২৬ মার্চ ২০২৬-স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ করল বাংলাদেশ। অর্ধশতক পেরিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার এ মুহূর্তে জাতি দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এ বছরের স্বাধীনতা দিবস শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্থান-পতন, গণআকাক্সক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল সে বাস্তবতার একটি বিস্ফোরক প্রকাশ। দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত রাজনৈতিক হতাশা, ফ্যাসিবাদী শাসন, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, নাগরিক অধিকার সংকোচন এবং প্রশাসনিক এককেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে জনগণের এই বিস্ফোরণ হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি; বরং এটি ছিল বহু বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তরুণ সমাজ, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, পেশাজীবী শ্রেণিÑসবাই মিলে একটি পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। এরপরের ১৮ মাস ছিল এক ধরনের ‘রাজনৈতিক অন্তর্বিরতি’। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় মূলত তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যূনতম স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। এ সময়কালটি নিঃসন্দেহে সহজ ছিল না। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়াÑসব মিলিয়ে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছে। তবুও, এই সময়টিতে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া কোনো টেকসই রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনকে ঘিরে শঙ্কা, বিতর্ক এবং প্রত্যাশা-সবকিছুই ছিল প্রবল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জনগণের অংশগ্রহণ এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের সৃষ্টি। নির্বাচনের পর নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এ সরকার কি সত্যিই পরিবর্তনের সেই আকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে পারবে?
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑস্বাধীনতার চেতনা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে আনা। নতুন সরকারের সামনে তাই প্রথম এবং প্রধান কাজ হওয়া উচিত আস্থা পুনর্গঠন। এ আস্থা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয়, বরং নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কেও ফিরিয়ে আনতে হবে। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও নিরপেক্ষ করা, প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা-এসব পদক্ষেপ ছাড়া এই আস্থা তৈরি হবে না। একই সঙ্গে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলোÑতরুণ প্রজন্মকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশই তরুণ, যারা শুধু কর্মসংস্থান নয়, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ চায়। তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে আবারও হতাশা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা জরুরি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কম জটিল নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওঠানামা, মূল্যস্ফীতির চাপ-সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি-এসব বিষয়ে নতুন সরকারকে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও সমানভাবে জরুরি। আমাদের রাজনীতিতে সহনশীলতার অভাব, সংলাপের অনীহা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মতই শক্তি, দুর্বলতা নয়। সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা-এসবই একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের পূর্বশর্ত। এই মুহূর্তে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসেÑরাষ্ট্র কি নাগরিকের জন্য, নাকি নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য? স্বাধীনতার চেতনা স্পষ্টভাবে প্রথমটির পক্ষেই দাঁড়ায়। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নতুন রাজনৈতিক সরকারের হাতে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে একটি ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় রূপ দিতে পারে; আবার চাইলে সেটিকে উপেক্ষা করে পুরোনো পথেই ফিরে যেতে পারে। প্রথমটি হলে বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে; দ্বিতীয়টি হলে ইতিহাস হয়তো আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আমাদের অঙ্গীকার হোক-রাষ্ট্রকে আরও গণতান্ত্রিক, আরও মানবিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক করে তোলা। কারণ স্বাধীনতা কোনো স্থির অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়, লালন করতে হয়। আজকের এই দিনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা যদি এই প্রতিজ্ঞা করতে পারি, তবেই স্বাধীনতার প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে।