মো. হাবিবুল্লাহ বাহার

রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল তাত্ত্বিক আলোচনায় ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ছায়াসরকার নিয়ে যখনই বিতর্ক ওঠে, তখন একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অবধারিত প্রশ্ন সামনে আসে এই অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্র কি কেবলই ক্ষতিকর, নাকি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও ধারাবাহিকতার জন্য এর কোনো মঙ্গলজনক বা অপরিহার্য দিকও রয়েছে? সাধারণ দৃষ্টিতে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে ডিপ স্টেটকে সবসময় জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রধান শত্রু হিসেবেই দেখা হয়। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তববাদী (Realist) চিন্তাধারার কিছু তাত্ত্বিক মনে করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির নৈরাজ্যজনক ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, দৃশ্যমান রাজনৈতিক পালাবদলের বাইরেও একটি স্থায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক ও অদৃশ্য কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই তথাকথিত ‘স্থায়ী কাঠামো’ কখন রাষ্ট্রের রক্ষক হিসেবে কাজ করে এবং কখন তা সীমানা ছাড়িয়ে ভক্ষকে পরিণত হয়ে খোদ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব গিলে খায়, তা নির্ধারণ করা আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট।

ডিপ স্টেটের পক্ষে সবচেয়ে বড় যে তাত্ত্বিক যুক্তিটি দাঁড় করানো হয়, তা হলো ‘স্থিতিশীলতা’ বা স্ট্যাবিলিটি এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি’। কোনো দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে, নির্বাচিত সরকারগুলো যখন জনতুষ্টিবাদী (Populist), অদূরদর্শী বা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন আমলাতন্ত্রের শীর্ষ স্তর, সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর অভিজ্ঞ অংশকে নিয়ে গঠিত এই অদৃশ্য শক্তি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত পতন ঠেকাতে একটি ‘শক অ্যাবজরভার’ বা ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। রাজনৈতিক দল বা নেতারা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের (যেমন পাঁচ বা দশ বছর) নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চিন্তা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাদের অনেক সিদ্ধান্তই থাকে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভে নেওয়া। কিন্তু একটি স্থায়ী এস্টাবলিশমেন্ট বা ডিপ স্টেটের কাছে রাষ্ট্রের কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল জমা থাকে। এই তাত্ত্বিকরা যুক্তি দেন যে, চরম অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপরিপক্বতার সময় এই ছায়াসরকারই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিগুলোকে ধসে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করে। তারা নিশ্চিত করে যে, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মূল Strategic Direction হঠাৎ করে এমন কোনো খাতে বইবে না, যা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

তবে স্থিতিশীলতার এই মোহনীয় ও আপাত-যৌক্তিক যুক্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ আর তা হলো ‘জবাবদিহিহীনতা’ এবং ‘ক্ষমতার বলয় কুক্ষিগতকরণ’। একটি গণতান্ত্রিক বা স্বাধীন রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধ অধিকার কেবল জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নেতৃত্বের হাতেই থাকা উচিত, কারণ দিন শেষে তাদেরই জনগণের কাছে ফিরে যেতে হয় এবং জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু ডিপ স্টেটের কোনো দৃশ্যমান মুখমণ্ডল নেই, তাদের কোনো নির্বাচনী ইশতেহার নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাদের কোনো আইনি বা নৈতিক জবাবদিহিতা নেই। যখন এই অদৃশ্য শক্তি নিজেদের সুবিধামতো, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বা ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে শুরু করে, তখন তারা কার্যত একটি অভিজাত ও স্বৈরাচারী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

ক্ষমতার এই নিরঙ্কুশ ও অদৃশ্য অপব্যবহারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ এবং ‘সম্মতি উৎপাদন’। ডিপ স্টেট অত্যন্ত সুকৌশলে রাষ্ট্রের একাংশের বুদ্ধিজীবী, তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং মূলধারার মিডিয়াকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। তারা পর্দার আড়াল থেকে স্থির করে দেয় রাষ্ট্রের জনগণ কী জানবে, মিডিয়া কী ন্যারেটিভ প্রচার করবে এবং নির্বাচিত সরকার ঠিক কোন পথে হাঁটতে বাধ্য হবে। এর ফলে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র যখন তার নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক, গোয়েন্দা বা করপোরেট ইশারায় বেশি চালিত হয়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটে এবং এক ধরনের কাঠামোগত স্থবিরতা নেমে আসে।

ডিপ স্টেটের এই ক্ষতিকর রূপটি সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক মাত্রায় পৌঁছায় তখন, যখন এই চক্রটি নিজেদের দেশের স্বার্থ ভুলে গিয়ে কোনো শক্তিশালী বিদেশি পরাশক্তি বা আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ‘প্রক্সি’ বা সেবাদাস হিসেবে কাজ শুরু করে। উন্নয়নশীল এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়, বিদেশি এস্টাবলিশমেন্ট সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের বদলে অত্যন্ত সুকৌশলে রাষ্ট্রের ভেতরেই একটি শক্তিশালী দালাল চক্র বা ছায়াসরকার গড়ে তোলে। তখন এই দেশীয় ডিপ স্টেট রাষ্ট্রের মঙ্গলের বদলে বিদেশি প্রভুদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে রাষ্ট্রের সামরিক আধুনিকায়নকে বাধাগ্রস্ত করে, সাবমেরিন বা মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (MRCA)-এর মতো কৌশলগত সমরাস্ত্র ক্রয়ের ফাইল বছরের পর বছর আটকে রাখে। তারা রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার যেকোনো উদ্যোগকে ভ্রূণেই বিনষ্ট করে দেয়।

এই বিশ্বাসঘাতকতাকে জায়েজ করার জন্য তারা সেই পূর্বনির্ধারিত সুশীল বয়ানের আশ্রয় নেয়। তারা বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়াকে দিয়ে প্রচার করায় যে নিজস্ব সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা রাষ্ট্রের দুর্বল অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝায় যে, “আমরা গরিব দেশ, আমাদের এতো দামি অস্ত্রের কী দরকার!” অথচ তাদের মূল এবং গোপন উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রটিকে সামরিকভাবে চিরকাল দুর্বল ও পরনির্ভরশীল রাখা, যাতে প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র অনায়াসেই তাদের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এ অবস্থায় ডিপ স্টেট আর কোনোভাবেই রাষ্ট্রের রক্ষক থাকে না; বরং তারা জাতীয় নিরাপত্তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় এবং রাষ্ট্রকে একটি পরাধীন ‘স্যাটেলাইট স্টেটে’ বা করদ রাজ্যে পরিণত করে। এমন রাষ্ট্রে নির্বাচন হয়, সরকার বদল হয়, কিন্তু পররাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষা নীতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসে না, কারণ রিমোট কন্ট্রোল থাকে বিদেশি এস্টাবলিশমেন্টের হাতে।

পরিশেষে তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক বিশ্লেষণ থেকে এই সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ডিপ স্টেট বা ছায়াসরকার দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক হতে পারে না। সাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতায় তারা হয়তো রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার একটি সাময়িক বিভ্রম তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অধিকার, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। একটি শক্তিশালী, সুরক্ষিত ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কোনো অদৃশ্য বা ছায়াসরকারের অভিভাবকত্বের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। এর বদলে রাষ্ট্রের যা প্রয়োজন তা হলো শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা বিদেশি আধিপত্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবলই নিখাদ দেশপ্রেমের ভিত্তিতে কাজ করবে। ছায়াসরকারের মায়াবী জালের ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, দেশপ্রেম এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাই কেবল একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গলের পথে এগিয়ে নিতে পারে। লেখক : প্রাবন্ধিক।