॥ মুঃ শফিকুল ইসলাম ॥

দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে আজ যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যার নাম নয়; এটি আমাদের বাজার ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে সরকার বলছে-দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, মজুদ পর্যাপ্ত। অন্যদিকে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইন, জনদুর্ভোগ, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই বৈপরীত্যের উৎস কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-এটি নিছক কোনো স্বাভাবিক সংকট নয়; বরং একটি পরিকল্পিত কৃত্রিম সংকট, যার নেপথ্যে রয়েছে অসাধু মজুদদার ও সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী চক্র।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ : বাস্তবতা নাকি অজুহাত? : মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন নয়, এবং বিশ্ববাজারে এর প্রভাবও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই প্রভাবকে অজুহাত বানিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা একটি পুরনো কৌশল। বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ভাঙন না ঘটলেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এখানে একটি “কারণ” কম, “অজুহাত” বেশি।

মজুদদারির পুরনো খেলা, নতুন রূপ : ইতিহাস বলে-যখনই কোনো পণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখনই এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেয়। তেলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

প্রশাসনের অভিযানে বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার লিটার তেল মজুদের ঘটনা প্রমাণ করে-সংকটটি প্রাকৃতিক নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি। “তেল নাই” লেখা পাম্পে গোপনে তেল মজুদ থাকা কেবল অনিয়ম নয়; এটি জনগণের সাথে প্রতারণা।

দুর্বল তদারকি : সমস্যার মূল শিকড় : সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ তদারকির দুর্বলতা। নীতিনির্ধারণে দৃঢ়তা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ।

যেখানে-সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতার অভাব, ডিলার পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া-এই বাস্তবতা বিদ্যমান, সেখানে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

ভোক্তার ভোগান্তি : কার দায়? : যখন একজন সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করে, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থার একটি ব্যর্থতার প্রতীক। সরকার যদি বলে-সংকট নেই, তাহলে মানুষের এই ভোগান্তির দায় কার ওপর বর্তাবে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রশাসনের অভিযান : সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান নয় : অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, এই চক্রটি কেবল জরিমানায় থেমে থাকে না; সুযোগ পেলেই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতএব, প্রয়োজন-কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, লাইসেন্স বাতিল, নিয়মিত নজরদারি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

সমাধানের পথ : শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ : এই সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন-

১. প্রতিটি পাম্পে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা

২. মজুদ ও সরবরাহের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা

৩. অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ

৪. স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

উপসংহার : কঠোর অবস্থান ছাড়া মুক্তি নেই। তেলের এই কৃত্রিম সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে-রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে বাজার অমানবিক হয়ে ওঠে। আর সেই অমানবিকতার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

এখন সময় এসেছে-কেবল বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করার যে রাষ্ট্র অসাধু চক্রের কাছে জিম্মি নয়।

নইলে “তেল নিয়ে তেলেসমাতি” কেবল একটি শিরোনাম নয়; এটি হয়ে উঠবে আমাদের ব্যর্থতার দলিল।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।