খন্দকার নূর হোসাইন

বিদ্যুৎ যেন আকাশ চিরে ফেলছে। সাগর গর্জন করে জানিয়ে দিচ্ছেÑসে কাউকে শাস্তি দিতে চায়। উত্তাল ঢেউয়ের ভেতর পড়ে গেছে একটা কচ্ছপ। হঠাৎ সে দেখতে পেল, একটা সাপ জলের সঙ্গে লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঢেউ তাকে বারবার পাথরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। পানিতে সে অভ্যস্ত নয়। এভাবে চললে সে মারা পড়বে। আরেকটা ঢেউ এলে হয়তো আর উঠতে পারবে না।

কচ্ছপের মায়া হলো। ঢেউকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল সাপের দিকে। কাছাকাছি পৌঁছে নিজের খোলসের পাশে সাপকে টেনে নিল। সাপও বুঝে গেলÑকচ্ছপ তাকে সাহায্য করতে চাচ্ছে। কোনোমতে কচ্ছপকে আঁকড়ে ধরে রাখল সে। আবার তেড়ে এলো সমুদ্রের ঢেউ। আছড়ে পড়ল তীরে। ঢেউয়ের ধাক্কায় দুজনই কয়েকবার ডুবে গেল। তবু কচ্ছপ হাল ছাড়ল না। এমন পরিবেশে সে অভ্যস্ত। অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত তারা তীরে পৌঁছাল।

ভেজা বালুর ওপর বসে পড়ল কচ্ছপ। পাশে পড়ে রইল সাপ। কথা বলার শক্তি নেই তার। এখানে পানি এসে পৌঁছাতে পারছে না। ঝড় তখনও চলছে। আধঘণ্টা পর ঝড় কমে এলো। মেঘের দল পাড়ি জমাল দূর দেশে। শেষ বিকেলের ম্লান সূর্য হেসে উঠল। সোনালি রোদের আভা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সাপের শরীরে শক্তি ফিরে এলো। কচ্ছপ তখনও পাশে অপেক্ষা করছিলÑযদি কোনো সাহায্য দরকার হয়।

মাথা উঁচু করে তাকাল সাপ। ফিসফিস করে বলল, ‘আমি তোমার কাছে ঋণী। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, বন্ধু।’

কচ্ছপ জবাবে মৃদু হাসল।

এ ঘটনার পর থেকে দুজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেল। সাপের সঙ্গে প্রায়ই কচ্ছপের দেখা হতো। সাপকে সে বিশ্বাস করেছিল।

কচ্ছপের ডিম দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। কয়েক রাত পর কচ্ছপ ডিম পাড়ল। চাঁদের আলোয় সে খুব সাবধানে বালু খুঁড়ল। ডিমগুলো একে একে নামিয়ে রাখল, তারপর বালু দিয়ে ঢেকে দিলো। কাজ শেষে ওখান থেকে চলে এলো কচ্ছপ।

সে চলে যাওয়ার পরই বালুর নিচে নড়াচড়া হলো। এক জোড়া চোখ অন্ধকারে জ্বলে উঠল। সাপ! সে জায়গাটা খুব ভালো করে মনে রাখল।

পরদিন রাতে সে একা এলো। বালু সরিয়ে একটি ডিম বের করল। খোলস ছিঁড়তেই ভেতরের নরম অংশ গড়িয়ে পড়ল। সাপ চুপচাপ ডিমটা খেয়ে ফেলল। ভুলে গেলÑকচ্ছপ তাকে কঠিন বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিল। ভুলে গেল বন্ধুত্ব। ডিম খেয়ে তার খুব ভালো লাগল।

পরের রাতে সে আর একা এলো না। বালুর ঢিবির চারপাশে ফিসফিস শব্দ শোনা গেল। আরও সাপ। তারা কেউ শব্দ করল না। শুধু বালু সরাল। ডিমগুলো নিয়ে পার্টির আয়োজন করল। সেদিন রাতে সব ডিম তারা খেয়ে ফেলল।

কয়েকদিন পর কচ্ছপ ফিরে এলো। ডিমগুলো ঠিক আছে কি না, তা দেখাই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু বালির ভেতর কোনো ডিম সে দেখল না। জায়গাটা আগের মতো নেই, গর্ত হয়ে আছে। ডিমগুলো যে নেই, বুঝতে তার দেরি হলো না।

হতাশায় ভেঙে পড়ল কচ্ছপ। এখানে তার সাপ বন্ধু আছে বলে ডিম হারানোর কোনো ভয় ছিল না। তবু হারালো। এত বড় ক্ষতি কে করল?

আশপাশে ভালো করে পরখ করল সে। বালুর ওপর দিয়ে সাপ চলাচলের চিহ্ন পেল। অন্য কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ নেই। চিহ্ন ধরে এগিয়ে বুঝল, পথের দাগটা তার সাপ বন্ধুর গর্ত পর্যন্ত চলে গেছে। আর কিছু বুঝতে অসুবিধা হলো না।

রাগে তার চোখ জ্বলে উঠল। সিদ্ধান্ত নিল, সাপটাকে ছাড়বে না। প্রতিশোধ নেবে। সে শক্তি তার আছে।

পরদিন দুপুরে কচ্ছপ দূরে দেখল, সাপটা খোলা জায়গায় রোদ পোহাচ্ছে। ক্ষুব্ধ চোখে তাকাল সে। সাপটা গোবেচারা দৃষ্টিতে তাকাল কচ্ছপের দিকে, যেন ভাজা মাছও উলটে খেতে জানে না। কচ্ছপের রাগ আরও বেড়ে গেল।

ঠিক তখনই চারপাশ কচ্ছপের কাছে নিস্তব্ধ মনে হলো। দূরের গাছে বসা পাখিদের ডাক থেমে গেল। বালুর ওপর দিয়ে একটা ছায়া নেমে

এলো। ঈগল!

একটা ঝাপটা। একটা আর্ত ফোঁস। সাপটা আর মাটিতে রইল না। গুলির মতো ঈগলটা এসে শিকার ছিনিয়ে নিল। ঈগলের নখে ধরা পড়ে শূন্যে উঠে গেল বিশ্বাসঘাতক সাপÑচিৎকার করার সময়ও পেল না।

কচ্ছপ কিছুক্ষণ নড়ল না। তার প্রতিশোধ নেওয়ার দরকার হলো না। আকাশ থেকে আগেই রায় হয়ে গিয়েছিল। সে ধীরে ধীরে সাগরের দিকে ফিরে গেল। সাগর তখন শান্ত।

বালুর নিচে চাপা দেওয়া ডিমগুলোর স্মৃতি ভুলতে পারছিল না কচ্ছপ। শুধু এতটুকু ভেবে স্বস্তি পেল, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি আসে আকাশ থেকে, অলক্ষে।