সিদ্দিক আবু বকর
ভৌগোলিক অবস্থান
সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত সাজেক ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত পর্যটন এলাকা। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্ব উত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম এবং পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে সাজেক বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়নও বটে। এই ইউনিয়নের আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। এখানে রয়েছে সাজেক বিজিবি ক্যাম্প। সাজেকের বিজিবি ক্যাম্পটি বাংলাদেশের বিজিবি ক্যাম্পগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত।
সাজেকের নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমণ এতোটা সহজ ও আরামদায়ক করার ক্ষেত্রে বিজিবি সদস্যদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আজকের সাজেকের উন্নয়নে বিজিবি সদস্যদের অবদান কিন্তু অনেক। সাজেক ভ্যালি মূলত রুইলুই ও কংলাক পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি চিত্তাকর্ষক পর্যটন এলাকা। সাজেকে আরও একটি পাড়া আছে, যার নাম হামারূপাড়া।
সাজেকের রূপ-রহস্যে রয়েছে দুরন্ত সাদা মেঘের বেদম ওড়াউড়ি, সবুজ অরণ্যের বিশালতা আর শীর উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অগণন পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত রুইলুইপাড়াটি ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। আর ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে কংলাকপাড়া। সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর বসবাস।
কিভাবে পৌঁছতে হয় এ মেঘরাজ্যে?
সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি। সাজেকের মূল আকর্ষণ সাদা মেঘ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট উচ্চতায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা রাত্রি যাপনও কম উপভোগ্য নয়। একবার ভাবুন তো দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আপনি। আর পেজা তুলার মতো সাদা মেঘ আপনার গতর চুমে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও! কেমন হতে পারে আপনার মনের অনুভূতি? হ্যাঁ সাজেক পৌঁছাতে আপনাকে যা করতে হবে-
ঢাকা থেকে যদি আপনি সাজেক যেতে চান সবচে সহজ এবং নিরাপদ উপায় হচ্ছে, আগে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে যাওয়া। ঢাকা থেকে বেশ কিছু অথেনটিক কোম্পানির বাস আছে। প্রতিদিন ঢাকা টু খাগড়াছড়ি রুটে চলাচল করে এই বাসগুলো। আপনি ঢাকা থেকে রাতের গাড়িতে (এসি/অথবা নন-এসি) উঠে পড়লেই হবে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আপনি পৌঁছে যাবেন খাগড়াছড়ি শহরে। যেখানে আপনাকে স্বাগত জানাবে সারিসারি সবুজ পাহাড়। শহর থেকে দীঘিনালা হয়ে বাঘাইহাট, তারপর আড়াই-তিনঘন্টার মধ্যে কাক্সিক্ষত রুইলুইপাড়া মানে সাজেক ভ্যালির প্রবেশমুখ। ভাবছেন আপনাদের ঢাকার বাসই আপনাকে পৌঁছে দেবে সাজেক ভ্যালি? একদমই ভুল ভাবনা।
খাগড়াছড়ি নেমেই সেরে নেবেন সব ধরনের জরুরি প্রয়োজন। নাস্তা সেরেই ধরতে হবে সাজেকগামী বাহন। বাহন বলতে আপনি পেয়ে যাবেন- জিপ (চান্দেরগাড়ি), সিএনজি ও মটরবাইক। আপনি কোন বাহনে যাবেন তার ফায়সালা হবে আপনারা কতজনের টীম তার ওপর। টিম যদি বড় হয় মানে ১০ থেকে ১২ জনের, আমি সাজেস্ট করব চান্দের গাড়িতেই হোক আপনাদের সাজেক যাত্রা। আর যদি ২/৩ অথবা ৪ জনের টিম হন, সিএনজি হবে আপনাদের জন্য বেটার অপসন। আর যদি একা হন সে ক্ষেত্রে মটরবাইক বিবেচনা করতে পারেন। আমাকে যদি বলেন আপনি কোনটাকে সাজেস্ট করবেন? আমার পরামর্শ থাকবে, চোখ বন্ধ করে উঠে যান চান্দের গাড়িতে। উঁচু-নিচু এ দুর্গম পথে কিছুটা বাড়তি সাহস ও কমফোর্ট দেবে আপনাকে এই চান্দের গাড়ি। অন্যবাহনও যে খুব ঝুঁকির তা কিন্তু নয়।
কখন কোথায় কতক্ষণ এবং কি ফর্মালিটিস মানতে হবে আপনাকে?
সকাল ৮ টার মধ্যে খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর বা দীঘিনালা থেকে উঠে বসবেন আপনার পছন্দের বাহনে। সতর্কতা: ভুলেও পার্সোনাল গাড়ি বা ড্রাইভার নিয়ে সাজেক ভ্রমণের চেষ্টা করবেন না। কারণ এই দুর্গম পথে যাত্রার জন্য খাগড়াছড়ি কিংবা সাজেকের দক্ষ ড্রাইভাররাই যুক্তিযুক্ত। আরেকটা বিষয় ছোটদলে কিংবা একা জার্নির চাইতে বড়দলে জার্নিতে গাড়ি ম্যানেজ কিন্তু সহজ হয়। নির্দিষ্ট যাত্রী ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই যেহেতু সব গাড়ি ছেড়ে যায় সেহেতু আপনাকে কুইক গাড়ি ম্যানেজ করতেই হবে। পরিবহন, থাকা, খাওয়ার ঝক্কি এড়াতে চাইলে যুক্ত হতে পারেন কোন এক ট্যুরিস্ট এন্ড ট্রাভেল এজেন্সির সাথে। আমি অবশ্য একটি ট্যুরিস্ট এন্ড ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে নির্ঝঞ্ঝাট সাজেক ভ্রমণ ১২ সদস্যের ফ্যামিলি ট্যুর সম্পন্ন করেছি। এতে সুবিধা- খাগড়াছড়ি আসা পর্যন্তই আপনার দায় বাকী সব ওদের। তবে আপনি কিভাবে ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করবেন সেটা আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ব্যাপার।
খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় শত্তর কি.মি. আর দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কি.মি। কিছুক্ষণ চলার পর আপনারা পৌঁছে যাবেন ১০নং পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্প। মূলত এখান থেকেই আপনাদের সাজেক ভ্যালির মূল জার্নিটা শুরু হবে। সাড়ে নয়টা থেকে এগারোটার মধ্যে আর্মি এসকর্টের মধ্য দিয়ে চলতে থাকবে আপনাদের গাড়ি। উল্লেখ্য, এখানে আর্মি চেকপোস্টে আপনাদের ইনফরমেশন পৌঁছে দেয়া ও অন্যান্য কাজ সারবেন আপনাদের গাড়ির ড্রাইভার। যেহেতু সব গাড়ি একই সাথে ছেড়ে যায়, কিছুটা দেরি এখানে হয়েই যায়। এ সময়টায় বাঘাইহাটের ফলের বাজার থেকে কিনে খেতে পারেন- ডাব, কলা, কমলা আনারসের মতো মজাদার অর্গানিক ফ্রেসফ্রুটস। অরেকটা বিষয় বলে নেয়া ভাল- সকাল ১০টা ও দুপুর ২টা এই দুই টাইমেই সাজেকের উদ্দেশে আর্মি এস্কর্টের মাধ্যমে সাজেক যাওয়া যায় এবং ফিরেও আসা যায় একই নিয়মে। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এই ব্যবস্থা। চাইলেই আপনি যখন তখন সাজেক ঢুকতেও পারবেন না বেরুতেও না।
চলুন শুরু করি মেঘের রাজ্যে স্বপ্নের যাত্রা
বাঘাইহাটের ফর্মালিটিস শেষে উঁচু-নিচু, আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে হেলে-দুলে ছুটতে থাকবে আপনাদের চান্দের গাড়ি। গাড়ি যেভাবে উঁচুতে উঠতে থাকবে মনে হবে এই বুঝি ঠেকে গেল আকাশ আমার শরীরে। এ কারণেই গাড়ির নাম চান্দের গাড়ি কী না জানি না! পিচঢালা মসৃণ রাস্তা থাকা সত্ত্বেও আদর পাবেন অনাকাক্সিক্ষত বেদম ঝাঁকুনির। এটাকে প্রকৃতির আদর বলে মেনে নিতেই হবে আপনাকে চরম অনিচ্ছায়। বৃহৎ আনন্দ আস্বাদনে এই সামান্য (?) ঝক্কি তো হজম করাই যায়, কি বলেন! আস্থা রাখতেই পারেন, ড্রাইভার কখনোই আপনাদের নিয়ে রাস্তা ছেড়ে গিরিখাদে পড়বেন না মোটেও।
চলতি পথে রাস্তার দুপাশের সবুজ বিথান আপনার চোখকে নিমিষেই শীতল করে দেবে। উঁচু পাহাড় আর দু’পাশের পাহাড়ি ছাড়া ছাড়া আদিবাসী বসত-বাড়িগুলো আপনাকে অন্য এক চিন্তার ঘোরে ফেলে দেবে। যে ঘোর বিরক্তিকর ঝাঁকুনিকে ভুলিয়ে দেবে আপনার অজান্তেই। যতদূর চোখ যায় উঁচু উঁচু পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জুমচাষের ফসল আপনাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেবে নিশ্চিত।
উঁচু থেকে উঁচুতে আরও কিছু উঁচুতে উঠতেই পাবেন সামান্য সময়ের যাত্রা বিরতি। মাচালং বাজারে আসতেই থামতে হবে আপনাদের কিছু সময়ের জন্য। এসময় সাজেক থেকে বেরিয়ে যাওয়া অপরিচিত পর্যটকদের সাথে হয়ে যাবে ক্ষণিকের চোখাচোখি। মাচালং বাজারেও পাবেন কলা, পেঁপে, পেয়ারাসহ নানা স্বাদের অর্গানিক পাহাড়ি ফল। চাইলে খেয়ে নিতে পারেন পছন্দ মতো।
পুনরায় যাত্রা শুরুর খানিক পরে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকবে সাজেকের উঁচু চূড়া। বেলা বারোটা কিংবা সাড়ে বারোটার মধ্যেই আপনারা পৌঁছে যাবেন ১৭২০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রুইলুইপাড়ায়। আগেই বলেছি, রুইলুইপাড়া হচ্ছে সাজেক ভ্যালির স্টারটিং পয়েন্ট আর এন্ডিং ঠিক কংলাক পাড়ায়। গাড়ি থেকে নেমেই উঠে যাবেন নির্দিষ্ট কটেজ কিংবা রিসোর্টে। অথবা খুঁজে নেবেন আপনার পছন্দসই কোনো রিসোর্ট কিংবা কটেজ। আরও একটু তথ্য দেই, এখানে আপনি অনায়াসে পেতে পারেন ইকোফ্রেন্ডলি কটেজ কিংবা রিসোর্ট। যা ইট পাথরের বাইরে গিয়ে নির্মিত হয়েছে বাঁশ বেত আর কাঠের সমন্বয়ে। আমার ট্যুরিস্ট এজেন্সিও আমাকে একটি সম্পূর্ণ বাঁশের তৈরি রিসোর্টে একোমোডেশন দেন।
চলুন হারিয়ে যাই মেঘ বৃষ্টি রোদের খেলায়
আপনি/আপনারা যদি পূর্ববুকিং ছাড়াই সাজেক ভ্যালিতে এসে থাকেন সমস্যা নাই তড়িঘড়ি চুজ করে ফেলুন আপনার অস্থায়ী স্বপ্নের নিবাস। একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন ফেসিলিটির বিপরীতে নির্ধারিত ভাড়া যেটা সেটাই তারা চার্জ করবে। উইক এন্ডে জাস্ট পাঁচশ টাকা বাড়তি চাইবে। তার মানে এখানে মনিটরিং সেল এতোটাই কার্যকর যে প্রতারিত হবার কোন ভয় নাই। আমার পরামর্শ থাকবে আপনারা আগে থেকেই রিসোর্ট বুক করে সাজেক আসবেন। মাত্র তিন কি.মি. সাজেকে রিসোর্ট কিন্তু হাতেগোনা। ট্যুরিস্টের চাপ বেশি থাকলে আপনি বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে আমার মতো কোন ট্যুরিস্ট এন্ড ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যুক্ত হয়ে আসলে আর কোন দুশ্চিন্তার ব্যাপার নাই। তবে অনেকেই আবার এডভেঞ্চার পছন্দ করেন কী না! তাদের বেলায় আমার কোন কথা নাই।
৫/১০ মিনিটের মধ্যেই আপনাদের রুম রেডি হয়ে যাবে। এ সময় একসাইটেট না হয়ে ধীরস্থির থাকুন। মনে রাখবেন সাজেক ভেলি জায়গাটি খুব বেশি বড় নয়। আপনার তাড়াহুড়োকে অতি যত্নে শিকায় তুলে রাখুন। ভ্রমণজনিত ক্লান্তি কাটাতে দ্রুত গোসল সেরে নিতে পারেন। গোসলে অনীহা থাকলে, নাকে-মুখে পানি ছিটিয়ে গা এলিয়ে দিতে পারেন নরম বিছানায়। আর কটেজের জানলায় চোখ রেখে নীল আকাশ আর সবুজ গম্বুজের ঘাড় ডিঙিয়ে অবলোকন করতে পারেন পরম মেঘের খেলা পরম বিস্ময়ে।
একটার মধ্যেই সেরে নিন নামায ও খাওয়ার পর্ব। ও হ্যাঁ অনেক সৌন্দর্যের মাঝে সাজেকের মসজিদটি কিন্তু আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করবেই করবে। ছোট কিন্তু দারুণ ডিজাইনে তৈরি সাজেকের এই ধবধবে সাদা মসজিদটি। মেঘের রঙেই যেন মেঘের সাথে মিতালি গড়েছে এই মনোরম মসজিদটি। শুক্রবার হওয়ায় আমি কিন্তু এই মসজিদেই জুমা আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলাম! মসজিদটি এমন এক উচ্চতায় ও এমন এক জায়গায় নির্মিত, মসজিদের খোলা জায়গায় দাঁড়ালেই দেখা যায় মিজোরাম ও বাংলাদেশ ভিউ। ভিউ’র কথাই যখন আসলো বলে নিই, আপনারা কিন্তু মিজোরাম ভিউ’র দিকে রিসোর্ট চুজ করার চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশ ভিউও মন্দ না বাট মিজোরাম ভিউটা আসলে অনন্য! আমি তথ্যটা জানতাম না কিন্তু সৌভাগ্যবসত আমার ট্যুরিস্ট এজেন্সি কিন্তু মিজোরাম ভিউতেই রিসোর্ট সিলেক্ট করে ছিলেন। এদিকটা থেকে মেঘের ওড়াউড়ি বাংলাদেশ ভিউ থেকে কিছুটা বেটার লাগে।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকাতে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে পড়ুন যদি না আপনার রিসোর্টের অধীনে খাবারের ব্যবস্থা থাকে। এখানে খাওয়া-দাওয়ায় খরচ তেমন বেশি না। পর্যাপ্ত হোটেল অথবা রেস্টুরেন্ট পেয়ে যাবেন আপনারা। আমরা সাধারণত যেমন খাবার খেয়ে থাকি, তেমন ধরনের স্বাভাবিক খাবারই এখানে পেয়ে যাবেন রিজনেবল প্রাইসে। রেসিপির বাড়াবাড়ি কিংবা দামের শাস্তি কোনটাই আপনাকে বিব্রত করবে না এখানে। কোন ট্যুরিস্ট এজেন্সির মাধ্যমে না যেয়ে থাকলে আপনি নিজেই চুজ করবেন কোন হোটেল বা রেস্টুরেন্টে আপনি খাবেন। ট্রেডিশনাল ফুড বলতে এখানে পাবেন ব্যাম্বো চিকেন ও ব্যাম্বো বিরিয়ানি। ব্যাম্বো শব্দটি থেকেই আন্দাজ করতে পারছেন বাঁশ জাতীয় কিছু একটা হবে। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন তবে পুরোপুরি ঠিক না। ভয় নেই টাকা দিয়ে বাঁশ খেতে হবে না। বাঁশে ভরে চিকেন অথবা বিরিয়ানির চাল তেলমশলায় সিদ্ধ করা এক বিশেষ ধরনের রান্না এই ব্যাম্বো আইটেম। খেতে কিন্তু বেশ লাগে। আরও একটা টিপস দিয়ে রাখি ওদের মেনু চার্ট দেখে সকাল থেকে রাত অব্দি প্যাকেজ নিয়ে নিলে খরচ যেমন কমবে পাশাপাশি খাবারেও পাবেন ভ্যারাইটি।
খাওয়া-দাওয়ার পর হাঁটাহাঁটি করতে পারেন রুইলুই পাড়ায়। অথবা সামান্য তন্দ্রা কাটাতে রিসোর্টে গিয়ে গা এলিয়ে দিতেও পারেন অনায়াসে। আমার পরামর্শ যেহেতু একটা টাফ-জার্নি করে এসেছেন, খানিক বিশ্রাম নেয়াই আপনাদের জন্য ভাল হয়।
বিকেল হতেই সূর্যের তেজ কিছুটা কমতে শুরু করে সাজেক ভ্যালিতে। সাথে কমতে থাকে তাপমাত্রাও। এ সময়টায় মেঘদল এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলে স্বভাব সুলভ ধীরলয়ে। যতই সময় গড়াতে থাকবে সন্ধ্যের দেয়ালে ততোই বাড়তে থাকবে মেঘদলের মিছিল। কয়টার সৌন্দর্য আপনি উপভোগ করবেন! একটার পর একটা তারপর আরও একটা। এ যেন বিরতিহীন মেঘের মিছিল! মিজোরাম কিংবা বাংলাদেশ দুই ভিউ থেকেই তখন অনন্য সে মেঘের খেলা।
এ সময়টাতে ডাকতে পারেন আপনাদের ড্রাইভারকে। আরেকটা বিষয় বলা হয়নি। গাড়ির ড্রাইভার কিন্তু এজন্য বাড়তি চার্জও করবে না আপনার কাছে। আপনার ডাক পাওয়া মাত্রই তিনি চলে আসবেন রিসোর্টের নিচে। গাড়িতে করে চলে যেতে পারেন সামান্য দূরে অবস্থিত লুসাইপাড়ায়। প্রবেশ ফি দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন লুসাইপাড়ায়। ভেতরে ঢুকতেই লুসাই জনগোষ্ঠীর ঘর-গেরস্তি, কৃষি সরঞ্জাম, শিকারের হাতিয়ারসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাবেন। আরও পেয়ে যাবেন তাদের ইতিহাসঐতিহ্যের আলোকে রচিত বইপত্র ও দুর্লভ ছবি। দুটি দোকানও পেয়ে যাবেন ভেতরে। হতাশার কথা হলো এই দোকানে লুসাই সংস্কৃতির সাথে যায় এমন কোন পণ্যই আপনি পাবেন না। এই দোকানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দুটোই দোকানদার ছাড়া। আপনি পণ্য কেনার পর নিজ দায়িত্বে নির্ধারিত মূল্য রেখে দেবেন নির্ধারিত বাক্সে। লুসাইপাড়ায় ঢোকার আগে ঐতিহ্যবাহী লুসাই ড্রেস পরতে কিন্তু একদমই ভুল করবেন না! বলে রাখি লুসাই ড্রেস কিন্তু ফ্রি-তে পরা যায় না। এটা ভাড়ায় পরতে হয়। আমি যখন গিয়েছিলাম, প্রতি ড্রেসে ভাড়া বাবদ একশো টাকা দিতে হয়েছে। এখন কত দিতে হয় আমার জানা নাই। মনে হয় এখনো একশোই হবে।
