আবু নেসার শাহীন
‘রোজ রোজ কোথায় যাও।’ সাজুর চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে পায়চারি করে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গত রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। ‘তুমি যা ভাবছো আসলে তা না। আমি অনন্যর কাছে যাই। কারণ...।’
‘কারণ তুমি এখনও অনন্যকে ভালোবাস। এখনও তার সাথে ঘর করার স্বপ্ন দেখ। তোমার চরিত্র আমার জানা আছে।’ সাজু সিগারেট ধরায়। ধোঁয়ায় সারা ঘর ভরে যায়। পুষ্প ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সাজু চিৎকার করে, ‘তুমি যা করছো তা অন্যায়’।
সাজু দু’টো কাঁচের গ্লাস ভাঙ্গে। ওয়াডড্রপের উপর থাকা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে। পুষ্প ছুটে এসে বলল, ‘তুমি ঠিক কি বোঝাতে যাচ্ছো?’
‘তুমি আর অনন্যর কাছে যাবে না। তুমি শুধু আমার। আমার একার।’ সাজু পুষ্পকে জড়িয়ে ধরতে চায়। পুষ্প তাকে বাধা দিয়ে আবারও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এবং পাশের ঘরে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘আমার পক্ষে অনন্যকে ভুলে যাওয়া সম্ভব না। সাত বছর প্রেম করেছি। আমার ঘাড়ে এখনও তার নিঃশ্বাস পড়ে।’ পুষ্প কাঁদে।
সাজু এ শীতের মধ্যেও ঘামে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করে তার। বাথরুমের গিয়ে ঝরনা ছেড়ে ভিজে। রাতে জ্বর আসে। একটানা সাত দিন জ্বরে ভোগে। চোখের নিচে গাঢ় কালি পড়ে। মাথায় উস্কোখুস্কো চুল। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। এ অবস্থায় একটা সিএনজি করে শেওড়াপাড়া চলে আসে। পুষ্পকে হাজার বার জিজ্ঞেস করেছে সাজু। অনন্য কোথায় থাকে? তার ঠিকানা কি? একবার শুধু বলেছে শেওড়াপাড়ায় থাকে। শেওড়াপাড়া অবশ্য বেশি বড় এলাকা না। নিশ্চয় অনন্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে। অনন্যকে খুঁজে পেলে জিজ্ঞাস করবে, অনন্যর মধ্যে কি আছে? যা তার মধ্যে নেই। কেন পুষ্প আজও তার কাছে ছুটে আসে।
শেওড়াপাড়া বাজার রাস্তা ধরে কিছু দূর এগুলে তিন রাস্তার মোড়। মোড় জুড়ে বিশাল বট গাছ। বট গাছের শান বাঁধানো চত্বরে কিছু লোকজন বসে গল্প করছে। সাজু কাছে গিয়ে বলল, “অনন্যকে চিনেন?’
‘কোন অনন্য? গ্রামের বাড়ি কোথায়? আচ্ছা অনন্য দেখতে কেমন?’ একজন বৃদ্ধ লোক বলল।
‘উনি কি লম্বা না বেঁটে?’ আর একজন বলল।
‘অনন্য কি করে বলুন তো? চাকরি না ব্যবসা?’ একজন কিশোর ছেলে বলল।
এসব প্রশ্ন শুনে সে হকচকিয়ে যায়। নিজেকে এ মুহূর্তে অসহায় মনে হয়। আস্তে করে কেটে পড়ে। সত্যি তো অনন্য সম্পর্কে সে বেশি জানে না। পুষ্প তাকে কিছু বলতে চায় না। সে এলোমেলো ভাবে খোঁজাখুঁজি করে। শরীর ক্লান্ত। রাতে বাসায় ফিরে পুষ্পর পাশে শুয়ে নিচু গলায় বলল, ‘অনন্যর কোনো ছবি আছে?’
পুষ্প কোনো কথা বলে না। সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। গল্পের বই পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পর গল্পের বই বন্ধ করে কাত হয়ে শোয়। তারও কিছুক্ষণ পর নাক ডাকে। সাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হাল ছাড়লে চলবে না। যে করেই হোক অনন্যকে খুঁজে বের করতে হবে। বিছানা ছেড়ে ওঠে। ড্রইং রুমে এসে টিভি ছেড়ে সিনেমা দেখে। সিগারেট ফুঁকে। রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয় না। সকালের দিকে গাঢ় ঘুম আসে। আর ঘুমের ভেতর অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে রোজ।
একদিন পর আবারও শেওড়াপাড়া আসে। একটা বাড়িতে ঢোকে সাহস করে। দশতলা বিল্ডিং। প্রতিটা ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করে। নিচে নেমে গেইটে চক দিয়ে দাগ কাটে। বেশ কয়েকটা বিল্ডিং-এ ওঠানামা করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একটা টিনশেড বাড়িতে ঢুকে দরজায় টোকা দিতেই একটা দশ বার বছরের ছেলে বের হয়। সে মুচকি হেসে বলল, ‘এখানে অনন্য থাকে?’
‘হ্যাঁ থাকে। কেন অনন্যকে আপনার কি দরকার?’
‘আমি ওর সাথে একটু কথা বলতে চাই। প্লিজ ওকে একটু ডেকে দাও।’
‘কি মুশকিল! ডাকলে সে আসবে?’ ছেলেটির চোখে মুখে বিস্ময়। এক দৃষ্টে সাজুর দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘ডাকলে আসবে না কেন?’ সে ভয়ে ভয়ে বলল।
‘ওর বয়স মাত্র এক বছর। আচ্ছা আপনি কে বলুন তো?’
সে আর কথা বাড়াল না। উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটতে থাকে। একটানা হেঁটে বাসায় ফিরে রাতে খাবার খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ বসের ফোন আসে, ‘কি ব্যাপার সাজু? আজ প্রায় দশ দিন হতে চলল তুমি অফিসে আসছো না, আমি জানি চাকরির টাকায় তোমার সংসার চলে। অথচ....।’
‘স্যার আমি কাল থেকে নিয়মিত অফিস করবো। টানা সাতদিন জ্বর ছিল। তাই.....।’
‘ওকে ওকে। বিকেলে বোর্ড মিটিং আছে। তোমার উপরে ভরসা আমার একটু বেশি।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার।’ লাইন কেটে যায়।
সে সিগারেট ধরায়। গ্রীন রোডের সতের তলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরে থাকে সে। এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সে ভাবে অনন্যকে খুঁজে বের করতে না পারলে তার সংসারটা ভেসে যাবে। কি রকম একটা অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছে সে। স্ত্রী সংসার করে তার সাথে অথচ অনন্যর সাথে মোবাইলে কথা বলে দরজা জানালা বন্ধ করে। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা চলে। পুস্প আর অনন্যর মধ্যে কত ভাব ভালোবাসা, কত মান অভিমান, কত ঝগড়া বিবাদ। এসব শুনতে শুনতে এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে সে। অনন্যকে খুঁজে বের করে হাতজোড় বলবে, অনন্য তুমি পুষ্পের জীবন থেকে সরে যাও। দেখ অল্প কয়েক বছর আমরা বাঁচি। এত অশান্তি কার ভালো লাগে বলো?
বোর্ড মিটিং হলো না। সে অফিস শেষে মতিঝিল থেকে বাসে চেপে শেওড়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড এসে নামে। সন্ধ্যে হতে এখন ও বেশ সময় আছে। রিক্সা চেপে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে। তারপর কালভার্ট এ নেমে এক বৃদ্ধ লোককে জিজ্ঞেস করে, ‘চাচা অনন্য নামে কাউকে চিনেন?’
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘অনন্য তো আজ বাইশ বছর হতে চলল আমেরিকায় থাকে। এক বিদেশী মেম বিয়ে করেছে ও। মাঝে মাঝে ফোন করে। মন চাইলে টাকা পয়সাও দেয়। এ আর কি। তা বাবা তুমি হঠাৎ অনন্যর খোঁজ করছো ? ’
‘না মানে এমনি।’ সে সামনে এগুতে থাকে। রাস্তায় প্রচুর ধুলো। কয়েকটা বাসায় খোঁজ করে চকের দাগ কাটে। বেশ রাত করে বাড়ি ফিরে। নিজের মতো করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হতে যাবে এমন সময় পুস্প বলল’, কি অনন্যর খোঁজ পেলে?
‘ইয়ার্কি মারছ না।’ সাজু রেগে গজ গজ করতে থাকে।
‘এ জীবনে তুমি আর অনন্যর খোঁজ পাবে না।’
‘শেওড়াপাড়া থাকলে অবশ্যই পাবো।’ সে ছুটে বেরিয়ে যায়।
‘বললামতো পাবে না’ পুষ্প চেঁচিয়ে বলল।
ফার্মগেট বাস স্ট্যান্ড এসে মতিঝিলের বাস ধরে। বাসে গাদাগাদি করে দাঁড়িযে থাকে। জ্যাম ঠেলে ঠেলে বাস সামনের দিকে এগুতে থাকে। হঠাৎ কে যেন বলে ওঠে, ’ না না ভাই অনন্য মোটেও কাজটা ভালো করছে না। এভাবে একটা মেয়েকে ঠকানো ঠিক হচ্ছে না তার। তাছাড়া মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে।’
সাজু লোকটার কাছে এসে বলল, ’ভাই অনন্যর ঠিকানাটা একটু দেন। অনন্য যে মেয়েটাকে ঠকাচ্ছে সে আমার স্ত্রী। অনন্য যে কোনো সময় আমার স্ত্রীকে ফোন করে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে। তার জন্য আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার সময়টা ভালো যাচ্ছে না। আমাদের বিবাহিত জীবন মোটেও সুখি না। গত কয়েকটা দিন ধরে আমি হন্য হয়ে অনন্যর খোঁজ করছি। প্লিজ অনন্যর ঠিকানাটা দেন।’
‘অনন্যকে আপনি কোথায় কোথায় খোঁজ করেছেন?’ লোকটা বলল।
‘শেওড়াপাড়ার অর্ধেকটা খোঁজ করেছি।’
‘কিন্ত আমার বন্ধু অনন্য জার্মানিতে থাকে আর মেয়েটা থাকে ঢাকার বংশালে। আপনি তাকে শেওড়াপাড়া খুঁজলে পাবেন? তাকে খুঁজতে হলে জার্মানে যান।’ লোকটার কথা শুনে সবাই হাসাহাসি করে। পরস্পর কথা বলে। সে বিব্রত বোধ করে। এক পর্যায়ে সে কারওয়ান বাজার স্টপেজে নেমে আবার মতিঝিলের বাস ধরে। ধীরে ধীরে শীত বাড়ছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকে কেমন যেন গুমট ভাব। সূর্যের দেখা যাচ্ছে না।
বোর্ড মিটিং সেরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়। খাওয়ার টেবিলে পুষ্পের মুখোমুখি বসে খেতে খেতে এক পর্যায়ে বলল, ‘আচ্ছা পুষ্প তোমার কাছে অনন্যর ছবি আছে?’
‘উহুঁ নেই।’ পুষ্প মুচকি হাসে।
‘সত্যি বলছো?’
‘হুঁ সত্যি বলছি। কেন ছবি দিয়ে কি করবে? পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ বিজ্ঞাপন দিবে?’
‘না।’ সে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে। পুষ্প কিছুতেই তাকে অনন্যর খোঁজ দিবে না। রাতে ঘুমের ভিতর অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। বাথরুমে ঢুকে ঝরনা ছেড়ে ভিজে। পুষ্প তখন গভীর ঘুমে। ড্রইং রুমে এসে ইন্টারকমে নিচতলায় গার্ডকে ফোন করে, আচ্ছা বদিউল আমি যখন বাইরে যাই তখন কি আমাদের কোন গেস্ট আসে? না মানে ম্যাডামের গেস্ট?
‘না স্যার। তবে ম্যাডাম প্রতিদিন কোথায় যেন যান। দুই তিন ঘন্টা পর আবার ফিরে আসেন।’
‘ঠিক আছে।’ সে বেডরুমে এসে পুষ্পের মোবাইল হাতে নেয়। আজ পুষ্প কার কার সাথে কথা বলেছে। একটা নম্বরে পুষ্প এক ঘন্টা কথা বলেছে। সে ঐ নাম্বারে ফোন দেয়। রিং হচ্ছে। সে খুব উৎফুল্ল। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা অনুভব করে। এ বুঝি অনন্যর গলা শুনতে পাবে। কিন্ত না রিং হতে হতে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে ঘন্টাখানেক চেষ্টা করার পর হাফিয়ে ওঠে।
পরদিন অফিসে গিয়ে এক ফাঁকে কাষ্টমার কেয়ারে যায়। নম্বর চেক করে দেখে পুষ্পের নামে রেজিস্ট্রেশন করা। ঠিকানাও তার। অদ্ভুত ব্যপার! সে হতাশ হয়ে পড়ে। অফিসে ঢুকতেই পিয়ন বলল, ‘স্যার আপনাকে ডাকে।’
সে বসের রুমে ঢুকতেই বস বলল, ‘কি সাজু আহমদ খবর কি?’
‘জ্বী স্যার ভালো।’ সে চেয়ার টেনে বসে।
‘কিছু দিন ধরে দেখছি তুমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে থাকো। অফিসের কাজে তোমার কোনো মনোযোগ নেই। কি হযেছে বলতো?’
‘না স্যার কিছু না।’ তার গলা জড়িয়ে আসে।
‘ঠিক আছে আপনি যান। তেমন কোন সমস্যা হলে শেয়ার করতে পারেন।’ বস কাজে মনোযোগ দেয়। সে ওঠে আসে। পুষ্পকে ফোন করে পাঁচটার ভিতর শাহবাগ আসতে বলে। অফিস শেষে হেঁটে শাহবাগ আসে। পুষ্পকে নিয়ে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে যায়। পুস্প অনন্য সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য দেয় না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ একজন মধ্যবয়সী মহিলা। সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি। মাসখানেক পর আবার আসবেন। আর সাজু আহমেদ বউকে একটু বেশি বেশি সময় দিন। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসুন।’
‘দেশ বিদেশ অনেক ঘুরেছি। কিন্ত কোনো কাজ হয়নি।’
‘ঠিক আছে আজ আপনারা যান। এক মাস পর আবার আসবেন।’
রাতে চাইনিজ খেয়ে বাসায় ফিরে দু’জন। পুষ্প ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে হাজার ডাকেও পুষ্পের ঘুম ভাঙ্গে না। সে নিজের মতো করে নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে পড়ে। ছুটির দিন। শেওড়াপাড়া এসে একটা টি স্টলে চা খায়। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে। বিশাল বিশাল হাউজিং বিল্ডিং গড়ে ওঠেছে। একটা একটা করে বিল্ডিং এ ঢুকে অনন্যর খোঁজ নেয়। এভাবে কখন যে সময় কেটে যায় সে টের ও পায় না। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে দেখে বেডরুমের দরজা বন্ধ। পুষ্প মোবাইলে কথা বলছে। পুষ্প বলছে, ‘না না অনন্য তুমি সাজুকে ভুল বুঝছো। সাজু খুব ভালো। ও আমার আর তোমার সম্পর্কে সব জানে। তবু আমাকে ডিভোর্স দিয়ে তাড়িযে দিচ্ছে না। আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসে ও। তবে কি জানো অনন্য তোমার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না। কেউ না। ’
সাজু দরজা ধাককাতে থাকে। পুষ্প দরজা খোলে না। চুপচাপ বসে থাকে। সাজু দরজা ধাককাতেই থাকে। অনেকক্ষণ পর দরজা খোলে পুষ্প। তার দুই হাতে দুইটা মোবাইল। সাজু পুষ্পর মোবাইল দুইটা নিয়ে দেখে পুষ্প এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে রিং দিয়ে কথা বলছিল। সাজু দু’চোখ কপালে তুলে বলল, ‘তাহলে এই?’
পুষ্প কাঁদে। সাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘তুমি তাহলে নিজের সাথে নিজে কথা বল?’ পুষ্প হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে, ‘ও কলেজে আমার এক বছরের সিনিয়র ছিল। সাত বছর প্রেম করার পর পারিবারিকভাবে আমাদের বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের ঠিক আগের দিন অনন্য আমাকে নিয়ে মোটরসাইকেরে চেপে ঘুরতে বের হয়। আমরা যখন তিনশ ফিটে তখন দমকা বাতাসের সাথে বৃষ্টি নামে। সামনের কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না দু’জন। এদিকে অনন্য ও মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। আমি অবশ্য বার বার নিষেধ করেছিলাম তাকে। অনন্য আমার কথা শুনেনি। একটা থেমে থাকা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেয়ে দুইজন দুই দিকে ছিটকে পড়ি। তারপর আর কিছুই মনে নেই। মানে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। চারদিন পর জ্ঞান ফিরে আমার। জ্ঞান ফেরার পর শুনি অনন্য আর বেঁচে নেই।’
‘সত্যি অনন্য বেঁচে নেই?’ সাজু শূন্যে লাফিয়ে ওঠে।
‘তো আর বলছি কি। সব যখন শেষ তখন আমার আর বেঁচে থেকে কি লাভ। বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেও সফল হলাম না। এক সময় ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকতাম। এই ভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর আমার দুই মোবাইলে দুইটা সিম ভরে নিজের সাথে নিজে কথা বলি। মনে মনে ভাবি এক পাশে অনন্য আর এক পাশে আমি। পরিবারের সবাই আমাকে নিয়ে ভাবে। কেউ বলে রিহেব এ দিতে, কেউ বলে পাগলা গারদে দিতে, কেউ বলে বিয়ে দিতে....।’
‘বুঝলাম তারপর এক পর্যায়ে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়।’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি প্রায় রোজ শেওড়াপাড়া যাও কেন?’
‘অনন্যর বাড়ি শেওড়াপাড়ায়। ঐখানে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। রোজ একবার গিয়ে কবর দেখে আসি।’
‘এতোক্ষণে পুরো ব্যপারটা বুঝলাম। শোনো পুষ্প তুমি নিজের সাথে নিজে যত খুশি কথা বল, আমার কোন আপত্তি নেই।’
‘কেন? আপত্তি নেই কেন?’ পুষ্প খুব অবাক হয়।
‘সে তুমি বুঝবে না। এখন রেডি হও। একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে সিলেট যাবো। রোববার দিন সকালে ফিরে অফিস করবো। যাও যাও রেডি হও।’ পুষ্প চোখ মুছে। কাপড় চোপড় গুছিয়ে নিয়ে সাজগোজ করে।