা, তবে তার নেওয়া শটটি দক্ষতার সাথে সামলে নেন আর্জেন্টাইন প্রাচীর এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৫২ মিনিটে মাঠের উত্তেজনা রূপ নেয় খেলোয়াড়দের হাতাহাতিতে; বদলি হিসেবে নামা পারেদেস স্পেনের রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখলে দুই দলের খেলোয়াড়রা উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।

৫৫ মিনিটে স্পেনের নিশ্চিত এক আক্রমণ নস্যাৎ করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। এর ঠিক এক মিনিট পরেই (৫৬ মিনিটে) গোললাইন থেকে বল রক্ষা করে আর্জেন্টিনাকে বাঁচান গঞ্জালো মন্টিয়েল। ৬৪ মিনিটে দানি ওলমোর একটি জোরালো শট মার্টিনেজের হাত ফসকে গেলেও তা লাইনের বাইরে চলে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আলবিসেলেস্তেরা।

একের পর এক পরিবর্তন ও মার্টিনেজের অতিমানবীয় রূপ

আক্রমণের ধার বাড়াতে ৬২ মিনিটে স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে একসাথে জোড়া পরিবর্তন আনেন। মিকেল ওইয়ারসাবালের জায়গায় ফেরান তোরেস এবং ফাবিয়ান রুইজের বদলে নামানো হয় পেদ্রিকে। এরপর ৭৫ মিনিটে আলেক্স বায়েনার পরিবর্তে নিকো উইলিয়ামস এবং দানি ওলমোর বদলে মাঠে আসেন মিকেল মেরিনো।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে বিরতির পর বাধ্য হয়ে একের পর এক পরিবর্তন করতে হয়। পারেদেসকে নামানোর পর চোটের কবলে পড়ে মাঠ ছাড়েন দুই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার গঞ্জালো মন্টিয়েল ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। এছাড়া রদ্রিগো ডি পলের জায়গায় মাঠে নামানো হয় জুলিয়ানো সিমেওনেকে।

৬৫ মিনিটের পর থেকে আর্জেন্টিনার ওপর দিয়ে স্প্যানিশ আক্রমণের সুনামি বয়ে যায়। লামিনে ইয়ামালের জাদুকরী ড্রিবলিং, পেদ্রি, তোরেস, লাপোর্ত এবং পাও কুবার্সির একের পর এক আক্রমণ একা হাতে প্রতিহত করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। বিশেষ করে ৬৭ মিনিটে ইয়ামালের ক্রস থেকে তোরেসের হেড এবং ৮০ মিনিটে লাপোর্তের হেড যেভাবে মার্টিনেজ রুখে দিয়েছেন, তা ছিল এককথায় অবিশ্বাস্য।

পরিসংখ্যানে স্পেনের আধিপত্য ও ম্লান মেসি

ম্যাচের পরিসংখ্যান স্পষ্ট জানান দিচ্ছিল স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা। ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলবার লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে দীর্ঘতম শটহীন থাকার রেকর্ড। স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের কড়া মার্কিংয়ের কারণে পুরো ম্যাচে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির বল স্পর্শ ছিল মাত্র ২২ বার। অন্যদিকে, স্পেনের তরুণ তুর্কি ইয়ামাল পুরো ম্যাচে ৫টিরও বেশি সফল ড্রিবল করে নজর কাড়েন। ২০১৪ সালের ফাইনালে মেসির করা ৭টি সফল ড্রিবলের পর কোনো ফুটবলারের ফাইনালে এটিই প্রথম এমন কীর্তি।

এনসোর লাল কার্ড ও অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট ছিল নাটকে ঠাসা। ৮২ মিনিটে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন এনসো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। মাঝমাঠে একটি আলগা বলের দখল নিতে গিয়ে স্পেনের পাও কুবার্সির ওপর অত্যন্ত বিপজ্জনক ট্যাকল করে বসেন এনসো। রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ আর কোনো দ্বিধা না করে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন।

১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনার ওপর শেষ মুহূর্তে চড়াও হয় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকে জোরালো শট নিলেও আবারও তা ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ। অতিরিক্ত চার মিনিটসহ মোট ১০০ মিনিটের খেলা শেষে ম্যাচ টাই ব্রেকারে না গিয়ে গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।

১০ জনের দল নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে শিরোপা বাঁচানোর কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে আর্জেন্টিনা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেসের সেই যুগলবন্দী আর ঠেকাতে পারেনি ১০ জনের আলবিসেলেস্তেরা। তোরেসের সেই জয়সূচক গোলেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে ট্রফি নিজেদের করে নেয় স্পেন।