সুমাইয়া আক্তার সুইটি

বাংলাদেশ অর্থনীতি ডলার সংকট যখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বিদেশ কর্মরত প্রবাসীরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ দেশে পাঠান, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। রেমিটেন্স দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ডলারের প্রবাহ বাড়ার ফলে স্থানীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা কমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ গুরুতর ডলার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। ডলারের সংকট মূলত তখনই তীব্র হয়, যখন একটি দেশের আমদানি ব্যয় তার রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক আয়ের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। বাংলাদেশের জ্বালানি, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল এবং শিল্পের কাঁচামালের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সকল সমস্যা নিরসন ভূমিকা পালন করছে রেমিট্যান্স।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রথমবার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করছিল। ২০২১ তা বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২,৩৯১ কোটি ডলার। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ কমে ২৬ মিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছে ৩,০৩৩ কোটি ডলার। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত এসেছে প্রায় ১৯.৪ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের একই সময় ছিল ১৫.৯৬ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই- মার্চ (২০২৬) পর্যন্ত এসেছে ২২.৬ বিলিয়ন ডলার। যা আগের তুলনায় ২২.৪% বেশি। এছাড়া মার্চ মাস পর্যন্ত প্রথম ২৯ দিনে প্রাপ্ত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

রেমিটেন্স বাড়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনেছে পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ আসাও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) - এর বৈদেশিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবহার অবস্থান নির্দেশিকা (ষষ্ঠ সংস্করণ) পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাবও প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে রেমিটেন্স ডলারের বাজারে বাফার হিসেবে কাজ করে একই সাথে রেমিটেন্স মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে। এছাড়া রেমিটেন্স দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন আমদানি ব্যয় বেশি হয় বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব ঘাটতি তৈরি হয়, তখন রেমিটেন্স সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। এর ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈদেশিক সংকট থেকে রক্ষা পায়। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও রেমিটেন্সের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থের মধ্যে প্রায় ৬০% প্রেরিত হয়েছে পরিবারের সহায়তায় ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য।

এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার যাবতীয় খরচ ও সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করে এবং একইসাথে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করে। ফলে গ্রামীন অর্থনীতি সচল থাকে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং দারিদ্রতা নিরসনে সহায়তা করে। রেমিটেন্সের প্রভাবে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটে সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাংক প্রাপ্ত অর্থকে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প ব্যবহার করতে পারে, যেমন ছোট ব্যবসা, শিল্প বা শিক্ষার উন্নয়ন। এতে দেশের আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী হয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের উন্নয়নের সরাসরি অবদান রাখে। রেমিটেন্সের মাধ্যমে সৃষ্টি অর্থনৈতিক গতিশীলতা স্থানীয় ব্যবসায়ী কার্যক্রম উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাড়ায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্য অনুযায়ী, রেমিটেন্স গ্রামীণ আয় বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পূর্বে বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় অর্থ প্রেরণের কর্মকাণ্ড দেখা গেলেও, সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং হুন্ডি প্রতিরোধ পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে প্রবাসীরা বৈধভাবে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ স্বচ্ছ ও টেকসই হচ্ছে।

আর রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতে পারছে। বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের উৎসাহ দিতে বর্তমান সরকার প্রায় ২.৫% হারে প্রণোদনা দিচ্ছে ফলে রেমিটেন্স আরও বাড়ছে। যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে। রেমিটেন্স বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে শুধু রেমিটেন্সের উপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধান নয় দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য। ডলার সংকটের সময় প্রবাসীদের রক্ত-ঘামের উপার্জনই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করছে। তাই প্রবাসীর আয়ের নিরাপদ ও বৈধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। যদি আমরা প্রবাসী আয় সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি এবং রেমিটেন্সকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারি, তবে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালীই হবে না বরং উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর পথ সুগম হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী ইডেন মহিলা কলেজ।