সানজীদ নিশান চৌধুরী
ঝড়টা যেন তৈরী হয়েই ছিল। রুমানার রিক্সাটা মোড় নিতেই ঝড়টা যেন ক্ষ্যাপা ঘাড়ের মতো রুমানার রিক্সাটার পিছে তেড়ে এলো। রিক্সাচালক রয়স্ক মানুষ। টাল সামলাতে পারলো না। রিক্সাটা গিয়ে হুমড়ি খেল একটা বাড়ির লোহার গেটে। রুমানাও তৈরী ছিল না। রিক্সা থেকে মুহূর্তে ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলো। রিক্সার একটা চাকা রুমানার বাঁ পা-টার ওপর দিয়ে দু’হাত এগিয়ে গিয়ে থামল। রাস্তা থেকে একটু ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে রুমানা এদিক
ওদিক তাকাল।
কড়।
ধুলো।
অন্ধকার।
বৃষ্টি।
চোখ মেলে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
রুমানা হঠাৎ আবিষ্কার করলো, পাশের বাড়ির মেইন গেটটা খোলা হয়েছে। এক সেকেন্ড ভাবল রুমানা। তারপর এগিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিল বাড়িটার বারান্দায়। চৈত্র মাসের শেষ দিকে আসা ঝড়। হঠাৎ এসেছে। কিন্তু থামছে না। বরং ঝড়ের সাথে হালকা বৃষ্টি।
বৃষ্টির ঝাপটা এসে রুমানাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। ঝড়ো বাতাসে রুমানা কাঁপছে। রিক্সা চালক ইতিমধ্যে রিক্সাসহ বারান্দার কাছে এগিয়ে এসেছে। রিক্সাটাকে বারান্দার পাশে ঠিক করে রেখে সে বারান্দার উপরে উঠে এলো। পিছনের দরজাটা খুলে যাওয়ার শব্দে রুমানা ফিরে তাকাল। বারো বছরের একটা ছেলে, হয়ত এ বাড়িতে কাজ করে। রুমানা কাছে এগিয়ে এসে বলল: সাহেব আপনাকে ভিতরে বসতে বলেছেন। ভেতরে এসে বসুন।
রুমানা ভাবলো, কি করবে।
এখানে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। বৃষ্টির ঝাপটা ইতিমধ্যে রুমানাকে অর্ধেকটা ভিজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে
ঘরের ভেতরে গিয়ে বসবে।
ছেলেটা আবারো বলল, এখানে শুধু শুধু ভিজছেন আপনি। ভেতরে এসে বসুন না আপা।
রুমানা এগিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে পা দিতেই চমকে উঠলো।
সামনের দেয়ালে হাতে আঁকা কয়েকটা পেইন্টিং ঝুলানো রয়েছে।
একটাতে একজন চাষি বৃষ্টির মধ্যে জমিতে হাল চাষ করছে।
আর একটাতে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। নদীতে উত্তাল ঢেউ।
তার মাঝে মাঝি পালতোলা নৌকাটাকে প্রাণপণ চেষ্টায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আর একটাতে শালবন। শাল গাছগুলোর মাথায় ঝড়ো হাওয়ার তাণ্ডব।
শাল গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে একজন পথিক এগিয়ে যাচ্ছে।
আর একটাতে পাগলা ঝড়ো হাওয়া সারাটা আকাশ-বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। আর তার মাঝে একটা দিশেহারা পাখি, ঝড়ো হাওয়ার শিকার হয়ে একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করছে। রুমানা অবাক হলো। দেয়ালে টাঙ্গানো পর পর চারটা পেইন্টিংয়ে ঝড় রয়েছে। আর রয়েছে ঝড়ের শিকার-চাষি, মাঝি, মানুষ এবং পাখি।
পঞ্চম পেইন্টিংটা কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র-আবেগ ও অনুভূতিতে পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত। পেইন্টিংয়ে একটি মুখ।
একজন তরুণির মুখ।
স্পষ্ট।
সামান্য বিষণ্ন।
চোয়াল দু’টো দৃঢ়।
কপালে ছোট্ট একটা টিপ।
গালে একটা কাটা দাগ।
তরুণির চোখ দু’টো যেন কথা বলছে।
যেন বলছে-’আমি’ হ্যাঁ, আমিই তোমার জীবনে ঝড় এনেছি। আমি ঝড় হয়ে তোমার জীবনের পর্ব আজ উল্টে-পাল্টে দিয়েছি। তরুণির ঠোঁটের কার্নিশে সামান্য হাসি ঝিলিক দিচ্ছে।
কিন্তু পেইন্টিং এর তরুণি টি কে?
যেন অত্যন্ত চেনা, একটি প্রিয় মুখ।
ঐতো পেইন্টিং এর তরুণির গালে কাটা দাগ।
রুমানা নিজের অজ্ঞাতেই নিজের গালে হাত দিল। ছোট বেলায় রুমানার গালটা পড়ে গিয়ে কেটে গিয়েছিল।
রুমানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, খেয়াল নেই। হঠাৎ চমক ভাঙে রুমানার।
: কে? রুমানা চমকে ফিরে তাকায়।
: আমি।
: তুমি আরিফ তুমি?
: হ্যাঁ আমি। দাঁড়িয়ে কেন রুমানা, বস। কেমন আছ?
রুমানা দাঁড়িয়েই থাকে। সামনের দেয়ালে টাঙ্গানো পেইন্টিংগুলোতে ঝড়ের শিকার-চাষি, মাঝি, পথিক ও পাখিকে আর একবার দেখে। তরুণির মুখ পেইন্টিংটাতে এসে চোখ দু’টো আটকে যায়। আরিফের প্রশ্নের জবাব দেয়া হয় না রুমানার। আরিফ বলে, রুমানা কই বস।
একটু থেমে বলে, আহ! তুমি দেখছি এক্কেবারেই কাকভেজা ভিজে গেছ। কিন্তু-আচ্ছা দাঁড়াও, আমার ঘরে তো শাড়ি বলতে কিছু নেই। বরং আমি তোমার জন্য একটা টাওয়েল এনে দিচ্ছি। হাত, মাথা, মুখ অন্তত মুছে নাও।
আরিফ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আর রুমানার মাথাটা যেন এক মুহূর্তে ঘুরে যায়।
সামনের বুক-শেলফটা ধরে নিজেকে কোনমতে সামলে নেয়।
কাজের ছেলেটা দু’কাপ কফি এনে টেবিলে রাখে। সাথে কিছু বিস্কিট।
টাওয়েল হাতে আরিফ রুমে প্রবেশ করে। বলে, নাও। হাত, মাথা, মুখটা মুছে এক কাপ কফি খেয়ে নাও। ভালো লাগবে। টাওয়েলটা হাতে নিতে নিতে রুমানা জিজ্ঞেস করে তোমার বৌ বুঝি কোথাও গেছেন?
: বউ?
হো হো করে হেসে ওঠে আরিফ বলে, বউ? কিন্তু রুমি আমার ঘরে বৌ আসবে কোথেকে? আমি বিয়ে করলে তো! রুমানা অবাক হয়: আরিফ তার মানে তুমি আজও বিয়েই করনি?
: নাহ্।
: কেন?
: সব কেন’র কি উত্তর আছে রুমানা? আর তাছাড়া তোমারে নিজের তো এই কেনো’র জবাব অজানা নেই। তুমি তো সবই জানো। আরিফ থামে। থেমে বলে, রুমানা, আমার কথা থাক। এবার তোমার নিজের কথা বল। তুমি কেমন আছ?
: ভাল। সংক্ষেপে উত্তর দেয় রুমানা। জানতে চায়: আরিফ, তুমি কি এখন আর ছবি আঁক না?
: না।
: না? না কেন? তোমার হাত তো কোন কালেই খারাপ ছিল না। তবে? ছবি আঁকা ছাড়লে কেন?
আরিফ অন্য কথায় চলে যেতে চায়। বলে, রুমানা, দেয়ালে ঐ টাঙ্গানো যে পেইন্টিংয়ে একজন তরুণি মুখ, ঐ ছবিটা কার?
