মো: আকতার হোসাইন

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুই দেশের মধ্যে এক নিঃশর্ত সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হয়। ভারতের সমর্থনেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে দৃঢ় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। সীমান্তরেখা নির্ধারণ, যৌথ নদীর পানি বণ্টন, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত অপরাধসহ আরও কিছু বিষয় এর মধ্যে অন্যতম। এসব ইস্যু নানা সময় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ফলে, বিশ্বে উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তগুলোর মধ্যে ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত– বাংলাদেশ সীমান্তে যত সংখ্যক মানুষ নিহত হয়, তা বিশ্বের অন্যান্য সীমান্তের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সীমান্তে মানুষের জীবনের মূল্য যেন অনেক সময়ই উপেক্ষিত হয়। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সীমান্তে ফেলানী হত্যাকাণ্ড।

তারপরও কাঁটাতারের বেড়া, ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক লাইট ও সরঞ্জামের মাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশ’ রুখতে এবার সীমান্তবর্তী নদী ও জলাভূমিতে কুমির ও সাপ ছাড়ার ভাবনা এসেছে ভারত সরকারের মাথায়। বিষয়টি নিয়ে ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বেশ কিছু জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কুমির ও সাপ ছাড়ার চিন্তা করছেন অমিত শাহ। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ বাদ দিলেও দেখা যায়, বিগত পুরো সময়জুড়ে দুই দেশই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তবে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ঘটে এই সীমান্তে, যেখানে বাংলাদেশীদের পাখি শিকারের মতো করে গুলী করে হত্যা করা হয়। এমন বাস্তবতায় সীমান্তে সরীসৃপ-অর্থাৎ কুমির ও সাপ-ছাড়া কতটা যৌক্তিক?

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদী ও জলাভূমি অঞ্চলে যেখানে বেড়া দেওয়া যায়নি এবং যেসব এলাকায় অষ্টপ্রহর পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে কুমির ও সাপের মতো সরীসৃপ ছাড়া যায় কি না, তা নিয়ে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, কুমির ও সাপের ভয়ে অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত পারাপার করতে দশবার ভাববে। সাপ ও কুমিরের ভয়ে অনুপ্রবেশ কমবে। বিএসএফ সূত্রের মতে, শুধু অনুপ্রবেশই নয়, এই ব্যবস্থার ফলে ওই সব এলাকা দিয়ে চোরাচালানও বন্ধ হতে পারে। কমতে পারে অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও। তবে বিষয়টি এখনো চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। কোনো ধরনের সরকারি আদেশ এখনো জারি করা হয়নি।

দ্য হিন্দু লিখেছে, ভাবনাটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মস্তিষ্কপ্রসূত। গত ২৬ মার্চ বিএসএফের সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটে একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অমিত শাহর এই ভাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না এবং তা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে।

কথিত বাংলাদেশী ‘অনুপ্রবেশ’ ভারতের শাসক দল বিজেপির কাছে একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রভাব বিস্তারে, বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা ধরে রাখা ও দখলের তাগিদে বিজেপি বারবার অনুপ্রবেশকে একটি বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরেছে। দুই রাজ্যেই এবারের ভোটে অনুপ্রবেশকারী বা ‘ঘুষপেটিয়া’ একটি বড় ইস্যু। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা আসাম নয় মেঘালয়, ত্রিপুরা, বিহার ও ঝাড়খন্ডেও বিজেপি ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের’ প্রসঙ্গটি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। বিহার ও ঝাড়খন্ডের নির্বাচনে তারা বলেছে, ঘুষপেটিয়ারা রাজ্যের অর্থনীতি চৌপাট করে দিচ্ছে এবং জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।

এবার সীমান্তে সরীসৃপ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি দু’দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমত, একজন ভারতীয় নাগরিকের জন্য এটি কতটুকু যৌক্তিক। দ্বিতীয়ত, একজন বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য এটি কতটা যৌক্তিক। আমি একজন সীমান্তঘেঁষা জনপদের মানুষ। যে জনপদে এখনও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

সীমান্তে সরীসৃপ ছেড়ে দিলে, তা কি শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে? যদি তা নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানও করে, তারপরেও কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে প্রায় দেড়শ গজ পর্যন্ত কৃষিজমি রয়েছে, যা ভারতীয় নাগরিকদের মালিকানাধীন। ওইসব নাগরিক নিয়মিত তাদের জমিতে কাজ করেন। যদি সীমান্ত এলাকায় বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কৃষিকাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে; এমনকি জীবননাশের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। জলাশয়ে যদি কুমির থাকে, তাহলে সেটিও ভারতীয় নাগরিকদের জন্য হুমকিস্বরূপ। একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। তাই সীমান্তে সরীসৃপ ছেড়ে দেওয়া মানে নিজ দেশের নাগরিকদেরই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। সুতরাং বিষয়টি ভারতের দিক থেকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অপরদিকে, বাংলাদেশীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকদের কৃষিকাজ করতে হবে ভয়ভীতি নিয়ে, যেখানে জীবননাশের আশঙ্কা রয়েছে। কুমিরসহ বিষধর সাপের ভয়ও বিরাজমান থাকবে। অনেক সময় কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, ফলে সাপের ভয়ে কৃষক বা রাখালদের কাজে চরমভাবে বাধার সৃষ্টি হবে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের দৈনন্দিন কাজে এর প্রভাব চরমভাবে পড়তে পারে।

এবার আসা যাক সীমান্তে চোরাকারবারিদের বিষয়টি নিয়ে। চোরাকারবারিরা সাধারণত ভয়ংকর প্রকৃতির হয়। তারা কুমির বা সাপ দেখে খুব একটা ভয় পাবে বলে মনে হয় না। কারণ, যারা বন্দুকের গুলীকেও ভয় পায় না, তারা কীভাবে সাপ বা কুমিরকে ভয় পাবে? এছাড়াও, সন্ধ্যার পর থেকে ভারতীয় পাশে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা থাকে, যেখানে একটি সুতোও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সুতরাং, এমন পরিস্থিতিতে সাপ বা কুমির কতটা টিকে থাকতে পারবে, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। ওই পরিবেশ কি তাদের জন্য উপযোগী হবে?

ভারতের পাশে যদি আলো নাও থাকে, তবুও টর্চলাইট ব্যবহার করে অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত পার হতে সক্ষম হবে। কারণ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীও সাপের ভয়ের কারণে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করতে পারবে না। আর সেই সুযোগ নিয়েই চোরাকারবারিরা আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে। ফলে, যে উদ্দেশ্যে ভারতীয় সরকার এ ধরনের চিন্তা করছে, তা হিতে বিপরীত হবে। উপরন্তু, বাংলাদেশের এবং ভারতের কিছু সাধারণ মানুষ এ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের কৃষিনির্ভর আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এই চোরাকারবার শুধু বাংলাদেশীদের দ্বারা হয় এমন নয়; ভারতীয় নাগরিকদের সম্পৃক্ততাও এতে থাকে। সুতরাং, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের দেশের নাগরিকরাও হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে।

অতএব বিষয়টি পুনরায় বিবেচনায় নিয়ে আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। একটি জন্তু কখনোই বুঝবে না কে ভারতীয় নাগরিক, কে বাংলাদেশী, আর কে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য। যা উভয় দেশের জন্যই হুমকি বয়ে আনবে; সঙ্গে থাকবে অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত জীবননাশের ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারেরও মনোযোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি, ভারতীয় হাইকমিশনারকে চিঠির মাধ্যমে উদ্বেগ জানানোও জরুরি।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট।