মোহাম্মদ অয়েজুল হক
এক
বিপ্লবের সাথে চার বছরের সংসার আমার। চার বছরের দিনরাত। দিনরাত ঠিক বলা চলে না, বেচারা সকাল ন’টায় অফিসে যায় বিকাল পাঁচটায় ফেরে। দিনটা ওর অফিস স্টাফদের সাথে কাটে। রাতের বেলা ঘর ছেড়ে বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস এতোদিনে গড়ে ওঠেনি। এতে আমার জন্য সুবিধা। অন্তত রাতটার পুরো ভাগ তাকে পাই। তাকে নিয়েই মালিবাগে ত্রিশ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িতে জীবনের চারটি বছর পার করে দিচ্ছি। দুটো বড় রুম একটা ছোট রুম খোলা বারান্দা আর টয়লেট এই আমাদের ত্রিশ হাজার টাকার ভাড়া বাড়ি। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও খুব একটা কিছু করতে পারেনি। গ্রামে বিপ্লবের বাবা-মার সংসার। মুন্সিগঞ্জ। মাঝে মাঝে এখনও বাবার কাছ থেকে টাকা আনতে হয়। বছরে দু’একবার যখন বেড়াতে যাওয়া হয় তখনই টাকার আব্দার। ওর বাবা খুব ভাল। একজন ধার্মিক মানুষ। বিপ্লব ছেলে হিসাবে মোটেও বাবার মতো নয়। সৎ হলেও ধার্মিক নয়। অনেকে বলে, যে ধর্মিক নয় সে সৎ হতে পারে না। আমি বুঝি না ধার্মিক হওয়ার সাথে সৎ আর আসৎ হওয়ার প্রশ্ন কেন! বিপ্লবের বাবা একদিন এ বিষয়ে বলছিলেন, ধর্ম খোদার বিধান। মালিকের বান্দা হয়ে, গোলাম হয়ে যে সৃষ্টিকর্তার কথা মানে না সে কি করে ভাল হতে পারে? তার কোন কিছু ভাল নয়। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানকে কি কেউ ভাল বলে? সে অনেক কথা। আমার সব কথা শুনতে ভাল লাগে না। সব কথা আমি কান দিয়ে শুনিও না।
মুন্সিগঞ্জ গেলেই বিপ্লবের সাথে যা একটু ঘোরা হয়। এদিক-ওদিক। খোলা প্রান্তরে। বেশিদিন না থাকলেও দিনগুলো আনন্দের হয়। বিপ্লবের কোন ভাই নেই। বাবার একমাত্র ছেলে সে। ওপরে নিচে দুটো বোন আছে। বড় বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগে। সিলেটের এক অভিজাত পরিবারে দশ বছর আগে পাড়ি জমিয়েছেন বড় আপা। বাড়ি থাকে কেবল স্বর্ণা। স্বর্ণা ছোট মানুষ। মাত্র সেভেনে পড়ে। মাঝে মাঝে আমরা যখন ঘুরতে বের হই স্বর্ণা জিদ ধরে তাকেও নিয়ে যেতে হবে। সে কি করে হয়। স্বর্ণা গেলে আনন্দ আর আনন্দ থাকবে না। এ জন্যই ওকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বের হই। গত বছরের কথা আমি আর বিপ্লব নদীর পাড়ে বসে ছিলাম। পাট গোডাউনের ঘাটের পাশে বাশের লম্বা চাটাই নদীর অনেকখানি ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। বাশের ছোট ছোট ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি দেখা যায়। নদীর ওপাশে ব্যস্ত নগরী। গল্প করছিলাম আমরা দু’জন। বিপ্লব মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে আমার একটা ছবি তুলে মোবাইলটা আমার হাতে দেয়। ‘দেখ তো কেমন হয়েছে?’
আমি ছবির দিকে তাকিয়ে দেখি। বাতাসে ওড়া চুল। আমার মুখের একপাশে পশ্চিমে ডোবা সূর্যের লালচে আভা এসে পড়েছে। ‘প্রকৃতি তার সব কিছু উজাড় করে তোমার মোবাইলের ছাবিতে বন্দি হয়েছে বিপ্লব। আমি কেমন?’
‘ভাল।’
‘কেমন ভাল?’
‘জানি না।’
‘কেন জানোনা? আমি কি তোমার পছন্দের মতো নই!’
‘তুমি খুব সুন্দরী কোন সন্দেহ নেই রিতা।’
‘সন্দেহ টা কিসে?’
‘এই যে তুমি মাঝে মাঝে ঝগড়া করো। এমন সব আব্দার কর যা আমি দিতে পারি না। আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।’
‘ভাত খেতে দিচ্ছ এই বা কম কিসে?’
হঠাৎ করেই বিপ্লবের মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। কালো হয়। বেশির ভাগ সময় ঈদ আসলে ঈদের আগে দশ আর পরে পাঁচ এই পনের দিন ওর মুখটা খুব মলিন থাকে। থাকাটা খুব স্বাভাবিক। ওর সাথে চাকরি করে, এমন কি ওর নিচের পোষ্টে যারা তাদের বউরাও ছয় ভরি সোনার নেকলেস, দামী দামী সব প্রসাধনী ব্যবহার করে। বিলাসবহুল জীবন তাদের। ঈদ আসলে যখন বন্ধুদের বাড়িতে যেতে হয় তখন লজ্জায় মাথা মুখ লুকাবার জায়গাও থাকে না আমার। এ লজ্জা আমাকে র্স্পশ করলেও বিপ্লব নির্বোধটা তার কিছুই বোঝে না। না বোঝা তবু ভাল, আমি ওকে বোঝতে গেলেই বিপত্তি।
‘কী আছে আমার? কী দিয়েছো!’
‘মানে!’
‘কেন তুমি কিছু বোঝনা?’
‘বুঝবো না কেন।’
‘এবার ঈদে...’
আমার কথা শেষ হবার আগেই বিপ্লব বলে ওঠে, ‘তোমার আব্দার পূর্ণ করার সাধ্য আমার নেই। ধৈর্য ধর। একদিন সব হবে।’
‘সে দিন কি এই সূর্য ওঠা দিন?’
‘দিন কি আমি বানাতে পারি! সূর্য ওঠা ছাড়া দিন হয় না।’
‘কোন বিপ্লব আমি তোমাকে স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, এবার ঈদে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবে।’
‘সরি।’
আমার বুক চিরে যায়। আরও কথা বাড়ালে সে বার বার শুধু বলে, আমি অসৎ উপায়ে রোজগার করতে পারবো না। আমি বুঝি না এই নির্বোধটাকে নিয়ে কিভাবে সামনে এগিয়ে যাব। বউয়ের সামান্য চাহিদা পূরণে যে ব্যর্থ তাকে আর যাই বলা যাক স্বামী বলা যায় না। স্বামী বলে মানতেও আমার কষ্ট হয়। বিয়ের আগে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। স্বামী-সংসারের স্বপ্ন। একটা ছোট্ট সংসার। একটা সুন্দর মায়াবী মুখ। আভিজাত্যের ছড়াছড়ি। স্বামীকে নিয়ে ঘুরাঘুরি। উড়াউড়ি। আসলে মানুষ হয়েছি বলেই উড়তে পারিনি। পাখির মতো ডানা ঝাপটে স্বাধীনভাবে আকাশ, সাগর, পাহাড়, নদী দিয়ে উড়া। বিপ্লবের উড়ার সীমানা হলো নদীর পাড়ে গিয়ে বসা। ঝিমানো। নদীর স্রোতের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে বলা, নদীকে ভালবাস। নদীগুলো মরে যাচ্ছে। ভারত আমাদের নদীগুলোকে গলা টিপে টিপে হত্যা করছে। মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে দেশ।
আমার খুব রাগ হয়। দেশ মরুভূমি না ছাই হোক তা দিয়ে আমাদের কি দরকার। দেশে তো বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট হচ্ছে, আছে। বড় বড় সুন্দর সুন্দর মন ভোলানো পার্ক আছে। বিপণী বিতানগুলো দিন দিন ফুলে ফেপে উঠছে। অভিযাত নাইট ক্ল্যাবগুলো স্বমিহমায় দিনের পর দিন উজ্জ্বল হচ্ছে। আমি বলি, ‘তোমার টাকা কি ভারত গিলে খাচ্ছে? আমি তোমার টাকার মরুভূমি হওয়া দেখে চিন্তিÍত।’
‘টাকা দিয়ে কি হয়?’
‘তোমার মাথা হয় বিপ্লব। টাকা থাকলে তোমার মাথা কিনতে পাওয়া যায়।’
‘আমার মাথা তো টাকা ছাড়াই কিনেছো।’
‘ কিনতে আর পারলাম কই। মাথা কিনলে তো আমার কথা শুনতে। আমার স্বপ্ন-সাধ পূরণ করতে।’
বিপ্লব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপ করে যায়। এভাবেই আমার না পাওয়া আর বিপ্লবের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দিনগুলো অতিবাহিত হয়।
কয়েক দিন থাকার পর যখন ঢাকা আসার সময় হয় বিপ্লবের তখন পকেট শূন্য। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মিন মিন করে বলে, ‘বাবা কিছু টাকা দাওনা।’
ভদ্রলোক ছেলের কথা শুনে হাসেন। মোটেও রাগ করেন না। হাসতে হাসতে বলেন, ‘দেখ আমার অফিসার ছেলে.... কতো টাকা চাই?’
প্রয়োজন অনুযায়ী দশ, বিশ, পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয় বিপ্লব। তাতে কি হয়! দশ বিশ আর পঞ্চাশ মিলেই বা বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে কার স্বপ্ন পূরণ করা যায়!
আমি আমার জীবনের হতাশা দূর করার অনেক পরিকল্পনা করেছি। না পাওয়ার ব্যথাগুলো দূরে ঠেলতে কতো প্রচেষ্টা আমার। সফলতা আসছিল না। কিছুদিন আগে আমাদের বাসার কলিং বেলটা হঠাৎ বেজে ওঠে। তখন বেলা দশটা। আমি নিশাতকে স্কুলে পৌছে দিয়ে মাত্র বাড়ি ফিরেছি। এমন সময় কে আসলো? দরজার ভেতর লাগনো লুকিং গ্লাস দিয়ে তাকাই। একটা ২৫ বছর বয়সী যুবক। বেশ দেখতে। আমি দরজা খুলে দেই। ‘আমার নাম সুজন মল্লিক।’ কথা বলে ছেলেটা।
‘সুজন মল্লিক ভেতরে আসুন।’
সুজন মল্লিক নামের মানুষটা ভেতরে এসে বসে। আমি বসি তার সামনা সামনি। ‘বলুন, কেন এসেছেন?’
‘একটা জরুরি প্রয়োজনে আমরা মহল্লার বাড়ি বাড়ি ঘুরছি।’
‘আপনার পরিচয়?’
‘নাম তো আগেই বলেছি, মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি আমি।’
‘ও আচ্ছা।’
‘আমরা কিছু সদস্য সংগ্রহ করছি। বলতে পারেন ভাল মনের মানুষ।’
‘জ্বি।’
‘আপনার ব্যাপারে আমরা তথ্য পেয়েছি আপনি নাকি নাচ-গান জানা মানুষ।’
আমি হাসি। ‘হ্যা, বাবা ছোট বেলা শিখিয়েছিলেন।’
‘যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমাদের দলে যোগ দিতে পারেন। আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান করে থাকি।’
‘খুশি হলাম। খুব খুশি হলাম।’
‘জানেন নাচ-গান মানুষকে প্রফুল্ল রাখে।’
‘জানি।’
তারপর থেকে মাঝে মাঝেই মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিসে যাতায়াত। ওখানে গিয়ে অনেকের সাথে পরিচয়। জীবনটাকে অনুভব করতে পারি নতুনভাবে। বিপ্লব গাধা এসব জানে না। জানলেও আমার কিছু আসে যায় না। ওর মতো গাধার সাথে জীবন জড়িয়ে সব হারাতে বসেছি। ও কি একটা মানুষ! চার হাত পা আছে ঠিক তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক করে নিজেকে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
দুই.
আমি রিতাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। সুমনাকে বিয়ে করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা ভুল। ভুল করলে তা সংশোধনের পথও থাকে। সুমনা ভুল রিতা ঠিক। মাঝে মাঝে মরা বাবা-মায়ের উপর ভীষণ রেগে যাই। তিন বছরের ব্যবধানে দু’জন মাটির গর্তে ঢুকে পড়লেন। গর্তে ঢোকার আগে সুমনাকে উপহার দিয়ে গেছেন। আমাকে ফেলে গেছেন দুনিয়ার গর্তে। কালো গর্ত। মহাকাশের গর্তকে ব্লাকহোল বলে, দুনিয়ার গর্তকে কি বলে! ম্যানহোল। সেখানেই পড়েছি আমি। রিতা মই দিয়েছে। উপর থেকে হাত বাড়িয়েছে। আমাকে ছোবে। টেনে তুলবে। সুমনাকে নিয়েই অনুষ্ঠানটা উপভোগ করছিলাম। চৌদ্দ ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবস। আগে আমাদের জানাই ছিলনা দিবসটার কথা। ইদানিং মিডিয়ার প্রচার প্রচারণায় মুখর, আনন্দময় হয়ে উঠেছে দিনটি। ঝাঁক বেধে ছেলে মেয়েরা তাদের ভালবাসা বিনিময় করে। পুরনো দুঃখ আর্বজনাকে ছুড়ে ফেলে দৃঢ় প্রত্যয়ে। আমাদের পাড়ার ছেলেরা নাইট ক্লাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি মানুষ, আমার কাছে ছেলেদের অনেক চাওয়া। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছি। চাঁদা। না দিয়ে উপায় আছে! মান-সম্মাান থাকে না। সকালে চা খেয়ে পেপার পড়ছি। ঠিক সে সময়ে সুজন, কামাল, রিপন, রাজন সহ পাড়ার একগাদা ছেলে মেয়ে হাজির।
‘কেমন আছেন?’ একসাথে কয়েকজন প্রশ্নটা করে।
পেপার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমি সবার জবাব একসাথে দেই, ‘ভাল আছি।’
‘সাত সকালে আপনাকে জ্বালাতে এসেছি।’ কথা বলে মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি সুজন মল্লিক।
আমি হাসি। ‘আমি তো চলাকাঠ না, সিগারেটও না। জ্বালাবেন কেন?’
সবাই হেসে ওঠে, আগপিছ হয়।
‘সে জ্বালানো না ভাই।’
‘কি জ্বালানো?’
‘এই একটু সহযোগিতা। আপনি ধনী মানুষ।’
‘কি ব্যাপারে?’ প্রশ্ন করি আমি।
‘আসছে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি আমরা একটা অনুষ্ঠান করবো। ভ্যালেন্টাইন্স অনুষ্ঠান।’
‘ও আচ্ছা। খুবই ভাল উদ্যোগ।’ সুমনাকে মানি ব্যাগটা আনতে বলি। আমার কথা মতো মেয়েটা চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মানিব্যাগ নিয়ে ফিরে আসে, আমার হাতে দেয়। কিছু বোঝে না এমনভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সুমনা। কেউ কেউ সুমনাকে চেয়ে দেখে। চোর চোর ভাব নিয়ে তাকায়।
এক হাজার টাকার পঞ্চাশ টা কড়কড়ে নোট ওদের দিকে বাড়িয়ে দেই। ‘কি খুশি তো?’
সবাই খুশি হয়। ‘ভাই সাহেব কি যে বলেন! আপনি টাকা না দিলেও খুশি হতাম।’
‘ধন্যবাদ।’
যাওয়ার আগে সুজন মল্লিক রিকোয়েস্ট করে, ‘অবশ্যই আসবেন কিন্তু। খুব নাচগান হবে ভাইজান।’
‘সময় পেলে আসবো।’
তারপরের কয়েকদিন খুব দ্রুত শেষ হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি আসে। বিকাল বেলা সুমনাকে বলি, রেডি হও। সুমনার রেডি হওয়া আমার কাছে অজানা নয়। দুই বছরে আমি তার রেডি হওয়া সর্ম্পকে জেনে গেছি। একটা সাধারণ কাপড় পরতেই তার পছন্দ। তেমন সাজগোজ করে বাইরে বের হওয়া তার ভাল লাগেনা। ওর বাবার অনেক সম্পত্তি যা ঐ এক মেয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন। ধনীর দুলালী বলেই চেহারা তেমন ভাল না হওয়া সত্ত্বেও আমার বাবা-মা সম্ভাবত সুমনাকে তাদের পুত্রবধূ হিসেবে পছন্দ করেছিলেন। অন্য দিনের মতো সুমনা সাজে। আমি ওর কাছে গিয়ে বলি, ‘সাজতে শিখলে না সুমনা?’
‘অন্য একদিন খুব করে সাজবো। বাইরে বের হওয়ার সময় আমার সাজতে ভাল লাগে না।’
‘তুমি আর খুব করে কি সাজবে? কাক কি সুন্দর করে কোনদিন গান গাইতে পারে!’
আমার কথা শুনে সুমনা রাগ করে না। মিষ্টি হেসে বলে, ‘বেশ তো, সে জন্যই তো এমন সব পোশাক পরি। কাকের মতো।’
‘বেশ হয়েছে এবার চলো।’
সন্ধ্যা হতেই একটা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। ছেলে আর মেয়ে। হাতে হাতে ফুল। চোখে মুখে ভালবাসা। দেখতে দেখতে অনুষ্ঠান স্থলে পৌছে যাই। ভি.আই.পি হিসাবে আমাদের বসার জন্য একেবারে স্টেজের সামনে জায়গা হয়। পেছনে অনেক মানুষ। পেছনের মানুষগুলো ভি.আই.পি নয়। ভি.আই.পি মানে কি! ভেরি ইমপর্টেন্ট পারসন। নিজেকে এমন কিছু ভেবে বেশ ভাল লাগছিল। সেই ইপর্পটেন্ট পারসন ভাব নিয়ে সামনে গিয়ে বসি। প্রথম থেকেই শুরু হয় ছেলে মেয়েদের দিয়ে নাচ তারপর ভালবাসার গান। দেখা অনেক অনুষ্ঠানের মতোই লাগছিল। শেষ দিকে হলো ব্যতিক্রম। তখন অনেক রাত। হঠাৎ মঞ্চের আলো নিভে গেল। যখন আলো জ্বলে উঠলো তখন আমার চোখ ছানাবড়া। এক অপূর্ব সুন্দরী রমণি মাইক হাতে দাঁড়িয়ে। আমার এবং তার দূরত্ব দশ গজের মতো। সে আমার সোজা স্টেজে। কিছু বলবে অথচ বলছে না। এক মিনিটের মধ্যেই কথা বলে উঠলো। সাউন্ড বক্স তার মোহনীয় কণ্ঠ ধারণ করে ছড়িয়ে দিল সারা হল ঘরে। ‘কনগ্রাচুলেশন অতিথিবৃন্দ, সম্মানিত সুধী। ভ্যালেনটাইন্সের দেশ থেকে ধেয়ে আসা ভালবাসা দিবসের অনেক অনেক ভালবাসা।’
মেয়েটা দম নেয়। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। ‘একটা ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন নিয়ে আমি রিতা, আমি রিতা...’ শব্দের প্রতিধ্বনিতে মানুষের উল্লাস। হৈ...রৈ...।
‘আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস। ভালবাসা দিবসের এই গভীর রাতে আমরা প্রিয় দর্শকদের ভেতর থেকে দশ জন কে স্টেজে ডাকবো। এখানে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দশ জন থাকবেন। আমাদের সাথে অতিথিরা নাচবেন।
কথা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত থেকে দশ জনের ডাক পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে আমিও সেই দশ জনের তালিকায় পড়ে যাই। আমি নাচবো অন্য কোন মেয়ের সঙ্গে। আমার বউ সুমনার মুখটা কালো হয়। হালকা আবছা আলোর মাঝে সুমনা আমার হাতটা আলতো করে ধরে বিনয়ের সাথে বলে, ‘প্লিজ তুমি যাবে না।’
আমার খুব রাগ হয়। ‘কি বলো সুমনা। যাস্ট এনজয়। এ আর এমন কি!’
‘আমি যদি কোন ছেলের সাথে তোমার সামনে নাচতাম কেমন লাগতো অংকুর?’ প্রশ্ন করে সুমনা।
সুমনার প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় নেই। না ভেবেই জবাব দেই ‘ভাল লাগতো।’
সুমনা নিরব হয়ে যায়। আমার মনে হয় সুমনাকে সাথে করে আনাটাই একটা ভুল হয়ে গেছে। একে একে দশ জন মেয়ে স্টেজে এসে হাজির হয়। সবার এক রঙের শাড়ি। হলুদ রং লাল পড়ের শাড়িগুলোতে দারুণ মানিয়েছে ওদের। আমি কার সাথে নাচবো!
সেই রিতা মেয়েটা এবার আহ্বান করে, ‘নির্বাচিত অতিথিরা চলে আসুন স্টেজে।’
তার কথা শেষ হবার সাথে সাথে দশ জন একে একে স্টেজে ওঠে। আমিও দশজনের একজন। স্টেজে উঠে খুব ভাল লাগছিল। কি এক মোহনীয় পরিবেশ। ভাগ্যক্রমে আমাকে প্রথম বলা হয়, ‘আপনি কার সাথে নাচতে পছন্দ করেন, দেখুন।’
আমার সামনে দশজন। রিতা হাসছে। ‘আপনার সাথে নাচতে খুব ভাল লাগবে রিতা।’
‘বেশ।’
এভাবে করে সবার পছন্দ যাচাই করে নাচানাচি শুরু হয়। একটা হিন্দি গান বাজছে। দর্শকের হৈ রৈ। তালি। আমি রিতার হাত ধরি। রিতা নিশ্চই ভাল নাচতে পারবে। হ্যাঁ সত্যিই সে গানের তালে তালে আমাকে দোলায়। আমি অনাড়ি মার্কা নাচের ফাঁকে ফাঁকে রিতার অপূর্ব চেহারার দিকে তাকাই। রিতা। কতো সুন্দরী মেয়েটা। আমার দেখা যে কোন মেয়ের চাইতে সুন্দরী। কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করলেও গানের প্রচণ্ড শব্দে তা হয়ে ওঠে না। প্রায় দশ মিনিট রিতার সাথে নাচানাচি করি। সাবাই নাচে। নাচ পর্ব শেষ হয় হিন্দি গান থেমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। গান শেষ হবার সাথে সাথে আমি সুযোগ কাজে লাগাই, ‘রিতা মহান ভালবাসা দিবসে আমার সবটুকু ভালবাসা তোমাকে নিবেদন করছি।’
‘আপনাকেও।’ হাসতে হাসতে জবাব দেয় রিতা। আমার বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে।
‘তোমার সাথে আমি কথা বলতে চাই। কিভাবে ?’
রিতা খুব মৃদু শব্দে কিন্ত দ্রুত উচ্চারণে বলে, ‘বি ব্লক ৭৮০, সকাল দশটার পর ছুটির দিন বাদে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে আমি তৈরি থাকবো।’
‘ছুটির দিন বাদে কেন?’
‘আমি বিবাহিত।’
‘ও আচ্ছা।’
আমি নেমে যাই। বুক ভরা আনন্দ নিয়ে নেমে যাই। নামার আগে আমার একটা ভিজিটিং কার্ড রিতার হাতে গুজে দেই। আগ্রহ থাকলে ফোন করবে মেয়েটা। আমার কানে বাজে, ছুটির দিন বাদে আমি আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে তৈরি থাকবো................ আমি বিবাহিত। অপরুপ সুন্দরী, মায়াবী রিতা। হোকনা সে বিবাহিত। তার হাজারটা বিয়ে থাকলেও আমি তাকে ভালবাসি। ভালবাসা দিবসে এসে যে ঠিক এভাবে করে একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে যাব ভাবতেও পারিনি।
বাড়ি ফিরে সুমনার কালো মুখ দেখে আমার মেজাজ গরম হয়। ‘কি ব্যাপার তোমার মুখ কালো কেন? ’
‘এমনি।’
‘এমনি মানে?’
‘সে তুমি বুঝবে না অংকুর।’
‘ও আমি রিতার সাথে নেচেছি তাই?’
সুমনা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ওর কান্না আমার ভাল লাগে না। কাঁদছে কেন! কান্নার এমন কি হলো? যাক ওকে ছোট খাট একটা সান্ত্বনা দেই, ‘কেদঁনা সুমনা। কাদঁলে আমার মেজাজ গরম হচ্ছে।’
আমার কথায় কর্ণপাত করেনা মেয়েটা, অনেকক্ষণ কাঁদে। কাঁদতে কাদঁতে এক সময় ঘুমিয়ে যায়। আমি জেগে থাকি। আমার চোখে ঘুম নেই। রিতা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। অনেক রাতে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। সুমনা ঘুমে কাতর। গভীর ঘুমে কি সব স্বপ্ন দেখছে কে জানে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে নাম্বারটা দেখতেই আমার বুকের ভেতর খুশিতে ভরে ওঠে। মন থেকেই আসে, হয়তো রিতা ফোন করেছে। এতো রাতে রিতার ফোন! আমার জন্য নিশ্চই এটা সৌভাগ্যের। তড়িঘড়ি ফোনটা নিয়ে পাশের ঘরে চলে যাই। সুমনাকে আমি ভয় পাই না, কিন্ত শত হলেও সে আমার বউ। কোন বউ এতো রাতে তার স্বামী কোন মেয়ে মানুষের সাথে কথা বলুক এটা পছন্দ করবে না।
‘হ্যালো।’
‘আমি রিতা।’
‘বিশ্বাস কর আমিও মন থেকে তাই ধারণা করেছিলাম।’
‘থ্যাংক উ। কেমন আছেন?’
‘ভাল।’
‘জানেন?’
‘কি জানবো!’
‘আমার স্বামীকে তার বাবা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। মুন্সিগঞ্জ। দু’একদিন পর আসবে।’
‘রিতা আমিও যে তোমাকে ভুলতে পারছি না।’
রিতা কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘আপনি একটা সমাধান করুন।’
‘কি সমাধান করবো রিতা?’ আমার বুকের ভেতর ধুকধাক করে। রিতাকে পাওয়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে ওঠে।
‘কাল সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে আসুন। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে।’
‘ধন্যবাদ রিতা। যে কোন ভাবে কাল আমি আসবো।’
তারপরও অনেক গল্প হয়। গল্পে গল্পে রিতা আর আমি দু’জন অচেনা মানুষ খুউব আপন হয়ে উঠি।
তিন
আকাশে অনেক মেঘ জমা হয়েছে। দুপুরের আকাশ। মনটা যে এতো খারাপ তা ঠিক কাউকে বোঝনো যাবে না। মন খারাপ হলে শুধু এতোটুকু বলা যায়, যে আমার মন খারাপ। কেমন খারাপ তার বর্ণনা দেওয়া যায় না। আমার জীবনে হয়তো একটা ঘন কালো অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আমি আমার মনের চোখে সে বিভৎস মুহূর্তগুলো দেখতে পাই। আমার চোখে ভাসছে যা হতে যাচ্ছে বলে আমি অনুমান করছি। চোখে ভাসছে, ভাসে। ছোট বেলা যখন নানু বাড়ি বেড়াতে যেতাম তখন নদীতে, পুকুরে কলা গাছের ভেলা দেখেছি। অনেকগুলো কলাগাছ কেটে একসাথে করে তারপর নদীতে কিংবা পুকুরে একজন অথবা কয়েকজনের ভেসে চলা। জীবনটাও তো অনেকটা সে রকম। নদীতে ভেসে সামনে এগোনোর মতো করে সময়ের স্রোত ধরে সামনে এগিয়ে চলা। সেখানে স্বপ্নরাও ভাসে, দুঃস্বপ্নরাও ভাসে। স্বপ্ন ভাসে, স্বপ্ন ভাঙ্গে। দুপুরের দিকটাতে সাধারণত ঘুমিয়ে কাটানো হয়, আজ ঠিক সে সময় মনটা খারাপ লাগছে। ইচ্ছা করছে কারও সাথে একটু গল্প করি। আমার গল্প করার মানুষ, যাদের সাথে গল্প করে মনটা একটু হালকা হয় তেমন কেউ নেই। তাছাড়া গল্প করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মুখে কাপড় গোজা, তার উপর শক্ত টেপ। হাত বাধা। এর উপর রুমের বাইরে থেকে তালা মারা। আমি এমন এক বন্দি যে কাউকে ডেকে তার ব্যথার কথা গুলো বলতে পারবে না, এমনকি লিখেও যেতে পারবে না। আমার দুঃস্বপ্নের শুরু ১৪ ফেব্রুয়ারি। মানুষ আজকাল দিনটাকে ভালবাসা দিবস বলছে। কিসের ভালবাসা দিবস? একজন, যাকে ভালবাসা উচিৎ তাকে পায়ে দলে, তার বুকটা খান খান করে অন্য কাউকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনা, ভালবাসা! সংসার ভেঙে, পরিবার ভেঙে এমন ভালবাসা চলতে থাকলে অচিরেই মানুষের হাহাকারে ভরে উঠবে দেশ। কাল রাতের ঘটনাটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কোন মানুষ কি পারে এমন কিছু ভুলে যেতে! কোন স্ত্রী? কি একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়। গভীর রাত। হাত বাড়িয়ে দেখি আমার স্বামী নেই। এতো রাতে বেচারা বিছানা ছেড়ে গেল কোথায়? এমনটি কখনো হয়নি। প্রথমে ভেবেছিলাম বাথরুমে গেছে। আমি লাইট জ্বালিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। কিছুক্ষণ পার হয়ে অনেকক্ষণ হয়। আমার চোখের ঘুম হারিয়ে যায় দুঃস্বপ্নের গভীর সাগরে। ভাবতে থাকি কোথায় গেল আমার স্বামী! আমাকে ফেলে এতোরাতে কোথায় গেল? চোখের পানি ফেলে ফেলে রাত পার হয়। ভদ্রলোক যখন আসেন তখন সকাল ন’টা। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। প্রশ্ন করি, ‘কোথায় গিয়েছিলে অংকুর?’
‘কেন আমি কি চুরি করি? রাতভর চুরি করে বেড়াই?’
‘না। আমি জানি তুমি চুরি করো না। কিন্তু কোথায় ছিলে সারারাত?’
‘একটা জরুরি কাজ ছিল।’
‘কাজটা কি রিতার সাথে ?’
আমার কথা শুনে চমকে ওঠে অংকুর। তারপরই লাল চোখে আমার দিকে তাকায়। ‘তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছো সুমনা।’
‘বাহ্, সুন্দর বলেছো। আমার স্বামী রাতে ঘরে থাকে না। আমি জানতে চাইলে সেটা বাড়াবাড়ি হয়?’
‘সুমনা আমি তোমাকে পরিষ্কার করে একটা কথা বলছি রিতাকে আমি ভালবাসি। তার জন্য আমি দুনিয়ার সব কিছু করতে পারি।’
‘আমার কি হবে অংকুর। আমি তোমার স্ত্রী, তোমাকে রিতার চাইতে হাজার হাজার গুন বেশি ভালবাসি আমি। নষ্ট ভালবাসার পথে পা দিও না।’
‘হাত পা সব দিয়ে ফেলেছি।’
অংকুরের মোবাইলটা বেজে ওঠে। মোটেও দেরি না করে ফোনটা রিসিভ করে। ‘হ্যালো।’
আমি অংকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কষ্ট নিয়ে মোবাইলের কথোপকথন শুনতে চেষ্টা করি। ওপাশ থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। রিতা ছাড়া আর কে হবে। মৃদু শব্দ আমার কানে আসে। ‘অংকুর খুব সমস্যায় পড়েছি।’
‘কি সমস্যা?’
‘১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কাল রাতে আমাদের একসাথে থাকার কথা পর্যন্ত আমার স্বামী জেনে গেছে। ও আমাকে মেরে ফেলবে অংকুর।’
‘কিভাবে জানলো?’
‘ঐ যে নিশাত। ও তার বাবাকে সব বলে দিয়েছে।’
‘চিন্তÍা করো না।’ অংকুর রিতাকে সান্ত্বনা দেয়।
‘চিন্তÍা করবো না! ও আমাকে মেরে ফেলবে অংকুর।’
‘তার আগে সে নিজেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে।’
আমি আর শুনতে পারি না। এসব কথা মানুষ হয়ে কিভাবে শুনি আমি! একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে হত্যা করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করছে। কেন মারবে? মারবে তার বিবাহিত বউকে পাওয়ার জন্য। পৃথিবীটা কোন দিকে ধেয়ে চলছে কে জানে? আধুনিক সভ্যতার ছোয়ায়, স্রোতে মানুষগুলো পশুর মতো হিংস্র হয়ে উঠছে। বিপ্লব অনেক সময় রিতার সাথে কথা বলে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। কথা শেষ করেই আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। পশুর চোখ। রাক্ষসের মতো লাল চোখে আমার দিকে তাকায়। আমার আর ভয় করে না। কিসের ভয় করবে? আমার আর কি আছে। হারাবার যেমন কিছু নেই পাওয়ার ও কিছু নেই। আমার সামনে এসে বলে, ‘যা শুনেছো সব কিছু পেটের মধ্যে হজম করে ফেলতে হবে।’
‘অসম্ভব অংকুর। আমি মানুষ।’
‘কি বলতে চাও তুমি?’
‘কালই তোমার প্রেম কাহিনী আর মানুষ হত্যার পরিকল্পনা আমি সবার সামনে প্রকাশ করে দেব।’
‘আমি যদি তোমাকে মেরে ফেলি।’
‘ফেলবে। স্ত্রী হত্যার দায়ে তোমাকে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হবে। সেখানে রিতাকে পাবে না।’
‘তুমি ঘুমাও সুমনা।’
‘না।’
‘কেন?’
‘তুমি আমাকে মেরে ফেলবে।’
অংকুর হাসে। হা হা করে অট্টহাসিতে মেতে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বলে, ‘মৃত্যু তার নিজের অবস্থানে থাকে। সময় হয়ে গেলে কেউ বাচতে পারে না।’
‘ঠিক বলেছো। তুমিও বাচতে পারবে না।’
‘আমার বাঁচা মরা নিয়ে তোমার চিন্তÍা করতে হবে না।’
‘অংকুর পাপের কিন্তু একটা শাস্তি আছে।’
‘আমাকে জ্ঞান দিওনা সুমনা।’
‘তোমাকে জ্ঞান দেবার সাধ্য, ক্ষমতা আমার কোথায়? ’
‘এইবার ঠিক বলেছ।’ অংকুর হাসে। হা হা শব্দে হাসে। সেই হাসি নিয়েই বেরিয়ে যায়। সারাদিন আর খোঁজ নেই। আমি চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। সারাদিন। কাউকে অংকুরের কথাটা বলতে পারিনি। আমার স্বামী, কিভাবে বলি। আমি যে তাকে ভালবাসি। বুকের ভেতর হাহাকার নিয়েই পড়েছিলাম। কিচ্ছু ভাল লাগে না আমার। কখন দিন গড়িয়ে রাত আসে জানিনা। অংকুরের ফেরার নাম নেই। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে যাই। ঠিক কখন বলতে পারিনা। সকালে নিজেকে আবিষ্কার করি হাত বাঁধা মুখের ভেতর কাপড় গোজা অবস্থায়। আমার সামনে বসে মুচকি মুচকি হাসছে অংকুর। শত চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারি না। একা একা কথা বলে আমার স্বামী, ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।’
আমার বুক ফেটে কান্না আসে। চোখ বেয়ে ঝর ঝর করে গড়িয়ে পড়ে বুকের ব্যথা। অংকুর বলে, ‘আজ রাতে তোমাকে মেরে ফেলবো। বউকে মেরে ফেললে কেমন হয় না? এজন্য তালাক দিয়ে দিলাম। সুমনা চিন্তÍা করো না তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মারবো না। গায়ে পেট্রোল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেব। অল্প সময়ের ভেতর তুমি পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেবে। রিতা থাকবে। শুধু রিতা থাকবে। আমার রিতা। ’ কথা শেষ করেই অংকুর বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। সকালের সূর্য তখন তার আলো দিয়ে দুনিয়াটাকে আলোকিত করেছে। আলোর খানিকটা আভা ঘরের জানালার কাচের আবরণ ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। সূর্য আলোকিত করছে দুনিয়া, এ তার কাজ। মানুষ দুনিয়াটাকে পাপের অন্ধকারে ছেয়ে ফেলছে। আলোকিত দিন পাপের আবরণে ঢাকা পড়েছে। অবৈধ প্রেম-ভালবাসা, নোংরামি, নষ্টামির সয়লাব। পরকীয়া প্রেমের কাহিনী এখন পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। কে জানে সেও হয়তো একটা শিরোনাম হতে চলেছে। হেড লাইনে তার বড় ছবি ছাপা হবে। বুকের কষ্ট লিখবে এমন সাধ্য কার! শয়তান দেখেনি সুমনা। মানুষগুলো আজকাল শয়তানকেও হার মানাচ্ছে। শয়তানের কালো ছোবলে বিষাক্ত জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা। দিন-রাত। এতো গুনাহ্, পাপ! সময়ের স্রোত মালিকের অবাধ্যতার আর্বজনায় ভরা। শান্তি উঠে গেছে। চিৎকার করে অশান্তিকে শান্তি বলছে মানুষ। কুরুচিকে বলছে রুচি। বিষাক্ত মানুষ, দেশ, সময়। প্রতি মুহূর্তের অজস্র পাপের ফসল লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। একের পর এক। রাক্ষুসে দিন রাত। আমার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। ভয়ে শরীরের লোমগুলো জেগে ওঠে। দাঁড়িয়ে যায়।
সন্ধ্যার পর গেট খোলার শব্দ হয়। এই গেট অংকুর ছাড়া আর কেউ খুলবে না। হ্যা, অংকুর এসে সুমনার সামনে দাঁড়ায়। হাতে একটা বোতল। বোতলে নিশ্চই পেট্রোল নিয়ে এসেছে। নিজের বউকে পুড়িয়ে মারবে। না সে এখন আর অংকুরের বউ নয়। সকাল বেলা তালাক দিয়ে গেছে।
‘বাড়িটা আমার, কেউ থাকে না তুমি জানো।’ কথা বলে অংকুর। ‘দারোয়ানকে বিদায় দিয়ে দিয়েছি। এখন আর কেউ নেই। তুমি তো চিৎকার করতে পারবে না আর চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। তুমি কি স্বেচ্ছায় আমার সাথে গাড়িতে উঠবে নাকি জোর করে ধরে নিতে হবে। ’
আমি গো গো আওয়াজ তুলে কাঁদি। না না বলে ঘাড় নাড়ি। যতক্ষণ বেঁচে আছি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া আমার কাজ। অংকুর যেন আমার কথা বুঝতে পারে। কাছে এসে আমার গায়ে পেট্রোল ছিটিয়ে দেয়। আমি এদিক ওদিক দৌড়াই। আমার পিছ পিছ অংকুরও দৌড়ায়। দৌড়ে দৌড়ে আমার গায়ে প্রেট্রোল দেয়। হাত বাঁধা তারপর পুরুষ মানুষ, আমি তার সাথে পেরে উঠি না। শেষমেশ আমার পা দুটোও দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে আমাকে ধরে পাজা কোলে করে নিয়ে যায়। গাড়ির পেছনে ফেলে। সামনে বসে গাড়িতে র্স্টাট দেয় অংকুর। আমি গো গো করি। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে আমার গো গো মার্কা চিৎকার রাস্তার মানুষ, আশে পাশের মানুষ শুনতে পায় না। বিশ মিনিট গাড়ি চলে। আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। আমার সারা গায়ে পেট্রোল। একটা ম্যাচের কাঠির র্স্পশে সুমনা ছাই হয়ে যাবে পুড়ে। কোথায় নিয়ে পোড়াবে কে জানে? গাড়ি থামে। আমি কেপে উঠি। মৃত্যুর কাছে এসে গেছি। আমার খুব মালিকের কথা মনে পড়ে। একদিন শুনেছিলাম কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তার সব গোনাহ হত্যাকারীর নামে লেখা হয়। এই আমার সান্ত্বনা। প্রভুকে মনে মনে বলি, প্রভু আমায় ভালবাস। ধৈর্য ধরে তোমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা দাও। আমাকে মাফ করো। গাড়ি থামিয়ে পেছনের দিকে ফেরে অংকুর। আমি পড়ে আছি পেছনের ছিটে। ‘তেল শেষ হয়ে গেল সুমনা। ধৈর্য ধর। গাড়ি নিয়ে পাম্পে যেতে পারছি না, তুমি কি গো গো করা বন্ধ করবে?’
আমি গো গো করি। আরও জোরে। অংকুর সেই পেট্রোলের পাত্রটা হাতে করে বাইরে বের হয়। রাস্তাটা বেশ নির্জন। তেলের স্টেশন এখান থেকে বেশ দূরে। বুদ্ধি করেই ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। অংকুর চলে যায়। চলে যাওয়ার পাঁচ মিনিটের মাথায় আবার এসে পেছনের দরজাটা খোলে। আমার হাত ধরে বলে, ‘তাড়াতাড়ি বের হন।’
কণ্ঠ শুনে আমি চমকে উঠি। অচেনা একজন মানুষ। পাগলের মতো দেখতে। ছেড়া জামা-কাপড়। চুলগুলো এলোমেলো। আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে বলে, ‘কি ব্যাপার আপনার গায়ে দেখছি পেট্রোলের গন্ধ। মানুষ পানি দিয়ে গোসল করে আপনি দেখছি পেট্রোল দিয়ে গোসোল করেছেন।’
‘আমার খুব বিপদ ভাই।’
‘হ্যা, আমি আপনার গো গো শুনেই বুঝতে পেরেছি। পরে বিপদের কথা শোনা যাবে। আসুন আমার সাথে পালান।’
লোকটা দৌড়ায়। আমিও তার পেছনে পেছনে দৌড়াই। দু’এক মিনিটের ভেতর তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মেলে। বেছে বেছে অলিগলি গুলো পছন্দ করছেন। ছোট ছোট গলি। এমন সব গলি দিয়ে এগোচ্ছেন যে সব গলি দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসা সহজ নয়। প্রায় পনের মিনিট দৌড়ানোর পর আমার পা লেগে আসে। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পাগলের মতো লোকটাকে বলি, ‘ভাই সাহেব আমি দুই দিন না খাওয়া।’
‘বেশ তো, না খাওয়ার চেয়ে বেচে থাকা অনেক ভাল।’
তার কথায় আমার প্রাণশক্তি ফিরে পাই। আবার দৌড়। এভাবে করে ঘণ্টাখানেক দৌড়াই। একটা গলির মাথায় এসে তিনি জানতে চান, আমাকে বেঁধে রাখা মানুষটার বাড়ি কোথায়?
‘মালিবাগ।’ জবাব দেই আমি।
‘বেশ, উল্টোদিকে এসেছি। আমার বিশ্বাস এই ঢাকা শহরে আপনাকে খুঁজে পেতে তাকে অনেক ভুগতে হবে।’
‘আর কোনদিন খুঁজে না পাক।’
‘পাবে না, ইনশা আল্লাহ।’
লোকটার মুখে পবিত্র মালিকের নাম শুনে আমার কান্না চলে আসে। পাগল দেখালেও তার কথাবার্তায় মনে হয় তিনি বিচক্ষণ জ্ঞানী একজন মানুষ। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে কি তার পরিচয়, কিভাবেই বা তাকে রক্ষা করতে ছুটে এলেন। ‘আপনার নামটা বলবেন ভাই?’
‘আমার নাম মোকলেস।’
‘কি করেন?’
‘রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। বসে থাকি।’ একটু বিরতি নিয়ে আবার বলেন, ‘জানেন গাছের নিচে বসে চা খাচ্ছিলাম। লাল চা। কেবল অর্ধেক চা খাওয়া হয়েছে এসময় আপনাকে নিয়ে আসা গাড়িটি গাছের পাশে, আমার পাশে দাঁড়ায়। আপনার গো গো শুনে অপেক্ষা করছিলাম কেউ একজন অথবা দু’জন যদি বেরিয়ে যায় তাহলে খুব ভাল হয়। গো গো করার কারণটা জানতে পারবো। প্রভুর ইচ্ছা একজন বের হলো। আমি খেয়াল করে দেখলাম গাড়িতে আর কেউ নেই, আপনি ছাড়া। ব্যাস।’
‘আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন ভাই।’
‘দুঃখিত। আপনার রব আপনাকে বাচিয়েছেন। আমার বাঁচানোর ক্ষমতা থাকলে আমার বাবা-মাকে আমি মরতে দিতাম না। তারা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমার সামনেই চলে গেছেন। ’
‘আপনার কেউ নেই? ’
‘মালিক আছেন।’
‘আমি আপনাকে একটু সাহায্য করতে চাই দয়াকরে যদি রাজি হন।’
‘কি সাহায্য? ’
‘আমার বাবা-মার একমাত্র মেয়ে আমি। তারাও দুনিয়াতে নেই। বাবা-মার রেখে যাওয়া কয়েকটা বাড়ি আছে আমার নামে। ’
‘আমাকে একটা বাড়ি লিখে দেবেন? ’
‘আপনি চাইলে সবগুলো দেব। ’
‘আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। এগুলো পরে ভেবে দেখা যাবে। আপতত একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার।’
‘এতো রাতে কি কেউ আশ্রয় দেবে? ’
‘সে আশ্রয় নয়। আপাতত রাস্তাার পাশে ফুটপাতে একটা সংসারের মতো করে সাজাতে হবে।’
ঠিক সে সময় একটা খালি রিকশা বেল দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যায়। ‘এই যে ভাই, যাবেন?’ ডাক ছাড়ে মোকলেস।
‘কই যাইবেন?’
‘কমলাপুর।’
‘যামু।’
‘কতো টাকা চাও ভাই, গরীব মানুষ। ’
রিকশাওয়ালা আমাদের দিকে তাকায়। ‘বিশ ট্যাকা দিবেন। অর্ধেক ভাড়া চাইছি। ঐ যে গরিব কইলেন হের লেইগা।’
‘দুনিয়ায় কোন ধনী নেই বন্ধু। যাদের আমরা দেখি ও সব ফকির ভাই। চোখের দেখা। ’
মোকলেসের কথা যতো শুনছি ততো ভাল লাগছে। অবাক হচ্ছি। কথায় মনে হয়না সে অসহায়, ফকির, মিসকিন। রিকশা ওয়ালা জবাব দেয়, ‘ঠিক কইছেন। সব চোখের দেহা।’
আমার একটা গল্প মনে পড়ে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমাদের এলাকার এক শিল্পপতি মারা যাওয়ার পর লোকজন বাবাকে ডাকতে এসেছিল। ‘মাটি দিতে যাবেন না?’
আমাদের অনেক থাকলেও বাবা সাধারণ গরিবদের খুব ভালবাসতেন। বাবা বলেন, ‘কার মাটি?’
‘ফিরোজ সাহেবের।’
‘ফিরোজ সাহেবের মাটি হবে কেন!’
‘কি বলছেন আপনি?’
‘কি বলছি! ফিরোজ সাহেব উপরের মানুষ। সারাজীবন উপরে থেকেছেন। ছয়তলার উপর থাকতেন, নয় তলায় অফিসে বসতেন। অফিসে বসে মানুষের ঘাড়, মাথায় পা দিয়ে হেঁটে বেড়াতেন। ’
একজন মিন মিন করে বলে, ‘তিনি মালিক, মানুষ। উপরের মানুষ।’
‘বেশ তো উপরের মানুষকে নিচে নামানোর দরকার কি? মাটির নিচের চিন্তÍা কি তার ছিল? নিচের মানুষের সাথে কথা বলতে তিনি লজ্জা বোধ করতেন। চুষে খেয়েছেন মানুষকে। মাটি দিয়ে হাঁটেননি। ওনাকে বিশ তলার ছাদে নিয়ে শুইয়ে দিন। উপরের মানুষ উপরেই থাক।’
আমরা কমলাপুর পৌঁছে যাই। ট্রেন স্টেশনে অনেক মানুষ। ছেলে- মেয়ে, বুড়ো -বুড়ি থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ আছে এখানে। কেউ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে। কেউ যাত্রীদের বাদাম খাওয়ায়। একপাশে আমি আর মোকলেস ভাই গিয়ে বসি। বসেই তিনি জানতে চান আমার ঘটনা। ‘বলুন আপনার কি হয়েছিল, কেনো হলো?’
আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলে যাই। আমার কথা শেষ হবার পরও মোকলেস ভাই কিছু বলেন না। যেন সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। তার চোখে মুখে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। কি ভাবেন কে জানে? সকাল পর্যন্ত আমরা ট্রেন স্টেশনে বসে বসে গল্প করি। আমি কয়েকবার লক্ষ্য করেছি ভদ্রলোক আমার সাথে কথা বললেও একবারও মুখ তুলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। ভোরের আভা পূর্ব দিগন্তে সামান্য উঁকি দিতেই মোকলেস ভাই বলেন, ‘নামাজ পড়া দরকার।’
অনেক দিন পর কারও মুখে নামাজের কথা শুনলাম। আমার বাবা বেঁচে থাকতে বলতেন। সুমনা নামাজ পড়না কেন? নামাজ না পড়লে খোদতালা অসন্তুষ্ট হন মা। সে সময় বাবার কথা শুনে শুনে নিয়মিত নামাজ পড়তাম। স্বামীর সংসারে এসে দীর্ঘদিন আর নামাজ পড়া হয়নি। আমাকে কোনদিন নামাজ পড়তে তো বলেই নি বরং আমি প্রথম প্রথম যখন নামাজ পড়তাম খুব উপহাস করতো। তাতে কি? উপহাসের দোহাই দিয়ে কি বাঁচতে পারবো আমি। না সে বাঁচা সম্ভব নয়। মোকলেস ভাইকে বলি,‘কোথায় নামাজ পড়বো?’
‘মহিলাদের নামাজ পড়ার জায়গা আছে, তুমি সেখানে গিয়ে অজু করে নামাজ পড়বে আর আমি যাব মসজিদে।’
‘আমার খুব ভয় করছে মোকলেস ভাই।’
‘কিসের ভয়?’
‘অংকুরের। না জানি কখন এসে আবার আমাকে ধরে নিয়ে যায়।’
‘তোমাকে কে বাঁচিয়েছেন সুমনা ?’
‘আমার মালিক।’ বুক থেকেই কথাটা বের হয়।
‘চলো যিনি তোমাকে বাঁচিয়েছেন তিনিই তোমাকে সুন্দর জীবনের পথ বাতলে দেবেন।’
আমি হাঁটি। হেঁটে হেঁটে একটা রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দরজার সামনে বড় করে লেখা মহিলাদের নামাজের স্থান। আমি ঢুকে যাই। ভেতরে ওজু করার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। আমি ছাড়াও দেখি দু’জন মহিলা আছেন। তারাও নামাজ পড়তে এসেছে। অজু করে নামাজ পড়তে দাঁড়াই। আজ কেন যেন আমার চোখ বেয়ে ‘ভালবাসার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীকে ভালবাসা নয়, পৃথিবীর কোন মানুষকেও নয়, আজকের ভালবাসা স্রেফ আমার খোদাতালার জন্য। অনেক সময় ধরে নামাজ পড়ি। অনেক সময় ধরে প্রভুর কাছে কাঁদি। কখন যে মোকলেস ভাই এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন আমি জানি না। আমার দোয়া, প্রার্থনা শেষ করে বাইরে উঁকি দিতেই দেখি তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। তড়িঘড়ি বের হয়ে বলি,‘মোকলেস ভাই সাড়া দেবেন তো।’
‘আমার পছন্দ নয়।’
‘মানে?’
‘কেউ তার মালিকের সাথে সাক্ষাৎ করবে আর আমি সে সময় তাকে ডাকবো সেটা আমার পছন্দ নয়।’
‘আপনি যে এতো ভাল আপনাকে দেখে বোঝা যায় না।’
‘আমাকে দেখে যেমন মনে হয় আমি ঠিক সেরকম।’
আমি হাসি। হাসতে ভুলে যাওয়া আমি হেসে ফেলি। মোকলেস ভাই আমাকে বলেন, ‘সুমনা।’
‘জ্বি।’
‘তোমাকে তোমার স্টাটাসের বাইরে একটা কাজ করতে অনুরোধ করবো। কাজটা আমি না বলা পর্যন্ত তোমাকে করতে হবে।’
‘অনুরোধ বলছেন কেন বলুন আদেশ, আর আমার কোন স্ট্যাটাস নেই। আমি একজন মানুষ এই আমার সব।’
‘সুমনা বলো, তুমি একজন মুসলিম।’
‘মুসলিম কথাটা শুনে আবার কান্না চলে আসে আমার। ধরা গলায় বলি, ‘আমি তো মুসলমান হতে পারিনি। পারিনি আমার জীবনে রবের দেওয়া বিধান বাস্তবায়ন করতে।’
মোকলেস ভাই হাসেন। পবিত্র মোহনীয় হাসি। ‘ক্ষমা চাও আর রবকে বলো, আমাকে মুসলিম বানিয়ে দাও। এমন মুসলিম যাকে তুমি ভালবাস।’
‘বলবো। প্রতিদিন। আমার প্রতিটি রাত আমি বলবো। ’
‘এখন তোমাকে একটু কষ্ট করতে হবে।’
‘বলুন।’
‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেবে কেউ তোমাকে কাজের মহিলা হিসাবে রাখে কিনা। আমি তোমার পেছন পেছন থাকবো। যে বাড়িতে গিয়ে তুমি আপাতত থাকার স্থান গাড়তে পারবে সেখান থেকে আর বের হবে না। আমি ধরে নেব তুমি কাজ পেয়েছ। থাকার যায়গা পেয়েছো।’
আমি মোকলেস ভাইয়ের কথা বুঝি না। হয়তো তার কোন বাড়ি ঘর নেই কিন্ত আমার তো অনেকগুলো বাড়ি আছে। একটা বাড়িতে গিয়ে উঠলেই তো হয়। দরকার হলে মোকলেস ভাই ও আমার সাথে থাকবেন। হয়তো ধর্মীয় কারণে তিনি একসাথে এক বাড়িতে থাকতে চাইবেন না আর সেজন্যই আমাকে এ কাজের কথা বলছেন। আমার মনের অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব না চাইতেই দিয়ে দেন ভদ্রলোক। ‘তোমার বাড়িতে আপাতত তুমি নিরাপদ নও। অংকুর যে কোন সময় সেখানে যেতে পারে। তোমার জীবন আমার কাছে যখন নিরাপদ মনে হবে তখন আমিই তোমাকে তোমার বাড়িতে পৌছে দেব বোন।’
মোকলেস ভাই ঠিকই বলেছেন। অংকুর কোন মানুষ না। যে কোন সময় সে আমাকে হত্যা করতে ছুটে আসবে। হয়তো পাগলের মতো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে শয়তানটা। এখন অচেনা অজানা একটা জায়গা আমার জন্য নিরাপদ। যে জাায়গা অংকুরে কাছে অজানা, অচেনা। তার ধারণার বাইরে। পথে বের হয়ে তিনটা বাড়ি যাই। কেউ আমাকে কাজ দেননা। প্রত্যেক বাড়ি গিয়ে বলি, আমাকে কি একটা কাজ দেওয়া যায়। বাড়ির কাজ। আমার বাবা-মা নেই। তিনটি বাড়ির কেউ আমাকে কাজ দেয় না। চতুর্থ বাড়ি ঢুকবো কি ঢুকবো না এমন সন্দেহের দোলাচালে ভুগি। আমার পেছনে মোকলেস ভাই। প্রায় ত্রিশ গজ দূরে। বাড়িটার নাম বিলাসী। বাড়ির সামনে একটা বড় গেট। এই বাড়ির হয়তো কারও বিয়ে হবে। আমি পেছন ফিরে তাকাই। মোকলেস ভাই ইশারা করেন। মাথা নেড়ে অনুমতি দেন প্রবেশ করার। বাড়ির গেটে গিয়ে কলিং বেলের সুইচে হাত রাখি। একটা টিপ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। পাঁচ মিনিট পর ১৬-১৭ বছরের এক মেয়ে বের হয়। সুন্দর লম্বা মুখ। ফর্সা চেহারা। সারা মুখে একটা মায়ার পরশ বুলানো। মেয়েটাকে দেখে আমার সাহস হয়। কেন যেন মনে হয় মেয়েটা আমাকে ফিরিয়ে দেবে না। আমাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, ‘আপা বলুন কি সমস্যা আপনার?’
‘আমার বাবা-মা নেই। একটা কাজ দেবে?’
‘কেন দেবোনা? আমাদের বাড়িতে একজন কাজের লোক দরকার। আপনি এসেছেন ভালই হলো।’ কথা শেষ করে মেয়েটা আমাকে দোতালায় নিয়ে যায়। সোফার উপর বসতে দেয়। আমার সামনা সামনি বসে বলে, ‘কি নাম আপনার?’
‘সুমনা।’
‘বাহ্ খুব সুন্দর নামতো।’
আমি ও পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘তোমার নাম কি আপু?’
‘আমার নাম মৌ। আমি এবার এইচ.এস.সি পরীক্ষা দেব। মডেল কলেজে পড়ি। জানেন আমাদের কলেজটা কিন্ত খুব সুন্দর।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যা।’ ঘাড় নেড়ে জবাব দেয় দেয় মৌ। ‘আপনার কি স্বামী নেই।’
‘ছিল, তাড়িয়ে দিয়েছে।’
‘গরিব হলে এই হয়। তাদের পাশে কেউ বেশি দিন থাকে না।’
আমি মনে মনে হাসি। গরিবরা তো বউ তাড়ায় আর ধনীরা বউকে মেরে ফেলার জন্য গায়ে পেট্রোল ঢেলে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসে। মৌ কি তা জানে। ছোট মানুষ। সামনের দিনে জ্ঞান বাড়ার সাথে সাথে হয়তো জানবে, বুঝবে। তার কথায় সায় দিয়ে বলি, ‘ঠিক বলেছো মৌ।’
মৌ খুশি হয়। মুখে খুশি খুশি ভাব নিয়ে বলতে শুরু করে, ‘আমাদের বাড়িটা সুখের। বলতে পারেন খুব সুখের। এই যে দুই তলা বাড়ি দেখছেন না?’
‘দেখছি।’
‘এই বাড়িতে আমার বাবা, দুই চাচা একসাথে থাকে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যাঁ। সেজ চাচা আর আব্বু মিলে ব্যবসা করেন। মেঝ চাচার কাজ হলো কন্ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন কাজ করা।’
‘তোমরা কয় ভাইবোন মৌ?’
‘আমার দুই বোন। বড় বোন হলো কানিজ ফাতিমা, তারপর আমি আমার ছোট মীম।’
‘দুই বোনের নাম তো বেশ সুন্দর। ইসলামী ভাবধারার তা তোমার নামটা মৌ হলো কেন?’
‘মৌ না তো আমার ভাল নাম আছে। কানিজ ফাওজিয়া।’
‘আমি তোমাকে ফাওজিয়া বলে ডাকবো।’
‘ভাল হবে।’
আমাদের কথার মাঝে চোখ ডলতে ডলতে মৌ এর বয়সী একটা ছেলে এসে হাজির হয়। রুমে ঢুকেই কথা বলে ছেলেটা , ‘সাত সকালে এতো প্যাক প্যাক করছিস কেন?’
‘ভাইয়া....’ লম্বা করে কথা বলে মৌ। গ্রামের মানুষজন এ ধরনের কথাকে বলে আহ্লাদি কথা।
‘কিরে গলে পড়ছিস কেন?’
‘কিসের মতো গলে পড়ছি ভাইয়া! মোমবাতির মতো?’
‘মোমবাতি তো ভাল তুই গলে পড়ছিস মরা ছুচার মতো। তোর গলে পড়ার ভেতর বিশ্রী গন্ধ বের হচ্ছে। মাছি ভন ভন করছে। ’
মৌ চিৎকার করে। ‘ভাইয়া...... এ্যা। শিয়াদ।’
ওদের চেঁচামেচি শুনে বয়স্ক এক ভদ্র মহিলা হাজির হন। আমাকে দেখে অবাক হন তিনি। মৌ কে প্রশ্ন করেন, ‘কে মেয়েটা?’
‘আমার আপু। জানো আম্মি ওনার বাবা-মা নেই। স্বামী ছিল তড়িয়ে দিয়েছে। কাজ করবে।’
মহিলা আমাকে ভাল করে চেয়ে দেখেন। ‘সাত সকালে তাকে কোথায় পেলি?’
‘পেয়েছি মা।’
এবার আমাকে বলেন, ‘কি কাজ করতে পারো তুমি?’
‘সব পারি মা। যা বলবেন তাই করবো। ’
‘বেশ। কতো টাকা চাও?’
‘আমাকে খেতে দিলেই হবে। ’ নরম সুরে জবাব দেই।
‘ঠিক আছে। তুমি যখন আমাকে মা বলেছো মেয়ের মতোই থাকবে এ বাড়িতে। শুধু আমাকে সাহয্য করবে। কি পারবে না?’
আমি অবাক হই। কি সুন্দর ব্যবহার এদের। ইসলাম মানলে বাড়িটা পুরাপুরি বেহেশত হয়ে যাবে।
চার.
সুমনাকে আমার প্রথম দেখা আর তাকে নিয়ে শত শত ভাবনা সহজেই জীবন থেকে চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। জীবন চলবে সাথে সাথে সুমনাও চলবে। সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যাবে সামনে। সুমনার চেহারা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমেই বলবো, মেয়েটা মোটেও সুন্দরী নয়। ছোটখাট কাকের মতো কালো একটা মেয়ে। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। হয়তো পেরিয়েছে কিংবা পার হয়ে দু’একদিন বেশিও হতে পারে। আমি ওর বয়সটা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারিনি। বয়স সম্পর্কে প্রশ্নও করিনি। প্রশ্ন না করার কারণ হলো সঠিক জবাব না পাওয়ার আশঙ্কা। ইদানিং কেউই নিজের বয়স সর্ম্পকে সঠিক তথ্য দেয় না। মেয়ে হলে তো কথাই নেই।
সুমনার সাথে পরিচয় আমার এক বন্ধু মহিনদের বাড়িতে। হাই স্ট্যাটাসের মানুষ। বছরে ৩৬৫ দিনে ওদের বাড়িতে ৭১০ টি উৎসব হয়। আজ জন্মদিন, কাল মৃত্যুবার্ষিকী, পরশু বিবাহ বার্ষিকী তারপর হ্যাপি নিউ ইয়ার, পহেলা বৈশাখ, ভালবাসা দিবস ইত্যাদি। হতেই থাকে। বাড়ির সামনে গেট সাজানো থাকে সারা বছর। মাঝে মাঝে ব্যানার পরির্বতন হয়। ব্যানারের লেখাগুলো এ রকম- ‘আজ রফিকের বিয়ে।’ ‘হানিমুন থেকে ফিরেছে শিয়াদ।’ ‘বাবা নেই।’ ‘আমেরিকার খালাম্মা তিনার ফুটফুটে কুটকুটে সন্তান ডাব্লুর জন্মদিন।’ হিন্দু সমাজের জন্য বলা একটা প্রচলিত প্রবাদ শুনে এসেছি ছোট বেলা থেকে, হিন্দুদের বার মাসে তের পূজা। পূজা মানে সহজ কথায় আনন্দ উৎসব। সেই বার মাসে তের পূজা প্রবাদটা যদি ভুলেও মহিনদের বাড়ির ত্রিসীমানায় আসে তো লজ্জায় হাওয়া হয়ে যাবে! ভাগ্য ভাল যে প্রবাদ মানুষ না। সে ঘুরেফিরে কারও বাড়ির চারপাশে আসে না আর তার গোল ফর্সা মুখ নেই।
মহিনের জন্মদিন ২০ শে জানুয়ারি। ২০ শে জানুয়ারি একটা ইতিহাস হয়ে গেছে আমেরিকার কালো প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শপথের কারণে। কোন এক বছর সম্ভবত ২০০৯ সাল। আমেরিকায় কালোরা প্রেসিডেন্ট হয় না। নিষেধ না থাকলেও হয় না। কয়েকশত বছর পর ওবামা রের্কড করেছেন। ইতিহাস হয়েছেন। ইদানিং আমেরিকানরা যা কিছু করছেন সবকিছুই ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। ইরাকে, আফগানে বুশের হামলা একটা ইতিহাস। জাইদি, ইরাকের সাংবাদিক বুশকে জুতা ছুঁড়ে মারলেন সেটাও একটা ইতিহাস। কতো মানুষ জুতা ছোড়া খাচ্ছে, জুতাপেটা হচ্ছে কিন্তু তারা তো ইতিহাস হতে পারছে না। ঠিক একই রকম ভাবে ২০ শে জানুয়ারি মহিনের জন্ম দিন হলেও সে ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবেনা। তারপরও ২০ শে জানুয়ারি মহিনের জন্মদিন, জন্মোৎসব! বিষয়টা মহিনের কাছে খুবই গৌরবের, গর্বের। আমাকে দাওয়াত করেছিল মাসখানিক আগে। হঠাৎ এক দুপুরে আমার হাতে সবুজ রংয়ের একটা কার্ড গুঁজে দেয়। জন্মদিনের কার্ড। আপনি আমন্ত্রিত। আমাকে একটু কৌতুকের ছলে বলে, ‘রিফাত সাপ আইসেন কিন্ত। আপনি তো এসবের ঘোর বিরোধী। ’
আমি হাসতে হাসতে বলি, ‘রিফাত সাপ না বলে রিফাত ব্যাঙ বল ভাই। আমি নিরীহ মানুষ। কাউকে ছোবল দেই না। শুধু ব্যাঙের মতো ঘ্যা ঘ্যা করি। তাতে কারও ক্ষতি হয় না।’
যাব কি যাবনা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পরও একটা রজনীগন্ধা হাতে করে গিয়েছিলাম। আমি গরিব মানুষ, আর ফুলের চাইতে ভাল কি আছে! অনেক লোকের মাঝখানে বড় একটা কেক সামনে করে দাঁড়িয়ে ছিল মহিন। রং-বেরংয়ের বেলুনের ছড়াছড়ি। কেকের উপর কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। পর্যাপ্ত আলো থাকার পরও কেকের উপর মোমবাতি জ্বালানোর তাৎপর্য কি আমি জানি না। নিশ্চই কিছু একটা রহস্য থাকবে! না থাকলে আধুনিক সভ্য সমাজ এগুলো করবে কেন? আমি সভ্য সমাজকে শ্রদ্ধা করি তারপরও এ বিষয়টিকে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না বছর ঘুরে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্মদিন আসে। একজন মানুষ একবার জন্মালেও তার জন্মদিন হয় ৮৪ বার। নামকরা কিছু একটা হতে পারলে তো কথাই নেই। তার জন্মদিনের, জন্মোৎসবের শুরু আছে শেষটা মালিকের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।
মহিনের জন্মদিনে আমার উপস্থিতিতে অনেকেই মুখ পোড়া, চোখ পোড়া ভাব নিয়ে চুপসে যায়। যেন মহতী অনুষ্ঠানে হিংস্র কোন পশুর আগমন। আমি হাসি। একাই। কেউ হাসে না। নিজেকে কেমন বেমানান মনে হয়। বোকা বোকা মনে হয়। অবশ্য অল্পক্ষণ পরই যখন মহিন ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভায় তখন চোখ পোড়া মুখ পোড়া সব মানুষগুলো উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। আমি বেঁচে যাই। তারপরও বাঁচি না। আশেপাশের সবাই সমস্বরে গীত গাওয়া শুরু করে, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ। আমিও হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ এর মতো করে মুখ নাড়াই। ঠোঁট নাড়াই। অনেক শব্দের মাঝে আমার নিঃশব্দের মুখ নাড়ানোও হ্যাপি বার্থ ডে হয়ে যায়। মনের মাঝে হাসি চেপে তন্ত্র মন্ত্র পড়ার মতো ঠোঁট নাড়াতে থাকি। মন্ত্র নিয়ে কবিরাজ সমাজ একটা কথা চালু করেছে- ভক্তিতে মুক্তি। কথাটা সত্য হলে এতোগুলো মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা মেশানো হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ গীত গাওয়ার সাথে সাথে মহিনের একদিনের বাচ্চা হয়ে যাবার কথা। সদ্য পৃথিবীতে আসা, জন্ম নেওয়া শিশু। এতোগুলো মানুষ, চিৎকার আর ভ্যা ভ্যা শুনে মহিনের বিস্ময়ের সীমা থাকবে না। মহিনও চিৎকার দেবে। তার চিৎকারে থাকবে অজানা আশঙ্কা, ভয়। এ কোন জগতে আসলো সে! প্রতিটি শিশুই ভূমিষ্ঠ হয়ে ক্যা ক্যা করে কাঁদতে থাকে। কেন কাঁদে? হয়তো পৃথিবীর কথা, মানুষের নিষ্ঠুরতার কথা তার কানে কানে কেউ বলে দেয়। হয়তো বলে দেয়, জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। আসলেই মানুষের জীবন সহস্র সহস্র পরীক্ষার আবরনে ঢাকা। পাশ করলে ভাল ফেল করলে মন্দ। পরীক্ষাকে পাশ কাটানোর কোন সুযোগ নেই। আমি যেবার ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছিলাম সেবার আমার সিট পড়েছিল লিটন নামের এক যুবকের পাশে। ওর ভাল নাম জহুরুল ইসলাম। ইংরাজী পরীক্ষা ভাল হয়নি বলে পরর্বতীতে আর পরীক্ষা দিতে আসেনি। বেচারার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছিল। কেন পরীক্ষা দিচ্ছেনা! অন্যগুলো দিতো। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ওর সাথে দেখা করার সুযোগ না হলেও পরীক্ষা শেষ হবার কয়েকদিন পরই ওদের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম। বেশ সুন্দর একটা বড়ি। তিন তলা বড়িটার নাম হ্যাপি কটেজ। দ্বিতীয় তলায় থাকে ওরা। বাকিগুলো ভাড়া। ঢাকা শহরে এই একটা সুবিধা। কোন রকম একটা বাড়ি থাকলেই হয়। ভাড়ার টাকায় চৌদ্দ পুরুষের জীবন কেটে যাবে। অনেক সময় বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে লিটন লিটন করছি। চিৎকার করে ডাকছি। কোন জবাব পাই না। শেষমেষ কলিং বেলের শরণাপন্ন হই। পর পর তিনটা সুইচ। প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলা, তৃতীয় তলা অনুমান করে মাঝখানের সুইচে একটা টিপ। তারপর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা। অপেক্ষার পালা শেষ হয় গোঁফে মুখ ঢাকা বেশ মোটাসোটা চল্লিশোর্ধ একজনের আগমনের মধ্য দিয়ে। গেট খুলেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন ভদ্রলোক। লাল চোখে কড়া মেজাজে বলেন, কাকে চাই?
আমি ম্যান ম্যান করে বলি, লিটন আছে?
‘কিসের লিটন?’
লোকটার ভাবলক্ষণ ভাল মনে হয় না। আমার মনে হয়েছিল দু’চার কথা বলেই আমাকে পেটানো শুরু করবে। দৌড় দেবারও সুযোগ নেই। ঢাকা শহরে নিরাপরাধ মানুষ দৌড় দিলেও মুর্হূতের মধ্যে সে অপরাধী হয়ে যায়। মানুষ জন কিলবিল করে এসে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। আমার বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস মার্কা কম্পন শুরু হয়। লিটন থাক। সারা জীবন সে আর পরীক্ষা না দিক তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কিসের লিটন! ওরে বাবা।
বিনয় মাখা কণ্ঠে বলি, চাচাজান, স্যার আমার বাড়ি মিরপুর। এদিকে হাঁটতে হাঁটতে এসেছিলাম। আসলে এমনিতেই কলিং বেলে টিপ দিলাম। আমার মাথায় একটু...।
কথা শেষ না হতেই গোঁফওয়ালা লোকটি ধড়াস করে গেটটা বন্ধ করে দেয়। গালি আওড়াতে আওড়াতে ভেতরে চলে যায়। আমি বেঁচে যাই। মনে পড়ে বুক ভরে দম নিয়েছিলাম। তারপর রাজপথ দিয়ে সামনে চলি, সামনে।
কিছুক্ষণ জন্মদিনের গীত গাওয়ার পর ভোজন পর্ব শুরু হয়। খাওয়া দাওয়া পর্বে ছেলে মেয়ে সবাই মিলে যখন গেলাগেলির তুলকালাম কান্ড চলছিল তখন একটা মেয়েকে দেখি অনেকটা আমার মতো একটা বিস্কিট হাতে করে বসে আছে। খাচ্ছে না। বিষণ্ন চেহারা। কি যেন ভাবছে। তার চেহারার বর্ণনা আগেই দিয়েছি। দেখতে মোটেই আকর্ষণীয় নয়। তেমন সাজগোঁজও করেনি। সাদামাটা একটা সেলোয়ার কামিজ। মাথায় একটা বেগুনি কালারের ওড়না। কিছুক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছে। এ কথা ভাবার অবকাশ নেই যে, মেয়েটা আমার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে আমাকে তার স্বপ্ন ভরা নয়নে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। এটা হতে পারে যে, বেমানান একজন মানুষ সভ্য আধুনিক সমাজের মিছিলে তার মতো বেমানান আরেকজন সহযোগী পেয়ে তাকে দেখছে। আপন ভাবছে।
মহিনের জন্মদিনে যাকে চিনেছিলাম তাকে আর ভুলতে পারিনি। সেদিন কথা না হলেও তার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় আবার দেখা। ছোট একটা ব্যাগ কাধে করে যাচ্ছে। নিশ্চই আশেপাশে বাড়ি। আমাদের মহল্লারই মেয়ে। জানি না হয়তো শৈশব থেকে একই আলো বাতাস, একই সূর্যের উদয় অস্তো আমাদের বেড়ে ওঠা। একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা। অনেক মানুষের ভিড়ে আমি তাকে জানতে পারিনি। জানবোই বা কি করে! মেয়েটা সুন্দরী নয়। মহল্লায় যুবতী সুন্দরী যত মেয়েই থাক ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের জেনেই ফেলি। কেউ প্রেমে মগ্ন হয়। প্রেমিক প্রেমিকার উৎফুল্ল চিত্তের ঘোরফেরা সবার নজর কাড়ে। তারপর আসে বিবাহ বিচ্ছেদের পালা। প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার মরণ চিৎকারে কারও আর জানতে বাকি থাকে না, অমুক বাড়ির ঐ মেয়ের প্রেমিক দেখ ওয়াসার পানির সাথে মিশে মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে গেছে। একবার এরকম গল্প শুনেছিলাম, ওয়াসার পানির বড় ট্যাংকির মধ্যে লাশ। পচে গলে একাকার। ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত টিউবওয়েল নেই। সবাই ওয়াসার পানি খায়। সেই পানিতে তীব্র গন্ধ। গন্ধ কেন? গন্ধ কেন! শেষমেষ পানির ট্যাংকির মধ্যে পাওয়া গেল গন্ধের রহস্য। মানুষ।
আমাাকে দেখে মেয়েটা দাড়ায়। তারপর দশ গজ দূরে থাকা আমার দিকে তাকায়। আমার বুকের কানে কে যেন নিঃশব্দে বলে, রিফাত মেয়েটা তোর জন্য দাঁড়িয়েছে। রাস্তাার মাঝখানে মানুষ জনের ভেতরও স্তাব্ধ হয়ে গেছে। তোর জন্য। আমি ছুটে যাই। অনেকটা নির্বোধের মতো। কাছাকাছি পৌছে প্রশ্ন করি, কেমন আছেন ম্যাডাম?
‘জ্বি,ভাল। আপনি?’ ফ্যাসফেসে গলায় জবাব দেয় মেয়েটা। সম্ভাবত ওর ঠান্ডা লেগেছে।
‘ভাল। আমিও ভাল আছি। তারপর আপনার বাড়িটা যেন কোনদিকে?’
‘পৃথিবী আমার বড়ি ঘর।’
‘ও আচ্ছা। তা কি করেন আপনি?’
‘আকাশ দেখি।’
‘আকাশ তো সবাই দেখে। দেখতেই হয়। আমি কি তাই শুনতে চেয়েছি?’
‘রাস্তাা দিয়ে হাঁটি।’
‘আমি কঠিন কথা বুঝি না। সহজ করে বলুন।’
মেয়েটার সহজ কথা শুনবো কি! দৌড়ে বাঁচি না। ঠিক আমাদের সোজা রাস্তাা দিয়ে একজন চাপাতি নিয়ে দৌড়ে আসছে। চাপাতিতে লাল রক্তের কাঁচা দাগ। তার সামনে মানুষ দৌড়ায়, পেছনেও মানুষ দৌড়ায়। বেঁেচ থাকলে অনেক খোশ গল্প করা যাবে, আগে বাঁচি এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনের রাস্তা ধরে দৌড় শুরু করি। দৌড় প্রতিযোগিতার একটা নির্ধারিত সীমানা থাকে। আমি যে দৌড় শুরু করি তার শেষ আর সীমা নেই। দৌড়ের মাঝে পেছনে ফিরে ফিরে দেখি। যতবারই পেছন ফিরি একই দৃশ্য- চাপাতি, লালরক্ত, দানব। লোকটা কাকে মারতে ছুটছে, কেন চাপাতি হাতে ছুটছে এ প্রশ্নের উত্তর আমি যেমন জানি না, তেমনি আমার সাথে, সামনে, পাশে, পেছনে দৌড়ানো কেউ হয়তো জানে না। আমরা দৌড়াচ্ছি। অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতো। নায়ক চাপাতি হাতে কষে ভিলেনদের দাবড়াচ্ছে।
প্রায় টানা দশ মিনিট রাস্তাা দিয়ে দৌড়ানোর পর দৌড় পর্ব শেষ হয়। লোকটাকে পুলিশ বাহিনী কৌশল করে ধরে ফেলে। লোকটা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হাবার পর দৌড়ানো আতঙ্কিত মানুষগুলো কৌতূহলী দর্শকে পরিণত হয়। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। ওকে কষে বেশ কয়েকটা থাপ্পড় মারতে খুব ইচ্ছা করছিল আমার। অনেক কৌতুহল, আগ্রহ থাকার পরও জানতে পারি না লোকটা কেন ওভাবে মানুষকে ধাওয়া করেছিল। তবে এতটুকু জানি যে, তার চাপাতির আঘাতে চৌদ্দজন মানুষ হাসপাতালে পৌছে গেছে। তার ভেতর থেকে হাসপাতাল পাড়ি দিয়ে দু’একজন কবরেও পৌছে যেতে পারে এমন সম্ভাবনাও নাকি প্রবল।
সেদিন বাড়ি পৌঁছাতে বিকাল চারটা বাজে। বাড়িতে আমার বাবা-মা, দুই ভাই, দুই ভাবী, দুই বোন, দুই ভাইয়ের চারটে বাচ্চা সব মিলিয়ে এগার সদস্যের একন্নবর্তী পরিবার। বড় সুখের সংসার আমাদের। বোন দুটোর জন্য অযথাই মা টেনশন করেন। পৃথিবীর সব মা গুলোই নাকি এরকম। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, মেয়ে দুটোর বয়স হয়ে যাচ্ছে।
আমি হাসি। বয়স তো সবারই হচ্ছে। টাইম অ্যান্ড...।
মা ধমক দেন। পাকা পাকা কথা বলতে হবে না। সারাদিন রাস্তাা দিয়ে ঘোরা আর খাওয়ার সময় বাড়ি এসে খাওয়া এই তো তোমার কাজ। এতো পাকা কথা আসে কোথা থেকে?
- জিহ্বা, কণ্ঠ, গলা থেকে।
মা রেগে যান। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বাবাকে ডাকেন। আমার বাবা সহজে উত্তেজিত হন না। অনেক জটিল বিষয় নিয়ে তিনি ভাবেন। বিষয়গুলো অনেক কষ্ট দেয়। মাথায় টেনশন, বুকে কষ্ট থাকলেও তিনি তা প্রকাশ করেন না। হাহাকার করেন না। এই যে মেয়ের বয়স বাইশ পার হতে চলছে উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছেন না। তারপরও হাহাকার নেই। আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের কষ্ট অনুভব করতে পারি।
বাড়ীর ভেতর পা দিতেই আমার সেই বাবার সমনে পড়ে যাই। বারান্দায় বসে পেপার পড়ছেন। আমাদের বাড়িটা পাঁচ কাঠা জায়গা নিয়ে। দুই পাশে দুটো ঘর মাঝখানে ছোট্ট আয়তনের ফাঁকা জায়গা। ঢাকা শহরের উপর পাঁচ কাঠা জায়গা মানে বিরাট কিছু। আমার তাই মনে হয়। আমাদের ছোট্ট জীর্ণশীর্ণ একতলা দুটো বিল্ডিংয়ের চারপাশে বড় বড় সুউচ্চ ভবন সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। বিল্ডিংয়ের মুখ থাকলে হয়তো উপহাস করতো। বলতো, কিরে বুড়া আর কতোকাল এভাবে থাকবি? আমাদের বিল্ডিংটা বলতো, বাবারে আমাদের মালিক ঠিক মতো খেতে পরতে দেয়না। দেখনা না খেয়ে খেয়ে কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছি। আমাদের বুকে পিঠে পোকা-মাকড়, গাছপালা ঘর বাঁধছে। আর বেশিদিন হয়তো থাকতে পরবো না। সত্যিই বাড়িটা অনেক পুরানো। স্বাধীনতার আগে আমার দাদা কলকাতায় চাকরি করতেন। দাদা-দাদির জন্ম ঐ কোলকাতাতেই। দেশ ভাগের পর দাদাজান তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমালেন। কলকাতার এক মুসলিম আর ঢাকার এক হিন্দু স্ব স্ব সম্পত্তি বদল করে দু’ দেশের বাসিন্দা হয়ে গেলেন। সে ১৯৪৭ সালের কথা। তখনকার করা সেই হিন্দু মালিকের বাড়িটাকেই আজকে পর্যন্ত আমরা আমাদের বাড়ি বলে চালাচ্ছি।
আমাকে ঢুকতে দেখে বাবা পেপার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকান। ভাল করে আমাকে দেখেন। আমি তার সন্তান রিফাত। যেন চিনতে পারছেন না এমন একটা ভাব। ‘কিরে তোর এ অবস্থা কেন?’
‘কি অবস্থার কথা বলছেন আব্বা?’
‘গায়ে ধুলাবালি, এলোমেলো চুল। মনে হচ্ছে রিকশা চালিয়ে এসেছিস। ’
‘জ্বি।’
‘ভেরিগুড। নিয়মিত রিকশা চালাবি। কিছু না হোক পকেট খরচের টাকার জন্য তো আর ভাইদের কাছে ধরনা ধরতে হবে না।’
‘রিকশা চালাইনি আব্বা।’
‘তাহলে! জ্বি বললি কেন?’
‘গায়ে ধুলাবালি, এলোমেলো চুল সেটা স্বীকার করলাম।’
‘ও আচ্ছা। তা চেহারাটা পাগলের মতো কেন?’
‘রাস্তাা দিয়ে দৌড়িয়েছি। একজন চাপাতি নিয়ে ধাওয়া করেছিল।’
‘কেন কেন!’ বেশ অবাক হন বাবা।
‘জানি না।’
আমার কথা শুনে বাবা নিরব হয়ে যান কথার আগামাথা কিছু বুঝে উঠতে পারেন না।
পাঁচ.
নিশাতকে খুব ভালবাসে বিপ্লব। চার বছরের সন্তান বাবা অফিস থেকে আসার সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। মুন্সিগঞ্জ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরতেই প্রতিদিনের মতো করে দৌড়ে যায় নিশাত। বাবাকে জড়িয়ে ধরে। বাবার সাথে প্রায়ই অনেক গল্প হয় তার। আজও গল্প জুড়ে দেয়। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও ছেলের সাথে সুন্দর করে কথা বলে বিপ্লব। কখনো ক্লান্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করে না।
‘বাবা জানো?’
‘কি জানতে হবে বলো।’
‘সে দিন রাতে কি সুন্দর অনুষ্ঠান হলো।’
‘কবে?’
‘কেন জানোনা, ঐ যে আম্মি আংকেলদের সাথে কি সুন্দর নাচলো।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যা।’
‘কেমন নাচলো বাবা?’
‘ঐ যে সিনেমার মতো। হাত ধরে ধরে। আংকেল তো কাল রাতে বেড়াতে এসেছিল। তুমি কেন যে আরেক যায়গায় বেড়াতে গেলে?’
ছেলের কথা শুনে বিপ্লবের মুখটা কালির মতো হয়ে যায়। আমি পাশের রুমে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনি। দৌড়ে গিয়ে ছেলেটার মুখ টিপে ধরতে ইচ্ছা করছিল। বিপ্লব অন্য দিনের মতো নিশাতের সাথে হাসি রশিকতায় মশগুল হয় না। চুপ করে বসে থাকে। নিশাত অনেক কথা বললেও বিপ্লব চুপ করে থাকে। নিশাত ঘুমানোর আগে আমি বিপ্লবের সামনে যাই না। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে গিয়ে ওর পাশে বসি। আমার দিকে এক বারের জন্যও তাকায় না বিপ্লব। কিছু সময় বসে থেকে কোন কিছু না জানার ভান করে বলি, ‘তোমার কি মন খারাপ?’
‘না।’ জবাব দেয় বিপ্লব।
‘মুখ দেখে কেমন মনে হচ্ছে।’
‘কেমন মনে হচ্ছে?’
‘কালো।’
বিপ্লব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ‘নীল মনে হচ্ছেনা?’
‘নীল কি হয়।’
‘১৪ তারিখ আমাকে মুন্সিগঞ্জ পাঠালে। কেনো?’
‘বাবা-মা কে দেখতে যাও না অনেক দিন সেজন্য। আর কি...’
‘তুমি কোথায় ছিলে? ’
আমি আশ্চর্য হওয়ার ভান করি। তারপর স্বাভাবিক হয়ে বলি, ‘কেন বাড়ি ছিলাম।’
‘না।’
‘তো।’
‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছো। তারপর........’
‘তারপর কি?’
‘তুমি বলোতো তারপর কি?’
প্রথম বিপ্লব কে পথের কাঁটা মনে করেছিলাম। আজ নিশাতকে মনে হচ্ছে, সে আমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে ফেললো। ওকে আমি পেটে ধরে ভুল করেছি। পেটের সন্তান হলে কি আমার এমন ক্ষতি করতে পারতো ছেলেটা। ঘুমিয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকাই। নিশাত। কাঁটাকে হুড়মুড় করে তুলতে গেলে কাঁটা বিঁধে যাবে। আমি বিপ্লবের একটা হাত ধরে বলি, ‘বিপ্লব প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আসমানের মালিকের দোহাই আমি এমন কাজ আর কোনদিন করবো না। প্লিজ ক্ষমা করে দাও। প্লিজ।’
চোখের পানিকে আহ্বান করি। চোখের পানি আমার কথায় সাড়া দেয় না। তারপরও বিপ্লব কিছুটা নরম হয়। কিছুটা বিশ্বাস করে। ‘তুমি ক্লান্ত এসো ভাত খাবে।’
‘না, খেতে ইচ্ছা করছে না।’
‘তাহলে ঘুমাই।’
বিপ্লব বিছানায় আসে। ‘তোমার একটুও লজ্জা করলো না রিতা।’
‘আবার সেই কথা। প্লিজ আমাকে মাফ করো।’
বিপ্লব আর কথা বাড়ায় না। আমি ঘুমানোর ভান করি। বিপ্লব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ছাদে চলে যাই। চাঁদ উঠেছে বড় একটা। ঢাকা শহরের রাস্তাা দিয়ে একের পর এক গাড়ি চলছে। রাত এগারটা, এখনো ব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি। অংকুরের নাম্বারে কল দেই। রিসিভ করে না। এতো সময় পথের একটা কাঁটা পুড়ে ছাই হবার কথা। সুমনা। আজ তার মৃত্যু হবে। অংকুরের বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়। মাথায় ঘিলু আছে বটে। প্রেট্রোল দিয়ে সুমনাকে জ্বালিয়ে দেবে কোন এক নদীর পাড়ে। নিরিবিলি যায়গায়। সুমনার বাবা-মা নেই। কোন আত্মীয়-স্বজনও নেই। পুড়ে ছাই হয়ে নদীতে ভেসে বেড়াবে। কেউ দেখে ফেললেও সমস্যা নেই। ব্যাপারটাকে স্রেফ আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। নিশাত আর বিপ্লব কে সরানোর ও একটা গ্রেট পরিকল্পনা করেছে অংকুর। সেটা হবে সুমনা চলে যাবার পরই। তারপর অংকুর আর রিতার একটা সুখের সংসার হবে। আমি বলেছি, ঢাকা নয় অংকুর চট্টগ্রাম চলে যাব আমরা। সেখানে আমাদের কেউ জানবে না। ঢাকার বাড়িটা বিক্রি করে কক্সবাজারে সুন্দর একটা বাড়ি করা যাবে। অংকুরের তো আর টাকার কোন অভাব নেই। বিদেশ থেকে ঘুরে আসবে কয়েক মাস। বিয়ের পরই চলে যাবে ওরা। তারপর দেশে এসে সব কিছু ভুলে নতুন এক জীবন। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন ধরে অংকুর। ‘হ্যালো।’ অংকুরের কণ্ঠে ভয়।
আমি চমকে উঠি, ‘কি হয়েছে অংকুর?’
‘সুমনাকে তো পাচ্ছি না।’
‘সুমনাকে পাবে মানে!’
‘মানে সে তো গাড়িতে হাত-পা বাধা, মুখে কাপড় গোজা অবস্থায় ছিল। হঠাৎ গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। আমি তেল নিয়ে এসে দেখি সুমনা নেই।’
‘কি বলছো অংকুর?’
‘হ্যা, এই যে এখন গায়ে চিমটি কেটে দেখি....... ঠিক বলছি রিতা, সুমনা নেই।’
‘কি অবাক করা কথা?’
‘আমার তো মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা। কি করি বলোতো।’
অংকুরকে হারানোর ভয়ে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। সুমনা এবার নিশ্চই কেস করবে। এমনও হতে পারে এ অবস্থায় সে দৌড়ে চলে যাবে থানায়। সুমনার গায়ে পেট্রোল। হাত-পা বাধার দাগ শরীরে। মামলা হলে অংকুরকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। সেখানে রিমান্ডে অংকুর স্বীকার করবে রিতা আর সে মিলে তার স্বামী-সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। সাথে সাথে বিপ্লবও মামলা করবে আমার নামে। এসব কথা অংকুর কে খুলে বলতেই ও অস্থির হয়ে ওঠে। ‘এখন!’
‘তুমি শান্ত হও অংকুর। মরেছিই যখন তখন একটা কিছু করতেই হবে। তুমি চলে আসো আমার এখানে।’
‘তারপর।’
‘আগে আসো পরে বলবো।’
কথা শেষ করে আমি নিচে চলে আসি। অংকুর আসবে। এতো রাতে দারোয়ান নিশ্চই আটকাবে তাকে। আগে এর সুরাহা করতে হবে। আমি নিচে চলে যাই। আমাকে দেখে বড় বড় গোঁফওয়ালা দারোয়ান চোখ বড় বড় প্রশ্ন করে, ‘এতো রাতে আফা?’
‘আর বলোনা আমার এক ভাই এসেছে বিদেশ থেকে। ঢাকাতে তার কেউ নেই। মাত্র ফোন করলো। এসব কি ভাল লাগে?’
‘ও আচ্ছা।’ দারোয়ান সহজে বুঝে ফেলে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি। অংকুরের আসতে বেশ সময় লাগে। গাড়ি রেখে প্রায় ঘণ্টা খানেক পর হাজির হয়। আমি দাঁড়িয়েই ছিলাম। অংকুর আসতেই বলি, ‘এতো দেরি হলো ভাইয়া?’
অংকুর আমার কথা সহজেই বুঝে ফেলে। দারোয়ানকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘আর বলো না আপু , তোমাদের রাস্তাঘাটের যে অবস্থা।’
‘চলো তোমার অনেক কষ্ট হয়ে গেছে।’
অংকুর আমার সাথে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। একেবারে ছাদে চলে যাই দু’জন। আমি অংকুরের চোখের দিকে তাকাই। ‘অংকুর ঘুমন্ত দু’জন মানুষকে মেরে ফেলবো আমরা।’
‘তারপর?’
‘পালিয়ে যাব যে দিক দুচোখ যায়।’
‘বেশ, চলো।’
‘দাঁড়াও, আমি আগে নিচে যাই। বাচ্চাটাকে সরাতে হবে।’
‘কেন!’
‘না হলে একজনকে মারার সময় অন্যজন চিৎকার করবে।’
‘কিভাবে মারতে চাও রিতা?’
‘আমি বিপ্লবের মুখ চেপে ধরবো। তুমি ছুরি বসিয়ে দেবে ওর বুকে। নিশাতকে মারতে তেমন কষ্ট হবে না। নাক-মুখ চেপে রাখলেই হবে।’
‘ধন্যবাদ রিতা। তোমার ভালবাসার প্রতিদান আমি কোনদিন শোধ করতে পারবো না।’
আমি আর কথা না বাড়িয়ে নিচে যাই। ডিম লাইটের আলো জ্বলছে। ছেলে আর বাবা একসাথে কি সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে। নিশাত একটা পা তুলে দিয়েছে বাবার পেটের উপর। আমাকে নির্ঘুম করে ওদের এই ঘুম আমার সহ্য হয় না। আমি নিশাতকে কোলে করে চুপি চুপি উঠি। বিপ্লবের ঘুম ভাঙ্গে না। এপাশের রুমে নিশাতকে এনেই অংকুরকে ফোন দেই। ‘চলে আসো।’
অংকুর একদম দেরি করে না। ফোন পেয়েই চলে আসে। আমি ফিস ফিস করে বলি, ‘প্রথমে নিশাতকে দিয়েই শুরু করি অংকুর।’
অংকুর প্রতিবাদ করে। ‘না। কোনরকম শব্দে বুড়োটা জেগে গেলে বিপদ। চলো আগে ঐ শয়তানটাকে ধরি।’
কোরবানির গরু জবাই করা একটা বড় ছুরি বানিয়েছিল বিপ্লব। ও কি জানতো ঐ ছুরি দিয়ে ওকে জবাই করা হবে। ছুরিটা অংকুরের হাতে দেই। অংকুর ভাল করে চেয়ে দেখে। ইশারা দেয় বিপ্লবের মুখে কাপড় দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরতে। আমি দেরি করি না। অংকুর এগিয়ে যায়। একই সাথে মুখ চাপা, একই সাথে ঘছ করে লম্বা ছুরিটা বিপ্লবের বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়া। কয়েকবার। প্রথম আঘাতের সাথে সাথে বিপ্লব সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে বসতে চেয়েছিল। দ্বিতীয় আঘাত তাকে দুর্বল করে দেয়। একটা তীব্র ব্যথার গোঙ্গানি ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। রক্তের ফিনকিতে গোসল হয়ে যাই অংকুর আমি দু’জনই। প্রায় মিনিট পাঁচেক ছটফট করে বিপ্লব। তারপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
নিশাতকে মারতে কোন কষ্টই হয় না। নাক মুখ চেপে ধরার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছেলেটা বাবার দলে যোগ দেয়। সব মিলিয়ে বিশ মিনিটের মতো সময় লাগে। লাশ দুটোকে এক যায়গায় এনে রেখে অংকুর বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। মরা লাশ নিয়ে চিন্তা। ঘরে ডিম লাইটের আবছা অন্ধকার। খাটে, বিছানায়, ফ্লোরে জমাট বাধা রক্ত লেপটে আছে। ‘লাশ দুটোকে ডিপ ফ্রিজে রেখে চলো গোসল করে ফেলি। গা দিয়ে গন্ধ বেরোচ্ছে। মানুষের রক্ত না যেন শুয়োরের রক্ত।’ কথা বলে অংকুর।
আমি অংকুরের কথা শুনে হাসি। দুজনে মিলে বিপ্লবকে ধরাধরি করে ডিপ ফ্রিজে রাখি। তারপর নিশাত। ঘরময় অবছা আলো, আবছা অন্ধকার। লাশ দুটো ফ্রিজে রাখার পর লাইট জ্বালিয়ে দেই। আর অন্ধকার চাই না। কেটে গেছে সব অন্ধকার। চাপ চাপ রক্ত মাখা কাপড়, কার্পেট একসাথে করে টয়লেটে রেখে গোসল করতে যাই। বেশ আরাম করে আধাঘণ্টা গোসল করি। গোসল শেষে আমার খুব ভাল লাগে। হালকা লাগে। অংকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘ কেমন আছো তুমি?’
অংকুর হাসে। হা হা করে হাসে। ‘অন্ধকার কেটে গেছে রিতা।’ কথা শেষ করেই আবার চিন্তিত হয়ে পড়ে। ‘সুমনা গেল কই?’
‘যাক না সেখানে খুশি। কাল আমরা হারিয়ে যাব। একটা কাজ করতে হবে বিপ্লব?’
‘কি কাজ?’
‘মাঝখানে আরেকটা মেয়েকে হত্যা করতে হবে। হত্যা করে কয়েকদিন পর লাশ বিকৃত হয়ে গেলে কাগজে একটা চিরকুট লিখে আমার নামে চালিয়ে দেবে।’
‘মেয়ে পাবো কই?’
‘কি যে বলো, দেশে কি আর মেয়ের অভাব।’
‘না।’
‘তাহলে! এমন কোনদিন আছে দু’দশটা খুন হচ্ছেনা।’
‘নেই।’ একটু বিরতি নিয়ে বলে, ‘আজতো আমরাই দুটো করে ফেললাম। খুন। ’
‘দেখ অংকুর এটা স্রেফ ভালবাসার জন্য। এক প্রকার বাঁচার জন্য মারা।’
অংকুর কথার জবাব দেয় না। আমরা সকালের জন্য অপেক্ষায় থাকি। সকাল হবে। সূর্য উঠবে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে আমাদের জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। ঢাকা শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব আমরা। যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। জানে না।
সকালের সূর্যটা যখন ওঠে তখন আমাদের আনন্দের কোন সীমা নেই। আজ সেই সূর্য উঠেছে যে সূর্য অংকুরকে আমার করে দেবে। চিরজীবনের জন্য। একটা ব্যাগে কয়েকটা জামা কাপড় ভরে ফেলি। আমার বিয়েতে দেওয়া বিপ্লবের সেই লাল শাড়িটা পরি। অংকুরের সামনে দাঁড়িয়ে বলি, ‘অংকুর দেখতো কেমন দেখাচ্ছে?’
আমাকে টেনে নেয় অংকুর।
এক্সিলেন্ট। চলো যাই। আমরা দরজা খুলে পা বাড়াতেই জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক, অদ্ভুত ঘটনাটা দেখি। বিপ্লব। চাপাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বিপ্লব যাকে মেরে কাল রাতে ডিপ ফ্রিজে ভরেছি সেই কিনা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। ভয়ে, শিহরণে সমস্ত শরীর একসাথে কেঁপে ওঠে আমার।
ছয়.
আমি ঘুমাতে চেষ্টা করছিলাম। চোখ বুজে পড়ে ছিলাম। আমার স্ত্রী যে কাজগুলো করেছে তা স্বামী হিসাবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। সেই বিয়ের প্রথম থেকেই আমার সাথে তার চাওয়া পাওয়ার বিস্তার ফারাক। অনেক চাওয়া তার। দুনিয়াটা গিলে খেতে চায়। আমি মাঝে মাঝে ঋণ করে, বাবার কাছে হাত পেতে ওর আশা পূর্ণ করার চেষ্টা করেছি। যত দেই তার অপূর্ণতা যেন ততোই বাড়ে। এভাবে করে আমার জীবনটা বিষিয়ে উঠেছিল, তার উপর রিতার পর পুরুষ নিয়ে রাত কাটানো, নাইট ক্লাবে গিয়ে নাচ গান করা এ শুধু আমার জীবনের জন্য বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে না আমার সন্তান নিশাতের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কলেজ জীবনে আমি ওর প্রেমে পড়ে যাই। আমি যেবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে সে বছর প্রথম বর্ষে ভর্তি হয় মেয়েটা। তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ভর্তি ফর্ম পূরণ করার সময়। নতুন কলেজে যারা এসেছে তাদের সহযোগিতার জন্য আমরা পুরানো ছাত্ররা জড়ো হয়েছিলাম বেঞ্চ টেবিল নিয়ে। আমাদের বাম সংগঠন থেকে নির্দেশ এসেছিল, তাদের সহযোগিতা করতে। এটা নবাগতদের দলে টানার একটা কৌশল। রিতা এসেছিল আমার সামনে।
‘ভাইয়া একটু দেখিয়ে দেবেন?’
আমি রিতাকে দেখি। কিছুক্ষণ পলকহীন ভাবে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। আমার পাশে বসা রাজিব আমার গায়ে আলতো পরশ বুলায়। আমার পলক ভাঙ্গে। ঝটপট করে বলি, ‘হ্যাঁ বসুন ম্যাডাম। আপনাদের সহযোগিতার জন্যই আমরা।’
আমি খোপ খোপ ঘর গুরো পূরণ করা শিখিয়ে দেই। মোবাইল নাম্বার লেখার ঐচ্ছিক ঘরটা যখন সামনে আসে তখন বুকের ভেতর ভাল লেগে ওঠে। ‘আপনার মোবাইল নাম্বার থাকলে...’
‘জ্বি, আছে।’
‘এই ঘরে লিখুন।’
রিতা ওর মোবাইল নাম্বার লেখে। কাগজের পৃষ্ঠায় লেখা ওর মোবাইল নাম্বারটা আমার বুকের ভেতর লেখা হয়ে যায়। মেয়েটা চলে যাবার পর রাজিব রসিকতা করে বলে, ‘কেমন লাগলো?’
‘ভাল।’
‘প্রেম করবি?’
‘খুব ইচ্ছা করছে।’
‘এই বুড়ো বয়সে প্রেম করবি! তোকে তো অনেক রিকোয়েস্ট করেছি। কোনদিন সাড়া দিসনি আজ কেন......’
‘রিতার অপেক্ষায় ছিলাম।’
রাজিব হো হো করে হেসে ওঠে। আমিও হাসি। গাল ভরা, বুক ভরা হাসি দিয়ে সব কিছু কাঁপিয়ে দেই।
তারপর রিতার সাথে খুব দ্রুত প্রেমের সর্ম্পক গড়ে ওঠে আমার। মার্ষ্টাস শেষ করে চাকরি নেওয়া পর্যন্ত অনেক প্রেম করি। বাবাকে যখন বিয়ের কথা বলেছিলাম বাবা আমার প্রথমেই আপত্তি করে বসেন। ‘না, বিপ্লব অতো লেখাপড়া জানা মেয়েকে বিয়ে করতে হবেনা।’
‘কেন বাবা, লেখাপড়া শিখলেই কি মানুষ খারাপ হয়?’
‘হয়। যারা বাবা-মা, পরিবার ছেড়ে হোস্টেলে থেকে লেখাপাড়া করে তাদের অধিকাংশ মেয়ের চরিত্র ভাল থাকেনা।’
‘সবাই কি এক রকম?’
বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল ধার্মিক একটা মেয়ের সাথে তোকে বিয়ে দেব।’
‘ধার্মিক দিয়ে কি হবে?’
‘তুই তো যে দলের সাথে আছিস, তা ইসলামের সাথে আমাদের বুকের ধর্মের প্রতি ঘৃণা জান্মানো শেখায়। চেয়েছিলাম এমন একটা মেয়ে তোর সাথে আনবো যার গুণে মুগ্ধ হয়ে তুই নিজেই ধর্মের প্রতি ঝুকে পড়বি।’
সে সময় ধর্মের কথা আমার ভাল লাগে না। কথা এড়িয়ে বলি, ‘রিতা খুব ভাল মেয়ে বাবা।’
‘ভাল হলে ভাল। জীবনটা তো তোর। আমার দায়িত্ব ছিল তোকে বোঝানো তুই এখন অনেক বুঝিস। ছোট হলে শাসন করতে পারতাম।’
বাবা কেন যে সেদিন শাসন করলেন না! হায় সে দিন যদি বাবার কথা শুনতাম আজ এই বুক ভরা কষ্ট নিয়ে তিল তিল করে মরতে হতো না।
হঠাৎ রিতা আস্তে আস্তে করে ওঠে। বিছানা ছেড়ে বাইরে বের হয়। আমি অবাক হই। ও রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই আমি নিঃশব্দে ওর পিছু নেই। সিঁড়ি বেয়ে মেয়েটা সোজা ছাদে চলে যায়। তারপর...আমি ওর মোবাইলের বেশি কথা শুনতে পারি না। অল্প কয়েকটা কথা শুনে নিচে আসি।
একটা চাপাতি দরকার আমার। মাত্র একটা কোপে ওর মাথা থেকে ধড়টা আলাদা করে দিতে হবে। পাশের ফ্লাটে আমার কলিগ হারুন থাকে। আমি আস্তে করে দরজা খুলে বের হই। হারুনের কলিং বেল টিপতেই চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে আসে ছেলেটা। আমি ওর পা ধরে রিকোয়েস্ট করি, ‘বন্ধু আমার একটা উপকার করতে হবে।’
ওর পা ধরেছি দেখে অবাক, রাগ হয় হারুন। ‘পাগলের মতো কি করছিস বিপ্লব?’
‘আমি পাগল হয়ে গেছি দোস্ত। ’
‘কি হয়েছে খুলে বলতো?’
আমি কিছু কথা হারুনকে বলি। আমার কথা শুনে হারুন অবাক হয়।‘আমি ওর পিছ পিছ থাকবো। সারারাত। তুই যে কাজটা করবি সেটা হলো আমার বিছানায় আমার ছেলেটার পাশে গিয়ে শুয়ে থাকবি।’
‘ঠিক আছে। আমি তোর ভাবিকে বলে আসি।’
হারুনের বউটা খুব ভদ্র। স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করবে না এ বিশ্বাস আমার আছে। ঠিক তাই। কিছুক্ষণ পর হারুন আসে। আমার বিছানায় গিয়ে আমার যায়গায় শুয়ে পড়ে। ডিম লাইটের আলোয় ঘরটা মায়াবী রাক্ষুসে রুপ ধারণ করেছে। আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা আলমারিকে মনে হচ্ছে রাক্ষস। ড্রেসিং টেবিলটাকে মনে হয় রাক্ষস। আসল রাক্ষস ছাদে উঠেছে। আমি পালিয়ে থাকি। কখন আসে মেয়েটা। অনেক সময় পর রিতা এসে দরজা খুলে বাইরে বের হয়। আমিও যাই। পিছ পিছ। দারোয়ানের সাথে ওর কথা শুনে বুঝতে পারি কোন এক পুরুষকে সে আহ্বান করেছে। সে আসবে। কেন আসবে! ছেলেটা আসলে সম্ভাবত তার সাথে পালিয়ে যাবে রিতা। পালানোর আগে ওর গহনা, টাকা পয়সা যা আছে সব কিছু চুপি চুপি চুরি করে নিয়ে যাবে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর একটা যুবক আসে। তাকে সাথে নিয়ে রিতা উপরে উঠে যায়। আমি কি করবো? এখনো চাপাতি যোগাড় করতে পারিনি। ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। সামান্য একটু শব্দ হয়। এখন চুপি চুপি হয়তো সবকিছু গোছগাছ করবে। আমি কাচের জানালা দিয়ে উকি দেই। তারপর যা দেখি আমার দেখার আগেই, চিৎকার করার আগেই একটা লম্বা ছুরি ঢুকে যায় হারুনের বুকে। উফ্। চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যাই। হারুনকে নয় ছুরিটা চালিয়েছে আমার বুকে। আমাকে হত্যা না করলে তো ওদের পালানোতেও শান্তি নেই। তাই আমি মনে করে হারুনকে মেরে ফেললো। আমার চোখের সামনে আমার জন্যই মরে গেল হারুন। কি জবাব দেব আমি হারুনের বউকে? কি জবাব দেব আমি? আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। বেরিয়ে যাই রাস্তাায়। বেরোবার সময় দারোয়ান প্রশ্ন করে, ‘ এতো রাতে কই যান ভাইজান?’
‘মেহমান এসেছে খাওয়াতে হবেনা। খাবার নিয়ে আসি।’
ঢাকা শহরের দোকান পাট তখনও খোলা। দু’একটা দোকান মাত্র বন্ধ করছে। আমি লোহা লক্কাড়ের দোকানের দিকে ছুটি। তড়িঘড়ি করে গিয়ে একটা সুন্দর চাপাতি কিনে জ্বানালা দিয়ে উকি দেই। কাঁচের জানালা। আবছা আলো। আমি যা দেখি পৃথিবীর কোন বাবা যেন তা না দেখে, আমার নিশাত কে ডিপ ফ্রিজ খুলে তার ভেতর ছেড়ে দিল। আমার বাবা একটুও নড়ল না। একটুও না। তারপর হারুন। মনে মনে বলি নিশাত, হারুন তোমরা ঠান্ডায় ঘুমিয়ে থাক। নিষ্পাপ বলে তোমরা নিশ্চই খোদার জান্নাত দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছ।
আমি ওদের দুটোকে ঠিকই জাহান্নামে পৌছে দেব। তোমরা নিশ্চিন্তে থাক। আমাকে মাফ করে দাও। বাকি সময়গুলো কেমন করে চলে যায় আমি জানি না। তারপর আমি কি করেছি তাও জানি না। থানার মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করি। আমার চারপাশে পুলিশ। আমি চোখ মেলে তাকাতেই এক পুলিশ বড় একটা গরানের লাঠি নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার বুক ভরা ব্যথা। ‘লাঠি নিয়ে এসেছেন কেন?’
‘আপনাকে আদর করবো। তার আগে বলুন খুন করেছেন কেন?’
‘আমি খুন করেছি?’
আমার কথা শেষ হবার সাথে সাথে পায়ের উপর প্রচন্ড একটা বাড়ি মারে। আমার একটুও ব্যথা করে না। কেন যেন অট্টহাসিতে লুটিয়ে পড়ি। ‘কটা খুন করেছি?’
আমার কথা শুনে পুলিশরা অবাক হয়। ‘জানোনা তাই না। জলজ্যান্ত দুটো মানুষ খুন করে ভান ধরেছ?’
‘লাশগুলো কি ডিপ ফ্রিজে পাওয়া গেছে?’
‘না। রাস্তায় দাবড়িয়ে কুপিয়ে মেরেছো। তোমাকে ধরতে আমাদের পেটের ভাত হজম হয়ে গেছে।’
আমার খুব ভাল লাগে। আমি তাহলে খুন করতে পেরেছি। দুটো শয়তানকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছি। আবার খারাপ লেগে ওঠে, আমার নিশাত ডিপ ফ্রিজে আছে। আমার নিশাত মরে গেছে।
তাড়িঘড়ি করে বলি, ‘দেখুন আমার ছোট বাচ্চা নিশাত ডিপ ফ্রিজে কাল রাত থেকে পড়ে রয়েছে ওর কষ্ট হচ্ছে। আপনারা গিয়ে ওকে বের করুন।’
আমার কথা শুনে কয়েক জন পুলিশ বের হয়ে যায়।
সাত.
রাতে শুয়ে শুয়ে অনেক সময় মেয়েটার কথা ভেবেছি। আমার কি করো প্রশ্নের জবাবে সে বলেছে, আকাশ দেখি। বেশ রহস্যময় কথা। তারপর ধাওয়া করা ব্যক্তির আগমনটাও রহস্যজনক। ওকে ফেলে দৌড়ে পালানোতে মেয়েটা কি ভেবেছে জানি না। কাল সকালে ওর সাথে দেখা করতে হবে। ভুল ভাঙ্গাতে হবে। জীবনের মায়া তো সবারই আছে, থাকবে। এটা দোষের কিছু নয়।
আজ মোবাইল নিয়েও একটা কান্ড ঘটেছে। এক বন্ধু তনু দুপুরের দিকে একটা টেক্সট পাঠিয়েছে। তাতে লেখা, কল মি আর্জেন্ট। একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তোমার ব্লাড দরকার। প্লিজ, না করো না। না করলে বাদরটাকে বাঁচানো যাবে না। প্রথম ভড়কে গেলেও একটু চিন্তা করে যা বুঝেছি তার সারমর্ম হলো- আমি একটা বাঁদর এটা প্রমাণ করা। অনেক ভেবে চিন্তে একটা উত্তর দিয়েছি। লিখেছি- ডিয়ার, আপাতত তুমি এক ব্যাগ ব্লাড দাও। আমি আসছি তারপর বাকিটা ভেবে দেখা যাবে। কোন বাঁদরটাকে বাচাঁতেই হবে। তোমার গাফেলতিতে যদি বাদরটা মারা যায় তাহলে কিন্ত তোমাকে বাঁদর ভুনা করে খাওয়াব। এরপর তার কাছ থেকে আর কোন উত্তর আসেনি। টেক্সট চালাচালি নতুন কিছু নয়। ইদানিং প্লে স্টোর ভরা এত এত যোগাযোগ মাধ্যম যে, অডিও, ভিডিও, টেক্সট করে করে ই দেন শেষ। মানুষ ও সমাজের লোকজন দিশেহারা। কাকে কি লিখবে? এজন্য একজনকে বাঁদর, একজনকে ছাগল, একজনকে ভেড়া প্রমাণ করার জন্য তারা সদা সচেষ্ট। কেউ কেউ রেগে কল ব্যাক করেন, কি ব্যাপার এসব কি? ও পাশ থেকে মিষ্টি সুরে বন্ধু বলে, ফান করলাম। বটেই। ফানের ধরন যখন একজন মানুষকে বিদ্রুপ করা, হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আজেবাজে জন্তু জানোয়ারের সাথে তুলনা করা, তখন এ জতীয় ফানম্যানদের যথাযথ জবাব হলো, পায়ের জুতা খুলে পিঠের উপর দু’ঘা দিয়ে বলা, দোস্ত ফান করলাম।
প্রতি রাতেই আমার মাথায় নানা ধরনের চিন্তা, মানুষের কর্মকান্ডের কথা ঘুরপাক খায়। সারাদিন পথে পথে ঘুরে যা দেখি, মানুষের সাথে মিশে যা শিখি সেগুলো রাত বাড়ার সাথে সাথে আমার চিন্তার খোরাকে পরিণত হয়। আলোকিত পথ ধরে কবে হাঁটবো আমরা? হায়, কতোদিন পরে আবার মুসলিম হিসাবে সত্য ও ন্যায়ের চেতনা আমাদের বুকে জাগ্রত হবে? আমার ভাবনা চিন্তÍা দূরে ঠেলে কেবল একটু ঘুম ঘুম, ঝিম ঝিম ভাব নিয়ে চোখ বন্ধ করেছি ঠিক সে সময় দরজায় টুকটাক আওয়াজ হয়। রাত প্রায় একটা হবে। এতো রাতে কারও আসার কথা নয়। এসময় চোর, শুধুমাত্র চোরের আগমন প্রত্যাশা করা যায়। অবশ্য চোর রাত একটায় এসে দরজায় শব্দ করবে না। চোর নিঃশব্দে আসে নিঃশব্দে চলে যায়। তাহলে! ডাকাত নাকি? আমি বুকে বেশ সাহস সঞ্চার করে বলি, ‘কে, ডাকাত নাকি?’
‘না, আমি। ’ বাইরে থেকে জবাব আসে।
‘আমি কে?’
‘সাইদুর রহমান।’
সাইদুর রহমান আমার ছোট খালু। খুবই মিশুক প্রকৃতির মানুষ। প্রায় যার সাথে দেখা হয় তার সাথেই দরবার হয়। কথা বলতে শুরু করলে মানুষটার সময়ের দিকে লক্ষ্য থাকে না। কথা বলতে বলতে তার মুল কাজ কি সেটাও ভুলে যান এক সময়। এই সাইদুর রহমান ভদ্রলোক বছরে খুব বেশিবার আমাদের বাড়িতে আসেন না। অধিকাংশ বছর দু’বার আসেন। তার মূলত বইয়ের ব্যাবসা। গ্রামের বাজরে বড় লাইব্রেরি আছে। পাইকারি দরে বই কেনার জন্য তার ঢাকা আসা। কে জানে বইয়ের ব্যবসা না থাকলে হয়তো পাঁচ বছরেও একবার আসতেন না। তার আসার আবার একটা সময় আছে। রাত একটার পর। সেটা দেড়টা হতে পারে দুটো কিংবা তিনটাও হতে পারে। প্রথম দিকে বাবা একটু আধটু বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।
‘সাইদ সাহেব।’
‘জ্বি, ভাইজান।’
‘এতো রাতে বাইরে ঘোরা ফেরা করেন বিপদ হবে তো।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভদ্রলোক তখন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুরু করেন।
‘হ্যা, ভাইজান। বিপদ তো জীবনেরই অংশ। সাথী। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শুধু বিপদ আর বিপদ। কারেন্টের খুটিতে মানুষ লিখে রাখে বিপজ্জনক, তারপরও বিপদ আমাদের ছাড়েনা...।’
এখানে সদুপদেশ দান নদীর মাঝখানে বটগাছ লাগানোর মতো ব্যাপার ভেবে বাবা আর কথা বাড়ান না। চুপ করে চলে যান। তারপর বাকী রাত ছোট খালুর কথার টর্নেডো, সাইক্লোন আমাকেই সইতে হয়।
আমার রুমের খাটটা বেশ বড়। পাঁচ হাত বাই চার হাত। খাটটার জন্ম হয়েছিল সম্ভবত আমার আর আগত সব মেহমানের থাকার জন্যই। সুন্দরী কাঠের খাট। ছোট বেলা থেকে যেমন দেখছি আজও তেমন। একটুও বদলায়নি। অনেক মানুষ বদলে গেছে। এই খাটে শোয়া অনেক মানুষ কবরে চলে গেছে কিন্তু খাটটা অক্ষত আছে আজও, স্বমহিমায়।
আমার ছোট খালুর আরেকটা বৈশিষ্ট হচ্ছে তার সাথে সব সময় একটা ডায়রি থাকে। হালকা নীল রংয়ের কভার। ডায়রিতে শুধু কবে, কখন আর কোথায় কি হারিয়েছে সে সব হিসাব, বর্ণনা লেখা। অনেক হারানোর কথা লেখা থাকলেও বিগত দশ বছরে ডায়রিটা তার কাছ থেকে হারায়নি। ডায়রীর লেখা গুলো এরকম-
ক. ২৭ শে জানুয়ারি ২০২৬। তখন বেলা সাড়ে বারটা। সূর্যের তেজ যথেষ্ট কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। আমি গোসলের জন্য মিরাজদের বাড়ির শেষ প্রান্তে বাঁশ বাগানের পাশের পুকুরটায় গেলাম। সাথে লুঙ্গি, গামছা ও একটা পাঞ্জাবি ছিল। বেশ ফূর্তি করে অনেক সময় ধরে গোসল করেছি। গোসল শেষে উঠে দেখি আমার খয়েরী কালারের পাঞ্জাবিটা নেই। পাঞ্জাবির পকেটে তিনশত কুড়ি টাকা ছিল। টাকার চেয়ে পাঞ্জাবিটা আমার কাছে প্রিয়। অনেক পূর্ণিমা রাতে ঐ পাঞ্জাবি পরে আমি জোস্না মেখেছি। মানুষেরা চুরি করে কেন আমি জানি না।
খ. পহেলা বৈশাখের মেলা। তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ পথে ঘাটে। মেলা বসেছে মোড়ে মোড়ে। রং মেখে কেউ কেউ ভূত সেজেছে। সবগুলোকে আমার কাছে বাদর মনে হয়। রং মাখা এক ভূতকে দাঁড় করিয়ে বলি, ‘কি নাম তোমার?’
‘আমার নাম বৈশাখী।’ জবাব দেয় মেয়েটা।
কথা বলার সময় দেখি ওর দাঁতেও খানিক রংয়ের ছোয়া লেগেছে।
‘বাহ্ সুন্দর নাম তো। বৈশাখী। পহেলা বৈশাখে তুমিই তো সাজবে।’
বৈশাখী হাসে। আমি বলি,‘বলতো বৈশাখী ষড়ঋতুর এটা কোন ঋতু?’
বৈশাখী স্বাচ্ছ্বন্দ্যে জবাব দেয়, ‘আপনি কি পাগল! বৈশাখ ঋতু এ কি কারও অজানা।’
আমি মনে মনে হাসি। বাংলাকে এরা কতোটা ভালবাসে, কতোটা জানে! মেয়েটা এসো হে বৈশাখ, এসো হে বৈশাখ নারী-পুরুষের মিছিলে যোগ দেয়। বৈশাখও যেন বলে, আমি আসছি। সত্যিই আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যায়। মেঘেরও যেন আনন্দ উৎসব। গড়াম-গুড়ুম আওয়াজ করতে করতে শেষ পর্যন্ত যখন ঝড় বৃষ্টি শুরু হয় তখন রাত এগরটা তেইশ মিনিট। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ওয়ালারা অনুষ্ঠান সাঙ্গ করে পালাতে শুরু করে। লোক শূন্য হয় রাস্তা ঘাট। টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে আমি হেঁটে চলি একা একা। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন ডাকে, ‘ওই ভাইজান।’
‘জ্বি।’ আমি পেছন ফিরে তাকাই। আমার দিকে একজন মানুষ হেঁটে হেঁটে আসে।
‘কেমন আছেন?’ অদ্ভুত ধরনের শান্ত লোকটার কণ্ঠস্বর।
‘ভাল ছিলাম, আপনাকে দেখে কেমন ভয় ভয় করছে।’ আমি সরল প্রাণে সত্য কথাগুলো বলে ফেলি।
‘ভয় করবে কেন! আমি চোর না ডাকাত?’
‘জ্বি?’
‘জ্বি মানে! ’ লোকটা হঠাৎ খেকিয়ে ওঠে। তার খেঁকিয়ে ওঠার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন লাফালাফি শুরু হয়। হার্টবিট বেড়ে যায়, ধড়াস-ফড়াস করে। আমি তার মুখের দিকে তাকাই। কালো গোঁফে ঢাকা ঠোট। লাল চোখ। আশপাশে কেউ নেই। আকাশে মেঘ। বেশ জোরে বাতাস বইছে।
‘কি ব্যাপার কথার জবাব দেন না কেন?’ আবার কথা বলে লোকটা।
‘জি ... মানে কি?’
আমার কথার অপেক্ষায় থাকে না লোকটা, পকেট থেকে মানুষ মারা যন্ত্র বের করে আমার ঠিক বুক বরাবর তাক করে। যেখানে হৃতপিন্ডটা লাফালাফি করছে সেখানে ঠেকিয়ে বলে, ‘যা আছে সুবোধ বালকের মতো বের করে দেন।’
‘জি স্যার দেব। তবে.......’
‘তবে কি? একেবারে কলজে ফুটা করে ফালামু হালা।’
আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম, বুড়ো মানুষ হয়ে সবকিছু দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব। কিন্তু সুবোধ বালক হওয়া তো কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমি বড়জোর সুবোধ বুড়ো হতে পারি। কথা না বাড়িয়ে পকেটে যা ছিল সব দিয়ে দেই। প্রায় পচিশ হাজার টাকা। টাকা দেখে লোকটার চোখে মুখে খুশির আভা ফুটে ওঠে। যাবার সময় বলে, দোয়া কইরেন। আমার খুউব কান্না আসছিল তখন। এবার আর বই কেনা হবে না।
আবার দরজায় টুকটাক শব্দ হয়। ভাবতে ভাবতে তদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। দরজা খুলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। ইচ্ছা না করলেও দরজা খুলতে হবে। আমার ছোট খালু এই গভীর রাতে একা একা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। অলসতা ভেঙে উঠি। দরজা খুলে দেই। দরজা খোলার পর সেই পরিচিত একটা দৃশ্য। পরিষ্কার ধবধবে সুন্দর পাঞ্চার্শোধ একজন মানুষ। সেই মুচকি হাসি। ‘কেমন আছো বাবা?’
‘আলহামদুিলল্লাহ।’
‘আসতে আসতে দেরি হয়ে গেল।’
‘না না এ আবার এমন কি দেরি।’ মাত্র রাত দেড়টা বেজেছে।’
‘ঠিক বলেছো। দেড়টা কোন রাত হলো?’
‘জ্বি, দেড়টা হলো দিন।’
ছোট খালু ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠেন। তার শব্দ করা হাসি শুনে আমি আস্তে আস্তে বলি, ‘খালুজান ওভাবে হাসবেন না। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শব্দ করে হাসলে ঘুম ভেঙে যাবে। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মানুষের খুব কষ্ট হয়। ’
মানুষ শব্দটা শুনে ছোট খালু যেন তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। ‘আরে রাখ তোমার মানুষ। আজকাল কি কেউ আর মানুষ আছে!’
বয়স হয়ে গেলে বুড়োরা কেন যেন অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে। অল্প বয়সীরা তা যেমন বুঝতে পারে না তেমনি তাদের কাছে কথা গুলো ভালও লাগেনা। কয়েকদিন আগে আমার বাবাও মানুষ বিষায়ক কিছু কথা বলছিলেন। তখন বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ করেই বৃষ্টি আসলো। সারা আকাশে এক চিলতে মেঘ ছিল না। গরমে মানুষ জন অস্থির হয়ে প্রায় এক মাস ধরে বৃষ্টি বৃষ্টি বলে চিৎকার করার পরও বৃষ্টির কোন ভাব লক্ষণ নেই। বৃষ্টির জন্য আবহাওয়া অধিদপ্তর কিংবা সরকারের কাছে প্রার্থনা করা যায়না। বৃষ্টির জন্য মিছিল করেও লাভ নেই। মানুষের অস্থিরতা, চাতক পাখির চেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা, প্রতিক্ষার এক পর্বে হঠাৎই সারা আকাশ কালো মেয়ে ছেয়ে গেল। মাত্র দশ পনের মিনিটের মধ্যে শুরু হয় মুষল ধারে বৃষ্টি। চুয়াল্লিশ বছরের রের্কড করা তেতাল্লিশ ডিগ্রী তাপমাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যে সুন্দর, কোমল ও সহনীয় এমন এক পরিবেশ তৈরী করলো যা সব মানুষের চোখে মুখে আনন্দের সুখের বার্তা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল। রাস্তায় মানুষের চিৎকার। আনন্দ- উল্লাস। আমি জানালা ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি। পাড়ার ছেলেগুলো ইমন, মিলন, ইকবাল, রফিক, সিরাজ সব আনন্দে মেতে উঠেছে। আমার কণ্ঠেও কি এক অজানা সুখের গান। যারা গান জানে না মাঝে মাঝে তাদেরও গাইতে ইচ্ছা করে। তারাও সুর করে যা মনে আসে তাই গায়। আমিও গান গাচ্ছিলাম। এমন সময় বাবা আসেন। আমার কবি কবি ভাব দেখে বাবা বলেন, ‘এই তুই নিজেকে কি ভাবিস সত্য করে বলতো?’
বাবার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথার কি উত্তর দেব একটু সময় নিয়ে ভাবি। জটিল প্রশ্ন। বাবা শুধু শুধু এ কথা বলেন নি। বৃষ্টির আগে বাতাসের সময় আমার পেছনের দরজাটা ধুপ ধাপ করে বাড়ি খাচ্ছিল। কিছু জামা কাপড় বাইরে শুকাতে দেওয়া ছিল। কিছু কাজে অজ্ঞতা বশত ভুল। বৃষ্টির প্রতি মহব্বত, ভালবাসা থেকে যার উৎপত্তি।
‘কেন মানুষ ভাবি।’
‘আজ থেকে আর মানুষ ভাববি না।’
‘কি ভাববো?’
‘ছাগল। নিজেকে মনে করবি একটা ছাগল। ছাগল আর তোর ভেতর পার্থক্য কি বলতো?’
ক্লাস ফাইভে জীব ও জড় পর্দাথের পার্থক্য পড়েছিলাম। সে সব মনে নেই। বাবার সামনে দাঁড়ালে মনে থাকা অনেক কথাই ভুলে যাই। যা মনে নেই তা মনে পড়ার প্রশ্নই ওঠেনা। সুতরাং ব্যর্থ চেষ্টা করে কি লাভ! তাছাড়া ছাগলও একটা জীব আমিও একটা জীব। জীব ও জড় পর্দাথের পার্থক্য এখানে কোন কাজে আসবে না। বই প্রনেতাদের মানুষ ও জানোয়ারের একটা পার্থক্য দেওয়া উচিত ছিল। অনেক ভেবে চিন্তে বলি, ‘বাবা ছাগল ঘাস খায় আমি ভাত খাই। আই ইট রাইস।’
‘না না এটা কোন পার্থক্য নয়। ঘাস খাওয়া প্রাকটিস করলে অল্প দিনেই ঘাস খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে যাবি।’
‘তাহলে? ছাগল ভ্যা ভ্যা করে চিৎকার দেয় আমি কথা বলি।’
‘হয়নি ছাগলের ভ্যা ভ্যা করার ক্ষমতাও তোর আছে।’
‘জ্বি, ছাগল আর আমার ভেতর কোন পার্থক্য নেই।’
‘আছে। পার্থক্য হলো রুপের। ছাগল দেখতে এক রকম তুই তার ব্যতিক্রম। দেখতে মানুষ আসলে মানুষ না। ’
কথা শেষ করেই বাইরে শুকাতে দেওয়া কপড়গুলো আমার মুখের উপর ছুড়ে মারেন।
তার মাত্র কয়েকদিন পর ছোট খালু বললেন, আজকাল কি কেউ আর মানুষ আছে! কথা গুলো মানুষের আচরণ, স্বভাব ও চরিত্রহীনতার চরম অবক্ষয়ের সতত্যা নিরীক্ষণ করে বলা। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মানুষ তার সহজাত মানুষকে মানুষ ভাবতে পারছে না। কখনো কখনো নিজের সর্ম্পকেও প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় আমি কি মানুষ?!
‘খালুজান হাত মুখ ধুয়ে আসুন, আমি চুপি চুপি গিয়ে আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসি।’
‘আমি খেয়ে এসেছি।’ সংক্ষেপে জবাব দেন ছোট খালু। সত্য বলতে দ্বিধা নেই ছোট খালুর জবাব শুনে আমি খুশি হই। গভীর রাতে অন্তত কিছু কষ্ট থেকে বাঁচা গেল। তারপরও সৌজন্যবোধের পরিচয় দিতে বলি, ‘তা কি করে হয়! অনেক দূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন। সামান্য কিছু খাবেন।’
‘না না, কিছু খাবনা।’
‘তাহলে হাত মুখ ধুয়ে আসুন। ঘুমাবো।’
ছোট খালু বাথরুমে ঢুকে হাতে মুখে পানি ছিটান। রুমে এসে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘কাল আমার সাথে সময় দিতে পারবে বাবা?’
‘কেন কি করবেন? ’ পাল্টা প্রশ্ন করি।
‘বই কিনতে যাব। বই না তো ছাই কিনতে যাব ছাই।’
‘এ কি বলছেন! ছাই কিনবেন মানে?’
‘ছাই না তো কি! সতের বছরে বইয়ের পরিবর্তন করতে করতে সেটা এখন আর বই নেই। যা আছে তা পড়ে ছেলে মেয়েরা কি শিখবে, শিখছে বলতে পার? এমন বই পড়ার চেয়ে না পড়া ভাল, যা মানুষের চরিত্র গঠনে সহয়ক নয়। ’
‘আপনি উত্তেজিত। আসুন শুয়ে পড়ুন।’
ছোট খালু বিছানায় আসলেও তার কথা শেষ হয়না।
‘কম ঘুমাবে বাবা।’
‘জ্বি, কম ঘুমাবো।’
‘পৃথিবী, বিশ্ব, মানুষ সব কিছু নিয়ে ভাবতে হবে। সবকিছু ধ্বংসের দিকে ছুটে চলছে।’
‘জ্বি।’
ছোট খালু বিশ্ব, মানুষ, জগত-মহাজগত, ভুমন্ডল-নভোমন্ডল নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকেন। আমি জ্বি, হ্যাঁ, হু দিয়ে জবাব দিতে থাকি।
এভাবে উত্তর দিতে দিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। আমার যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন ছোট খালু ঘড় ঘড় শব্দে নাক ডেকে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। তাকে বিছানায় রেখে চুপি চুপি উঠি। আজ সুমনার সাথে দেখা করতে হবে। বেশ কয়েক দিন সুমনার কথা ভাবছি। ভাবছি তার সাথে কথা বলতে হবে। অনেক কথা। কি কথা আমি জানিনা। সুমনার সাথে দেখা করতে হলে মহিনদের বাড়ি যেতে হবে। মহিনদের বাড়ি গেলে কি মনে করবে ওরা! তারপর যদি বলি সুমনার সাথে দেখা করতে চাই, কথা বলতে চাই আমাকে থাপ্পড় মেরেও বসতে পারে। মেয়েটাকে কেন যেন আমার খুব আপন মনে হচ্ছে। ছোট খালু ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। কখন উঠবে কে জানে! বিকালে আবার তার সাথে বই কিনতে যেতে হবে। আমি তড়িঘড়ি বের হই। নাস্তা খেতে ভাল লাগছে না। ইদানিং আমার এই এক রোগ হয়েছে, খাওয়ায় রুচি নেই। ভাবনার রুচি বেড়েছে। শুধু কি সব ভাবি। দরজা খুলে বাইরে বের হতেই দেখি, গেটের পাশে পেয়ারা গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে আছেন আমার বাবা। বেশ মনোযোগ সহকারে পেপার পড়ছেন। পেপারের দিকে যতো মনোযোগ ই থাক আমাকে বাইরে বেরোতে দেখলে তিনি যে আড়চোখে তাকাবেন কোন সন্দেহ নেই। আমি ঠিক গেটের পাল্লাটা স্পর্শ করবো ঠিক সে সময় বলবেন, এদিকে আয়। কোথায় যাচ্ছিস, কেন যাচ্ছিস, কি দরকার? অনেক প্রশ্ন। রিমান্ডের আসামীকেও সম্ভাবত এতো জেরা করা হয়না। তারপরও আমাকে যেতে হবে। আজ গেট পর্যন্ত যাবার আগেই বাবা ডাক দেন, ‘রিফাত।’
আমি বাবার সামনে গিয়ে দাড়াই। ‘জ্বি।’
বাবা পেপারের দিকে আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করেন, ‘পড়, কাল যে তোদের চাপাতি নিয়ে দাবড়িয়েছিল তার ঘটনা দিয়েছে।’
‘কি লিখেছে!’
‘লিখেছে অনেক কিছু। পড়ে দেখ।’
‘আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে বাবা। পরে পড়বো।’
‘তোর আবার জরুরি কাজ কি! সারাদিন ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াস।’
‘জ্বি, আমি যাই।’
‘শোন, মূল ঘটনাটা শুনে যা।’ বাবা বলে যান, ‘সরকারী কর্মকর্তা বিপ্লব। ওর স্ত্রী রিতা। বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর। স্ত্রী অংকুর নামে এক ব্যবসায়ীর সাথে পরকীয়া প্রেমের সর্ম্পক গড়ে তোলে। বিপ্লব অনেক বুঝিয়েও স্ত্রীকে ফেরাতে পারে না। সর্বশেষ পরকীয়া প্রেমের ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হয়। স্ত্রী রিতা কৌশলে তার প্রেমিক কে ডেকে আনে স্বামীকে হত্যা করতে। স্বামীও ব্যাপারটা ধরে ফেলে। অবশেষে চারটা খুন। রিতা তার নিজের সন্তÍান ও স্বামীর বন্ধু হারুনকে হত্যা করে অংকুরের সহযোগিতায় আর পরে বিপ্লব হত্যা করে স্ত্রী ও তার প্রেমিক অংকুরকে। দুটো খুনের পর ভদ্রলোকের মাথা খারাপ হয়ে যায়। চাপাতি হাতে রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষকে আক্রমন করে। তোর ভাগ্য ভাল।
আমি বেঁচে যাবার জন্য খুশি হই, আবার খুশি হতে পারি না। রিতা তার নিরাপরাধ সন্তানকে হত্যা করেছে। মাসুম বাচ্চার কোন শত্রু থাকার কথা নয়। ছিল না। তার মা তার জন্য কাল হলো। রাক্ষুসী মা। মানুষ খোকো শয়তান। কিছু না বুঝেই মরে যায় ছোট একটা বাচ্চা। হারুন কি অপরাধ করেছিল কে জানে? মসজিদের হুজুর একদিন একটা কথা বলেছিলেন, কেয়ামতের আগে এমন সময় আসবে যখন খুন হওয়া, মরে যাওয়া মানুষ জানতে পারবে না কি কারণে তাকে হত্যা করা হলো। সে সময় কি চলে এসেছে! রাক্ষুসে দিন রাত? যুগ। আসুক না, যুগ ফেরানোর ক্ষমতা কার? অবশ্য স্ব স্ব অবস্থানে থেকে ইসলামের আদর্শ প্রচার করতে থাকলে হয়তো আবার সুদিন ফিরে আসবে।
প্রায় দশটা বাজে। বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন অনেক দিন তিনি তার সন্তানকে দেখেন না। চাহনিতে মায়ার ঝিলিক। আমি বলি, ‘বাবা যাই?’
বাবা মাথা নাড়েন। এক মুহূর্ত দেরি না করে গেট খুলে বের হই। সেই পথ, ঢাকার বড় প্রশস্ত পিচঢালা রাস্তা। জোর পায়ে মহিনদের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকি। রস্তায় প্রথম যার সাথে দেখা হয় সে একটা পাগল। ওর নাম মোকলেস। আমাকে দেখেই হাসে। হাসির মধ্যেও ভাল মন্দ আছে। ভাল হাসি, মন্দ হাসি, খুশির হাসি, ব্যথার হাসি, বিদ্রুপের হাসি। মোকলেসের হাসিটা কোন ক্লাসের আমি বুঝে উঠতে পারি না। সাত সকালে পাগল দেখলাম। দিনটা ভাল যাবে বলে মনে হয় না। লোকে এরকম বলে। আসলে কি তাই। দিন তো দিনের মতোই যায়। ভাল কাজ করলে দিন খুশির হয়, ভাল হয়। আর মন্দ কাজ করলে দিন মন্দ হয়। পাগল দেখার সাথে দিনের কি সর্ম্পক?
‘কেমন আছেন?’
‘আমি ব্যস্ত মোকলেস। খুবই ব্যস্ত। সুমনার সাথে কথা বলতে হবে।’
‘সুমনা কে?’
‘একজন মানুষ। নারী।’
‘নারী তো! তার সাথে আপনার কি কথা?’
‘মেয়েটাকে দেখে আমার খুব আপন মনে হয়েছে। আবার জানতে চেও না কেন আপন মনে হয়েছে। সব কেন’র কিন্ত জবাব নেই।’
‘ও আচ্ছা। আমিও আপনার সাথে যাব।’
‘কোথায় যাবে!’
‘আপনার সাথে। আপনার পিছ পিছ। আপনি যেখানে যাবেন আমিও সেখানে যাব।’
মহাবিপদ। অজানা এই মোকলেস নামক মানুষটা গত কয়েকদিন ধরে সুমনাদের বাড়ির ত্রিশ গজ দূরে ক্লাবের খোলা বারান্দায় ঘাটি গেড়েছে। তাকে অনেক জেরা করার পর যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো তার পৃথিবীতে কেউ নেই। বাবা-মা হারা এতিম। রাত হলে ক্লাবের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে বসে ঘুমায়। মশা, পোকা মাকড়ের এই ঢাকা শহরে খোলা যায়গায় কিভাবে একটা মানুষ ঘুমায় আমার বুঝে আসেনা। বুঝে আসুক বা না আসুক অনেক মানুষ এভাবে রাত পার করে এটা শতভাগ সত্য।
‘আমার সাথে যাবে কেন?’
‘আপনাকে আমার খুব পছন্দ।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যা।’
আমি হাটতে থাকি। আমার সাথে মোকলেস। হাটতে হাটতে মোকলেস বলে, ‘আপনার নাম তো রিফাত তাইনা?’
‘হ্যাঁ, রিফাত।’
দেখতে দেখতে সুমনাদের বাড়ির সামনে পৌছে যাই। অবাক হয়ে দেখি আজ গেট সাজানো নেই। ‘তুমি আমার সাথে যাবে মোকলেস?’
‘আপনি না বললেও যাব।’
‘আমাকে লজ্জায় ফেলনা। যাও পাগল।’
আমার কথা শুনে মোকলেস হাসে। আমার আগেই সে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। আমি মোকলেসের পিছনে। বাড়ির মধ্যে ঢুকেই ডাক দেয়, ‘সুমনা, ও সুমনা।’
আমি চমকে উঠি। মোকলেস কি সুমনাকে চেনে! না তার চেনার কথা নয়। সে একটা পাগল। রাস্তায় থাকে। মোকলেসের ডাক শুনে মৌ বেরিয়ে আসে। আমাকে জানে মৌ। তার চাচাতো ভাই মহিনের বন্ধু আমি। মোকলেস গাধাটাকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকায়, তারপর আমাকে বলে, ‘কাকে সাথে করে এনেছেন রিফাত ভাই?’
‘পাগল। মোকলেস।’
ঠিক সে সময় সুমনা এসে দরজায় দাঁড়ায়। মোকলেসকে দেখে তার চোখ দুটো খুশিতে ভরে ওঠে। সামনে এসে বলে, ‘কেমন আছেন ?’
‘তোমার বিপদ কেটে গেছে সুমনা। তুমি কি আমার সাথে যাবে?’
‘কোথায়?’ প্রশ্ন করে সুমনা।
‘আমি যেখানে নিয়ে যাই।’
‘যাব।’ ঘাড় নেড়ে সায় দেয় সুমনা।
আমি অবাক হই। এই পাগলের সাথে সুমনার পরিচয় কিসের! শুধু আমি অবাক হই তাই নয়, মৌ মেয়েটাও অবাক হয়। সুমনার কাছে এসে বলে, ‘এই কি তোমার স্বামী সুমনা আপু।’
সুমনা চুপ করে থাকে। বেশ কিছুক্ষন চুপ থাকার পর বলে, ‘আমি চলে যাব মৌ। তোমরা আমাকে মাফ করে দিও। আর কোন আমি কিন্ত আবার আসবো।’
‘এখনই চলে যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’ মাথা নেড়ে সায় দেয় সুমনা।
‘সবাই যে ঘুমিয়ে আছে। বলে যাবেন না।’
‘তুমি বলো। বলো সুমনা সবার কাছে মাফ চেয়েছে, তাকে যেন মাফ করে দেয়। তোমাদের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না মৌ।’
মৌ এর চোখটা ছলছল করে। আমার বুকের ভেতরও কষ্ট হয়। সুমনা মেয়েটা খুব ভদ্র। তার বুকের ভেতর মনে হয় অনেক কষ্ট। মোকলেস পগলটা যদি তার স্বামী হয় তো সে নিশ্চই সুমনাকে অনেক কষ্ট দেয়।
সুমনা মোকলেসকে বলে, ‘চলুন।’
মোকলেস হাঁটা শুরু করে। ওর পেছন পেছন সুমনা। সুমনার সাথে আমার আর কথা বলা হয়না। তার সাথে আমার অনেক কথা। খুব জানতে ইচ্ছা করছে সুমনা ঠিক ও রকম কেন। শান্তÍ। সুন্দর। ওরা সুমনাদের বাড়ি থেকে বের হলেই আমার যেন কিসের ধ্যান ভঙ্গ হয়। আমি আরেক ধ্যানে পড়ি। ওদের পেছন পেছন হাঁটতে থাকি। আমাকে পেছনে আসতে দেখে মোকলেস দাঁড়ায়, ‘আপনিও যাবেন?’
‘কোথায়?’
‘আমি যেখানে নিয়ে যাই।’
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলি, ‘যাবো।’