মাহবুবুল হক

বাংগালী বা বাংলাদেশীদের কপালে শান্তি খুব একটা সয় না। এটা বিধিবদ্ধ কোনো বিষয় না। মহান আল্লাহ বাংগালীর জীবনে এটা নির্ধারিত করে রাখেননি। এটা অবশ্যই আমাদের অর্জন। আমরা বহু কষ্ট করে অশান্তি অর্জন করি। অসুখ অর্জন করি। অস্বস্তি অর্জন করি। আমরা যদি আমাদের পরিবারের দিকে দৃষ্টি ফেরাই তাহলে দেখবো, এখন কোনো একটি পরিবারে সুখ নেই, শান্তি নেই এবং স্বস্তিও নেই। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে একটি পরিবারেও সুখ নেই। হয় পূর্বপুরুষদের অপরিণামদর্শী কোনো কার্যকারণের জন্য, যেটা পূর্ব থেকে বাহিত হয়ে এসেছে। ইংরেজরা বলে ‘লেগাসি অব দ্যা পাস্ট’। একটা অপকর্ম বা দুষ্কর্ম পূর্বপুরুষের কেউ হয়তো ভুল করে হোক, ইচ্ছা করে হোক, করে গেছে। তার ফলাফল তৎক্ষণাৎ শেষ হয়ে যায় না, চলতে থাকে। এটাকে আমরা বলি পরম্পরা। একটা ছোটখাট উদাহরণ দেই-

আমাদের দাদাজানের ‘সোরিওসিস’ ছিলো। পূর্বে এটাকে সোরিওসিস’ বলে সাধারণ ডাক্তাররা, জানতো না। ধীরে ধীরে শনাক্ত হলো যে, এটা একটা দুরারোগ্য চর্মরোগ। এরপরে বিভিন্ন নামে এটা চলে আসছিলো। কেউ বলেছেন একজিমা, কেউ বলেছেন দাদ, কেউ বলেছেন এটা একটা বার্ধক্যজনিত অসুখ। ৫০ বছর বয়সকাল থেকে তাঁর সোরিওসিস শুরু হয় এবং যতই তাঁর বয়স বাড়তে থাকে ততই এই চর্মরোগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি নিজেও পাবলিক হেলথের অফিসার ছিলেন।

চর্মরোগের বড় বড় ডাক্তারের সংগে এ বিষয়ে তিনি অনেক আলোচনা করেছেন। জানার চেষ্টা করেছেন। ’৯০ দশকের একেবারে শেষে, প্রায় মৃত্যুর আগে তিনি জেনেছিলেন , আমাদের পূর্বপুরুষের কাউকে পাগলা কুকুর কামড় দিয়েছিলো। গণ্ডগ্রামে এর তেমন কোনো চিকিৎসা ছিলো না। ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-তুমার ইত্যাদি দ্বারা হয়তো চিকিৎসা নিয়েছিলেন কিন্তু তেমন কোনো ফল হয়নি অর্থাৎ পাগলা কুকুরের কামড়ে কোনো চিকিৎসা না হওয়ায় এটা বংশীয়-জিনে পরিণত হয় এবং ক্রমে তা বংশ থেকে বংশানুক্রমে চলতে থাকে। এছাড়া আরও একটি সূত্র তিনি পেয়েছিলেন সেটা হলো ‘সোরা’ জাতীয় এক ধরনের নেশা। যা আফিম, তামাক, সীসা ও নিকোটিন জাতীয় কোনো নেশা। যা রক্তের সংগে মিশে গিয়ে ‘সোরিওসিস’ জিন তৈরী করে এবং বংশানুক্রমে তা বিস্তৃত হতে থাকে।

এ রোগের সংগে আমাদের ‘লাইফ স্টাইল’ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। যারা নেশা জাতীয় পানিয় বা সিগারেট জাতীয় নেশায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েন, দেখা যায় তাদের এ রোগ বেড়ে যায়। যারা ‘রেড সেল’ জাতীয় খাদ্যদ্রব্য, চিড়িং মাছ, শুটুকী, মাটির নিচের খাদ্যদ্রব্য বর্জন করতে পারে, তারা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারে। কিন্তু এ রোগ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ পুরোপুরিভাবে উপশম হতে পারেনি। আব্বাজানের মৃত্যুর পর আমাদের ৮ ভাই চার বোনের মধ্যে যাদের বয়স ৫০ ঊর্ধ্ব হয়েছে তারাই অবশ্যম্ভাবীরূপে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমান সময়ে দেখা গেছে এ রোগের সাথে যুক্ত হয়েছে আর্থারাইটিসও, যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘সোরিওসিস আর্থারাইটিস’।

পারিবারিক অভিজ্ঞতা থেকে একটা খসড়া বিবেচনা এখানে রাখার চেষ্টা করেছি। মূল কথাটা হলো, পূর্ব পুরুষদের মধ্যে এইসব রোগের উৎসকালে বা প্রারম্ভে অবহেলা করে যারা অদৃষ্টের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের উত্তর পুরুষ পরম্পরাগতভাবে কষ্টে ভুগে আসছেন। অসুখে ভুগছেন। অশান্তিতে ভুগছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা একটা সাধারণ দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ। আজ আমাদের যে সুখ, শান্তি বা স্বস্তি নেই এজন্য ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে আমরা একা দায়ী নই। আমাদের পূর্ব-পুরুষরাও কোনো না কোনোভাবে দায়ী। তাদের সবাই যদি ভবিষ্যতের কথা ভাবতেন, উত্তরাধিকারদের ভালোমন্দ বিষয়ে সচেতন থাকতেন বা দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকতেন, তাহলে হয়তোবা এ কষ্ট, দুঃখ, অশান্তি বা অস্বস্তির মধ্যে আমাদের জীবন অতিবাহিত করতে হতো না।

সুখের জন্য, শান্তির জন্য, স্বস্তির জন্য এবং গোটা জাতির আগামী ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে সমুজ্জ্বল করার জন্য বহু সংগ্রামের পর পাকিস্তানের সৃষ্টি। প্রায় ২০০ বছরের মুসলিম জাতির সংগ্রামের ফসল ছিলো পাকিস্তান। সে পাকিস্তান মুসলিম জাতির একটি অংশকে সুখ, শান্তি, স্বস্তি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা প্রদান করতে পারেনি। আমরা অস্থির হয়ে উঠলাম। ধৈর্য্যের বাঁধ আমরা ধরে রাখতে পারলাম না। সরাসরি পূর্বপুরুষদের দায়ী করে আমরা নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় বিভোর হয়ে উঠলাম। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের স্বপ্ন এতো উঁচুতে চলে গেল যে, আমরা সকলে মিলে স্বপ্নে ভাসতে লাগলাম। সম্ভাবনার পর সম্ভাবনা আমাদের দৃষ্টিকে এতোটাই প্রসারিত করলো যে, আমাদের চারদিকে আমাদের যারা প্রতিবেশী রয়েছেন, তাদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি এসব নিয়ে ভাববার কোনো অবকাশই আমরা পেলাম না। আজকের যুগে যে কোনো শ্রেণীর একজন মানুষ বা পরিবার, যেকোনো জায়গায় বসবাস করতে গেলে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম কত কিছু ভাবে। এ বিষয়ে লিখতে গেলে নিবন্ধটি অনেক লম্বা হয়ে যাবে, সে কারণে সেদিকে আমরা পা বাড়ালাম না। কিন্তু দুঃখের এবং কষ্টের বিষয় হলো আজকের যুগের মানুষ যদি কোথাও বসবাস করার জন্য ১০০টি বিষয় ভাবে, ৪০ দশকের শেষে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তার ১০ ভাগের ১ ভাগও ভাবেনি। শুধুই ভেবেছেন, মুসলিম ভাইরা একত্রিত হয়ে একটা দেশ গড়তে পারলেই আমাদের জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। এটাকে কপালের দোষ বা অদৃষ্টের লেখা ইত্যাদি বলে বিষয়টিকে ছোট বা খাটো করা যাবে না।

ষাটের দশক থেকে আমাদের স্বপ্নের একটা কিনারা যেন খুঁজে । ১৯৬৫তে পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধ শুরু হয়। ভারত পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে আঘাত বা আক্রমণ করে কিন্তু ঘূণাক্ষরেও পাকিস্তানের পূর্বাংশ তথা পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে আঘাত করেনি। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বপ্ন আরও উত্তুঙ্গ হয়। আমরা ভাবলাম পাকিস্তান আমাদের বন্ধু নয় ভারত আমাদের প্রকৃত বন্ধু। কারণ তারা আমাদেরকে আঘাত করেনি। যদি আঘাত করতো তাহলে যে অস্র, গোলাবারুদ, সৈন্য সামন্ত আমাদের ছিলো তাতে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যেতাম। আমরাতো অরক্ষিত ছিলাম। পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলতো আমাদেরকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারতো না।

একথা পানির মতো পরিষ্কার যে, ভারতের সাহায্যের ওপর ভরসা করেই আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিলাম। আমাদের এ ভুখণ্ডটি বা ব-দ্বীপটি ভারতের খুব প্রয়োজন ছিলো। সে কারণে তারা শর্তসাপেক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করেছে। কিন্তু এ সাহায্য বা সহযোগিতা পরিণামে দেশ ও জাতিকে কোন্ ‘ব্ল্যাক হোলে’ ফেলবে সেটা আমরা কস্মিনকালেও ভাবিনি বা ভাবার কথা আমাদের মনেও আসেনি।

এ কাহিনী অনেক দীর্ঘ। শুধু সংক্ষেপে এটুকুই বলা যায় যে ‘ব্ল্যাক হোলে’ আমরা ঢুকেছিলাম তা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। ভারত এক এক করে আমাদের সবকিছু হাতিয়ে নিয়েছে। আমাদের সীমান্তকে বলতে গেলে তারা তাদের দখলে রেখেছে। তাদের সুবিধামতো আমাদের সীমান্তকে তারা ব্যবহার করেছে। ধীরে ধীরে তারা আমাদের রাস্তাঘাট দখল করেছে। আমাদের রাস্তা-ঘাটের ওপর দিয়ে তাদের মালামাল অস্রসস্র ত্রিপুরা, আসাম, মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম ও সেভেন সিস্টার , সেসব প্রতিটি স্থানে সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছে। তাদের সুবিধার জন্য আমাদের রাস্তা-ঘাটকে সংস্কার করতে হয়েছে। বিশাল বিশাল ব্রীজ তৈরী করতে হয়েছে। যতটা হয়তো আমাদের এই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিলো না। এতে এসব ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় বাজেটে নিজস্ব প্রাইওরিটিকে কখনও কখনও উপেক্ষিত হয়েছে। আমাদের নদী-বন্দর ও সমুদ্র-বন্দর এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন এটা উভয় দেশের সম্পত্তি। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো যে, আমাদের আমদানির একটা বড় অংশ তাদের কাছ থেকেই পূরণ করতে আমরা সবসময় বাধ্য থাকতাম। অন্যদিকে বর্ষাকালে যখন আমাদের পানির তেমন প্রয়োজন থাকতো না এবং তারা যখন বন্যার অবস্থায় পৌঁছে যেত তখন তাদের সেই উজানের পানি প্রায় ৫৪টি নদীর মাধ্যমে ভাটির এ দেশে প্রবাহিত হতো। এ অবস্থায় আমরা ফি-বছর বন্যায় হাবুডুবু খেয়ে আসছি। খরা মৌসুমে কৃষিকাজ করার জন্য যত পানির দরকার সে পানি তারা পুরাতন ফারাক্কা বাঁধসহ ৫৪টি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের বঞ্চিত করে এসেছে।

জনগণ যখনই দেশ ও দশের স্বার্থে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতো, তখনই আমাদের সরকারই বলে এসেছে ভারত আমাদের বন্ধু দেশ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। তাদের কিছু আবদার তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কারণে আমাদের মেনে নিতেই হবে। এভাবে বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে জাতির নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু বিষয়ে ভারতের ওপর আমরা ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষকরে গত ১৮ বছরে এ নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়গুলি চূড়ান্তরূপ ধারণ করে। জনগণের বিবেচনায় বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিলো ভারতেরই একটা করদ রাজ্য। দেশবাসীর দাবি ছিলো আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে সমতার ভিত্তিতে আমরাও যেন এগিয়ে যেতে পারি। ধীরে ধীরে জনগণ দেখতে লাগলো আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের কর্তৃত্ব বাড়ছে। শুধু অর্থনীতি ক্ষেত্রে না; ধাপে ধাপে বাড়ছে জীবন ও জগতের সকল ক্ষেত্রে। অর্থাৎ আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্র নীতি, কৃষি, চিকিৎসা, বস্র, শিক্ষা, বিনোদনসহ সব ক্ষেত্রেই ভারতের আধিপত্য এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো যে, তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাগ বা অভিমান করে একবার উচ্চস্বরে বলেছিলেন : সবকথা ঠিক ।

আমরা ভারতকে সব দিয়েছি। তারা যা চায়নি তাও। আর আমাদের দেয়ার কিছু নেই। আরও বলেছেন, আমরা যা দিয়েছি বহুকাল তারা এর লাভালাভ ভোগ করতে থাকবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এ রহস্যময় কথায় ভারত যেমন বিরক্ত হয়েছিলো দেশবাসীও প্রচণ্ডভাবে এর প্রতিবাদ করেছিলো। দেশবাসী বুঝে ফেলেছিলো, যদি হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখা হয় অর্থাৎ হাসিনার দাবি অনুযায়ী ২০৪১সাল পর্যন্ত আওয়ামী সরকারকে যদি টিকিয়ে রাখা হয়, তাহলে প্রকাশ্যেই আমরা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। সিকিমের অবস্থা যা হয়েছিলো বাংলাদেশের আবস্থাও তা হবে। জনগণ প্রত্যক্ষভাবেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকলো যে, সরকার শুধু নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য বার বার জাল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনগণের লাগাতার প্রতিবাদের সাথে বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশ কিছু বিরোধীদলও প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট ছিলো। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চলছিলো। সাথে সাথে ভারত ও আমাদের তাবেদার সরকারের শয়তানী ও লুটপাটও চলছিলো। এ অবস্থার ভিতর দিয়েই আওয়ামী সরকার ফ্যাসিবাদী সরকারে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলো।

