দেশের ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে মারাত্মক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। দেশে ব্যবসায়রত ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে অধিকাংশই বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সংকটে ভুগছে। তারা চাইলেও ঋণ আবেদনকারিদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করতে পারছে না। সিডিউল ব্যাংক হলো সাধারণত ক্ষুদ্র আকারের ঋণের চেয়ে বৃহৎ অঙ্কের ঋণদানের ক্ষেত্রেই বেশি আগ্রহী। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে, ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে যারা ঋণ গ্রহণ করেন তাদের তৎপরতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৃহৎ ঋণ গ্রহীতাদের মাঝে ঋণ খেলাপি হবার প্রবণতা বেশি। আর যারা ক্ষুদ্র এবং ছোট আকারের ঋণ গ্রহণ করেন তারা সাধারণত ঋণ খেলাপি হন তুলনামূলকভাবে কম। ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ খেলাপি থাকতেই পারে।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করে কেউ যখন সামর্থ্য থাকা সত্বেও ইচ্ছে করে ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন। যারা ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হয়েছেন তাদের একটি বড় অংশই ইচ্ছাককৃত ঋণ খেলাপি। এরা সামর্থ্য থাকা সত্বেও ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করেন না। সেপ্টম্বর, ২০২৫ কোয়ার্টারের তথ্য মোতাবেক, ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ছাড়কৃত ঋণের ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ঋণ হিসাব অবলোপন, ঋণ হিসাব পুন:তফসিলিকরণ এবং মামলাধীন প্রকল্পের নিকেট প্রাপ্য ঋণের অংশ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে যাবে।
তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপি হবার প্রবণতা বেশি। যেসব ঋণ গ্রহীতা ১০ কোটি টাকার কম ঋণ গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে খেলাপির হার হচ্ছে ২১ শতাংশ। আর ৫০ কোটি টাকা বা তারও বেশি অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছেন এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার হচ্ছে ৫১ শতাংশ। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার হচ্ছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। আর ১ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ১০ কোটি টাকার কম এমন ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। খেলাপি ঋণ সৃষ্টিতে ঋণ গ্রহীতারা যেমন দায়ি তেমনি ব্যাংকারগণও সমভাবে দায়ি। কারণ ব্যাংকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ব্যতীত একজন আবেদনকারির পক্ষে ঋণ পাওয়া সহজ নয়। ঋণের আবেদন প্রাপ্তির পর যদি তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হতো তাহলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেকটাই কমে যেতো। ব্যাংক থেকে ঋণ পাবার জন্য আবেদন করলে ১.২৫ অথবা ১.৫০ শতাংশ মূল্যের সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে জামানত হিসেবে বন্ধক দিতে হয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ১ কোটি ঋণের জন্য আবেদন করে তাহলে তাকে অন্তত ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা অথবা ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে জামানত হিসেবে প্রদান করতে হয়। ব্যাংক কর্মকর্তারা অধিকাংশ সময়ই উপরের চাপে অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বন্ধকীযোগ্য সম্পদের অতি মূল্যায়ন করে থাকেন। ফলে কোন কারণে গৃহীত ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংক বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করার উদ্যোগ নিলে সঠিক মূল্যে তা বিক্রি করতে পারে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টগণ দীর্ঘদিন ধরে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিলে এলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে কর্ণপাত করছে না। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝে মাঝে এমন সব আইনি পরিবর্তন করে যা ঋণ খেলাপিদের কিস্তির টাকা পরিশোধ না করেও নিজেদের খেলাপিমুক্ত দেখানোর সুযোগ পান। যেমন, কিছুদিন আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুন:তফসিলিকরণের সুযোগ দিয়েছিল। নির্বাচনের আগে এভাবে ঋণ খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্য কারো না বুঝার কারণ নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় বড় ঋণ খেলাপিদের অনেকেই খেলাপি ঋণের দায়মুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেছেন। নতুন সরকার ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চান। কিন্ত ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের জাতীয় সংসদে বসিয়ে রেখে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ কি সম্ভব হবে? বিগত সরকার আমলে ব্যাংকিং সেক্টর অর্থ পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছিল। আগামীতে ব্যাংকিং সেক্টর স্বেচ্ছা ধারায় প্রবাহিত করার জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে।