মুহাম্মদ কামাল হোসেন

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ছোটশরীফপুর গ্রামটি এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে আছে। পুব আকাশে মেঘের আভা। আজ ঈদের দিন। এক মাস সিয়াম সাধনার পর খুশির সওগাত নিয়ে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। গ্রামের মসজিদে ফজরের আজান শেষ হতেই মেঠো পথে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির প্রশস্ত উঠোনে আমগাছের নিচে পাটি বিছিয়ে বসে আছে একদল শিশু। বড় আঙ্কেল আনোয়ার হোসেন ঢাকা থেকে এসেছেন। তিনি বাড়িতে পা রাখা মানেই আনন্দের নতুন মাত্রা। তিনি একটি বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও শেকড়ের টান তাকে প্রতিবছর গ্রামে টেনে আনে। তিনি আমাদের সবার প্রিয় মানুষ। বড় আঙ্কেল পাটি বিছিয়ে বসেছেন। তার চারপাশ ঘিরে আমরা এগারোজন ভাইবোন। সবার বড় আরাফাত। এরপর মারিয়া, সাদিয়া, আরেফিন, আরিয়ান, আরহাম। তারপর জাকিয়া, লামইয়া, আয়ান, মুসকান আর সবার ছোট ফাতিহা। আমরা সবাই উন্মুখ হয়ে আছি সেলামির জন্য।

বড় আঙ্কেল হাসলেন। তার চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তি। তিনি বললেন, “সোনামণিরা, আজ তোমাদের ঈদের সেলামি দেব। তবে তার আগে একটা বিশেষ পাঠশালায় অংশ নিতে হবে। এই পাঠশালার নাম আমাদের ঈদ পাঠশালা। এই পাঠশালা তোমাদের জীবনের পাথেয় হবে।” আমরা অবাক হলাম। বড় আঙ্কেল আমাদের মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই। এই পাঠশালা বই খাতার নয়। এটি হলো জীবন আর মানুষের মন বোঝার পাঠশালা। তোমরা কি তৈরি?” আমরা সবাই একসাথে সম্মতি জানালাম। বড় আঙ্কেল পকেট থেকে কয়েকটি রঙিন খাম বের করলেন। তবে সেগুলো কাউকে দিলেন না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ঈদের আনন্দ আসলে কোথায়? নতুন জামায় নাকি দামি খাবারে?” সবার ছোট ফাতিহা আধো আধো বোল ফুটিয়ে বলল, “নতুন জামায়।” আঙ্কেল হেসে বললেন, “নতুন জামার আনন্দ তো শুধু তোমার। কিন্তু যদি তোমার আনন্দ দেখে অন্য কেউ হাসে, তবে সেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়।”

আমাদের পাড়ায় অনেক শিশু আছে যাদের আজ নতুন জামা জোটেনি। বড় আঙ্কেল বললেন, “তোমাদের সেলামির কিছু অংশ কি তোমরা তাদের দিতে পারবে?” আরাফাত আর আরেফিন নিজেদের মধ্যে চোখের ইশারা করল। তারা ঠিক করল সেলামির টাকা দিয়ে তারা পাড়ার এতিম ছেলেটির জন্য রঙিন কিছু চকোলেট আর পিঠা কিনে দেবে। মারিয়া আর সাদিয়া ঠিক করল তাদের জমানো টাকা দিয়ে অভাবী শিশুদের জন্য কিছু মেহেদি কিনে নিয়ে আসবে। শিশুদের ছোট হৃদয়ে এক অদ্ভুত মমতা জন্ম নিল। আঙ্কেল তাদের পিঠ চাপড়ে দিলেন। তিনি বললেন, “অন্যের জন্য ত্যাগ করাই বড় ইবাদত। মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া অনেক বড় কাজ। মনে রেখো, পকেটের টাকার চেয়ে মনের উদারতা অনেক দামি। নিজের জন্য তো সবাই করে, মানুষের জন্য করতে পারাটাই আসল মনুষ্যত্ব।”

সকাল দশটা বেজে গেছে। আমরা সবাই নতুন জামা পরে বড় আঙ্কেলের সাথে দিঘীর পাড়ে হাঁটতে বের হলাম। আমাদের আরও দুজন ছোট আঙ্কেল বিদেশ থেকে ছুটিতে এসেছেন। তারা আমাদের সাথে হাঁটছেন। এমন সময় দেখা হলো রহমত চাচার সাথে। রোদের তীব্রতা বাড়ছে। রহমত চাচা দিঘীর পাড়ে কাজ করছেন। উনার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। বড় আঙ্কেল আমাদের থামালেন। তিনি বললেন, “দেখো, আজ আনন্দের দিন হলেও অনেকেরই বিশ্রামের সুযোগ নেই। রহমত চাচা আমাদের কত উপকারে আসেন। তোমরা কি পারো উনার এই কষ্ট একটু লাঘব করতে?” আরিয়ান আর আরহাম দৌড়ে বাড়িতে গেল। তারা বড় এক গ্লাস ঠাণ্ডা শরবত আর একখানা গামছা নিয়ে এল। রহমত চাচা অবাক হলেন। আমরা যখন উনাকে ঘিরে দাঁড়ালাম আর আরিয়ান শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিল, বৃদ্ধ মানুষের চোখের কোণে পানি জমে ওঠল।

রহমত চাচা বললেন, “বাজান, এই রোদে এক গ্লাস শরবত জান বাঁচাল। তোমাদের এই হাতের ছোঁয়া আমার কলিজা ঠাণ্ডা করে দিল।” বড় আঙ্কেল আমাদের বললেন, “শোনো সোনামণিরা, মানুষকে সম্মান করা আর তাদের তৃষ্ণা মেটানো বড় কাজ। মানুষের দোয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই যে রহমত চাচার চোখে এক ফোঁটা আনন্দের জল দেখলে, এটিই হলো ঈদের প্রকৃত সার্থকতা। ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া আর তৃষ্ণার্তকে জল দেওয়া ইসলামের শিক্ষা। এই শিক্ষা তোমরা অন্তরে গেঁথে রাখো।” আমরা বুঝলাম সেবা করার মাঝে এক অন্যরকম তৃপ্তি আছে। দামি খেলনাতেও এই সুখ নেই। এটি মানুষের প্রতি এক পরম শ্রদ্ধার প্রকাশ। বড় আঙ্কেল আমাদের শেখালেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যে এক একজন স্রষ্টার সৃষ্টি লুকিয়ে আছে। কাউকে তুচ্ছ করা যাবে না।

বাড়ি ফিরে আমরা দেখলাম রান্নার ধুম লেগেছে। মর্জিনা, আঁখি, নাসরিন, জেসমিন আর পাখি আন্টি সবাই মিলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন। কেউ সেমাই রাঁধছেন। কেউ ফিরনি সাজাচ্ছেন। বিশাল হাঁড়িতে মাংসের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পাঁচ ভাই আর তাদের স্ত্রী সন্তানদের এই বিশাল মিলনমেলা। বড় আঙ্কেল আমাদের সবাইকে বারান্দায় ডাকলেন। তিনি বললেন, “তোমরা সবাই এক পরিবারের। তোমাদের পরিচয় তোমরা এই মাটির সন্তান। মনে রাখবে, জীবনে কখনো একে অন্যকে ছোট মনে করবে না। বড়দের সম্মান করবে। ছোটদের খুব ভালোবাসবে। একতা থাকলে সেখানে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। বিবাদ মানুষের সব পুণ্য খেয়ে ফেলে।” আরাফাত আর আরেফিনের মধ্যে সকালে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল। বড় আঙ্কেলের কথা শুনে তারা লজ্জা পেল। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।

জাকিয়া আর লামইয়া নিজেদের খেলনাগুলো সবার সাথে ভাগ করে খেলতে শুরু করল। আমাদের বাড়িতে আজ কোনো বিভেদ নেই। নেই কোনো মান অভিমান। সবার মনে কেবল ভালোবাসা। ছোটরা বড়দের দোয়া নিলো। বড়রা ছোটদের বুকে টেনে নিলো। বড় আঙ্কেল তৃপ্তির চোখে তাকিয়ে বললেন, “মিলনই শক্তি। এই যে এক হয়ে থাকার আনন্দ, এটিই আল্লাহ পছন্দ করেন। তোমরা বড় হয়ে অনেক বড় হবে, কিন্তু এই মাটির টান আর ভাইবোনের ভালোবাসা যেন কখনো ফুরিয়ে না যায়।” বড় আঙ্কেল আরও বললেন, “পরিবার হলো বটবৃক্ষের মতো। তার শিকড় যত গভীরে যাবে, শাখা প্রশাখা ততই বিস্তৃত হবে।” আমরা উপলব্ধি করলাম, পরিবারের শান্তিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি।

