রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কারণ, বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। তাদের অর্জিত ও প্রেরিত অর্থই আমাদের অর্থনীতিকে সঞ্জিবনী শক্তি দিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশী অভিবাসীদের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশের বার্ষিক রেমিটেন্সের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, জুন ২০১৫ সাল মোতাবেক বাংলাদেশ রেমিট্যান্সের দিক দিয়ে বৃহত্তম প্রাপক দেশসমূহের একটি যেখানে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স প্রেরণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ ও ২০২২ এ দুই অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বিষয়ক হালনাগাদ তথ্য না দিলেও ধারাবাহিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই আমাদের রেমিটেন্স প্রবাহ বেশ ইতিবাচক।

করোনাকালে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি খানিকটা স্লথ হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু আমাদের পরিশ্রমী ও উদ্দমী প্রবাসীরা সে অবস্থা থেকে আমাদেরকে মুক্তি দিতে সক্ষম হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্সে খানিকটা উত্থান-পতন লক্ষ্য করা গেলেও সার্বিক পরিস্থিতি ছিলো ইতিবাচক। তবে সে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের ইতিহাসে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। যা আমাদের অর্থনীতির জন্য সোনালী হাতছানি। প্রাপ্ত তথ্যমতে সদ্যবিদায়ী মাস মার্চে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা পৌনে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। স্বাধীনতার পর এটিই দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত ১ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন প্রবাসীরা। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে শক্তিশালী ভিত গড়ে দেশের অর্থনীতি। রীতিমতো আশাবাদের সৃষ্টি করছে প্রবাসী আয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী-মার্চের পুরো সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার ডলার, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারির চেয়ে প্রায় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি। আর গত বছরের একই সময়ের চেয়ে (মার্চ ২০২৫) ৪৬ কোটি ডলার বেশি। যা সত্যিই আশাবাদী হওয়ার মত খবর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ইতিহাসে এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের (২০২৫) মার্চ মাসে। সে সময় মোট ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল একই বছরের ডিসেম্বরে। ওই মাসে আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন) রেমিট্যান্স। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। ওই মাসে ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৯০ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহে চাঙাভাব থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বিভিন্ন কৌশলগত নীতিমালা ও কঠোর তদারকির ফলে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৈদেশিক আয় দেশে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধ চলছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। তাদের জীবন-জীবিকার ওপর যুদ্ধের প্রভাব অস্বাভাবিক নয়। আর যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে এ শঙ্কাটা আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আমাদের রেমিট্যান্স প্রভাবে যাতে ভাটির টান না পড়ে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নতুন সরকারকে নতুন নতুন বৈদেশিক শ্রমবাজার অনুসন্ধান করাও জরুরি। যাতে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখা যায়। একই সাথে যেকোন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য খুবই জরুরি।