জনগণের সাথে সাথে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাক্ষুষ দেখতে পেল, আওয়ামী সরকারের নির্যাতনে বিরোধীদলগুলো এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হচ্ছে। তখনই দেশ রক্ষার জন্য, জাতিকে রক্ষার জন্য, শিক্ষার্থীরা পৃথকভাবে নিজেরাই প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মূলধাপে পৌঁছে গিয়েছিলো ‘২৪ সালের জানুয়ারিতে। যখন আওয়ামী সরকার সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে দিনের ভোট গোপনে রাতে সম্পন্ন করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হাতিয়ে নেয়।

এটা স্পষ্ট যে, বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী জনতার আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এ আন্দোলনে কোনো দলীয় ভিত্তি ছিলো না। বাম, ডান, মধ্যপন্থী, ইসলামিস্ট, সেকুলারিস্ট, হিন্দু, মুসলিম, ছাত্র-ছাত্রী, পুরুষ-মহিলা, যুবক-যুবতী সবার, সকল মহলের নির্মোহ অংশীদারিত্ব ছিলো। শিক্ষার্থী ও জনগণ বলতে কোনো বিভেদ ছিলো না। জুন-জুলাইয়ে এসে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া দেশের সকল রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। আন্দোলন অভ্যুত্থানে রূপ পরিগ্রহ করে। অভ্যুত্থান, এক লাফে সামগ্রিকভাবে প্লাবিত হয়। ৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্ট, ২০২৪ সালে। ভারতের বন্ধু বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট সরকার পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়ে যায়। এ জায়গায় এসে গোটা জাতি আবার ডিপ স্টেটও ভারতের পরামর্শে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিবর্তে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। যা প্রচলিত সংবিধানের আশ্রয়ে সৃষ্টি লাভ করে। এখান থেকেই শুরু হয় জাতিগতভাবে নতুন আরেকটি বড় ধরনের সংকট। যার রেশ বর্তমানে এবং আগামীতেও অবিরাম চলতে থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ভারতবিহীন একটা স্বাধীন-সার্বভৌম-আত্মপরিচয়সমৃদ্ধ জাতি গঠনের উদ্যোগ নেয়। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্য সকল রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী অন্তর্বর্তী সরকারের সকল উদ্যোগ পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে। পরবর্তীতে বিএনপি বাধ্য হয়ে সরকারের অধিকাংশ উদ্যোগ গ্রহণ করে নেয়। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নানা পরিবর্তন ও সংস্কারসহ জাতীয় নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। বিএনপি নানা ছল-চাতুরি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে সরকার গঠন করে।

সরকার গঠন করে বিএনপি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সকল কল্যাণময় উদ্যোগকে অস্বীকার করে বসেছে। তারা গণভোটকে অস্বীকার করছে। বিপ্লবকে অস্বীকার করছে। যে বিপ্লবের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় বসেছে, সেই বিপ্লবকেই তারা অস্বীকার করে বসেছে। অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তি সরকারের সকল উদ্যোগ ও আয়োজনকে তারা নস্যাৎ করার সর্বাত্মক চেষ্টায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর নানা নৈতিক ও আইনগত বিষয়আসয় রয়েছে, যা বিএনপি ন্যক্কারজনকভাবে উপেক্ষা করছে। সবচেয়ে বড় কথা তারা জনগণকে অবজ্ঞা করছে। দেশ ও জাতিকে ভয়ানক ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন করার অপচেষ্টায় নিমগ্ন রয়েছে। অর্থাৎ ২৪ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে পরাধীনতার জগদ্দল পাথর থেকে দেশ ও জাতি বেরিয়ে এল, যে জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে এলো, সে জাহান্নামে আবার ফিরে যাবারসমূহ পাঁয়তারা করছে বিএনপি। ডিপ স্টেট, ভারত, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি পুনরায় এক হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বিরোধী দল ও দেশবাসী এক হয়ে এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে দিয়েছে। সমাবেশ মিছিল সবকিছু আরম্ভ হয়ে গেছে। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে তুমুল আন্দোলনের সূচনা হয়ে গেছে।

লেখক : প্রবীণ কলামিস্ট।