জমকালো ও বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ১৬টি শহরে দীর্ঘ এক মাস ধরে চলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলো বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে। ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ, রোমাঞ্চকর সব ম্যাচ আর কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনায় ঘেরা ২৩তম বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। মাঠের লড়াইয়ের রোমাঞ্চের পাশাপাশি ভাঙা-গড়ার খেলায় ফুটবল ইতিহাসের অসংখ্য রেকর্ড নতুন করে লিখিয়েছে এবারের আসর।
তারকার মেলা ও প্রথম 'হাফ-টাইম শো'
ফাইনাল ম্যাচ শুরুর ঠিক ৯০ মিনিট আগে শুরু হওয়া সমাপনী অনুষ্ঠানটি ছিল চোখধাঁধানো। বিশ্বখ্যাত ‘বালিচ ওয়ান্ডার স্টুডিও’-এর সৃজনশীল ভাবনায় গান, নাচ ও আধুনিক প্রযুক্তির মিশ্রণে ফুটিয়ে তোলা হয় বিশ্ব সংস্কৃতির মেলবন্ধন। গ্যালারিতে উপস্থিত ৮২ হাজারেরও বেশি দর্শককে সুরের মূর্ছনায় মাতান লরা পাউসিনি, নিকোল শেরজিঙ্গার এবং কিংবদন্তি ব্রিটিশ গায়ক রবি উইলিয়ামস। হলিউড সুপারস্টার টম ক্রুজের বিশেষ উপস্থিতি ও জেনিফার হাডসনের কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ছিল আমেরিকান সুপার বোল এর আদলে প্রবর্তিত প্রথম ‘হাফ-টাইম শো’। মাঠের ফুটবলের চরম উত্তেজনার মাঝেই মধ্যাহ্ন বিরতিতে কোল্ড প্লে ব্যান্ডের প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিনের তত্ত্বাবধানে ম্যাডোনা, শাকিরা, জাস্টিন বিবার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিটিএস এর ১১ মিনিটের যৌথ পারফরম্যান্স দর্শকদের মাঝে এক ভিন্নমাত্রার আলোড়ন সৃষ্টি করে। যদিও ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবির নিয়ম অনুযায়ী বিরতি সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট হওয়ার কথা, তবে এই রাজকীয় মঞ্চ তৈরি ও সরিয়ে নেওয়ার কারণে বিরতি ২০ থেকে ২৫ মিনিট দীর্ঘ হয়।
প্রথমবার দেওয়া হলো ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ ও ট্রাম্পের ট্রফি প্রদান
এবারের বিশ্বকাপে যোগ হয়েছে এক ঐতিহাসিক নতুনত্ব। আমেরিকান বাস্কেটবল বা বেসবলের আদলে এবারই প্রথম বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের জন্য বিশেষ ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ চালু করেছে ফিফা। চ্যাম্পিয়ন দলের স্কোয়াড ও কোচিং স্টাফসহ মোট ৩০ জন সদস্য এই আংটি পাচ্ছেন। পুরস্কার বিতরণীর সময় অধিনায়ক ও কোচকে প্রতীকীভাবে একই মাপের আংটি দেওয়া হলেও, পরে প্রত্যেকের আঙুলের মাপ অনুযায়ী তৈরি করে ব্যক্তিগত আংটি পৌঁছে দেওয়া হবে। ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের হাতে সোনালী ট্রফি তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
৪৮ দলের নতুন দিগন্ত ও ভেন্যুর রেকর্ড
ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ আসরটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। ৩২ দলের চেনা প্রথা ভেঙ্গে এবারই প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টে অংশ নেয় ৪৮টি দেশ। ৪টি করে দল নিয়ে মোট ১২টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলগুলো মাঠে নামে। দলের সংখ্যা বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪টিতে। শুরুতে দল সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের মাঝে মাঠের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ে সেই সংশয় কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। ছোট দলগুলোর দুর্দান্ত প্রতিরোধ, জায়ান্ট কিলিং আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোর নাটকীয়তা প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব ফুটবলের পরিধি ও মান দুটোই দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের একক কীর্তি গড়ে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।
মাঠের রোমাঞ্চ ও ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের 'বিজ্ঞাপন' ম্যাচ
১ জুন টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই প্রতিটি ম্যাচে ছিল টানটান উত্তেজনা। নক-আউট পর্বের সমীকরণ ছিল গোলকধাঁধার মতো জটিল। তবে পুরো আসরের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি। ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার সেই ম্যাচে গোলবন্যার এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী দেখেছে বিশ্ব। প্রথমার্ধের ইংল্যান্ডের কাছে ৪-০ গোলে পিছিয়ে ছিল ফ্রান্স। বিরতির পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও ফ্রান্স ৪-৬ গোলের ব্যবধানে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায়। ফলে ব্রোঞ্জ পদক নিজেদের করে নেয় ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর গত ৬০ বছরে বিশ্বমঞ্চে এটাই 'থ্রি-লায়ন্স'দের সেরা সাফল্য। ১০ গোলের এই রোমাঞ্চকর লড়াই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে।
বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানালেন যে মহাতারকারা
এই বিশ্বকাপের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক সোনালী প্রজন্মের অবসান ঘটলো। আধুনিক ফুটবলের দুই মহাতারকাÑআর্জেন্টিনাকে মহিমান্বিত করা লিওনেল মেসি এবং পর্তুগালের গোলমেশিন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তাদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি খেলে ফেললেন। এছাড়াও ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড জাদুকর লুকা মদ্রিচ, ব্রাজিলের তারকা নেইমার জুনিয়র, পোল্যান্ডের স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডোভস্কি এবং ফ্রান্সের প্রবীণ তারকাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই সর্বোচ্চ মঞ্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেন। বিশ্বমঞ্চে এই কিংবদন্তিদের শেষবারের মতো দেখতে পাওয়া ফুটবলভক্তদের জন্য ছিল এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা।
প্রাইজমানি ও আর্থিক খতিয়ান
এবারের আসরে ফিফা তাদের প্রাইজমানির অঙ্কে বড় ধরনের লাফ দিয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য মোট প্রাইজমানি রাখা হয়েছে রেকর্ড ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল পাচ্ছে রেকর্ড ৫ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা) এবং রানার্স-আপ দল পাচ্ছে ৪ কোটি মার্কিন ডলার। ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ জয়ী ইংল্যান্ড পেয়েছে ৩ কোটি এবং চতুর্থ স্থান অধিকারী ফ্রান্স পেয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই কেবল অংশগ্রহণের ফি হিসেবেই পেয়েছে ৯০ লাখ ডলার করে।
বাণিজ্যিক দিক থেকেও ২০২৬ আসরটি ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক টুর্নামেন্ট। টিকিট বিক্রি, স্পন্সরশিপ এবং রেকর্ড মূল্যে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে ফিফা এইচক্রের রেকর্ড ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয় করেছে। স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল মাধ্যমে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভিউয়ারশিপের রেকর্ড গড়েছে এই আসর।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "উত্তর আমেরিকার এই আসরটি ফুটবলকে বিশ্বায়নের এক নতুন চূড়ায় নিয়ে গেছে। বাণিজ্যিকভাবে এটি আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এবং লাভজনক বিশ্বকাপ। তবে অর্থের চেয়েও বড় বিষয় হলোÑতিনটি আয়োজক দেশের আতিথেয়তা এবং নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট প্রমাণ করেছে যে বিশ্ব ফুটবলের পরিধি ও মান কতটা শক্তিশালী হয়েছে।"
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপটি ছিল ফুটবলের আধুনিকায়ন, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির মতো প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও বাণিজ্যিক সফলতার এক নিখুঁত সংমিশ্রণ। মেসি-রোনালদোর মতো মহাতারকাদের বিদায় যেমন ফুটবলকে কিছুটা আবেগপ্রবণ করেছে, তেমনি নতুন উদীয়মান তারকাদের উত্থান প্রমাণ করেছে যে ফুটবলের ভবিষ্যৎ হাতবদল হয়ে একদম নিরাপদেই রয়েছে। সব মিলিয়ে, বৈচিত্র্য এবং উন্মাদনায় এই আসরটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সফল হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।