তরুণিকে তুমি চিনতে পারছো নিশ্চয়?
: হ্যাঁ।
: জানো, বারো বছর আগে আমি ঐ তরুণির মুখখানা এঁকেছি। আর ওটা আঁকা শেষ করে আমার তুলি ব্রাশ সব ভেঙ্গে নর্দমায় ফেলে দিয়েছি।
: সে কি!
রুমানা হতবাক হয়।
অনেক্ষণ কোন কথা বলতে পারে না। চেয়ে চেয়ে পেইন্টিংয়ে আঁকা তরুণির মুখ আর সে মুখের স্রষ্টা আরিফÑ চৌধুরীকে দেখতে থাকে।
২.
এখানে এসে রুমানা আবার এ কোন ঝড়ের মুখোমুখি হল?
টয়লেট থেকে হাত-মুখ ধুয়ে-মুছে রুমানা বেরিয়ে এলো। আরিফ হেসে জিজ্ঞাস করলো: টয়লেটে গিয়ে তুমিÑ বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
: রুমানা লজ্জায় লাল হল।
বলল, হ্যাঁ, হঠাৎ বারো বছর আগের আমিতে ফিরে গিয়েছিলাম।
: সেকি? মৃত অতীতে ফিরে গিয়ে বর্তমানকে শুধু শুধু দুঃখ দেওয়া কেন? তার চেয়ে রুমানা তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। তুমি বস আমি রবিকে ডাকছি। কফির কাপটা বদলে দেবে।
আরিফ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
রুমানা বাধা দেয়, না থাক। আমি ঠান্ডা কফিই খাব।
: বেশ!
আরিফ আবার বসে পড়ে। বলে। কিন্তু রুমানা তুমি এ সময় যাচ্ছিলে কোথায়? মার্কেটিংয়ে বুঝি?
: না।
: তবে?
: অফিসে যাচ্ছিলাম।
: অফিসে?
: হ্যাঁ, আমি চাকরি করি।
: কিন্তু তোমার স্বামী তো শুনেছি একজন প্যারিস ফেরত ইঞ্জিনিয়ার।
তাহলে........
: তিনি বিদেশে থাকেন।
: বিদেশে থাকেন? কেন, কেন?
: সেখানে তিনি তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের নিয়ে গত দশ বছর ধরেই বসবাস করছেন।
: তার মানে তুমি.......
ঝড় আর বৃষ্টি কখন থেমে গেছে, রুমানা খেয়াল করেনি।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক রিক্সাওয়ালা হাঁক দেয়: আপা, ঝড়-বৃষ্টি থাইমা গ্যাছে, অহন যাইবেন?
রুমানা এক চুমুকে কফির কাপটা শেষ করে তাড়াতাড়ি বলে, হ্যাঁ, যাচ্ছি।
আরিফকে বলে: আসি আরিফ। আমার দশটায় অফিস। এখন সাড়ে এগারোটা বাজে। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আরিফ, রুমারার দিকে অনুরোধের সুরে বলে একটু দাঁড়াও, তিনমিনিট, দুটো কথা শুনে যাও। রুমানা তুমি আমার জীবনে ঝড়ের মতো এসেছিলে আবার ঝড়ের মতো চলে গেছো, আমাকে কিছু না বলে। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রুমানা। যার জন্য আমার পাশে তোমার স্থানে অন্য কাউকে স্থান দেইনি এখনো।
আরিফের চোখে চোখ রেখে রুমানা পা..... বাড়ায়।
আরিফ কিছু বলার আগেই রুমানা ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে রিক্সায় গিয়ে বসে।
বারবার ঝড় রুমানার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে। আর একটা নতুন ঝড় আসার আগেই রুমানা নিজেকে রক্ষা করতে চায়। রিক্সায় চেপে বসে রুমানা একবারও পিছন দিকে ফিরে তাকায় না।
সে জানে, পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আরিফ চৌধুরী।
ঝড়ে বিধ্বস্ত একটি স্মৃতির দেয়াল। রুমানা রিক্সায় বসে ভাবে তাহলে আরিফ আমার জন্য এখনো একাকী জীবন কাটাচ্ছে।