নীল জলরাশি, অপার ভৌগোলিক সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য ভূমধ্যসাগর একসময় ছিল বিস্ময় আর আকর্ষণের প্রতীক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেটিই আজ পরিণত হয়েছে এক নীরব মৃত্যুফাঁদে। প্রতিনিয়ত ঢেউয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও তরুণ প্রাণ। উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশের বহু তরুণ ইউরোপমুখী হচ্ছে। তারা অবৈধ ও অনিশ্চিত পথে পাড়ি জমাচ্ছে। উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ ডুবে মারা যাচ্ছে, কেউ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বারবার উঠে আসছে। বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে- কোনো অর্জন বা গৌরবের কারণে নয়; বরং মৃত্যু, নিখোঁজ আর গভীর মানবিক বিপর্যয়ের বেদনাদায়ক পরিসংখ্যান হিসেবে। এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের বারবার সতর্ক করে। তবুও আমরা আমাদের কলিজারটুকরা সন্তানদের এই মৃত্যুযাত্রা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। অথচ এটি কোনো রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক অভিযান নয়। এটি অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবনের করুণ ও অকাল পরিসমাপ্তি। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে বাংলাদেশি তরুণদের সলিলসমাধির এই বেদনাদায়ক ধারাবাহিকতা কয়েক দশক ধরে চলছে। কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের অভাবে কোনো সরকারই এ প্রবণতাকে থামাতে পারেনি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাই কেবল বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয় ; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, নীতিগত দুর্বলতা ও ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। গত ২৯ মার্চ ইতালিগামী একটি নৌকা ডুবে ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১০ জন তরুণও ছিলেন। ৪ এপ্রিল ২০২৬ আরেকটি নৌকাডুবিতে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও দুজনের লাশ পাওয়া যায় এবং অন্তত ৭০ জন এখনো নিখোঁজ। চলতি বছরেই ভূমধ্যসাগরের মধ্যাঞ্চলে নিখোঁজ হয়েছেন কমপক্ষে ৭২৫ জন। ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি দুর্ঘটনায় দুই শিশুসহ অন্তত ৫৩ জন প্রাণ হারান। আমি যখন লিখছি, তখনও সংবাদের শিরোনাম-ভূমধ্যসাগর। এই লেখা প্রকাশের সময়ও হয়তো একই খবর আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো-পাচারকারীদের নির্দেশে অনেক সময় মৃতদেহ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়। অমানবিকতা যেন এখান নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকে। প্রিয়জন ফিরবে- এই আশায় তারা দিন গোনে। কেউ নিখোঁজ, কেউ হয়তো মৃত। কিন্তু মৃতদেহ না পাওয়ার যন্ত্রণা তাদের শেষ বিদায়টুকুও কেড়ে নেয়। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যারা হারায়, তারাই শুধু বোঝে- এই শূন্যতা কতটা গভীর, কতটা অসহনীয়।
মানুষ বাঁচতে চায়- তাই স্বপ্ন দেখে! এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব স্বপ্ন আলো আনে না। কিছু স্বপ্ন জীবনটাই কেড়ে নেয়। ভূমধ্যসাগর থেকে ফিরে আসা মানুষগুলো এই সত্য ভালো করেই জানে। তবুও আমাদের সমাজে বিদেশযাত্রা মানেই স্বপ্নপূরণ। এক অন্ধ বিশ্বাস, এক অযাচিত উচ্ছ্বাস; যেখানে বাস্তবতা আর বিভীষিকার ফারাকটা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে। বিদেশে যাওয়া অপরাধ নয় ; বৈধ পথে গেলে সেটি সম্মানের, সম্ভাবনার। কিন্তু অবৈধ পথ মানেই ঝুঁকি, ভয় এবং অনিবার্য বিপদ। সব জেনেও আমরা থামি না। সফলতার মোহে সন্তানদের ঠেলে দিই অন্ধকারে- যেন সফলতাই সব, বেঁচে থাকা নয়। এই ভ্রান্ত বিশ্বাসই হয়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ফাঁদ। আর সেই ফাঁদ পেতে বসে আছে মানবপাচারকারীরা। তারা স্বপ্ন দেখায়। অথচ সেই স্বপ্নের ভেতরই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু। গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে জমি-জমা বিক্রি করে ১০-১২ লাখ টাকা তুলে দেয় দালালের হাতে। একবারও ভাবে না- এই টাকা কি নিরাপদ ভবিষ্যৎ দেবে, নাকি এটাই হবে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের শুরু। অথচ সরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবুও অনেকেই নিরাপদ পথ এড়িয়ে অনিশ্চিত অন্ধকারে পা বাড়ায়। এর পরিণতি ভয়াবহ-কখনো সাগরে মৃত্যু, কখনো অপহরণ, কখনো ডিটেনশন ক্যাম্পে অমানবিক জীবন।
আমাদের সমাজে অন্যের সাফল্য দেখে অস্থির হয়ে ওঠার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কে কত দ্রুত ধনী হলো, কার জীবন কত বিলাসী- এই তুলনাতেই সফলতার মানদণ্ড নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জনই হয়ে উঠছে সাফল্যের প্রতীক। এই মানসিকতার ছাপ এখন সমাজজুড়েই স্পষ্ট। বিদেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়তে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা। প্রবাসী পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা, শিক্ষা কিংবা চরিত্রের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে। ফলে পরিবারগুলো মরিয়া হয়ে সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে চায়। কিন্তু পথটি বৈধ কি না, তা বিবেচনাও করে না। এই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটও। সীমিত কর্মসংস্থান, আয়ের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্য তরুণদের বিদেশমুখী করছে। শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেকেই স্থিতিশীল চাকরি পাচ্ছে না। ফলে তাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প পথ খোঁজার তাগিদ। এই দায় কেবল শিক্ষার্থীর নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থা, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সমন্বিত ব্যর্থতা। অন্যদিকে বিদেশে গিয়েও অনেকেই প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারছেন না। দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানের ঘাটতির কারণে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে কঠিন বাস্তবতায়, আর সেই বেদনা তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও কর্মসংস্থানের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। বেসরকারি খাতেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞতার অজুহাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। অথচ দেশীয় তরুণদের দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ সীমিত। এই বৈপরীত্য দূর করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) এর তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারানোদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশি। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই সাগরে প্রাণ হারিয়েছে বা নিখোঁজ হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যার ভেতরেও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে দৃশ্যমান- যেন এক নীরব বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা। ২০১৯ সালের মে মাসে লিবিয়া থেকে ইতালির পথে নৌকাডুবিতে ৬৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ৪০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। এরপর ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সাল-প্রতিটি বছরই সাক্ষী থেকেছে এমন একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার। ২০২১ সালের জুনে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে বাংলাদেশ, মিসরসহ চারটি দেশের অন্তত ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী সাগরে ডুবে মারা যান। ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়া ৩০ জনের ভাগ্য এখনো অজানা- তারা আর কখনো ফিরবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত। ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৮ বাংলাদেশি প্রাণ হারান। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (টঘঐঈজ) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই শত শত অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ হয়েছেন- ২০১৩ সালে ৬৩৬ জন, ২০১৪ সালে ৭৭০ জন, ২০১৫ সালে ১,৫৫৫ জন, ২০১৬ সালে ১,৪৮৫ জন, ২০১৭ সালে ৭৯৫ জন এবং ২০১৮ সালে ৬৭৭ জন। সব মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২,৫৩৯ জনে। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি হাজারো অপূর্ণ স্বপ্নের সমাধিলিপি, অসংখ্য পরিবারের না-ফেরাদের জন্য অপেক্ষা, আর এক অন্তহীন বেদনার নাম-ভূমধ্যসাগর। প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের কান্না। প্রতিটি সংখ্যা একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। প্রতিটি সংখ্যা এক অনন্ত অপেক্ষার প্রতীক। নিখোঁজদের অধিকাংশের লাশ কখনোই ফিরে আসে না। ফলে পরিবারগুলো বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার এক অন্তহীন যন্ত্রণায় ভোগে। এই দুঃসহ বাস্তবতা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে মানবপাচার দমন করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের পথকে করতে হবে সহজ, নিরাপদ ও স্বচ্ছ। শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। সফলতা মানেই বিদেশে যাওয়াÑ এই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে পারলেই হয়তো একদিন থেমে যাবে এই মৃত্যুমিছিল। লেখক: আইনজীবি ও প্রাবন্ধিক।