এক
সম্প্রতি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খামেনির শাহাদাতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কিছু কিছু আলেমের প্রতিক্রয়া দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। একজন আলেম ও ওয়ায়েজীন বলেছেন যে, তিনি শিয়াদের মুসলমানই গণ্য করেন না। ইরানের ওপর হামলা করার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিন্দা করতে নারাজ। আরেকজন জোর গলায় বলেছেন, যারা শহীদ হন তারা বেশেহতে যান। তবে ইমাম খামেনিকে যদি আল্লাহ বেহেশত নসীব করেন তা হলে আলেম হিসেবে তিনি বেহেশত পেলেও তা বিক্রি করে তিনি দোজখ কিনে নেবেন। কী অদ্ভুত কথা তাই না। আপনি এদের সম্পর্কে কী মন্তব্য করবেন! অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের খ্যাতনামা আলেমদের বৃহদাংশ এবং ইসলামীদলগুলো শিয়া-সুন্নি সংঘাত উড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করে ইরানের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন যে, ইরানের শিয়ারা মুসলমান, তারা এক কালেমায় বিশ্বাস করে, আখিরাতে বিশ্বাস করে, মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)কে আখেরি নবী হিসেবে স্বীকার করে, নামায পড়ে, রোজা রাখে, হজ¦ করে, জাকাত দেয় এবং ইসলামী অনুশাসনসমূহ মেনে চলে। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ও তার দোসর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে এ জন্য হত্যা করেনি যে, তিনি শিয়া ছিলেন। বরং এ জন্য হত্যা করেছে যে, তিনি মুসলিম বিশ্বের একজন জাদরেল আলেম ও ঈমানদীপ্ত একজন নেতা ছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হবার পূর্বে দেশটি পাহলভী বংশের শাসনাধীন ছিল এবং পাশ্চাত্য শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে দেশটির ইসলামী শক্তিকে নির্যাতন নিষ্পেশনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। সাবাক বাহিনীর গুপ্ত ঘাহতকদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আলেম-ওলামা ও নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের দেশত্যাগ করতে হয়েছিল। রেজা শাহ পাহলভীর অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে ইমাম খোমেনি ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই ইসলামী বিপ্লবের নেতুত্বে দেন।
একটি মুসলিম দেশ হিসেবে ইরানের সাথে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত পুরনো। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের ন্যায় ইরানও বাংলাদেশের শ্রম বাজারের অন্যতম একটি অংশ। বাংলাদেশের বহু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারসহ দক্ষ অদক্ষ শ্রমিক ইরানে কর্মরত আছে। দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের বহু ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া করে। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে গঠিত আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা তথা আরসিডি গঠিত হয়েছিল ইরান, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিয়ে। ১৯৯৭ সালে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খ্যাতনামা ইসলামী আন্দোলনের নেতা ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের উদ্যোগে গঠিত ডিএইচ তথা আটটি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত Developing-8 শীর্ষক জোটের অন্যতম সদস্য ছিল ইরান। বাংলাদেমের ডি-এইচ ইন্টারমিনিস্টারিয়েল স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দীর্ঘ ৫ বছর (১৯৯৭-২০০২) কাজ করার সুযোগে ইরানকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার আমার সুযোগ হয়েছে। বিপ্লবোত্তর ইরান সম্পর্কে পাশ্চাত্য মিডিয়াসমূহ এবং দেশ-বিদেশের ইসলাম বিদ্বেষী মহল নানামুখী মূতা বিয়েসহ নারীদের ওপর নির্যাতন, সেখানে তাদের বন্দী জীবন ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার নানা কল্পকাহিনী প্রচার করতে থাকে। এ অবস্থায় ইরানের ইসলামী সরকার আশি ও নব্বই-এর দশকে বহু দেশী বিদেশি সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আলেম-ওলামা ও সরকারি কর্মকর্তাদের ইরান সফর স্পন্সর করেন। আমারও এই সুযোগ গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল এবং এতে ইরান বিরোধী প্রোপাগাণ্ডার অন্তঃসারশূন্যতা প্রত্যক্ষ করেছি। ইরান একটি ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক দেশ। এ দেশটির একটি সংবিধান আছে। সংবিধানটি ১৪টি সাধারণ মূলনীতির Genaral
