মনসুর আহমদ

জীবনের পড়ন্ত বেলায় শৈশব ও কিশোর জীবনের স্মৃতি বড় মধুময় হয়ে ভেসে ওঠে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামের বন বাদাড়ে, নদী ধারের ঝোপঝাড়ে, বাড়ির পাশের হাটে মাঠে। জেলে, চাষী, কামার- কুমার ও বৈদ্যের সাথে মিলে মিশে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। সে কারণে আমার রোজা, আমার কোরবানি ও ঈদের স্মৃতির সাথে মিলেমিশে আছে এ সব সাধারণ মানুষের সাথে।

আমার জীবনের প্রথম রোজা শুরু হয়েছে প্রাইমারি স্কুলজীবন শেষ হওয়ার সাথে সাথে। অনেক শিশুরা কম বয়সে শখ করে রোজা রাখে, কিন্তু আমার বেলায় তা নয়। বিধবা মায়ের একমাত্র কিশোর সন্তান হওয়ার পরেও মা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, তিনি আমার জন্য দুপুরে ভাত রাঁধতে পারবেন না। তখন সবেমাত্র আমি প্রাইমারি স্কুল ছেড়েছি। মাকে কষ্ট দেব না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, তাহলে রোজাই রাখব। জীবনের প্রথম রোজা রাখার বছরেই ঊনত্রিশটি রোজা রেখে ফেললাম। শীতের সকালে কলাই ক্ষেতে বড়দের সাথে কলাই তুলতে গিয়ে ভুলে কচি কলাই খেয়ে একটি রোজা ভেঙ্গে ছিলাম। মাসয়ালা না জেনেও অন্য কিছু না খেয়ে সারাদিন রোজা রেখে ছিলাম। এরপরে জীবনের লম্বা সময় একবার মাত্র অসুখে ভুগে দুই তিনটি রোজা ভেঙ্গেছি।

সে বছরে রোজা শীতকালে পড়েছিল। ভোররাতে মা ডাক দেওয়ার সাথে সাথে শীতের কাঁথা ছেড়ে চোখ কচলাতে কচলাতে মায়ের পাশে বসে পড়তাম সাহরি খেতে। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে তিন বছর মার কাছে থেকে রোজা রাখার সুযোগ হয়েছিল। এই তিন বছরে সাহরি খেতে মা আমাকে এক দুটির বেশি ডাক দিয়েছেন বলে আমার মনে পড়ে না। মা আমার জন্য মাছ ভাজা ও ডাল বড়ার সাথে দৈ কলা রাখতেন। দৈ খাওয়ার সে অভ্যাস আজও আছে, সারা বছর দৈ-এর কথা ভুলে থাকলেও রোজার মাস এলেই মনে দৈ খাওয়ার ইচ্ছা জাগে। বিবি তাই প্রতি রাতে সাহরির জন্য নিজ হাতে অতি যত্নে দৈ পাতে। আমি রস করে বলি, এমন সুন্দর দৈ যখন বানাতে পার তাহলে দৈ-এর একটা দোকান দেইনা। শুনে বিবি রাগ করে না, ছেলে, মেয়ে, জামাই বৌদের সামনে মুখ বুজে বুজে হাসে।

পরের বছরে রোজা রাখার স্মৃতি বেশ মজার। সে বছর খুব দুর্ভীক্ষ ছিল। বাড়ির পাশের মজিবর নামে একটি ছেলে মাকে এসে বলল, চাচী , আমাকে উপকার করতে হবে। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে, কী উপকার করতে হবে?’ মজিবর বলল, চাচী, আমিতো ছেপারা, কোরানশরীফ কিছুই পড়তে জানি না। আমি রোজার মাসের রাতগুলি আপনাদের বাড়িতে থেকে মনসুর ভাইর কাছে আরবি শিখতে চাই। মা শুনে বেশ খুশি হলেন। বললেন, বেশ, আসবা। মা বাংলা লেখাপড়া জানতেন না। নওয়া মামুর কাছে মা কোরানশরীফ পড়া শিখে ছিলেন। প্রতিদিন জোহরের পরে মা সাদা শাড়ি পরে বসে যেতেন কোরান তেলাওয়াত করতে। আমি প্রায় দিন মার পাশে বসে তার কোরান পড়া শুনতাম। আমি কোরান পড়ার শুরুটা মার কাছে করছিলাম।

মজিবর সারাদিন এ বাজারে সে বাজারে তরকারি বেচাকেনা শেষে সাহরির জন্য থালায় কিছু ভাত তরকারি নিয়ে এশার আগে হাজির হতো আমাদের বারান্দায়। সে আমার চেয়ে বয়সে বড় হওয়ার পরেও আমাকে সম্মান দেখাত। তাকে আমি আরবি পড়াতাম। আমি ছোট বেলা থেকে গল্প শুনতে ভালোবাসতাম। মজিবর ওর মার কাছে হাতেম তাই, গাজী কালু চম্পাবতী ইত্যাদি কাহিনী শুনে শুনে তা প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিল। সে আমাকে প্রতি রাতে এ সব গল্প শুনাত। আমি গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।

সে বছর খাল বিলে বেশ মাছ পড়েছিল। বাড়ির পাশের জয়নাল ভাইর নেতৃত্বে দশ বার জন জুটেছিলাম মাছ ধরার জন্য। আমি ছিলাম বয়সে সবার ছোট। সারাটা মাস সকাল থেকে জোহর পর্যন্ত মাছ ধরে কাটায়ে ছিলাম। আমি ওদের সাথে থাকতাম বটে, কিন্তু তেমন কোন কাজে লাগতাম না। আমার বেশ লজ্জা হত যখন কোন কাজ না করেও তাদের সমান সমান ভাগ নিয়ে মার কাছে ফিরে আসতাম। আজ আর সে খাল বিলও নেই, মাছের লাফালাফিও নেই। মাছ ধরার দলের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। শৈশবের সেই স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

বড় মজা হতো ইফতারির সময়। আছরের আগ থেকেই মা চাচীরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন ইফতারের আইটেম বানাতে। ডালের বড়া, মলিদা বানাবার জন্য ডাল বাটা, চাল গুঁড়া করায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। সাধারণ গৃহস্তের ঘরে ছোলার রেওয়াজ খুব একটা ছিল না। ডিম, আলুর চপ বানাতে তখনও পল্লীর মানুষ শুরু করেনি। মাগরিবের আজান পড়ার সাথে সাথে পানি, মলিদা, মুড়ি ও ডালবড়া দিয়ে ইফতার করাটাই ছিল তাদের কাছে বড় আনন্দের ব্যাপার। তখনকার দিনে গ্রামে একটা ভাল রেওয়াজ ছিল ‘রোজা খোলান’। প্রায় বাড়িতে এটা হত। সাধ্যানুযায়ী অনেক লোককে এতে দাওয়াত করা হত। এসব অনুষ্ঠানে ছোলা, খেজুর ও শরবত পরিবেশন করা হতো। তবে মাগরিব নামাজ শেষে সবাইকে মাংস ও অনান্য সালুন দিয়ে পেট পুরে খাওয়ান ছিল রোজা খোলান অনুষ্ঠানের মূল কাজ। আমরা এসব অনুষ্ঠানে খুব মজা পেতাম। এ সময় হুজুর, মৌলভীদের কদর খুব বেড়ে যেত। আমার বড় ভাই ছিলেন মওলানা। তাকে প্রায় রাতে সন্ধ্যায় রোজা খোলার দাওয়াত ও সাহরিতে মিলাদের দাওয়াতে যেতে হত। মনে মনে ভাবতাম বড় হলে মওলানা হব, তা হলে এ ভাবে ভালো ভালো খাওয়া যাবে। কিন্তু আমার মওলানা হওয়ার সে আশা পূরণ হয়নি, বড় ভাইর ইচ্ছা পূরণ করতে প্রকৌশলী হয়েছিলাম।

