হুসাইন দিলাওয়ার

মাগরিবের সময় ঘনিয়ে আসে। আদিব জানালার পাশে বসে রাস্তায় তাকিয়ে থাকে। নিচে কোথাও ইফতার কেনার হাঁক, জিলাপি ভাজার গন্ধ, হৈ হল্লা, সবই আছে শুধু তাদের মেসটায় কেউ নেই। চার হাজার টাকা টেবিলের কোণে রাখা, যেন তাকিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করে- এই টাকায় কতদূর যাওয়া যায়?

মা বিকেলে ফোন করেছিল।

-কিরে বাবা, ইফতারের কিছু জোগাড় করেছিস তো?

আদিব বলেছিল,

-হ্যাঁ মা, হয়ে যাবে।

কিন্তু ফোন রাখার পর বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। “হয়ে যাবে”Ñ এই শব্দটাই এখন তার কাছে বড় মিথ্যে মনে হয়।

গ্রামের কথা মনে পড়ে। তেঁতুলগাছের ছায়া, বিকেলের বাতাস, ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে মসজিদের মাইকে কোরআনের তিলাওয়াত। এখানে আদিব একা। একটা শহর, কয়েকটা স্বপ্ন, আর অসংখ্য হিসাব।

টিউশনি থেকে অতিরিক্ত একটা টাকাও বোনাস হিসেবে পায়নি। কিন্তু তার বড় আশা ছিল। এক হাজার টাকার চারটি নোট গুনে গুনে আবার রেখে দেয়। একে একে সবাই বাড়ি চলে গেছে। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ব্যাগ-বোঁচকা গুছিয়ে মহাখুশিতে ঈদ উদযাপনের জন্য চলে গেছে সবাই। সবার শেষে গিয়েছে শ্রাবণ। যাওয়ার সময় আদিবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল:

-তুই কবে বাড়ি যাচ্ছিস রে?

টিউশনিটা থেকে ছাড়ছে না রে, বলছে আর কয়েকটা দিন পড়িয়ে দিতে।

কিন্তু বোনাস তো পায়নি, উপরন্তু টিকিট না পাওয়ার আশঙ্কায় মনটা দুমড়ে-মুচড়ে যায় তার।

ট্রেনের সাতশো টাকার টিকিটও এখন দুই হাজার টাকা। একটু কমে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাসের টিকিট যেন পূর্ণিমার চাঁদ- দেখা যায়, ধরা যায় না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে মাগরিবের আজান হয়ে যায়, আদিব টেরই পায় না।

ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে থাকে তার। অগত্যা হন্তদন্ত হয়ে ইফতার রেডি করে। তার বিক্ষিপ্ত মনে নতুন দুশ্চিন্তা দানা বাঁধেÑ টিউশন ফি! ঈদের পরেই মোট অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হবে।

সময়মতো সেমিস্টারের টিউশন ফি’র টাকা পরিশোধ করতে পারবে কি না এই দুশ্চিন্তাটা বারবার এসে হানা দেয় তার ক্লান্ত মন-মস্তিষ্কে। ক্ষুধাতুর পেটেও ছোলামুড়ির গ্রাসটুকু গিলতে কষ্ট হয় তার। গলা দিয়ে নামতে চায় না। ক্ষুধার চেয়ে দুশ্চিন্তাই যেন বেশি।

ভালো রেজাল্টের কারণে হয়তো কিছু ওয়েভার পাবে, কিন্তু তারপরেও টাকার অঙ্কটা মোটেও কম নয়। এই হিসাব মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়।

এদিকে গ্রামের দিকেও স্বস্তির খবর নেই। কৃষির যা অবস্থা, ধানের দাম নেই বললেই চলে। যে সামান্য দাম পাওয়া যায়, তা সারের খরচে, বিষের খরচে, কামলা আর নিত্যনির্বাহের খরচ মেটাতে মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। সব হিসাব কাটছাট করে শেষে অবশিষ্ট থাকে হাতেগোনা কিছু টাকা।

এমন অবস্থায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা খরচ করে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়া আদিবের জন্য একপ্রকার বিলাসিতা। অথচ তার মনটা বারবার গ্রামেই ছুটে যায়। খুকির সঙ্গে খুনসুটি, উঠোনে রাঙা দুপুর, ঈদের নতুন জামা, বাবার সঙ্গে ঈদের জামাতে যাওয়া, মায়ের হাতের সেমাই। সবকিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্মৃতিগুলো ভর করে তার চোখে, ঝলসে ওঠে দৃষ্টি।

তারাবির নামাজের জন্য টুপি পরে মসজিদের পথে রওনা হয় সে। বাইতুল হিফজাল মসজিদে ইমামের তিলাওয়াত শুরু হলে চারদিক এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যায়। তন্ময় হয়ে বিশ্বাসে ডুবে তারাবির নামাজ পড়ে আদিব। ইমামের কণ্ঠের তিলাওয়াত ঝরনার খলখল শব্দের মতো প্রবাহিত হয়। মনে হয় এই মুহূর্তে সে দুনিয়ার নয়, অন্য কোনো জগতের পথিক।

নামাজ শেষে সে বসে পড়ে সোহাগ মামার দোকানে। এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। কাঁচের ভেতর ধোঁয়া ওঠা লালচে চা। দুটো চুমুকেই শরীরটা একটু হালকা হয়। কিন্তু মনটা এখনো ঈদে বাড়ি ফেরা হবে কি না এই অনিশ্চয়তায় আকাশ-পাতাল দোল খায়।

ঠিক তখনই হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে তার পিঠে হাত রাখে।

ঘুরে তাকিয়ে আদিব দেখে সৃজন ভাই। এলাকার বড় ভাই হিসেবেই পরিচিত। একসময় ছিলেন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, এখন একটি প্রাইভেট ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। গত বছর স্কুলের এক অনুষ্ঠানে আবার নতুন করে পরিচয় হয়েছিল তাদের।

-কী রে, তুই বাড়ি যাসনি?

-টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না, ভাইজান।

-কী বলিস? তাহলে তো ভালোই হলো।

-ভালো হলো কেমনে, ভাইজান?

সৃজন ভাই হেসে বলেন-

আরে আমি একজন পার্টনার খুঁজছিলাম বাড়ি যাওয়ার জন্য। তোমার ভাবী আর ভাতিজা-ভাতিজিদের আগেই বিমানে করে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি অফিসের কাজে আটকা পড়েছিলাম। ড্রাইভারও তো আমাদের গ্রামের। তাকেও যেতে হবে। একা একা গেলে বোর হতাম তুই চল আমার সঙ্গে। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।

একটু থেমে আবার বলেন-

আর শোন, ঈদের পরে আমাদের বিপি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে কোনো প্রোগ্রাম করা যায় কি না এই ব্যাপারে তোর পরামর্শও দরকার।

তাহলে সেই কথাই রইল। কাল আমরা একসাথেই রওনা দিচ্ছি।

এই কথাগুলো বলেই হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন সৃজন ভাই।

আদিব চেয়ারে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ আগেও যে অনিশ্চয়তা বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে ছিল, মুহূর্তেই তা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। দুশ্চিন্তার অবসান হয়।

এবার সত্যিই ঈদে বাড়ি যাওয়া হচ্ছে! এই ভাবনাতেই মুখে অনিচ্ছাকৃত একটা হাসি ফুটে ওঠে আদিবের।