একশ্রেণির স্বার্থান্ধ ও সুযোগসন্ধানীদের কারণেই আমাদের দেশের রজানীতি গণমুখী চরিত্র হারিয়েছে। তারা রাজনীতিকে রীতিমত রঙ্গমঞ্চে পরিণত করেছেন। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে শ্রেণি বিশেষের অবাধ ভোগ, বিলাস, আত্মপুঁজা ও হীন উচ্চাভিলাস চরিতার্থ করার অন্যতম অনুসঙ্গ। ফলে তাদের কাছে দেশ ও জাতীয় স্বার্থ নিতান্তই গৌণ।

সে ধারাবাহিকতায় দেশের এক শ্রেণির রাজনীতিক নতুন নতুন আশ্চর্য্যরে জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অতীতে আমরা সপ্তাচর্যের কথা শুনলে এখন অত্যার্শ্চয়ের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। যা বাড়তে বাড়তে একেবারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ‘বে গায়রে হেসাব’ পর্যায়ে চলে গেছে। এসব আশ্চর্যের সৃজন করেছেন আমাদের দেশের স্বার্থান্ধ ফরিয়া রাজনীতিকরা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম আশ্চর্যের জন্ম দিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের দাবিবার আওয়ামী লীগ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে স্থাপন করে। স্মরণ করা দরকার যে, ভারত ভেঙে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিলে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য। সে পাকিস্তান আন্দোলনের তুখোর ছাত্রনেতা ছিলে বাকশালের প্রতিষ্ঠাতা ও জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিও পাকিস্তানের পক্ষে ‘লরকে লেংগে পাকিস্তান, কায়েক করেংগে আল কুরআন’ স্লোগান দিয়ে পাকিস্তান দাবি আদায় করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অপরিণামদর্শিতা ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার হীন মানসিকতা সহ নানাবিধ কারণেই আমারা পাকিস্তানের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারিনি।

ফলে এক অনিবার্য বাস্তবতায় বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। তাই যৌক্তিক কারণেই বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হওয়া উচিত ছিলো ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা গেলো বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থান দেয়া হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে ভারতীয় সংবিধানের ডুপ্লিকেট বানানো হলো। আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি যদি ধর্মনিরক্ষেতা আর পুরো সংবিধানই ভারতীয় সংবিধানের ছায়াকপি হয়, তাহলে তাহলে অখণ্ড ভারতের প্রবক্তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা যাবে? এটি ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আশ্চর্য। যা একশ্রেণির রাজনীতিকের রীতিমত আত্মপ্রতারণার শামিল। এ ঘটনা প্রমাণ করে একশ্রেণির রাজনীতিক দেশ ও জাতির স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে অধিক গুরুত্ব দেন। ফলে জনগণের স্বার্থের কথা তাদের কাছে নিতান্তই গৌণ।

এরপর স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার আরো নানাবিধ আশ্চর্যের জন্ম দিয়েছে অবলীলায়। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে জনগণকে যুদ্ধে নামিয়ে অনেক ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে স্বাধীনতার পর তারাই আবার দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েক করেছিলো। গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করার জন্য মাত্রা ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ব পত্রিকা বাদে সকল গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছিলো। ভিন্নমতকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে দমনের জন্য কমরেড সিরাজ শিকদার সহ প্রায় ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিলো। জনগণের ওপর নিবর্তন চালানোর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিলো রক্ষীবাহনী। এ তথাকথিত এ বাহিনীই হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ ও গুপ্তহত্যা সহ হেন অপকর্ম নেই করেনি। অথচ সবকিছুই করা হয়েছিলো জনগণের অধিকার রক্ষার কথা বলেই। কিন্তু অনেক আশ্চর্য জন্ম দেয়ার পর তাদের বিদায় হয়েছিলো আরো আশ্চর্যজনকভাবে। ইতিহাসের নির্মম পরিণতি থেকে তারা রক্ষা পায়নি। সঙ্গত কারণেই তাদেরকে প্রায়াশ্চিত করতে হয়েছিলো বেশ চড়ামূল্যের।

