তৌসিফ রেজা আশরাফী

ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি খুলে দিয়েছে অপরাধের এক নতুন দিগন্ত। একসময় প্রতারণা বলতে বোঝানো হতো মুখোমুখি ঠকানো, জাল দলিল বা সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ। কিন্তু আজ প্রতারণার রূপ বদলেছে এখন তা ঘটছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, এমনকি একটি সাধারণ ফোন কলের মাধ্যমে। অনলাইন প্রতারণা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত বিস্তারমান অপরাধব্যবস্থা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ই-কমার্সের বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে। গবেষণা বলছে, এ ডিজিটাল সম্প্রসারণ যেমন অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেন ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ একই সময়ে সাইবার জালিয়াতির অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), অনলাইন ব্যাংকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে প্রতারণার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন, এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

প্রতারণার ধরন ও বাস্তবতা : বর্তমানে অনলাইন প্রতারণার নানা রূপ দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে প্রচলিত কিছু হলো ফিশিং (ভুয়া লিংক বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য চুরি), OTP বা ব্যাংক তথ্য জেনে নেওয়া, অনলাইন শপিং প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ স্কিম, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

বাংলাদেশের সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন শপিং প্রতারণাই সবচেয়ে বেশি ঘটছে। একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট অনলাইন প্রতারণার প্রায় ৪০ শতাংশই ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট। এছাড়া বিনিয়োগ প্রতারণা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং চাকরির প্রতারণা প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এসব প্রতারণা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে ভুক্তভোগীকে ছোট অংকের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়, পরে ধীরে ধীরে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এক আন্তর্জাতিক জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ ভুক্তভোগী প্রথমে “বিশ্বাসযোগ্য অফার” দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

বাস্তবতা : সাধারণ মানুষই লক্ষ্য : সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এটি একটি বড় প্রবণতার প্রতিফলন যেখানে প্রতারকরা মানুষের বিশ্বাস, অজ্ঞতা এবং আবেগকে কাজে লাগায়।

একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতারণার শিকারদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং তাদের বড় অংশই প্রথমবারের মতো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কারণ তারা প্রযুক্তিগত প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে কম অবগত।

কেন বাড়ছে অনলাইন প্রতারণা? : বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন : ১. ডিজিটাল অজ্ঞতা : অনেক ব্যবহারকারী এখনো সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন নন। তারা সহজেই ভুয়া লিংকে ক্লিক করেন বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করেন। একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ শতাংশ ব্যবহারকারী শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না।

২. প্রযুক্তির অপব্যবহার : ডিপফেইক, এআই এবং উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতারকরা এখন আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা করতে পারছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-নির্ভর প্রতারণার ঘটনা গত দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

৩. আইনি দুর্বলতা ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা : আইন থাকলেও তার প্রয়োগ যথাযথ নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করলেও দ্রুত বিচার বা অর্থ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় না। একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২০ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে আগ্রহী হন।

৪. সংগঠিত অপরাধচক্র : বর্তমানে অনলাইন প্রতারণা একক ব্যক্তির কাজ নয়; এটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইবার প্রতারণার প্রায় ৬০ শতাংশই আন্তঃদেশীয় চক্র দ্বারা পরিচালিত।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : অনলাইন প্রতারণা এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা।বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের অর্থনৈতিক ক্ষতি ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সাইবারসিকিউরিটি ভেঞ্চারস-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের ক্ষতি বছরে প্রায় ১০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল ৭২টি দেশে অভিযান চালিয়ে ৪৫,০০০-এর বেশি ক্ষতিকর সার্ভার ও আইপি বন্ধ করেছে এবং বহু প্রতারককে গ্রেফতার করেছে। একটি আন্তর্জাতিক জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে অন্তত ৩ জন কোনো না কোনোভাবে সাইবার প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত : সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা মনে করেন, “ফিশিং এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এখনও সবচেয়ে বড় হুমকি”, কারণ এগুলো মানুষের মনস্তত্ত্বকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সাইবার আক্রমণের সূচনা হয় ফিশিংয়ের মাধ্যমে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ভুক্তভোগী লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগই করেন না, ফলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না। একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ ভুক্তভোগী প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ করেন না।

সামাজিক প্রভাব : অনলাইন প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এর সামাজিক প্রভাবও গভীর। অনেক পরিবার সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ, হতাশা এবং সামাজিক অনিরাপত্তা।

একটি সামাজিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতারণার শিকারদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভোগেন এবং ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, কারণ তারা প্রযুক্তি সম্পর্কে কম অবগত।

করণীয় : সমাধানের পথ : এ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন :

১. সচেতনতা বৃদ্ধি : স্কুল, কলেজ এবং গণমাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে।

২. প্রযুক্তিগত সুরক্ষা : ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. দ্রুত আইনি ব্যবস্থা : সাইবার অপরাধের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ব্যক্তিগত সতর্কতা : অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, OTP বা পাসওয়ার্ড শেয়ার না করা, যাচাই ছাড়া লেনদেন না করা।

উপসংহার : অনলাইন প্রতারণা আজকের যুগের এক নীরব মহামারি। এটি এমন এক অপরাধ, যা অস্ত্র ছাড়াই মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিতে পারে। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, অপরাধও তত জটিল হচ্ছে। তাই শুধু আইন বা প্রযুক্তি দিয়ে নয়, প্রয়োজন সচেতন সমাজ, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং সতর্ক নাগরিক।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে এ চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে অনলাইন প্রতারণা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, দিনাজপুর আইন কলেজ।