হাছনা বিনতে বোরহান

আমাদের পরিবারের ছোট সদস্যরা যেমন ছোট ভাই বোন বা সন্তান,ওরা আমাদের জন্য মহান আল্লাহ প্রদত্ত সেরা উপহার। ওদেরকে নৈতিক শিক্ষা দেয়া সুন্নাহ। কিন্তু এ সুন্নাহটি আমলের ব্যপারে আমরা গাফিল। ঘটা করে আকিকার সুন্নাহটি পালন করলেও সন্তানের সুন্দর নাম রাখা ও তাকে দীনি শিক্ষা দেয়ার সুন্নাহগুলো আমরা ভুলে যাই। অথচ তাদেরকে সঠিক পদ্ধতিতে লালন-পালন এবং সঠিক শিক্ষা প্রদান করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। এ দায়িত্বে গাফিলতির জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি ও করতে হবে। সাধারণত শিশুদের লালন-পালনে আমরা যতটা উদগ্রীব থাকি তাদেরকে নৈতিক শিক্ষা প্রদানে ততটা গাফিল থাকি। তাদের শান্তি, আরাম, উন্নত খাওয়া-পরার সুব্যবস্থা করতে কখনো কার্পণ্য করি না। সাধ্যের মধ্যে তাদের সকল চাহিদা নির্দ্বিধায় পূরণ করতে থাকি। তাদের সব অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করলেও নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার অধিকারের ব্যপারটি গুরুত্ব দেই না। অভিভাবকের পক্ষ হতে শিশুর জন্য সেরা উপহার হচ্ছে সুশিক্ষা। কিন্তু দুঃখজনক ভাবেই দিন দিন এ বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে।

এটি অভিভাবকদের চরম ভুল আর এ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। ছোটবেলা থেকেই আমরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে, শ্রেষ্ঠ জীবন-বিধানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই না, তাদেরকে ভালো মন্দ কাজের পুরষ্কার ও শাস্তির ব্যাপারে জানিয়ে রাখি না, নবী রাসূলগণের আদর্শে মহৎজীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করি না। যার ফলশ্রুতিতে তারা আজ মানবসম্পদে পরিণত হতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনৈতিকতার তীব্র দুর্গন্ধে চারদিক দূষিত হচ্ছে। এ ব্যর্থতার দায়ভার তো আমাদেরই। শিশুরা আজ ডোরেমন, রুদ্রা, শিভা, রোবোবয়, অগী প্রভৃতি কার্টুন নিয়ে বসে থাকে। এসব দেখতে দেখতে তাদের মন-মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে, সব সময় এ কার্টুন ক্যারেক্টারগুলোই তাদের মনে, চিন্তা-চেতনায় বিচরণ করে। ওরা ভাবে-ইশ! আমার যদি ডোরেমনের মতো একটা ফ্রেন্ড থাকতো তাহলে আমার হোমওয়ার্ক করে দিত বা মুহূর্তেই আমার সুবিধা মতো একটি গেজেট বানিয়ে দিত। কেউ কেউ ভাবে, ইশ! আমার যদি রুদ্রা, শিভার মতো ফ্রেন্ড থাকতো তাহলে তো যেকোনো প্রয়োজনেই তাদেরকে ডাকলে তারা ছুটে এসে হেল্প করতো! কেউ আবার ভাবে আমার যদি অগীর মতো একটি অলিভিয়া বান্ধবী থাকতো! এভাবে শিশুরা ভুল শিক্ষা নিয়ে বড় হচ্ছে।

এসব কার্টুন দেখে দেখে তারা প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাচ্ছে না। আমাদের বন্ধু, অভিভাবক একমাত্র সাহায্যকারী মহান আল্লাহর কাছেই যে সব সময় সাহায্য চাইতে হবে এ বিষয়টি এখন শিশুরা বুঝে না। সাহায্যের জন্য বা বন্ধু হিসেবে তারা কল্পনায় ডোরেমন, রুদ্রা, শিভাকে ই চাচ্ছে, নাউজুবিল্লাহ! কার্টুন দেখে দেখে তারা ছোট বেলা থেকেই বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড এ অভ্যস্ত হচ্ছে যা ইসলামে হারাম। তাই এসব কার্টুন না দিয়ে আমরা তাদেরকে আব্দুল বারী, ওমর হানা, চুচু সিরিজ, শান্তির ছায়া এবং আবু বকরের সাথে ইসলামের পথে দেখাতে পারি। এগুলোতে শেখার কিছু আছে। আর যদি কার্টুন শো টোটালি অফ করে আমরা তাদের জন্য ভিন্ন এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে তো আরো ভালো হয়। কারণ মোবাইল বা টিভিতে না চাইলেও অপ্রত্যাশিত জিনিস গুলো বার বার সামনে এসে পড়ে। তাই ডিভাইস থেকে দূরে থাকাই উত্তম। আমাদের শিশুরা আজ নবী-রাসূল গণের নাম না জানলেও খেলোয়াড় ও তারকাদের নাম ঠিক ই জানে। ওরা সাহাবীগণের দুনিয়াবিমুখ জীবন-যাপনের কাহিনী না জানলেও নিকি, ভøাড, রোমা, ডায়ানাদের বিলাস বহুল জীবন সম্পর্কে ঠিকই জানে।

আমরা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে অতি ব্যস্ত না হয়ে তাদেরকে সময় দেয়া জরুরি। তাদের সাথে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা ও ঘোরাফেরা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে সালাম, সালাত, সিয়াম, যিকির, মাসনূন দুয়া, হিজাব, ইসলামি পোশাক, ইসলামি বই পাঠ, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, পরোপকার, ক্ষমাশীলতা প্রভৃতিতে অভ্যস্ত করানো আবশ্যক। তাদেরকে সুশিক্ষা দিয়ে সুন্দর জীবন গড়তে সহায়তা করার সুফল আমরা ইহকাল, পরকাল উভয় জগতে ই পাবো ইনশাআল্লাহ।

লেখক : প্রাবন্ধিক।