কামাল হোসাইন

আমি যখন বলি, আমাদের ঘরটা মাটির তৈরি, অনেকে তখন ভাবে আমি এটাকে অন্য অর্থে ব্যবহার করছি। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। আমাদের ঘরটা সত্যিই মাটি দিয়ে বানানো। যার দেয়াল মাটির, মেঝে মাটির, চাল খড়ে ছাওয়া। বর্ষাকালে খড় ভিজে জবজবে হয়ে গেলে ঘরের ভেতর এমন এক অপার্থিব গন্ধ ছড়ায়Ñ ভেজা মাটি আর পচা খড়ের অন্যরকম গন্ধ। যে গন্ধে আমার শৈশব, যৌবন আর বর্তমান একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

এই ঘরেই আমার জন্ম। অসময়ে বাবার চলে যাওয়া, মায়ের চোখের আলো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসা, আমার বিয়ে ভেঙে যাওয়াÑ সব কিছুতেই এই ঘরটা নীরব সাক্ষী।

আমি বড় কোনো স্বপ্ন নিয়ে জন্মাইনি। আমাদের গ্রামে বড় কোনো স্বপ্নের জায়গাও নেই। এখানে মানুষ সকালে উঠে ভাবেÑ আজ কী খাবে। যারা আমাদের চেয়ে একটু অবস্থাপন্ন, তারা ভাবেÑ আগামী সপ্তাহে কী খাবে। প্রতিদিন কয়েক মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই আমাদের গ্রামের মানুষ বর্তে যায়।

আমার বাবা মানুষ হিসেবে মোটেও সাহসী ছিলেন না। তিনি দিনমজুর ছিলেন। যেদিন তাঁর কাজ জুটত, সেদিন রাতে আমাদের হাঁড়ির তলায় কিছু ভাত পড়ে থাকলেও তরকারি থাকত না একদম। যেদিন বাবার কাজ জুটত না, সেদিন সামান্য কিছু লবণ-ভাত খেয়েই আমরা রাত কাটিয়ে দিতাম। মা তখন বলতেন, ভাতে আজ লবণটা একটু বেশি দিয়ে খা, সঙ্গে ঝাল পুড়িয়ে মেখে নে। তাহলে ভাত ভালো লাগবে!

আমি তখন নিতান্তই ছোট ছিলাম। মায়ের কথায় তখন বিশ্বাস করতাম, লবণ বেশি হলে ঝালভাত সত্যিই ভালো লাগে।

বাবা মারা যান এক বর্ষার রাতে। সেদিন কাজ থেকে বাবা বাড়ি ফিরছিলেন। নদীর ঘাটে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেননি তিনি। সঙ্গে কেউ না থাকায় কেউ দেখতেও পায়নি তাঁকে। সকালে জেলেরা তাঁর লাশ পায়, আধা-কাদায় ডোবা অবস্থায়। তখন আমার বয়স মাত্র বারো বছর।

গ্রামে বাবাহীন ছেলের পরিচয় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মানুষ করুণা দেখিয়ে এগিয়ে আসে, কিছু মানুষ আবার সুযোগও খোঁজে। মাকে তখন অনেকেই বলেছিল, দিনকাল ভালো না। ছেলেটাকে কাজে লাগাও, নাহলে নষ্ট হয়ে যাবে।

নষ্ট মানে কীÑ আমি তখন বুঝতাম না। এখন বুঝি, নষ্ট মানে হলো নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া।

আমি আর স্কুলে যাই না। স্কুল ছেড়ে কাজ ধরি। প্রথমে ইটভাটায়, পরে ধানক্ষেতে বাবার মতো দিনমজুর। আমার শরীর তখনো কাজ করার মতো পুরোপুরি শক্ত হয়ে ওঠেনি, কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি আমার। থামাতে পারিনি। অভাবের তাড়নায় আমাকে বয়সের চেয়ে বেশি চাপ নিয়ে কাজ করে যেতে হয়েছে। কাজের বেলায় গ্রামে কারো শরীরের বয়স দেখা হয় না, কাজের বয়স দেখা হয়।

বাবা চলে যাওয়ার পর মা ধীরে ধীরে নানা চিন্তায় যেন হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলেন। আগের মতো বকেন না, হাসেন না। সন্ধ্যার পর ঘরের কোণে একা একা নানা দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকেন। আমি বুঝতাম, তাঁর চোখের সামনে শুধু বাবার চলে যাওয়ার শেষ পদচ্ছাপটা ভাসেÑ আর চোখে অশ্রুবন্যা বয়ে যায়।

আমার বয়স যখন কুড়ি হলো, তখন গ্রামেই অন্য পাড়ায় একটা বিয়ের কথা ওঠে। মেয়েটার নাম শিউলি বেগম। আমি চিনতাম। শিউলিও চিনত আমাকে। গায়ের রং চাপা, চোখ দুটো ভারি সুন্দর! সে বেশি কথা বলত না। বিয়ের ব্যাপারে আমাদের দুই পরিবারের কথাবার্তা প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ করেই তা থেমে যায়।

কারণটা খুব সাধারণÑ আমাদের ঘরটা পাকা নয়, মাটির।

শিউলির বাবা বলেছিলেন, ছেলের কোনো দোষ দেখি না, কিন্তু ঘর যদি পাকা না হয়, মেয়েটার ভবিষ্যৎ পাকা হবে কেমন করে?

আমার চরম অসহায়ত্বের দিনে আমি সেদিন কিছুই বলিনি। বলতে পারিনি। নীরবতা মানে অনেক সময় সম্মতির মতো শোনায়। ও বিষয় ওখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে।

এরপর অনেক বছর কেটে যায়। আমি আমার সাধ্যমতো কাজ করি, ঘরে প্রয়োজনীয় খাবার আনি, মায়ের ওষুধ কিনি। কিন্তু ঘরটা আর পাকা হয় না। পাকা ঘর করতে হলে টাকা লাগে। যে টাকা ঘর করতে লাগবে, তা আমার সেই সামান্য আয়ে করা আদৌ সম্ভব নয়। মোদ্দাকথাÑ দরিদ্র মানুষের পাকা ঘরের স্বপ্ন থাকা উচিত নয়। মানায় না।

গ্রামে এখন অনেক পরিবর্তন। মোবাইল এসেছে, ফেসবুক এসেছে, সরু রাস্তার জায়গায় বড় বড় রাস্তা হয়েছে। গ্রামে এখন আর কারো মাটির ঘর নেই। সবই পাকা দালানবাড়ি। বিদ্যুৎ ছিল না, সেটাও এসে গেল। মানে এখন আধুনিক গ্রাম হয়ে গেল আমাদের। এত কিছু বদলালেও মানুষের প্রশ্নের ধরন বদলায়নি। এখনো মানুষ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী খবর তোমার?

মানেÑ এখন কেমন আছি আমি। কী করি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি কিনা...

গ্রামে আমার এক বন্ধু ছিলÑ নাম কাদের। সে রাজধানী ঢাকায় গিয়েছিল। বছর তিনেক পর গ্রামে ফিরল। হাতে তার স্মার্টফোন, পায়ে দামি জুতো। সে যথন গ্রামে ফিরল, তখন সবাই তার চারপাশে ভিড় করতে থাকল। তার বলা কথার দিকে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল যেন! সে বলল, ঢাকায় কষ্ট আছে ঠিক, কিন্তু ভবিষৎও আছে।

আমি কিছু বলিনি। আমি জানি, ভবিষ্যৎ সবার জন্য একরকম হয় না।

এরই মধ্যে একদিন মা বললেন, তুই ঢাকায় চলে যা বাবা। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এখানে থেকে আর কী করবি বল? আমার কথা ভাবিস না। কোনোভাবে চলে যাবে। তোরও তো ভবিষ্যৎ আছে। বিয়ে থা করবি...

আমি পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম মায়ের দিকে। তারপর আমাদের মাটির ঘরের দেয়ালের দিকে। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ফাটলের ভেতর দিয়ে পিঁপড়ারা যাওয়া-আসা করছে। বটগাছের ছোট্ট চারা গজিয়েছে একপাশে। আমি ভাবলামÑ পিঁপড়ারাও কি বুঝে নিয়েছে যে, এই ঘর আমাদের ছেড়ে যেতে হবে? তারা সবাই তাদের দখল বুঝে নিতে বড়ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যেন!

কিন্তু এই আমি ঢাকায় যাইনি। গ্রামেই পড়ে রইলাম। বলতে পারো আমার ঢাকায় যাওয়ার সাহস হয়নি, অচেনা কোথাও যাবার ব্যাপারে আমার মন টানেনি। এই গ্রামের সবাই আমাকে চেনে, জানে। শহরে গেলে আমি সেখানে কেবল আরেকটা অচেনা মুখ বৈ কিছু নই।

গত বছর গ্রামে বন্যা এসেছিল। নদী ফুলে ওঠে পাড়ের দুপাশ একেবারে ছাপিয়ে গেল। আমাদের উঠোনে হুড়মুড় করে পানি ঢুকে পড়ল। উপায়ন্তর না পেয়ে আমি মাকে নিয়ে আমাদের বাড়ির কিছুটা দূরের স্কুলঘরে গিয়ে আশ্রিত হলাম। রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে শুয়ে উপলব্ধি করলামÑ চারদিকে মানুষের মাঝে চাপা কান্না, বাচ্চাদের চিৎকার, বৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাস... সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য!

আমি নির্বাক হয়ে ভাবলামÑ এইসব শব্দ কারই বা কানে ঢুকছে! কেউ কি শোনে এসব?

বন্যার পানি নামার পর ফিরে এসে দেখি, আমাদের ঘরের একপাশ ধসে পড়েছে। আমি মাটি কেটে কেটে আবার দেয়াল তুললাম। এই কাজে কম অভ্যস্ত আমি। কাজ করতে গিয়ে হাতের তালু ফেটে রক্ত বের হলো। সেই রক্ত মাটির সঙ্গে মিশে গেল। আমি বুঝে নিলামÑ এই মাটি আমাকে ছাড়বে না কিছুতেই। এই মাটি কামড়েই পড়ে থাকতে হবে আমার।

কয়েকদিন পর একটা কাজ করতে গিয়ে কোদালের মাথা শক্ত কিছুর সঙ্গে ঠোকর খেল। মাটি সরিয়ে দেখি, বাবার পুরোনো একটা টিনের বাক্স। অনেক বছর আগে নদীর পানি বাড়লে বাবা এটা উঠোনের পশ্চিম কোণে পুঁতে রেখেছিলেন।

বাক্স খুলে দেখিÑ কিছু কাগজ, বাবার পুরোনো হাতঘড়ি, আর ভাঁজ করা কিছু টাকা। খুব বেশি না, আবার খুব কমও না। এতদিনে যদি আমি একটু একটু করে এমন করে টাকা জমাতে পারতাম, তাহলে হয়তো এই পরিমাণ টাকাই আমার থাকত। কিন্তু... বুক থেকে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বের হয়ে এলো। বাবার জন্য কান্না করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মায়ের দিকে তাকিয়ে সেই কান্না চেপে রাখলাম।

বাবার ঘড়িটা কানের কাছে তুলে ধরলাম। কাঁটা চলে না। শব্দ নেই। তবু মনে হলো, সময়টা থেমেও নেইÑ ওটা আমার ভেতরেই বয়ে চলেছে যেন।

সেদিন রাতে মা বললেন, তোর বাবা বলত, ঘর বানানো সহজ, কিন্তু মানুষের মতো মানুষ বানানো কঠিন।

সত্যিই তাই। এটা আমি এখন উপলব্ধি করি।

পরের সপ্তাহে বন্ধু কাদের আবার গ্রামে এলো। সে এখন এনজিওতে কাজ করে। তার সঙ্গে এক লোকÑ এনজিওর বড় অফিসার। বন্যাকবলিতদের মাঝে ঋণ দেয়ার বন্দোবস্ত করছেন তারা। সেই এনজিওর সহযোগিতা নিয়ে আমাদের ঘরটা পাকা করার সুযোগ আছে, তবে শর্ত হলোÑ শহরে কাজ নিতে হবে, নিয়মিত আয় দেখাতে হবে। লোকটা আমার ঘর দেখল। দেয়াল, চাল, উঠোনÑ সব। তারপর বলল, চেষ্টা করলে ঘরটা পাকা করতে পারবেন। সেদিন রাতে ঘুম এলো না আমার। চালের খড়ের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলো এসে পড়ছে আমার মুখের ওপর। আমি বিড়বিড় করে হিসাব কষতে লাগলামÑ ঋণ, শহর, কাজ, মাÑ আর এই ঘর। সব একসাথে ধরে রাখা সম্ভব নয় আমার দ্বারা। সিদ্ধান্ত পাকা করলাম।

পরদিন সকালে মাকে বললাম, মা, আমি দু-এক মাসের জন্য গ্রামের বাইরে যেতে চাই। হয়তো ঢাকায়। অনুমতি দাও।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকলেন। তারপর ধীরকণ্ঠে বললেন, যা। তবে ঘরটা ভাঙিস না। এই ঘরের কথা মনে রাখিস। এটা তোর বাবার ঘর।

আমি বুঝলাম, তিনি শুধু মাটির ঘরের কথা বলছেন না। আমার অস্তিত্বের কথাও বলে দিলেন।

যাওয়ার আগের দিন অতি যত্নে ঘরের মেঝে নতুন করে লেপে দিলাম। দেয়ালের ফাটলগুলো নরম কাদা দিয়ে ভরাট করলাম। এতে ঘরটা নতুন হলো না বটে, তবে যত্নে নিকোনো বলেই মনে হলো।

ভোর হবার আগে উঠলাম। মাকে সালাম করলাম। দোয়া নিলাম। তারপর রাস্তায় পা রাখলাম। খানিকটা এগিয়ে রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে পেছনদিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম আবার। আমাদের মাটির ঘরটা জোছনার আলোয় ভেসে যাচ্ছে। দূর থেকে ধূসর মনে হচ্ছে। স্থির দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ঘরটা আরও ছোট মনে হচ্ছে। সুনসান। খুব পরিচিত।

আমি জানি না, আমি আর কোনোদিন ফিরব কি না এই মাটির ঘরে। আবার এটাও জানি না, শহর আমাকে গ্রহণ করবে কি না। জানি না, যে ঋণ নেয়ার কথা আমি ভাবছি, এই ঋণ আমার ঘর পাকা করবে, না আমাকে আরও ভেঙে মাটির ভেতর সেঁধিয়ে দেবে।

তবে আমি কেবল জানিÑ আমি প্রথমবারের মতো মায়ের কথায় তাঁর জন্য শেষ চেষ্টা করতে যাচ্ছি, পালিয়ে যাচ্ছি না।

আমার পেছনে তখন দূরে কোথাও একটা মাটির ঘর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।

আর সামনেÑ একটা অচেনা রাস্তা, যার শেষ মাথা দেখা যায় না।