তারাবীহ নামাজ আদায়টা ছিল আমাদের জন্য একটা মজার বিষয়। আমাদের বাড়ির সামনে ছিল এক বিরাট পুকুর। পুকুর পাড়ের প্রশস্ত চত্বরে পাড়ার ছেলে বুড়ো সবাই আসত তারাবীহ পড়তে। সুরাহ তারাবীহ হতো, ইমামতি করতেন মিয়া ভাই। আমরা ছোটরা পুরো নামাজ আদায় করতাম না; কিছু পড়েই পেছন থেকে ভেগে এসে দূরে দুষ্টুমিতে মত্ত হতাম। বেশ কয়েক বছর হলো পুকুর পাড়ের সে যায়গায় মিয়া ভাইর প্রচেষ্টায় পাকা মসজিদ নির্মিত হয়েছে। সেখানে প্রতি রমজানে খতম তারাবীহ হয়। মসজিদের পাশে তৈরী করা হয়েছে বিশাল কবরস্থান। সেখানে শুয়ে আছেন মা, পাড়া প্রতিবেশী সহ অনেক আত্মীয় স্বজন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় সেখানে দাঁড়াতেই মনের আয়নায় ভেসে ওঠে তাদের সব স্মৃতি, চোখ সিক্ত হয়ে ওঠে।

ঈদ এলেই মনে পড়ে শৈশব কৈশোরের টুকরো টুকরো ঈদের স্মৃতি। ঈদের দিন ক্ষণ নিয়ে গ্রামে প্রায়ই দলাদলি হতো। সিন্ধু, করাচিতে চাঁদ দেখা গেল না পূর্ব পাকিস্তানের কোথায়, এ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তখনও কোথাও কোথাও দুই দিন ঈদের নামাজ হতো। যে কারণে আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়ে যেত। আমাদের ঈদগাহে একবার এমনটা ঘটে ছিল। করাচিতে চাঁদ দেখা গেছে সে মোতাবেক আমরা ঈদগাহে নামাজ পড়তে এলাম, কিন্তু গ্রামের অন্যতম মুরব্বী গফুর শেখ রাজী হলেন না। তিনি কয়েক জনকে নিয়ে পরের দিন ঈদের নামাজ আদায় করলেন। শৈশবের সেই স্মৃতি করুণ ভাবে ভেসে ওঠে যখন দেখি আজও একই ভূখণ্ডে এক ঈদ দুদিনে পালন হচ্ছে ।

তখন আমি সম্ভবত প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। নামাজের আগে ঈদগাহে শুরু হয়েছিল বেশ বিতর্ক তাকদীর ও তদবীর নিয়ে। তাকদীরের পক্ষে আবদুল (বৈদ্য) তালুকদার, বিপক্ষে হাজী সোনামদ্দী হাওলাদার। বৈদ্য পাড়ার সব মুসুল্লি আবদুল তালুকদারের পক্ষে, বাকিরা হাজী সাবের পক্ষে। এ নিয়ে কোন হাতাহাতি হয়নি, তবে শোর-গোল হয়েছিল বেশ। অবশেষে ইমাম সাহেবের কথায় বিষয়টি মিটমাট হয়ে গেল। যতটুকু মনে পড়ে, ঐ ঈদের পরবর্তী ঈদের নামাজগুলো আদায় আমাদের পুকুরপাড়ের ঈদগাহে চালু হয়, যা আজও চালু আছে।

নতুন ঈদগাহে ঈদের নামাজ আরো আনন্দময় করতে এগিয়ে এলেন আচমত আলী খান। যেহেতু ঈদুল ফিতরে সে কালে গ্রামের খুব কম বাড়িতেই ঝাল গোশত খাওয়ার অবস্থা ছিল, তাই তিনি ঈদগাহে আসা সবাইকে খাসী জবেহ করে ভাত খাওয়াতেন, আর ঈদুল আজহাতে সেমাই শিরণী খাওয়াতেন। আমরা ছেলের দল খুব সকালে উঠে মা‘র বানানো গুড়ের পাকানো শিন্নী খেয়েই ছুটে যেতাম ঈদ গাহের পাশে বড় ডেকাচির রান্না দেখতে। কি যে মজা লাগত, তা বলে শেষ করা যাবে না।

ঈদুল আজহার আমেজটা ছিল কিছুটা ভিন্নতর। নামাজ শেষে নাস্তা খেয়েই ছুটে যেতাম কোরবানীর গরুর পাশে। হাড় লিক লিকে গরুর গায়ে আমরা খুব আদর করে হাত বুলাতাম। গ্রামে গঞ্জে কোরবানীর গোশত বানাতে বানাতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। মা চাচীদের রান্না শেষ করতে এশা পেরিয়ে যেত। আমরা সবাই চুলার পাশে পাশে ঘুর ঘুর করতাম। রান্না শেষে মা থালায় যখন মাংসগুলো তুলে দিতেন তখনও গোশত থেকে গরম ধোঁয়া উড়ছে। হাপুস হুপুস চাউলের রুটি দিয়ে খাওয়া শুরু হতো, আর সাথে সাথে চলতো ঝালের যন্ত্রণায় হা হু। গরুর মাংসে কি একটু বেশি ঝাল না হলে চলে ? তখন মনে করতাম কোরবানীর গোশতে হাড়ের পরিমাণ বেশি থাকে, কিন্তু কেন তা বোঝার জ্ঞান তখন ছিল না।

কোরবানীর ঈদের জন্য ছাগল কেনা নিয়ে একটা ঘটনা আজও মনে হলে বেশ শরম পাই। মিয়া ভাইর হাতে মা কয়েকটি টাকা দিয়ে দুই ভাইকে পাঠালেন একটি মোটা তাজা ছাগল কিনতে। দুই ভাই বাজার ঘুরে একটি বকরী কিনে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলাম। বকরীটি দেখে মা মাথায় হাত দিয়ে মিয়া ভাইর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,“কিরে বাবা, এট কি কিন্যা নিয়া আইছ? এটা তো কয়েক মাস পরে বাচ্চা দেবে।” মার কতা শুনে মিয়া ভাই বোকামীর জন্য লজ্জা পেলেন বটে, তবে আমি ছাগলের বাচ্চা নিয়ে খেলতে পারব ভেবে খুশি হলাম।

গ্রামে কোরবানীর গোশত বিলানো নিয়ে খুব একটা সমস্যা হতো না। কে বিলাবে! যারা কোরবানী দিত তারাতো অধিকাংশই ছিল গরীব। তবুও গরীবদেরকে কিছু বিলাতো, আর বাকিটা আত্মীয় স্বজনদেরকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াত। সে কালেতো আর ফ্রিজ চালু ছিল না। তাই কেউ কেউ গোশত জ্বাল দিয়ে কয়েক দিন রেখে দিত। গ্রামের সাইজদ্দি চাচা সারা বছর কাজ করতো যশোহরে। সে কোরবানীর সময় মাটির কলসী ভরে কোরবানীর গোশত নিয়ে বাড়িতে আসত। প্রায় সময় তা নষ্ট হয়ে যেত। পরিবারের সবাই তাই খেয়ে পেটের পীড়ায় ভুগতো। শেষের বারে চাচা এই গোশত খেয়ে এমন অসুস্থ হলেন যে তাতেই মারা গেলেন। প্রতি বছর কোরবানীর সময় গোশত বিলাবার সময় গ্রামের সাইজদ্দি চাচা সহ গরীব লোকদের কথা খুব মনে পড়ে।

চাকুরী জীবনের মাজামাঝি সময় একবার ঈদ পালন করতে বাড়িতে রওয়ানা করলাম। বিবিসাব গ্রামে মায়ের বাড়িতে। ভাবী ঈফতারি ও সাহরির জন্য যা যা প্রয়োজন তা দিয়ে দিলেন। তখন লঞ্চে বাড়ি যেতে হতো। সদরঘাট থেকে লঞ্চে চড়লাম। সে কি ভিড়! যেখানে বসে পড়লাম সেখানেই গোটা রাত কাটাতে হল। এমনকি ভিড়ের কারনে জায়গা ছেড়ে গোটা রাত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া সম্ভব হলো না। ভাবীর দেওয়া ভাত গোশত সব নষ্ট হয়ে গেল। উপায় কি! বিনা হাত মুখ ধোয়ায় সেই নষ্ট ভাত গোশত খেয়েই শেষ রোজাটি রেখে ছিলাম। সেদিন শপথ করে ছিলাম আর কোন ঈদেই গ্রামের বাড়ি আসব না। হ্যাঁ , ঐ ঈদের পরে আমার আর কোনও ঈদই বাড়িতে করা হয়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতে আর কোন ঈদ গ্রামের বাড়িতে করা সম্ভব হবে কি না তা এক মাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

লেখক: কলামিস্ট ও গ্রন্থকার