বাকশাল পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন তারাও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা নিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এক্ষেত্রে তারা কিছু কিছু ভালো কাজ করে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলো। কিন্তু ক্ষমতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতে খুব একটা সময় লাগেনি বরং নানাবিধ নতুন নতুন আশ্চর্যের জন্ম দিয়েছিলো। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা না করে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে দেশে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলো দীর্ঘদিন প্রতিবেশী দেশে প্রশিক্ষিত এক এক তাবেদারকে। এটি তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সে ধারাবাহিকতা ১৯৮১ সালে এক রক্তাক্ত পট পরিবর্তনের আর এক নতুন আশ্চর্যের জন্ম হয়েছিলো। নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি ক্ষমতায়টিকে গেলেও তাদের পথচলা মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিলো না। কারণ, ষড়যন্ত্র তাদের পিছু কখনোই ছাড়েনি। একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের এদেশীয় এজেন্টরা সরকারের নামে নানাবিধ কুৎসা ও অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিলো। এক পর্যায়ে ১৯৮২ সালে এক মোক্ষম সময়ে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে একটি নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটেছে। পতিত সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও দলীয়করণের অভিযোগ আনা হয়েছিলো। কিন্তু যারা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলো, তাদের দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামল ছিলো আরো বেশি অপশাসন-দুঃশাসন ও বিষাদময়। এভাবেই আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিক জনগণের কল্যাণের কথা বলেই নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করে নিয়েছে; লিপ্ত হয়েছে আত্মপ্রতারণায়ও। সবসময় বলির পাঠা বানানো হয়েছে জনগণকে।

যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য মরণপণ স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারি শাসনামালে এর ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট ছিলো না বরং সে সময়ে যথগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সবই ছিলো দেশ ও জাতির নির্মম তামাশা ও প্রহসন। অথচ স্বৈরাচারি শাসকগোষ্ঠী সব সময় দাবি করে এসেছিলো যে, তারা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ভোট চুরির পর এসব পতিতদের নির্লজ্জ গলাবাজি বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় ও আত্মসচেতন মানুষ হতবাক হলেও এরা কিন্তু লজ্জা পায়নি। কারণ, একশ্রেণির রাজনীতিকের অভিধানে লজ্জা বলতে কোন শব্দ আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। আর এজন্যই হয়তো একজন রাজনীতিক ‘বিশ্ববেহায়া’ খেতাব লাভ করেছিলেন। তিনি এখন জীবিত না থাকলেও তার অনুজ এখন তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। জাতির চরম দুর্ভাগ্য যে, এদের কাছেই আবার আমাদেরকে আপ্তবাক্য ও ওয়াজ-নসিহত শুনতে হয়।

যাহোক প্রায় ৯ বছরের অপশাসনের যাতাকলে পৃষ্ট হবার পর ১৯৯১ সালে ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল তথা ৩ জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর রূপরেখায় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারি শাসনের পতনের পর মনে করা হয়েছিলো যে, দেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন হয়েছে এবং দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। কারণ, যে কেয়ারটেকার পদ্ধতির সরকারের অধীনে নির্বাচন করে যারা ক্ষমতায় এসছিলো, তারা লঙ্কায় গিয়ে নতুন করে রাবণে পরিণত হয়েছিলো। তারা ক্ষমতায় গিয়ে কেয়ারটেকারকে চিনতেই পারেন নি। নিজেদের জন্ম পরিচয়কেই তারা অস্বীকার করে বসেছিলেন। দেশে নতুন করে শুরু হয়েছিলো রাজনৈতিক সঙ্কট। বিশেষ মাগুরা উপ-নির্বাচনে ব্যাপক ভোটচুরির অভিযোগ ওঠার পর সে সঙ্কট আরো তীব্রতা পেয়েছিলো। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তা আমলে না নিয়ে ক্ষমতার মোহে মদমত্ত হয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে বসলেন। কিন্তু জোরজবরদস্তি করে দখল করা ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ি হলো না। জনগণের দাবির প্রতি নতিস্বীকার করে জুন মাসে আরেকটি নতুন নির্বাচন দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হলো। এটাও ছিলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরেক আশ্চর্য এবং একশ্রেণির রাজনীতিকের আত্মপ্রতারণার দলিল।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক ঘটন-অঘটনের কুশীলব ছিলেন একশ্রেণির অবক্ষয়িত রাজনীতিকরা। অনেক ছড়াই-উৎরাই পার হয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট। কিন্তু দলটির অদূরদর্শি সিদ্ধান্তের কারণেই দেশ বিরোধী শক্তি নানাবিধ মওকা পেয়ে বসে। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে তারা দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন করতে শুরু করে এবং সারাদেশেই তারা এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। এমনকি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টন ময়দানে প্রকাশ্যে রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর পৈশাচিক নৃত্য চালানো হয়। ফলে ১/১১-এর পেক্ষাপট সৃষ্টি হয় এবং দেশীয় ও আন্তজার্তিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই একটি পাতানো, সাজানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে বিশেষ একটি শক্তিকে ক্ষমতায় আনা হয়। এর পরের ঘটনা তো কারোরই অজানা নয়।

যাহোক, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসনের পর ছাত্র-জনতার যুগপৎ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। স্বৈরাচারের ধ্বংস স্তুপের ওপর প্রাসাদ নির্মাণ করে জাতিকে মুক্তি দেয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে জাতিকে সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। রাজনৈতিক দলগুলো ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করে গেছে। এ কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করতে সরকারকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করতে হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার করতে গঠন করতে হয়েছে নানাবিধ রাষ্ট্র সংস্কার কমিশন। তৈরি হয়েছে জুলাই ঘোষণা, জুলাই সনদ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অধ্যাদেশ। সে আদেশ অনুযায়ি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জনগণের প্রদত্ত রায়ের ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। যারা ক্ষমতায় গেছেন তারা নির্বাচনের আরেক অংশ গণভোটকে অস্বীকার করে আমাদের এতোদিনের সকল অর্জনকেই ভেস্তে দিতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীনরা নিজেরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালালেও তারা এখন সবকিছু বিস্মৃত হয়ে দেশকে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা রাজনীতিসূলভ ও বিজ্ঞচিত কোন সিদ্ধান্ত নয়। রাজনীতিতেও একটা পরিমিত বোধ থাকা দরকার হলেও তারা ক্ষমতার দম্ভে আত্মরম্ভী হয়ে উঠেছেন। যা আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিকে আদর্শিক দেউলিয়াত্মই প্রমাণ করে।

একথা স্মরণ করা দরকার যে, আমাদের দেশে যখন যারা বিরোধী দলে থাকেন তখন তারা জনগণকে অমীয় বাণী শুনিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর সবকিছু বিস্মৃত হয়ে বসেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আমরা সে চিত্রই লক্ষ্য করছি। ক্ষমতাসীনরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর এবং সে সনদকে সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক কেম্পেইন চালালেও এখন তা রীতিমত অবৈধ হয়ে গেছে। মানে ঝড় গেলে পাটুনী.......। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই আমাদের রাজনীতিকদের এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হয়, রাজনীতি সেবামূলক কাজ হলেও শ্রেণি বিশেষের স্বার্থান্ধ ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে রাজনীতি এখন ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হয়েছে। আর এক্ষেত্রে মোক্ষম ভূমিকা পালন করে এসেছে ক্ষমতা পাগলরা। সঙ্গত কারণেই রাজনীতি হারিয়েছে গণমুখী ও কল্যাণকামী চরিত্র; হয়েছে ভাঁড় শ্রেণির মানুষের রঙ্গমঞ্চ। এক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ ও দেশপ্রেমী রাজনীতিকরা পরিণত হয়েছেন নিরব দর্শকে। সঙ্গত কারণেই প্রচলিত রাজনীতি গণমানুষের কল্যাণের পরিবর্তে হয়ে উঠেছে লাগামীন ভোগ-বিলাসের অনুসঙ্গ। এমনকি রাজনীতি হয়ে উঠেছে শ্রেণি বিশেষের আত্মপুঁজার মোক্ষম হাতিয়ারে। বস্তুত, অবৈধ ক্ষমতালিপ্সা ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণে রাজনীতির অঙ্গন এখন পরিত্যক্ত বিরাণভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। এর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে অশরীরিদের হাতে। যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

গাল্পিক রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছিলো এক পরিত্যক্ত বিরাণ প্রাসাদ। সেখানে অতীতে রাজ-রাজরাদের বসবাস ছিলো। তারা কখনোই প্রজাদের কথা ভাবতো না বরং এ প্রাসাদকে তারা ইন্দ্রিয় বিলাসের মোক্ষম হাতিয়ার বানিয়েছিলো। চলতো লাগামহীন পাপাচার। সে লাগামহীন পাপাচারের গড্ডালিকা প্রবাহে তারা কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিলেন। প্রাসাদটি পরিণত হয়েছিলো একভীতিকর পাষাণপুরীতে। কথিত আছে, রাত হওয়ার সাথে সাথে প্রাসাদটি অশরীরিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতো। রাতভর চলতো নাচ, গান, সুরা-সরাব সহ অতীতের পাপাচারী উম্মাদনা। জনশ্রুতি ছিলো সে পরিত্যক্ত প্রাসাদে একরাত অবস্থান করলেই নাকি সে আর স্বাভাবিক থাকতো না বরং মানসিক ভারসাম্য পাগল হয়ে যেতো। তাই একথার কল্পচিত্র রাতভর মানুষকে স্মরণ করে দিয়ে পাগল মেহের আলী বলতেন, ‘সব ঝুট হ্যাঁয়, সব ঝুট হ্যাঁয়, তফাৎ যাও, তফাৎ যাও!’

পাগল মেহের আলীর প্রলাপ শ্রেণি বিশেষের জন্য শিক্ষণীয় নয় কি? দেশ, জাতি এবং নিজেদের মর্যাদা ও সম্মানের স্বার্থেই বিষয়টিকে সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা দরকার। অন্যথায় রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই বিফলে যাবে এবং ব্যর্থ হবে আমাদের সকল জাতীয় অর্জন; রাজনীতিতে ফিরে আসবে সুস্থ্য ও ইতিবাচক ধারা; শান্তি পাবে না হাজারো শহীদের আত্মা! বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।

www.syedmasud.com