লুসাইপাড়া থেকে বেরিয়ে আবার উঠে বসুন গাড়িতে। গাড়ি এবার আপনাদের নিয়ে যাবে কংলাক পাহাড়ে যাওয়ার ঠিক আগের হেলিপেডটায়। বলে রাখি সাজেক ভ্যালিতে একাধিক হেলিপেড রয়েছে। খোলা হাওয়ায় হেলিপেডে দাঁড়িয়ে সবুজ পাহাড় আর মেঘের খেলা উপভোগ করতে পারেন মন ভরে। কী মিজোরাম! কী বাংলাদেশ দুই ভিউতেই চোখ রাখতে পারেন এই হেলিপেডে দাঁড়িয়ে। ভাগ্য ভাল হলে দেখবেন এই সময়টায় আপনার গা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে দুষ্ট মেঘেরদল।
যাদের হার্ট দুর্বল তাদের সাজেস্ট করব কংলাক পাহাড়ে না উঠে হেলিপেডে দাঁড়িয়েই উপভোগ করবেন সূর্যাস্তের দারুণ মুহূর্ত। আর যাদের হার্ট প্রব্লেম নাই, তারা দ্বিধাহীন চিত্তে চলে যান কংলাক পাহাড়ের পাদদেশে। তারপর এক পা দুপা তিন পা করে উঠে যান ১৮০০ ফুট উঁচু সেই কংলাক পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায়। এখানেও একটি পাড়া দেখতে পাবেন আপনারা। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, এর নামই কিন্তু কংলাকপাড়া। কংলাক পাহাড়ে ওঠা মানেই কিন্তু আপনি সাজেকের সর্বোচ্চ উঁচুকে জয় করে ফেলেছেন! কী খুব গর্ব হচ্ছে না! হতেই পারে। আর এখান থেকে সূর্যাস্তও দেখার মজাই কিন্তু আলাদা! সূর্যাস্তের পর ধীর পায়ে নেমে আসুন সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের আনন্দে।
নিচে নামতেই চোখে পড়বে এলইডি লাইটের মৃদু আলোয় বসেছে নানা রঙের মুখরোচক খাবারের পশরা। যেখানে ট্রেডিশনাল ব্যাম্বো টি, জিলাপি, পিঠাসহ ঝালমুড়ি, চটপটির মতো দেশীয় খাবার। চাইলে খেতে পারেন নির্দ্বিধায়। আমি সাজেস্ট করব ট্রেডিশনাল ফুডে যাদের ভক্তি হবে না, তারা যেন এগুলো ট্রাই না করেন। ফুড পয়জনিং হয়ে গেলে কিন্তু মহাবিপদ। ডাক্তার কবিরাজ মেলা ভার এই উপত্যকায়।
কয় রাত কয় দিনের ট্যুর বেটার
এখানে আমি আপনাদের দুই দিন একরাতের প্যাকেজের ট্যুরিস্টদের ট্যুরযজ্ঞ শেয়ার করলাম। আমি অবশ্য তিন দিন দুই রাতের ট্যুরিস্ট ছিলাম। তাই আমার ট্যুর আরও কিছুটা স্মুথ ও আরামদায়ক ছিল। আপনাদেরও বলব যদি বাজেট এবং সময় দুটোই আপনার নাগালে, তবে অবশ্যই দুই রাত স্টে করুন সাজেকে। আর যারা জার্নির ধকল নিতে অভ্যস্ত, তারা একরাত থাকলেও সমস্যা নেই। জায়গাটি এতোই ছোট যে ঘুরে দেখার জন্য দুই দিন একরাত যথেষ্ট। আবারও বলছি, আমার পরামর্শ দুই রাত অবস্থান করুন জার্নি জনিত ক্লান্তি যাতে আপনার ভ্রমণকে ব্যোরিং না করে তোলে।
