মহান ভাষা শহীদ দিবস অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ। আমাদের মননে অনন্য মহিমায় ভাস্বর দিনটি। ইতিহাসের পাতায় অমর সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর প্রমুখের রক্তে রাঙানো এ দিনটির মহিমা অপার। একদিকে এটি রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান ভাষা শহীদ দিবস। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আপন মহিমায়।

ভাষা শহীদদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা, মায়ের ভাষা বাংলা। ৭৪ বছর আগের এ দিনটি এসেছিল ধাপে ধাপে। তমদ্দুন মজলিশ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিরলস চেষ্টায় ভাষার মর্যাদার দাবি তিলে তিলে জনগণের মনে যায়গা করে নেয়। এরপর মানুষ সংগঠিত হয়, সোচ্চার হয়। সংগঠনটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলে। এ দাবির পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন ততকালীন পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী, কবি সাহিত্যিকগণ। বাংলা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নাগরিকদের মাতৃভাষা। তারা এর পরিবর্তে অন্য ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। ফলে তাদের দাবি ছিল ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ দাবির গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ আন্দোলন ও ভাষার দাবি অব্যাহত রাখে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের দাবি উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা জারি করে তা দমানোর চেষ্টা করা হয়। দিনটি ছিল ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রয়ারি, বাংলা ৮ ফাল্গুন। কিন্তু ১৪৪ ধারা অমান্য করে ছাত্ররা আন্দোলন চালিয়ে গেলে এক পর্যায়ে ছাত্র মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। অকালে ঝরে যায় বরকত রফিক সালামসহ অনেকের তাজা প্রাণ। ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাবি দাওয়ার মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হলেও ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ঢাকার রাজপথে সে দিন ঘটেছিল ইতিহাস পাল্টে দেয়ার ঘটনা। ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয় অনেকেই। তাদের মধ্যে ছিলেন ছাত্র শ্রমিক ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। ভাষার দাবীতে প্রাণ দেয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। ফলে তা আন্তর্জাাতিক পরিমন্ডলে গুরুত্ব পায়। তারই স্বীকৃতি দিনটিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা।

একুশের চেতনা আমাদের আত্মমর্যাদাশীল করেছে। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ এ স্লোগান তাই আজও সমহিমায় ভাস্বর। বাংলা আজ স্ব মহিমায় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব স্বীকৃতি এলেও একথা সত্যি যে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে এর প্রতিষ্ঠা আজো হয়নি। ভাষার মূল চেতনা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনার বিপরীত। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে শিশুরা অন্য ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। আর চলছে ইংরেজির অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন। আমরা ইংরেজি শিক্ষার বিরুদ্ধে নই, কিন্তু রক্ত দিয়ে যে ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছি তার মর্যাদা রক্ষা করা আশু কর্তব্য। আমরা মনে করি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত ৫৪ বছরে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ কাজ হয়নি।

একুশে ফেব্রুয়ারির যে চেতনা আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে সাহায্য করেছে, সেই দিনটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, প্রজন্মান্তরে বুকে ধারণ করতে হবে। আবেগের স্থান থেকে বের হয়ে এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা সে ব্যাপারে যত্নশীল হবার জন্য নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী, সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংশ্লিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।