এ্যাডভোকেট আবু হাসিন
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ বৃত্ত থেকে সরকারের বেরিয়ে আশা প্রয়োজন হলেও আশাবাদী হওয়ার মত কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং সরকার ক্রমেই ব্যাংক জালেই বৃত্তাবদ্ধ থাকছে। ফলে আমাদের অর্থনীতিকে সংকীর্ণ গলিপথেই অগ্রসর হতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ নির্ভরতার কারণেই দেশে মূল্যস্ফীতি শুরু হয়েছে। বিশেজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ওভারড্রাফটের মাধ্যমে ঋণ বাড়ায়, তাহলে তা সরাসরি অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বেশি থাকলে অতিরিক্ত তারল্য মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে যদি সরকার আরো ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংক খাতে তারল্যসঙ্কট আরো বাড়বে। ফলে শিল্পঋণ, এলসি এবং আমদানি অর্থায়নে সমস্যা অনিবার্য হয়ে উঠবে। তাই সরকারের উচিত-রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, নন-ব্যাংক উৎস থেকে ঋণ বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্র ও বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকারের কোন কার্যকর ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেই, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য কোন সুখবর নয়।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মতে, সরকারের ঋণ নির্ভরতা এখন সকল সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। বাজেট বছরের শেষ প্রান্তিকে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের এ বাড়তি ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি করছে এবং আগামী তা আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক-ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা কার্যত অতিক্রম করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রভিশনাল তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ছয় হাজার ৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যেখানে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট বছরের শেষ প্রান্তিকে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের এ বাড়তি ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে রীতিমত নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক-ঋণ পাওয়া বড় ধরনের অনিশ্চিয়তা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একথা কারো অজানা নয় যে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ বেড়ে ৬.৫৭ লাখ কোটি টাকায় এসেছে ঠেকেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতের বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট নিট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জুন ২০২৫ শেষে এ পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে ঋণ বেড়েছে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা, যা বাজেট লক্ষ্যমাত্রারও বেশি।
অবশ্য নানা কারণেই সরকারের ঋণ গ্রহণ প্রবণতা বেড়েছে এবং তা চলমানই রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো-রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ, ব্যাংক একীভূতকরণে সরকারি মূলধন সহায়তা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অতিরিক্ত ব্যয়। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি সরকারকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরো নির্ভরশীল করে তুলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় ব্যয় মেটাতে ঋণই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এখন সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। জুন ২০২৫-এ যা ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বেড়েছে ৩২ হাজার ১৯২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওভারড্রাফট খাতে ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা জুনে ছিল শূন্য। এটি ইঙ্গিত করছে যে, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে সরকার স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস এডভান্স খাতে স্থিতি রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকেও সরকার ঋণ নিয়েছে। ফলে সরকারের ঋণ বোঝা এখন রীতিমত পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮০৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। জুন ২০২৫-এর তুলনায় এ খাতে ঋণ বেড়েছে দুই হাজার ১৯৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারের লাগামহীন ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যেই বেসরকারি খাতে চাপ বেড়েছে এবং আগামীতে পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বৃদ্ধির প্রবণতা চলমান রয়েছে। ব্যাংক খাতের ভাষায় এটিকে বলা হয় ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়। ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের তহবিল এখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের জন্য ঋণপ্রবাহ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে তিনটি বড় চাপ তৈরি হয়-প্রথমত, ঋণের সুদহার বাড়ে। অর্থাৎ সরকার বেশি হারে ঋণ নিলে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। ফলে বেসরকারি ঋণে সুদহার বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া অর্থাৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যাহত হয়। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থাৎ বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যায়। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে কয়েক বছরের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে অনাগ্রহী। এর সাথে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে মূল্যস্ফীতিরও শঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রতিফলনও শুরু হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ওভারড্রাফটের মাধ্যমে ঋণ বাড়ায়, তাহলে তা সরাসরি অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বেশি থাকলে অতিরিক্ত তারল্য মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে যদি সরকার আরো ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংক খাতে তারল্যসঙ্কট আরো বাড়তে পারে। ব্যবসায়ী মহল বলছে, এতে শিল্পঋণ, এলসি খোলা এবং আমদানি অর্থায়নে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ব্যাংকারদের মতে, সরকারের উচিত- রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, নন-ব্যাংক উৎস থেকে ঋণ বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্র ও বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা। সবমিলিয়ে ৯ মাসেই ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া সরকারের আর্থিক চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি খাতে, যেখানে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নতুন চাপে পড়ছে। যা অর্থনীতির জন্য মোটেই সুসংবাদ নয়।
তাই জাতীয় অর্তনীতিকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে এবং গণমুখী অর্থনীতি প্রবর্তনের জন্য সরকারকে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতার অশুভ বৃত্ত থেকে অবশ্যই বেড়িয়ে আসতে হবে। এ জন্য সরকারের আয় বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। আর এ কর্মযজ্ঞকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সহ সকল ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুনীতি সবচেয়ে বড় বাধা। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। তাহলেই আমাদের অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: আইনজীবি ও প্রাবন্ধিক।