Principles) ভিত্তিতে প্রণীত। ব্রহ্মমাণ নিবন্ধে আমি তাদের এই মূলনীতি ও সংবিধানের বিষয় এবং ধারা উপধারাগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। বলাবাহুল্য, ১৯৭৯ সালের ২৯ ও ৩০ মার্চ তারিখ মোতাবেক ইরানী বর্ষ ১৩৫৮ সালেল ৯ ও ১০ ফারওয়দিন এবং হিজরী ১৩৯৯ সালের জমাদিউল আউয়াল মাসের ১ ও ২ তারিখে ইরানের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত সফল বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত গণভোটে ইরানী ভোটারদের ৯৮.৮ শতাংশ ভোটার এই মর্মে রায় প্রদান করেছেন যে, ইরানের সরকার কাঠামো ও প্রকৃতি হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অর্থাৎ দেশটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত হবে।
অনুচ্ছেদ-২ : সরকার কাঠামো হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র নিম্নোক্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে ক. আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়; তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি সকল সার্বভৌমত্বের মালিক, তার সকল আইন ও অনুশাসন দ্বারা দেশ পরিচালিত হবে এবং তার কাছে নতিস্বীকার করতে হবে। খ. অহি (Devine Revolation) এবং তার মৌলিক ভূমিকা হবে সকল আইনের উৎস। গ. আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন এবং আখিরাতে বিশ্বাস ও শেষ বিচারের ওপর আস্থা ও এ আস্থার গঠনমূলক ভূমিকা মানুষের সামগ্রিক কাজকর্মকে আল্লাহর পথেই ধাবিত করবে। ঘ. আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও তার ইনসাফের মানদণ্ডই হবে আইন প্রণয়নের ভিত্তি। ঙ. নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা (ইমামত) এবং অব্যাহত দিকনির্দেশনা ইসলামী বিপ্লবের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য মূল ভূমিকা পালন করবে।
চ. সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধকে সমুন্নত রাখা, মানুষের স্বাধীন সত্ত্বাকে সম্মান প্রদান করা যাতে করে তার সমতা, ন্যায়পরায়ণতা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষা পায়। এ উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা হবে :
- কুরআন সুন্নাহ নির্ধারিত যোগ্যতা ও মানদণ্ডের আলোকে প্রাজ্ঞ ফকিহদের ইজতিহাদের অনুসরণে ইজতিহাদ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মানবিক গবেষণায় প্রাপ্ত সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক ফলাফল সংগ্রহ ও তার ব্যবহার এবং মানুষের কল্যাণে তার প্রসার।
সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-নির্যাতনকে না বলা। বিনা অপরাধে কাউকে শাস্তি দেয়া। আইন বহির্ভূতভাবে নাগরিকদের গ্রেফতার-নির্যাতন অথবা অনুরাগ ও বিরাগের বশবর্তী হয়ে কারুর ওপর জুলুম করা এবং নফসের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরাধে লিপ্ত হওয়া রোধ করা।
অনুচ্ছেদ-৩ : অনুচ্ছেদ ২ এ বর্ণিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ অর্জনের জন্য ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সকল সম্পদ ও যোগ্যতাকে নিম্নোক্ত কাজে লাগানো :
১। ধর্মানুরাগ ও ইসলামের আকিদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে নৈতিক মূল্যবোধ গঠন ও প্রসার এবং সকল প্রকার অন্যায়, দুর্নীতি-ব্যভিচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও সংগ্রাম পরিচালনার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
২. সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমসমূহকে গণসচেতনতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহার।
৩. সকল স্তরে সকলের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং উচ্চ শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার প্রসার ঘটানো।
৪. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং ইসলামী শিক্ষাসহ সকল খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনসমূহকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান।
৫. সাম্রাজ্যবাদ ও বিদেশি প্রভাবের অবলোপন।
৬. আইনি কাঠামোর আওতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান।
৭. রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাগ্য নির্ণয়ের সাথে দেশের আপামর জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
৮. জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রে বিরাজিত সকল প্রকার অবাঞ্চিত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সকলের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চয়তা প্রদান।
৯. অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর বিলোপ সাধন করে যুগোপযোগী একটি সরকারি কাঠামো সৃষ্টি।
১০. দেশের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক সংহতি এবং ইসলামী অনুশাসনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সকলের জন্য সার্বজনীন বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
১১. ইসলামী অনুশাসন ও মূল্যবোধ অনুযায়ী একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সঠিক অর্থনৈতিক পদ্ধতি নির্ণয়ে যাতে সকল প্রকার শোষণ-বঞ্চনা ও দারিদ্র্য দূরীভুত হয় এবং ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকল মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা-কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
১২. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প, সমরাস্ত্র, প্রতিরক্ষা প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন।
১৩. নারী-পুরুষ সকলের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা ও আইন ও বিচার এবং সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন আচরণ।
১৪. ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ এবং জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি।
অনুচ্ছেদ ৪ : ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সকল আইন, ফৌজদারী, দেওয়ানী, অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক তা যাই হোক না কেন, ইসলামী মানদণ্ডই তার ভিত্তি হবে। অভিভাবক পরিষদের ফকিহরা এই মানদণ্ড বিচার করেন।
অনুচ্ছেদ ৫ : ওয়ালি আল আসর যত দিন পর্যন্ত গুপ্ত অবস্থায় থাকবেন ততদিন পর্যন্ত উম্মাহর বেলায়েত ও নেতৃত্বের দায়িত্ব ন্যায়পরায়ন (আদিল) ও ধার্মিক (মুত্তাকি) একজন ফকিহ পালন করবেন যিনি যুগোপযোগী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী হবেন, যার প্রশাসনিক যোগ্যতা সন্দেহাতীত হবে এবং যিনি সংবিধানের ১০৭ ধারা অনুযায়ী দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
অনুচ্ছেদ ৬ : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের যাবতীয় কাজ-কর্ম জনমতের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। প্রেসিডেন্ট, ইসলামী শূরা কাউন্সিলের প্রতিনিধি বা কাউন্সিল সদস্যদের নির্বাচন কিংবা সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় বর্ণিত পদ্ধতির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে প্রাপ্ত ফলাফল উপরোক্ত জনমত বা জনরায় বলে বিবেচিত হবে।
অনুচ্ছেদ ৭ : পবিত্র কুরআনের সূরা আল ইমরানের ১৫৯ নং আয়াতে এবং সূরা আস শূরার ৩৮ নং আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী পরামর্শ সভাসমূহ, যেমন ইসলামিক কনসালটেটিভ এসেম্বলি, প্রভিন্সিয়েল কাউন্সিল, সিটি রিজিওন, ডিস্ট্রিক্ট ও ভিলেজ কাউন্সিলসমূহ গঠিত হবে। এই গঠন প্রক্রিয়ায় সংবিধানে বর্ণিত নিয়ম-নীতি অনুকরণ করা হবে।
অনুচ্ছেদ ৮ : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা দানের ইসলামী নির্দেশনা পরিপালন করবে। এটি যেমন সরকারের দায়িত্ব হবে তেমনি জনগণও পারস্পরিক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালন করবে। পবিত্র কুরআনের সূরা তওবার ৭১ নং আয়াতের নির্দেশনা : ‘মুমিন পুরুষ ও মহিলা পরস্পর পরস্পরের অভিভাবক, তারা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।’ এ নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। দায়িত্বের শর্তাবলী, পরিধি ও সীমাবদ্ধতা বা প্রকৃতি সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। (চলবে)।