গাজী মুনছুর আজিজ

মধ্যরাতে মুঠোফোনে মানিক ভাই জানালেন, ঢাকায় রাঙা-মানিকজোড় দেখা গেছে, তা-ও আমার বাসার পাশেই। সেই পাখির খোঁজেই খুব ভোরে রওনা হই দুজনে। বসিলা সেতু পার হয়ে প্রথমে আসি কেরানীগঞ্জের আটি ভাওয়ালের গুইটা বাজার। এরপর গাড়ি রেখে গ্রামের পথ ধরি। ১০ মিনিটের মাথায় চলে আসি পাখিটির স্থানে। স্থানটি মূলত মাছ চাষের জলাশয় বা খামার। আর এখানেই দেখা গেছে পাখিটিকে।

আমরা হেঁটে হেঁটে জলাশয়ের একটা পাড়ে এসে দাঁড়াই। মাঘের সকাল, শীত পড়েছে বেশ, সঙ্গে ঘন কুয়াশা। সূর্যেরও দেখা নাই। তাই আশপাশের তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমরা এদিক-ওদিক খুঁজি। কিন্তু না, পাখিটির দেখা পাইনি। অনেক্ষণ পর মানিক ভাইয়ের নজর পড়ল জলাশয়ের মাঝে। দেখি কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। তবে দূর থেকে কুয়াশার ভেতর দিয়ে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড পর আমরা আবিষ্কার করি, আমাদের চোখের সামনে মহাবিপন্ন রাঙা-মানিকজোড় দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুজনেরই চোখে-মুখে আনন্দের রেখা ভেসে উঠল।

মানিক ভাই ক্যামেরা বের করে পাখিরটির ছবি তোলার চেষ্টা করছেন। তবে কুয়াশার কারণে খুব একটা ভালো ছবি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ভালো ছবি পাওয়ার আশায় মানিক ভাই মাটিতে বসে পাখির দিকে ক্যামেরা তাক করে আছেন। অবশ্য সাক্ষী হিসেবে আমিও মোবাইলের ক্যামেরা জুম করে কয়েকটি ছবি তুলি। ধীরে ধীরে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। কুয়াশাও কেটে যাচ্ছে। ফলে আরও স্পষ্ট হচ্ছে পাখিটির প্রকৃত রূপ। ক্যামেরায় ছবিও পাওয়া যাচ্ছে বেশ।

পাখিটি আকারে বিশাল বকের মতো। এর ইরেজি নাম পেইন্টেড স্টর্ক (Painted stork.)। এটি সোনাজঙ্গা নামেও পরিচিত। পাখিটি লম্বায় ৯৩ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওজন তিন কেজি (কমবেশি) পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ডানা ৫০ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ২৬.৫ সেন্টিমিটার, পা ২৪.৫ সেন্টিমিটার, লেজ ১৬ সেন্টিমিটার। এর সাদা শরীরে কিছু কালো লাইন ও কমলা ছোপ আছে। পালকহীন গাল কমলা বর্ণের। এর হলুদ রঙা ঠোঁট লম্বা এবং তলোয়ারের মতো বাঁকানো। ওড়ার সময় ডানা ও লেজের প্রান্ত কালো দেখায়। ডানার সাদা অংশে কালো লাইন আছে। চোখগুলো কালো। পা লাল। বুকে আড়াআড়ি কালো পট্টি আছে। ছেলেপাখি ও মেয়ে পাখি দেখতে একইরকম। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি কালচে বাদামি।

এরা নদীর পাড়ে, জলমগ্ন মাঠ, হ্্রদ, জোয়ার-ভাটার কাদাচর, লবন চাষের জমি বা মাছ চাষের জমিতে বিচরণ করে। সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। অল্প পানিতে হেঁটে হেঁটে ঠোঁট খুলে কাদায় ঢুকিয়ে এরা খাবার খুঁজে খায়। খাবারের তালিকায় আছে মাছ, ব্যাঙ, চিংড়ি জাতীয় প্রাণী ও পোকা।

পানির ধারে প্রায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে এরা বিশ্রাম করে। জুলাই-অক্টোবর এদের প্রজননকাল। পানিতে দাঁড়ানো গাছে ডালপালা, পাতা, খড় ও নল দিয়ে বড় মাচার বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো বাদামি লম্বা দাগসহ অনুজ্জ্বল সাদা। ২ থেকে ৫ টি ডিম দেয়। ডিমের মাপ ৭ দশকি ০ দ্ধ ৪ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার। ছানারা বাসা ছাড়ে ২৮ দিনের মাথায়।

এটি বাংলাদেশের অনিয়মিত জলচর পরিযায়ী পাখি। ফলে একে খুব কমই দেখা যায়। অনেক আগে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের জলাভূমিতে দেখার তথ্য আছে। উনিশ শতকে সিলেট বিভাগে ছিল, এমন তথ্যও আছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরে রাজশাহীর চরাঞ্চলে দেখা গেছে এবং কেরানীগঞ্জ ও পদ্মা সেতু এলাকায় উড়ন্ত অবস্থায়ও একে কেউ কেউ দেখেছেন। তবে ঢাকার মাটিতে একে এবারই প্রথম দেখা গেল। এটি বাংলাদেশে মহাবিপন্ন বলে বিবেচিত। এ ছাড়া বিশ্বে এটি প্রায়-বিপদগ্রস্তের তালিকায় রয়েছে। তাই এমন একটি বিরল পাখি দেখে আমাদের সত্যিই ভালো লাগছে।

আমরা অনেকক্ষণ ধরে পাখিটির প্রতি নজর রাখছি। এর খাবার সংগ্রহের ধরণটা আসলেই দারুণ। প্রথমে এর তলোয়ারের মতো বাঁকানো ঠোঁট দুটি খুলে পানিতে ঢুকিয়ে রাখে। এভাবে অনেকক্ষণ থাকে। এরপর হঠাৎ দেখা গেল তার দুই ঠোঁটের মাঝখানে মাছ ধরা পড়েছে। তখন সে মাছটিকে নিয়ে কাদাপানি থেকে মাটিতে উঠে আসে এবং মাছটিকে ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে খায়। অনেক সময় ছোটমাছ হলে গিলে ফেলে। এভাবে অল্প পানির কাদায় হেঁটে হেঁটে এ খাবার খোঁজে। আমরা অনেকবার এর মাছ ধরার কারিশমা দেখি। এ ছাড়া এর আরেকটি মজার বিষয় হলোÑ এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেয়া। বিশ্রাম নেয়ার সময় এক পা গুটিয়ে রেখে আরেক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মানিকজোড়ের পাশাপাশি জলাশয়ে বা আশপাশে আরও দেখি দেশি-কানিবক, ছোট-পানকৌড়ি, মাঝলা-বগা, পাতি-চড়ুই, পতি-আবাবিল, বড়-কুবো, ঝুঁটি-শালিক ও কালচে-ফুটকি।

আমরা যখন পাখিটির খাবার সংগ্রহ দেখছি, তখন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান স্থানীয় এক যুবক। নামÑ রনি। হাতে কাস্তে। কৃষি কাজ করেন। পাখিটিকে দেখিয়ে বললাম, এমন পাখি এখানে আগে দেখেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। ৫ থেকে ৭ বছর আগে শীতের সময় এমন পাখি দুইটা এখানে এসেছিল। তখন আমাদের একজন ফাঁদ পেতে একটি পখি ধরে ফেলে। অবশ্য পরে পাখিটি মারা যায়। এর পরের বছর থেকে এখানে এমন পাখি একটিই আসে। তার কথা শুনে মনে হলোÑ ৫ থেকে ৭ বছর আগে এখানে একজোড়া রাঙা-মানিকজোড় এসেছিল। এরপর থেকে সম্ভবত সঙ্গীর টানেই এ মানিকজোড় প্রতিবছর এখানে আসে।

রাঙা-মানিকজোড় ছাড়া আরও চার প্রজাতির মানিকজোড় বাংলাদেশে দেখার তথ্য আছে। এর মধ্যে ধলা-মানিকজোড় বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি। অনেক আগে শীতে সিলেট বিভাগে দেখা গেছে বলে তথ্য আছে। এ ছাড়া কালা-মানিকজোড়ও বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি। শীতে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের নদীতীরে থাকে। খুব কমই দেখা যায়। অন্যদিকে ধলাগলা-মানিকজোড় বাংলাদেশের প্রাক্তন পরিযায়ী পাখি। শীতে সুন্দরবন, হাওর ও উত্তরবঙ্গে দেখা গেছে। এখন খুব কমই দেখা যায়। এ ছাড়া কালাগলা-মানিকজোড়ও প্রাক্তন পরিযায়ী পাখি। শীতে হাওরে ও নদীতীরে থাকে। এটিও খুব কমই দেখা যায়।

অনেকক্ষণ এক জায়গায় থাকার পর পাখিটি উড়ে আসে পাশের আরেকটি জলাশয়ে। আমরাও তার প্রতি নজর রাখি। প্রায় চার ঘণ্টা নজর রাখার পর পাখিটি উড়াল দেয়। এরপর আমরা জলাশয়ের পাশের ফসলের খেত ধরে দূরের একটা সরিষা খেতের দিকে এগোই। দেখি আমাদের কিছুটা দূরে একটা খেতের পাশে ৪টি বুনো শেয়াল। আসলে গ্রামীন ঝোপঝাড়ে এখনও দুই/একটি শেয়াল দেখা যায়। কিন্তু ঝোপঝাড় পরিষ্কার হলে এ বুনো প্রাণিগুলো কোথায় যাবে? এমন প্রশ্নে মানিক ভাই বললেন, কোথায় আর যাবে, আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে!

লেখক : গবেষক ও সদস্য বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব