মুন্সী আবু আহনাফ
বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান, বাম ও সেকুলার ন্যারেটিভের অনেকগুলো সুপারফিশিয়াল টাইটেল আছে। এরমধ্যে কমন হলো স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিস্তানপন্থী, রাজাকার, আলবদর, আল শামস, ধর্মীয় মৌলবাদগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠী। গত ৫৫ বছরে জাতিকে বিভক্ত করে এগুলোর এতবেশি চর্চা হয়েছে বুঝে না বুঝে, যে কিছু মানুষ এই ট্যাগলাইন ব্যবহার করে অবচেতনে, চেতনার আবেগে। যদিও ৫ আগস্ট ২০২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই ট্যাগিং-এর প্রবণতা কিছুটা কমেছে। ’৭১-এ রাজাকার একটা প্যারামিলিটারি ফোর্স ছিলো, এখন নাই। এখন যদি এই ট্যাগলাইনে আরেকটা শব্দ যোগ করা হয়-পাকিস্তান আর্মি। তাহলে পুরো ট্যাগলাইন কৌতুককর হয়ে যাবে। ব্যাপারটা এমনই। রাজাকার, আল বদর, আল শামস সম্পর্কে যারা নিরেট মূর্খ তারাই হরেদরে এটা ব্যবহার করছে। ৩৬শে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সেই ট্যাবু ভেঙে ফেলেছে। তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার বলে। আর এই “রাজাকার” স্লোগান দিয়েই ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট, গণহত্যাকারী ও এশিয়ার দানব খ্যাত হাসিনার পতন ঘটায় ছাত্র-জনতা। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসর বামরা স্বাধীনতার পক্ষের-বিপক্ষের শক্তি বলে ন্যারেটিভ তৈরি করে যে বিভক্ত রাজনীতি গত ৫৪ বছর করেছিল, তা আবার শুরু করতে চায় বিএনপি। এটা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় আরও পরিষ্কার হলো। গত ২৭ মার্চ শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিএনপির আলোচনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অপশক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার শক্তিকেই এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে আবার সেই অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যারা সেইদিন আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে, পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে, হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আমাদেরকে ভালো করে সতর্কতার সঙ্গে সেই অপশক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীনতার শক্তিকেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেখানেই আমাদের সাফল্য। এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এক. ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ১০ হাজার রাজাকারের যে তালিকা করেছিলো তারমধ্যে ৮ হাজারের বেশি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত! পরে তড়িঘড়ি করে সে তালিকা বাতিল করে দিয়ে আর কোনো তালিকার পথেই হাঁটে নাই। ‘রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী’ বইয়ের ৬৯ পৃষ্ঠায় লেখক একেএম নাজির আহমদ বলেন, সেই সময় (১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রুকন) ছিলেন সাড়ে চারশত জন। কর্মী সংখ্যা ছিলো ছয় হাজার থেকে সাত হাজারের মধ্যে। এই জনশক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন বৃদ্ধলোক ও নারী। ভাবুন একবার। ইতিহাসের কোনো দলিলপত্রেই প্রমাণ করতে পারেনি যে জামায়াত ও তার নেতাকর্মীরা রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিল, এমনকি কথিত প্রশ্নবিদ্ধ আইসিটি ট্রাইব্যুনালও পারেনি। এখন মির্জা ফখরুল সাহেবরা আবার কি উদ্দেশ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পুরোনো বয়ান দাঁড়করানোর অপচেষ্টা করছেন সেটা জাতির সামনে পরিষ্কার। ’৭১-এ স্বাধীনতার পর ত্রিশ লাখ শহীদের ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়েছে পলাতক ফ্যাসিস্ট ও জুলাই গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ। কিন্তু দেশে ভাতা পায় মাত্র কয়েক হাজার। এটা কেমন বিচার। যদি ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েই থাকে তবে বাকী শহীদ পরিবারগুলোকে কোনো সময়ই ভাতা দেওয়া হয়নি কেন? গত ৫৫ বছর ধরে রাজাকার রাজাকার বলে ফেনা তুলে দেখা গেলো, সব রাজাকারের ফেনা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ভিতর। আবার অনেক বিখ্যাত রাজাকার আছে বিএনপির ভিতরেও। মিথ্যাচারের ন্যারেটিভ অর্ধ শতাব্দীতেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এখন আর কোন সম্ভাবনা নেই। ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা’ বইয়ের ৬৫ পৃষ্ঠায় অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৭১-এর সংকট সৃষ্টির জন্য ভূট্রোকে এক নম্বর দোষী এবং ইয়াহিয়া খানকে দ্বিতীয় নম্বর অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করেন এবং পাকিস্তানকে ভাঙার জন্য ভারত সরকার ও ইন্দিরা গান্ধীর ইন্ধনের কথা উল্লেখ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার এক লেখায় বলেন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে যখন শেখ মুজিবের বিচার শুরু হয় তখন “শেখ মুজিব তার গলায় পবিত্র কুরআন ঝুলিয়ে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “কীভাবে আমার পক্ষে আমার প্রিয় দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা ভাবা সম্ভব।”——কিভাবে সম্ভব”? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায় হলেও, এই সময়কাল ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক বিতর্ক ছড়িয়ে রয়েছে। পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনকালে স্বাধীনতার ৪৯তম বছরে এসে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে প্রথম দফায় ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অতীতের সংগ্রহ করা নথি পর্যালোচনা করে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপের এ তালিকায় কথিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ছিল না। এই তালিকার অধিকাংশ নাম ছিল পলাতক ফ্যাসিস্ট বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্যদের এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির অনেক মরহুম নেতার নাম। যেমন: মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন যুদ্ধাপরাধী। ১১ হাজার উল্লেখযোগ্য যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় তার নাম ৭১০ নম্বরে ছিল। স্বাধীনতার পর মুজিব রেজিম কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া এবং জিয়াউর রহমান কর্তৃক রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া একাত্তরের প্রধান পরাজিত রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ নেতারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিতে পুনর্বাসিত হয়েছে।
দুই. “বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত প্রশ্ন” বইয়ের ৩১১ পৃষ্ঠায় (সম্পাদনায় সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ও মুহাম্মদ সাইদুল ইসলাম) উল্লেখ করা হয়, ‘‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে জামায়াত নেতারা রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন-(আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের) প্রসিকিউটর এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। ..... ট্রাইব্যুনালের একটি প্রবল প্রবণতা ছিল এই অনুমান করা যে, যদি কেউ জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে স¦য়ংক্রিয়ভাবে সে রাজাকার বাহিনীর অংশ ছিল; যদিও এটি সেই সময়ে সত্য ছিল না। একই ভুল অনুমান অনেক জামায়াত বিরোধী স্কলারও বজায় রেখেছেন, যারা জামায়াতকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর সাথে সম্পর্কিত গ্রুপগুলোকে সহায়ক রাজাকার বাহিনীর অংশ হিসেবে দেখেন। তবে তারা কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ বা দলিল উপস্থাপন করতে পারেনি, যেখানে প্রদর্শিত হয় যে জামায়াত সরাসরি এই নৃশংসতায় জড়িত ছিল; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটিবি’র মামলাগুলোর রেফারেন্স ছাড়া, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য কর্তৃপক্ষ বা দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।’’(বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত প্রশ্ন, পৃষ্ঠা-৩১১-৩১২)। এবার আসুন জেনে নেই আসলে রাজাকার কারা এবং এ বাহিনী গঠন করেছিল কারা? ১৯৭১ সালের ২ মে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপন (Notification No. 324/71, Ministry of Home Affairs, Govt. of Pakistan, May
1971) অনুযায়ী, রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে। এ বাহিনী ছিলো প্রশাসনিকভাবে মিলিটারি কমান্ডের অধীনে পরিচালিত এবং এতে অংশগ্রহণ ছিলো সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে। প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়, The Razakar Force is a paramilitary auxiliary bodz under the Home Ministry. It shall operate under local military command, and its recruitment is open to all loyal citizens. (Islamabad Gazette, May 1971).
তিন. আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দলের নেতারা এতোই গান গায় মনে হয় আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধ দল অথচ এ দলটিই সব চেয়ে বড় রাজাকারের দল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ তালিকায় সর্ব প্রথমে উঠে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের নামসহ তার ছেলে শেখ কামাল রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। শেখের পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধ করেই নাই বরং পাকিস্তানের মাসিক ভাতা নিত নিয়ম মতো এবং শেখ মজিবুর রহমান কখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি তিনি চেয়ে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে, তাহলে রাজাকার কে?
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, এমন অভিযোগে বিরোধীজোট বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের বিচার করেছে রাজাকারের দল (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের কথিত স্বপক্ষ শক্তি দাবি করে অথচ শেখ মজিবুর রহমানসহ শেখ কামাল রাজাকারের নামের তালিকায়ও নম্বর ওয়ান। অথচ আওয়ামী লীগে থাকা রাজাকারদের ব্যাপারে একেবারে নীরব। কি কারণে এ নীরব? এদলটিতেও রয়েছে, অসংখ্য স্বাধীনতাবিরোধী। আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন সময় বক্তৃতায় বলেছেন, আওয়ামী লীগে রাজাকার থাকলে দেখিয়ে দেন-আমরা তাদের বিচার করব। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে ৪৬ জন যুদ্ধাপরাধী তাদের পরিবার কোন না কোনভাবে ’৭১ সালে পাকিস্তান সরকার ও যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্বাদের হত্যাসহ নানা ধরনের মানবতবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা। আমাদের অনুসন্ধানে নিচে ৪৬জন আওয়ামী লীগের শীর্ষ রাজাকারের তালিকা থেকে ১৮ জনকে তুলে ধরা হলো: ১. ঢাকা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ২. সাবেক পর্যটনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা লে.কর্ণেল (অব) ফারুক খান, ৩. ফরিদপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী এবং শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ৪. ময়মনসিংহ ৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন, ৫. আওয়মী লীগের সেকেন্ড ইন কমান্ড সংসদ উপনেতা ফরিদপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, ৬. আওয়ামী লীগের প্রেসেডিয়াম সদস্য সৈয়দ জাফরউল্লাহ, ৭. গোপালগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুসা বিন শমসের, ৮. মির্জা গোলাম কাশেম: জামালপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারদলীয় সাবেক হুইপ মির্জা গোলাম আযমের বাবা। ৯. রংপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক এইচ এন আশিকুর রহমান, ১০. চাঁদপুর-১ আসনের সাবেক সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ১১. জামালপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মাওলানা নুরুল ইসলাম, ১২. কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান হাওলাদার, ১৩. গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী রাফেজা বেগমের ভাই আজিজুল হক, ১৪. কোটালিপাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র এইচ এম অহেদুল ইসলামের পিতা বাহাদুর হাজরা, ১৫. গোপালগঞ্জের এ পি পি ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদার, ১৬. আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদারের পিতা হাসেম সরদার, ১৭. জামালপুর বকশিগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি অবুল কালাম আজাদের পিতা আবদুল কাইয়ুম মুন্সীসহ প্রায় শতাধিক। ১৮. ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন নিখিল পাকিস্তানের সাবেক খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী কাজী আব্দুল কাদের। একাত্তরে “রাজাকারি”র জন্য মুজিব রেজিম কাজী আব্দুল কাদেরের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলো। কাজী আব্দুল কাদেরের সন্তান কাজী ফারুক কাদের ২০০৮ সালে হাসিনা-এরশাদ জোটের প্রার্থী হিসাবে নিলফামারি-৩ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধপন্থীরা কাজী ফারুক কাদের এবং কাজী আব্দুল কাদের উভয়ের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড হওয়ার অভিযোগ এনেছিল।
চার. স্বাধীনতার পর অনেক বড় বড় মুসলিম লীগ নেতা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদে ছিল এবং মন্ত্রী এমপিও হয়েছে। যেমন: ১. শাহ আজিজুর রহমান (বাংলাদেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী)। ২. আবদুর রহমান বিশ্বাস (বাংলাদেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি)। ৩. মশিউর রহমান যাদু মিয়া। ৪. মোশাররফ হোসেন শাহজাহান। ৫. আহসানুল হক মোল্লা যিনি পচা মোল্লা নামেও পরিচিত। ৬. চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। ৭. চৌধুরী আকমল ইবনে ইউসুফ। ৮. আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা। ৯. আব্দুল মজিদ তালুকদার। ১০. কাজী ফারুক কাদের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। ১১. মির্জা রুহুল আমিন, তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর পিতা। ১২. ড. ওসমান ফারুক। ১৩. আব্দলু আলিম। ১৪. মাহমুদুন্নবী চৌধুরী। ১৫. চট্টগ্রাম-৭ থেকে নির্বাচিত হন মুসলিম লীগ নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে তাঁর সন্তান ও ভাই বিএনপির সংসদ সদস্য। তাঁর পরিবারের অনেক সদস্য আওয়ামী লীগ থেকেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৬. ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুসলিম লীগের ইসমাইল হোসেন তালুকদার। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ-৩ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হোসেন তালুকদারের বাবা। ১৭. পাকিস্তানের সাবেক সংসদ সদস্য আফতাবউদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-১০ থেকে মুসলিম লীগের এমপি হন। আফতাবউদ্দিন চৌধুরীর ইন্তিকালের পর তাঁর ছেলে আমানউল্লাহ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে মুসলিম লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমানউল্লাহ চৌধুরী বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন। ১৮. তৎকালীন ফরিদপুর-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহসিন হল সংসদের সাবেক জিএস এবং মুসলিম লীগ নেতা ইব্রাহিম খলিল নোয়াব বালা। তাঁর ভাই শরিয়তপুর ভেদরগঞ্জের বিএনপি নেতা মাসুম বালা (সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান)। এছাড়াও ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের আগেই অনেক প্রথিতযশা মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগদান করেন। তাঁদের মধ্যে মির্জা রুহুল আমিন (মির্জা ফখরুলের বাবা) অন্যতম।
পাঁচ. প্রসঙ্গ যখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাবা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাবা মির্জা রুহুল আমিন ১৯৭১ সালে ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার প্রসিদ্ধ রাজাকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালে দালাল আইনের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর একাত্তরের ঘাতক দালালদের আটক করে বিচার করা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে আটক থাকা মোট ১১ হাজার দালালের একজন ছিলেন মির্জা ফকরুলের বাবা রুহুল আমিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট দালাল আইন বাতিল করে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে আটককৃত অপরাধীদের মুক্ত করে দেন। একাত্তরে মির্জা ফখরুল মেননপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। মেননপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন অনুসারী ছিল মাওলানা ভাসানীর। কোন ছাত্র ইউনিয়নই তখন শেখ মুজিবকে নেতা মানতোনা। আওয়ামী লীগকে মনে করতো বুর্জোয়া সংগঠন। ঠাকুরগাঁও সীমান্তের ওপারে ভারতের ইসলামপুরে মির্জা ফখরুলের নানা বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে মির্জা ফখরুলরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইসলামপুরের নানা বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। মির্জা রুহুল আমিন চখা মিয়া বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। শাহ আজিজুর রহমানসহ সব মুসলিম লীগার রাজাকার, ভাসানী ন্যাপ অনুসারীদের তখন ক্ষমতায় যাবার সহজ গন্তব্য ছিল বিএনপি।
আবার প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর মওদুদ আহমদের মতো বাবা মির্জা রুহুল আমিন চখা মিয়াও এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন। তখন এদের কারোরই খালেদা জিয়ার জন্যে ভালোবাসা কাজ করেনি।