বিকেলের আকাশটা ধীরে ধীরে আবির মাখা হয়ে এল। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ডুবুডুবু। বড় আঙ্কেল আমাদের নিয়ে উঠোনে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, “আমাদের ঈদ পাঠশালার শেষ পাঠ হলো ক্ষমা। যদি কারো সাথে কোনো বিরোধ থাকে তবে আজই তা মিটিয়ে ফেলো। মন পরিষ্কার না থাকলে ঈদের আনন্দ পূর্ণ হয় না। আর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাও। তিনি আমাদের সুস্থ রেখেছেন। আজকের দিনটি আমাদের জন্য এক বড় নেয়ামত।” আয়ান আর মুসকান হাত তুলে দোয়া করল। আমরা সবাই মিলে এক কাতারে দাঁড়ালাম। বড় আঙ্কেল এবার সবার হাতে সেলামির খাম তুলে দিলেন। তবে আমরা সেই টাকাগুলো হাতে নিয়ে শুধু নিজের কথা ভাবলাম না। আমাদের মনে তখন ভেসে উঠছে রহমত চাচার হাসি। পাড়ার অভাবী শিশুদের মুখ।

রাতের নিস্তব্ধতায় ছোটশরীফপুর গ্রামের প্রতিটি ঘরে যখন প্রদীপের আলো জ্বলছিল, তখন আমাদের বাড়িটিতে এক মানবিক শিক্ষার দীপশিখা প্রজ্বলিত হলো। বড় আঙ্কেল আনোয়ার হোসেন আমাদের হৃদয়ে এমন এক বোধের জন্ম দিলেন যা কোনো পাঠ্যবই দিতে পারে না। আমাদের ঈদ পাঠশালা আমাদের শিখিয়ে দিল অহংকার বর্জন করা। ত্যাগের মহিমা আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। পরদিন সকালে যখন বড় আঙ্কেল বিদায় নিতে যাবেন, তখন আরাফাত উনার হাত ধরল। সে জিজ্ঞেস করল, “বড় আঙ্কেল, আগামী ঈদেও কি আমাদের পাঠশালা বসবে?” বড় আঙ্কেল আনোয়ার হোসেনের চোখে আনন্দের জল চিকচিক করে ওঠল। তিনি আমাদের জড়িয়ে ধরলেন।

আঙ্কেল বললেন, “এই পাঠশালা তো প্রতিদিনের জন্য। মানুষের প্রতি দয়া আর মায়া যতদিন তোমাদের হৃদয়ে থাকবে ততদিন এই পাঠশালা চলতেই থাকবে। তোমাদের আচরণই হবে তোমাদের আসল পরিচয়। তোমরা যখনই অন্যের অশ্রু মুছবে, তখনই আমাদের এই পাঠশালা জয়ী হবে।

জীবনে যা কিছুই করো না কেন, আগে একজন ভালো মানুষ হতে হবে। সেই ভালো মানুষ হওয়ার কারখানাই হলো এই ঈদ পাঠশালা।” গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটার সময় আমাদের মনে হলো পৃথিবীটা কত সুন্দর। ঈদের প্রকৃত খুশির চাবিকাঠি এখন আমাদের হাতে। সেই চাবি হলো ভালোবাসা আর ত্যাগ। ছোটশরীফপুর গ্রামের আকাশ বাতাস যেন সেই খুশিতেই মুখরিত হয়ে ওঠল। এই শিক্ষা আমরা কোনোদিন ভুলব না। মানবিকতার এক নতুন ভোরে আমরা পা রাখলাম। আমাদের ঈদ পাঠশালা সফল হলো।

সবাই যার যার মতো করে ঘরে ফিরে এল কিন্তু মনের ভেতর সেই পাঠশালা রয়ে গেল। আমরা বুঝতে পারলাম কেবল বই পড়লেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। হৃদয়ের শিক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বড় আঙ্কেল আমাদের জীবনের এক বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ঈদের এই দিনে আমরা শুধু নতুন পোশাক পেলাম না, পেলাম এক নতুন প্রাণ। এই প্রাণের স্পন্দন আজীবন আমাদের সৎ পথে চলতে সাহায্য করবে। অন্যকে ভালোবাসার যে বীজ আঙ্কেল বুনে দিলেন, তা একদিন বিশাল মহীরূহ হবে। আমরা এগারোজন ভাইবোন প্রতিজ্ঞা করলাম, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, মানুষের পাশে দাঁড়াব। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল করব আমাদের জীবন। আমাদের এই ঈদ পাঠশালা আজীবন অম্লান থাকবে।