শাদমান শাহিদ

মিঞাবাড়ির আমগাছে ঝুলন্ত লাশ দেখার দৃশ্যটা গ্রামের সবখান থেকে মুছে যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন কেন জানি আমরা জেগে উঠলাম। মনে হলো, দীর্ঘ ঘুমের পর হাশরের মাঠে উঠছি। যেখানে নতুন জীবন। নতুন করে সবকিছু শুরু এবং কেন জানি মনে হতে লাগলো, এই প্রথম আমরা কিছু একটা ভাবতেও শিখছি। এমনকি চিনতে পারছি নিজেদের হাত-পা-নাক-মুখ-চোখও। শুধু কি তাই? মনে হলো এই প্রথম মুখের ভেতর কথার যন্ত্র পাইছি। ইচ্ছা করলেই যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে কথার জাহাজ ছুটিয়ে দিতে পারি।

সে-সঙ্গে এটাও জানলাম, ভাবনারও একখান যন্ত্র আছে। যন্ত্রটা চালানোর পদ্ধতি আছে। এই কথা জানার পর বুঝলাম, এতদিন যা ভাবছিলাম, সবই পণ্ডশ্রম। ভাবনাটা পদ্ধতি অনুসারে শুরু করার দরকার ছিল। উচিত ছিল লাশটার মুখের দিকে তাকানো। বিশেষ করে ঠোঁটে। নিশ্চয়ই ঠোঁটের কোনায় একটা টেরচা হাসি ছিল। যেখানে লেপ্টে ছিল ঘটনার এফোঁড়ওফোঁড়।

আমাদের এখন আফসোসের সীমা নাই। যদি পদ্ধতি অনুযায়ী তাকাতে পারতাম, তাহলেই কামটা সারে। অবশ্য এই ব্যর্থতার পিছনে আমাদের তেমন দোষও থাকার কথা না। কারণ আমরা তখন ঘুমের মধ্যে ছিলাম। ঘুমটাও আবার স্বাভাবিক ছিল না। মন্ত্র দিয়ে আটকিয় রাখছিল।

ফলে আমাদের হাল ছিল আদিম যুগের মতো। যখন গুহায় বাস করতাম। যখন একমাত্র আহার যোগাড় ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ-কাম ছিল না। কোথায় কোন মাংসাশী প্রাণী কখন কাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে, কোথায় কোন অজগর কাকে প্যাচিয়ে ধরেছে, কে কোন জলাশয়ে কুমিরের পেটে হজম হয়ে গেল, কিছুরই খবর রাখতাম না যখন।

এভাবেই ডুবায় রাখছিল। ফলে ধরতে পারলাম না কিছুই। কেবল দেখে গেলাম মিঞাবাড়ির পিছনে আমগাছের নিচ থেকে তিন নাম্বার ডালে একটা লাশ ঝুলছে। আর তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কিছু মানুষ আর কিছু কাক। যাদের লাশ দেখা ছাড়া সেদিন সকালে আর কোনো কাজ ছিল না। অবশ্য আরও কিছু লোক ছিল। যারা কোনো কালেই কোনো কাজে লাগে না। বইয়ের ভাষায় যাদের বলা হয় ভদ্রলোক।

আমরা তখন ছোট ছোট জটলা ধরে ঘুরছিলাম আর পদ্ধতি ছাড়া উল্টাপাল্টা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, দোষটা লাশের নিজেরই। অথবা তার স্বামী খলিল মিঞার। অথবা খলিল মিঞার ছোটো ভাই মতিন মিঞার। কারণ মতিন মিঞার চরিত্র সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা কম নয়। অথবা মতিন মিঞারও না। দোষ যদি কেউ কইরা থাকে, তা খলিল মিঞার বাপ-মা। তারাই হাউশ কইরা গরিবের মাইয়াটারে ঘরে আনছিল। আবার খলিল মিঞার শ্বশুর-শাশুড়িরও হতে পারে, তাদের উচিত ছিল মিঞাবাড়ি সম্পর্কে একটু আধটু খোঁজখবর নেওয়া।

অথবা দোষটা উল্লেখিত কারোরই না। যত দোষ লাশের মাংসের। আপন মাংসে হরিণা বৈরী।

অথবা মাংসেরও না। দোষটা অন্য একজনের। যার সঙ্গে লাশটার কোনো সম্পর্ক নাই। হতে পারে সেই লোকটা সেলিম ডাক্তার। কারণ সেলিম ডাক্তারের সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই একটা ধারণা আছে। মানুষের গোপন রোগ থাকা অস্বাভাবিক কিছু না, খলিল মিঞারও থাকতে পারে আর এরজন্যে হয়তো সে কোনো একদিন সেলিম ডাক্তারের দ্বারস্থ হয়ে থাকবে। আর সেদিন সেলিম ডাক্তারও হয়তো বলে থাকবে, “খলিল মিয়া, অত ভাবাভাবির দরকার নাই। লাল টকটকা একখান মাইয়া দেইখা বিয়া কইরা ফালাও। তুমি তো বুঝবা না, মাইয়া মাইনষের শরীর হইল গিয়া কষ্টি পাত্থর। ওইটায় একবার ঘষা খাইতে পারলে মরা মানুষও জেতা হয়। একিন না হয়, একবার তালুইর কথা রাখতে মন্দ কি। পরে যদি সুবিধার করবার না পারো, তখন তালাকের পথ তো আছেই। তবে আমার বিশ্বাস, তোমার যা ধরন, তাতে বিয়াই একমাত্র দাওয়াই। বাকি তোমার ইচ্ছা, আমার কাছে আর কোনো ফর্মুলা নাই।”

অথবা দোষটা সেলিম ডাক্তারেরও না। এমনকি মুখলেস কবিরাজেরও না। কারণ খলিল মিঞার হয়তো কোনো সমস্যাই নাই।

এইভাবে আমরা ভাবনার খালবিলনদী পার হয়ে সাগরে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। অথবা বলা যায়, অদৃশ্য দৈত্য জিয়ন কাঠি উল্টাপাল্টা করে ঘুম পাতায় রাখছিল।

আবার এরই মধ্যে কী থেকে কী হলো জানি না। একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে শুনি মিঞাবাড়ির আমগাছের ঝুলন্ত লাশটা নাকি আবার জ্যান্ত হয়ে ওঠেছে। কথাও নাকি বলতে শুরু করেছে এবং বলেও দিয়েছে ঘটনার আগাপাশতলা।

ফলে আমরা আবার গিয়ে জড়ো হই বটতলা। যেখানে দুই-তিনটা টঙ দোকান নিয়ে নতুন বাজার জমেছে। বাজারটা জমে সকাল বেলা। ফলে ভোর বেলা তুলে আনা টাটকা তরিতরকারি সহজেই হাতের নাগালে পাওয়া যায়। অপর দিকে নগদে বাজার পেয়ে ঘরের গিন্নীরাও বেশ খুশি। আমরা তখন টাটকা তরকারি দিয়ে নাস্তা সেরে বটতলায় যেয়ে জড়ো হই, আড্ডা মারি। বটতলায় তখন ঢাকা শহরে টাকা উড়ার মতো কথা ওড়ে। আর তখনই জানতে পারি, লাশ নয়, কথা কইছে লাশের আত্মা। লাশের আত্মা ভর করেছে নাসিমার দেহে। এক দেহে দুই আত্মা। নাসিমা হলো মিঞাবাড়ির বছইরা মুনি বাদলের স্ত্রী।

আমরা তখন এও জানতে পারি, বাদল সম্প্রতি বড়ি খাওয়া ধরছে। বড়ি বেচে জসিম ডাক্তার। লোকেরা আরও বলাবলি করে, জসিম ডাক্তারের কারণে গ্রামের ছেলেরা সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বড়ি খাওয়া পোলাপানগুলো গোড়াকাটা লাউডগার মতো খালি ঝোলে। কখনও কখনও বড়ি খাওয়ার টাকা না পাইলে ঘরে আইসা উৎপাত চালায়। কোনো কোনো পোলা বাপ-মা’র গলার কাছে দা ধরতেও দ্বিধা করে না।

বাদলেরও একই হাল।

তার বউ একদিন চিৎকার করে বলতে থাকে, এই জাউরা যখন আমারে মাইরাই ফালাইবো, তখন আর পেটের কথা আটকায়া রাখুম ক্যান?

আমরা তখন চালাক হয়ে উঠি। বাদলের বউয়ের পেট থেকে কথা বের করার কায়দাকানুন করি এবং কিছু কথা বের করতে সক্ষম হই। ফলে আগের নামগুলোর সঙ্গে আরও কিছু নাম যোগ হয়। ফলে বিষয়টা নিয়ে আমরা আবার প্রথম থেকে শুরু করি এবং জানতে পারি লাশের একটা ডাকনামও ছিল। গ্রামে তারে সকলে ফুলি ডাকতো।

আমরা ফুলির বাপকে পরামর্শ দিই। বলি, তালুই, এখন তো বিষয়টা মোটামুটি পরিষ্কার, তাইলে আর দেরি ক্যান? লন যাই থানায়। ফুলির বাপ তখন নিরস হাসে আর বিড়বিড়িয়ে কি যেন কয়। আমরা কান খাড়া করি, কিন্তু স্পষ্ট হয় না কিছুই।

আমরা তখন তালেব মাস্টারের কাছে যাই। কিছুদিন হয় তিনি রিটায়ার করে গ্রামে আইছেন। লোকেরা বলাবলি করে, তিনি নাকি এখন থেকে গ্রামেই থাকবেন। শিক্ষিত মানুষ, গ্রামে থাকলে তো ভালোই। বিপদআপদে অনেককিছুতেই কাজে লাগে।

আমরা গিয়ে তাঁকে ধরলাম।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বৃত্তান্ত শোনার পর তাঁর ভাষাও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিড়বিড়িয়ে কী জানি কয়। বলতে গেলে পরে শুনি ফুলির বাপের মতো তিনিও একজন ঝুলন্ত লাশের পিতা। পুলিশ-আদালত ইত্যাদি শুনলেই তাঁর ভাষা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন আমরা তাঁর মিনমিনা কথার অর্থ উদ্ধারের জন্য আবারও কান খাড়া করি। দেখি, তার গলার স্বর এককালীন ট্রানজিস্টার রেডিওর মতো। আধা বোঝা যায় বাকিটা কেবল গড়গড়। তারপরও যা বুঝলাম, তা হলো, কেন জানি তিনি দৃশ্যমান দুনিয়া থেকে গোপন হয়ে থাকতে চান। তিনি যখন বললেন, অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারতাম যদি, যদি কেউ দেখতে না পেতো। তখন আমরা বুঝলাম, এই “যদি”র ব্যাখ্যা হচ্ছে, ঘরে আরও দুটো সন্তান আছে, তাদের বেড়ে ওঠা আছে।

এই ধারণার পর আমরাও তখন এক ধরনের অস্পষ্টতার মধ্যে ঢুকে পড়ি। যেদিকে চোখ যায়, কেবল ধোঁয়াশা দেখি। আর একে-অপরের দিকে তাকিয়ে যা বলি, তা ট্রানজিস্টারের গড়গড়ে শব্দের চাইতেও বাজে অবস্থা।

এই যখন পরিস্থিতি, তখনই কানে আসে শহরে নাকি আবাবিল নামছে। পাথর মেরে সব শেষ করছে। তখন আমাদের মনে পড়ে, আবাবিল নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র পাখির কথা। যে পাখির ঝাঁক বহুবছর আগে আরব দেশে আবরাহা নামে এক বাদশাকে তার বিশাল হস্তী বাহিনীসহ গিলে ফেলেছিল।

আবার কেউ জানায় আবাবিল না, ওগুলো মশার দল। আমরা তখন মশা দল নিয়ে পড়ি। গবেষণা করতে করতে জানতে পারি, প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে মধ্যপ্রাচ্যে কোটি কোটি মশা একদিন নমরুদ নামক এক জালেম বাদশাসহ তার সৈন্যসামন্তদের নাক দিয়ে ঢুকে মগজে গিয়ে কামড় বসায়।

ফলে তারা প্রথমে সাইকো হয়, পরে অদ্ভুত আচরণ করতে করতে মারা যায়।

এইসব শুনতে শুনতে আমরা তখন মাঘের ভোরের মতো কোয়াশা কেটে কেটে বের হয়ে আসতে থাকি।

এর কদিন পরেই শুনি আবাবিল নাকি শহর শেষ করে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের রগে রগে। গ্রাম-গঞ্জ-শহর-বন্দর সবখানে ক্ষুদ্র পাখির ঝাঁক। এমনকি আমাদের ঘরেও। আমাদের ঘরের ক্ষুদ্র পাখিটা স্কুলের কথা বলে বের হয় ঠিক, কিন্তু সহজে ফেরে না। কদাচিত ফিরলেও অনেক বেলা করে। কিছু জিজ্ঞেস করলে এমনভাবে কথা বলে। মনে হয় ওদের মুখে কোনো ডিভাইস লুকানো। না হলে এমন স্পষ্ট কথা আমরা সাত জন্মেও শুনি নাই।

এমনই এক পরিস্থিতির ওঠানামার ভেতর একদিন দেখি তালেব মাস্টার, দেখি ফুলির বাপ। দুইজনেই বেশ ফুরফুরা মেজাজে মতি মিয়ার চা-স্টলে দুধ চায়ে চুবিয়ে চুবিয়ে বনরুটি খাচ্ছে। আমরা কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই কড়া অর্ডার, মতি মিয়া, সবাইকে চা দাও। আরও যা যা চায় সব দাও। সব কাপে বেশি করে সুগার দিও। খবর পাইছি ডায়াবেটিস এখন থেকে অন্যদিক দিয়ে গড়াবে। দেশে আবাবিল নামছে। মশা নামছে।

তারপরেই মাস্টার সাহেবের মুখে দিল খোলা হাসি। হাসির তুড়ে কেটে যেতে থাকে সব অস্পষ্টতা।

আমরা তখন দুধ চা খাই এবং বেশি করে চিনি দিয়ে।