নির্বাচনের সময় বিএনপি অনেক চমৎকার কথা বলেছে। সংস্কারের কথা বলেছে, ৩১ দফার কথা বলেছে। তবে সরকার গঠনের পর সেসব কথা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা লক্ষ্য করছে জনগণ ও পর্যবেক্ষকরা। ক্ষমতায় গেলে অনেকেই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায়, এমন কি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বয়ান দিয়ে নিজেরাই আবার ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অঙ্গনের এমন চালচিত্র জনগণকে শঙ্কার মধ্যে রাখে। তাই বাংলাদেশের নতুন সরকারের কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য রাখছে জনগণ এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের আদলে ফিরিয়ে নেওয়ার দুঃখজনক পাঁয়তারা চলছে। অধিকার অধ্যাদেশগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া বন্ধ করে অবিলম্বে সেগুলোকে আইনে পরিণত করার দাবি জানিয়েছে।
শনিবার অধিকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোটের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ-এ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে (রহিত) জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি জাতীয় সংসদে বিল আনতে সুপারিশ করেছে। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে এবং আগামী ১০ এপ্রিলের পর এগুলোর কার্যকারিতা হারাবে। জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অধিকার তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানায়।
বিবৃতিতে অধিকার জানায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোটে অংশ নিয়ে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। জনগণের এই বিপুল রায়কে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সরকারদলীয় সদস্যরা বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের দাখিল করা, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অগ্রাহ্য করে বাতিলের সুপারিশ করেছেন। অধিকার স্মরণ করিয়ে দেয়, ফ্যাসিবাদী হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়েছিল; যার ফলে বিরোধীদলের নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী ও সাধারণ নাগরিকরা বিচারিক হয়রানি, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। সেই সময় বিরোধীদল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতা-কর্মীদের এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চললেও হাসিনা সরকারের আজ্ঞাবহ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই ব্যাপারে তখন নিশ্চুপ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। দুর্নীতিদমন কমিশনকেও (দুদক) হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধীদের দমন করতে এবং ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল উল্লেখ করে অধিকারের বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সংসদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। আমরা মনে করি, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের সরকারী কর্মকাণ্ডগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের দেশ ও গণবিরোধী তৎপরতাগুলো নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেইগুলো এখন আইনে পরিণত করা বিএনপি সরকারের কর্তব্য। এর বদলে তারা যদি ওই অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে-এই সরকারও কি ফ্যাসিবাদী আমালে ফিরে যেতে চায়? আশাকরি, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখবে।