শুধু জয়-পরাজয় নয়, যুদ্ধের একটা নৈতিক দিকও আছে। ইরান যুদ্ধে এই বিষয়টি আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মিডলইস্ট আই জানায়, ইরানে সম্ভাব্য স্থল যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেই তীব্র আপত্তি ও অসন্তোষের আভাষ পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির অনেক সেনাসদস্যই এ যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন না। নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে যুদ্ধবিরোধীদের সহায়তাকারী সংস্থাগুলোতে এখন যুদ্ধবিমুখ সেনাদের ফোন আসছে। অলাভজনক সংস্থা ‘সেন্টার অন কনশেসন অ্যান্ড ওয়ার’-এর দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের দপ্তরে যুদ্ধবিমুখ সেনাদের ফোন আসার হার বহুগুণ বেড়ে গেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মাইক প্রাইজনার সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ফোন বেজেই চলেছে। জনগণ যা জানে, তার চেয়েও অনেক বেশি সেনা ইউনিটকে মোতায়েনের জন্য সক্রিয়া করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বড় আকারে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা চলছে। এর মধ্যেই মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের একটি বড় প্রশিক্ষণ মহড়া বাতিল করেছে সম্প্রতি। উল্লেখ্য, এই ডিভিশনের সেনারা মূলত শত্রুসীমায় আকাশপথে দ্রুত অবতরণ করে স্থলযুদ্ধে অংশ নিতে পারদর্শী। অন্যদিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা ‘ড্রাফট’ আবার চালু হওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিটকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানান। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ ১৯৭২ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় পুরুষদের বাধ্যতামূলক যুদ্ধে পাঠানোর আইন কার্যকর ছিল। উল্লেখ্য, ‘সেন্টার অব কনশেসন অ্যান্ড ওয়ার’ মূলত সেই সব সেনাকে আইনি ও নৈতিক সমর্থন দেয়, যারা বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অস্ত্র ধরতে নারাজ। সংস্থাটি বলছে, মার্কিন সেনাদের মধ্যে এই ‘কনশিয়েনসেস অবজেক্টর’ বা বিবেকবান যুদ্ধবিরোধীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা ইরান যুদ্ধ নিয়ে পেন্টাগণের পরিকল্পনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পরে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক্সে আরেকটি পোস্টে বলা হয়, ‘আমাদের কাছে একজন সেনাসদস্যের ফোন এসেছে, যিনি মোতায়েনের মুখোমুখি। তিনি এখন কনশিয়েনসেস অবজেক্টরস হিসেবে আবেদন করতে চাইছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি তার ইউনিটের মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা থাকার কথাও বলেছেন। তিনি সবাইকে আমাদের ফোন নম্বর দেবনে বলেও জানিয়েছেন।

সংস্থাটির পোস্টে বলা হয়, মার্কিন সেনারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি যুদ্ধজাহাজের ওপর হামলা ও ইরানে মেয়েদের একটি স্কুলে মার্কিন হামলার ঘটনায় চরম আপত্তি প্রকাশ করেছেন। ওই স্কুলটিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই মেয়ে শিশু। তারা ওই স্কুলটির শিক্ষার্থী ছিল। মিডলইস্ট আইয়ের খবর অনুযায়ী, ইরানের মিনার শহরের ওই স্কুলে দু’বার হামলা করা হয়। প্রথমবার হামলার পর আতঙ্কে এক জায়গায় আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থী ও তাদের উদ্ধারকারীদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনকে এই হামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। উপলব্ধি করা যায়, শুধু জয়-পরাজয় নয়-যুদ্ধের একটা নৈতিক দিকও আছে। এ কারণেই মার্কিন সেনারা অনৈতিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইছেন না এবং তারা স্কুলে হামলার ঘটনায় চরম আপত্তি প্রকাশ করেছেন। এমন বোধ মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুসহ বিশ্বের বড় বড় নেতাদের অনেকেই ওই নৈতিকবোধ হারিয়ে ফেললেন কেমন করে? এই বোধ ছাড়া প্রকৃত শাসক হওয়া যায় কী?