সন্ধ্যা নামতেই রুইলুই পাড়ায় ছড়াতে থাকবে বারবিকিউর ঝাঁঝালো গন্ধ। এই গন্ধ আপনার ভাল লাগতে পারে আবার নাও পারে। যেমন আমি এবং আমার স্ত্রী গন্ধটা একদম নিতে পারি নাই। রাত নামার পুর্ব মুহূর্তে বসে যেতে পারেন দল বেঁধে কিংবা একাকী কটেজের ঝুল বারান্দায়। দেখবেন কিভাবে মেঘের দল ছুঁয়ে যায় আপনার শরীরের লোমকূপ থেকে মনের দুয়ার। দিনের সাজেক যেমন মেঘ বৃষ্টি আর রোদের খেলায় বর্ণিল। রাতের সাজেক তেমনটা নয়। ক্ষণিক মেঘের প্রস্থানে অপরিচিত পোকার অদ্ভুত আওয়াজে আলো আঁধারের ভৌতিক একটা আবহ বিরাজ করে পুরো সাজেক ভিলেজে। সন্ধ্যার পর থেকে আঁধার ঘনিভুত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকৃতি যেন আপনার সাথে কথোপকথনের এক উদার প্লাটফর্ম হয়ে ওঠে এই সাজেক পল্লি।
সাজেক ভ্যালি ভ্রমণে কিঞ্চিৎ সতর্ক হতেই হবে আপনাকে
আগেই জেনেছেন, সাজেক ভ্যালি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭২০ ফুট ওপরে। কংলাক পাড়ায় তা ১৮০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু। অতএব, বুঝতেই পারছেন পর্যটন এলাকাটি শুধু সুন্দর নয়, এ এক ভয়ঙ্কর সুন্দর! যে কারণে কিছু সতর্কতা ট্যুরিস্টদের মানতেই হয়। আমরা যারা সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ করব, অবশ্যই ওখানকার জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-কালচারকে শ্রদ্ধা করব। তাদের খাদ্য, পোশাক কিংবা আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে বিরূপ মন্তব্য একদমই করব না। মনে রাখবেন তাদের ভাষা আমরা বুঝি না বটে তারা কিন্তু আমাদের ভাষা পুরোটাই বোঝেন। যেসব ট্রেডিশনাল ফুড আমার রুচিতে বাঁধবে তা আবেগের বশে কোনমতেই ট্রাই করব না। যদিও পুরো সাজেক নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা তথাপি নির্ধারিত তিন কি.মি. এলাকার বাইরে যাব না আমরা। আবেগের বশে কিংবা বীরত্ব দেখাতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করব না মোটেও। এখানে কেউ বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিক সহায়তা নাও পেতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পাহাড়ি-বাঙালি ইস্যুতে এখানে একধরনের কনফ্লিক্ট রয়েছে বহু আগ থেকে। যে কারণে মাঝেমধ্যেই এ অঞ্চল উত্তাল ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। আমরা যারা সাজেক ভ্রমণে যাচ্ছি আগেভাগেই সরকারি নির্দেশনা জেনে মুভ করব। আর অতি অবশ্যই চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যাকালীন সাজেক ভ্রমণ করব না। পাহাড়ি-বাঙালি ঝামেলায় মাঝেমধ্যে সাজেকে ট্যুরিস্টদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে পড়ার সম্ভাবনাকে মাথায় রাখতে হবে। কখনই নিজে অথবা নিজেদের ড্রাইভারকে দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কখনোই সাজেক ভ্রমণ করব না। জানেন তো পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এখানে পানির খুব অভাব। এলাকাবাসী বহুদূর ঝর্ণা থেকে পানি এনে ব্যবহার করে। আমাদের জন্য মিনারেল ওয়াটারই ভরসা। তাই পানির অপচয় না করা হবে বিবেকবান মানুষের কাজ।
সাজেক ভ্রমণে অবশ্যই যা সাথে নেবেন আপনি
সাজেক খুব বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। তাই একটা ব্যক্তিগত ছাতা থাকা খুব জরুরি। বৃষ্টির কারণে রাস্তা কখনো কখনো খানিকটা কাদাযুক্ত হয়ে থাকে। হাঁটাচলার সুবিধার্থে কেডস/স্নিকার রাখতে পারেন সাথে। খুব উঁচুতে ওঠার অভ্যাস না থাকলে কংলাক পাহাড়ে না ওঠাই ভালো। সাজেক ভ্যালিতে প্রচলিত বিদ্যুৎ সংযোগ নেই সোলার প্যানেলই এখানে পাওয়ার সাপ্লাইয়ের একমাত্র মাধ্যম। অতএব, সাজেক ভ্রমণে মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারে পাওয়ারফুল এক বা একাধিক পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখতে পারেন।
কখন যাবেন সাজেক ভ্যালি
মনুষ্য সৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাদ দিলে বলা যায় সারা বছরই সাজেক ভ্রমণ করা যায়। যেহেতু সাজেক মেঘবৃষ্টির খেলা, আমি সাজেস্ট করব আপনারা তুমুল বর্ষায় চেষ্টা করবেন সাজেক ভ্রমণের। এতে করে রোদের সাথে মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি যেমন দেখতে পাবেন রাতেও মিলে যাবে মেঘের সাথে চাঁদের রুপোলী আলোর মিলন মেলা। তুমুল বর্ষা ঋতুই সাজেক ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক সাথে প্রবল চিত্তাকর্ষক তো বটেই। ফিরে আসার দিন সাথে করে নিয়ে আসতে পারেন স্থানীয়দেও হাতে তৈরি নানা তৈজসপত্র নামমাত্র মূল্যে। বাঁশের তৈরি কাপসহ নানা ধরনের জিনিস তারা রুইলুইপাড়ার বাজারে নিয়ে আসে সকালে। আর কাঁচা সবজি ফলমূল পাবেন বেসুমার তাও নামমাত্র মূল্যে। আর জানেন তো এখানের হলুদ দেশ বিখ্যাত। হলুদ আনতে ভুলবেন না যেন।
যারা এখনো সাজেক যাননি তাদের বলব, মেঘ রাজ্যের খেলা নিজ চক্ষে উপভোগ করার এ দুর্লভ সুযোগ হেলায় হারাবেন না। একবার হলেও সাজেক যান। নিজে একা না পুরো ফ্যামিলি নিয়ে যান। সাজেস্ট করব যান যদি বড় টিমে যান। ১২/১৪ জনের টিম সাজেক ভ্রমণের জন্য পারফেক্ট টিম। এটাও জেনে রাখুন, সাজেক থেকে একমুহূর্তে দেখে নিতে পারেন পুরো রাঙামাটি। আর এ জন্যই সাজেককে বলা হয়ে থাকে রাঙামাটির ছাদ! ঢাকায় যেমন উঁচু এপার্টমেন্টের ছাদ থেকে দেখে ফেলতে পারি পুরো শহর সাজেক থেকেও ঠিক তাই। একপলকেই পুরো রাঙামাটি আপনার চোখের তারায়! আপনাদের সাজেক ভ্রমণ শান্তির হোক। হোক চরম উপভোগের। এই প্রত্যাশায় আজ এ পর্যন্তই।
লেখক: কবি ও ছড়াকার