জাফর আহমাদ

অসৎ নেতৃত্ব একটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। লোভ, দুর্নীতি, ও অযোগ্যতার কারণে এই নেতৃত্ব দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। উন্নয়নের চাকা স্থবির করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টে নিমজ্জিত হয় এবং স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।

এ ধরনের নেতৃত্ব দেশের সম্মানিত মানুষদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে। সমাজে হানাহানি, ঘুষ এবং চরম নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে জাতি তিলে তিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। অসৎ নেতৃত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের কি কি ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করে তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

অসম্মান ও ফাসাদ : দেশের শাসনভার যখন অসৎ ও অযোগ্য লোকদের হাতে ন্যস্ত হয় তখন তারা দেশের সম্মানিত, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অবমূল্যায়ন ও অসম্মানিত করে। সমাজে ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা, অন্যায়-অবিচার এবং অরাজকতা বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে বাধার সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে কোনো দেশের অসৎ বা স্বৈরাচারী নেতৃত্ব যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়, তখন তারা মূলত এই দু’টি পথই বেছে নেয়: এক, দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের অবমাননা: সমাজের বিবেক হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী, আলেম, ইসলামী স্কলার, শিক্ষাবিদ বা গুণীজনদের চরিত্র হনন বা অপদস্থ করা হয়।

এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার মতো কাউকে না পায় এবং সমাজে কোনো নৈতিক আদর্শ অবশিষ্ট না থাকে। দুই, ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি: বিভাজন (Divide and Rule) তৈরির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে অনৈক্য, ঘৃণা এবং অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। যখন মানুষ নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত থাকে, তখন নেতৃত্বের অন্যায় কাজগুলো আড়ালে পড়ে যায় এবং তাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না। ইসলামী দর্শনে যাকে ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বা জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আল কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এই একই কথা বলেছেন, “সে বলল, কোনো বাদশাহ যখন কোনো দেশে ঢুকে পড়ে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে এবং সেখানকার মর্যাদাশীলদের লাঞ্ছিত করে এ রকম কাজ করাই তাদের রীতি।”(সুরা নমল:৩৪) অর্থাৎ অসৎ নেতৃত্ব যখন কোন জনপদের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন সে সেখানকার সংশোধন ও মঙ্গল না করে সেখানকার ধন সম্পদ লুটে নেয়।

এ জন্য সে জমিনে ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সংশ্লিষ্ট জাতিকে এতটা মাথাহীন করে দেয় যার ফলে সে আর কখনো মাথা উঁচু করে নিজের অংশটুকু চাইতে না পারে। এ উদ্দেশ্যে সে তার সমৃদ্ধি, শক্তি ও মর্যাদার যাবতীয় উপায়-উপকরণ খতম করে দেয়। তার দেশে যেসব লোকের মধ্যে আত্ম-মর্যাদাবোধের লেশমাত্র সঞ্জীবিত থাকে তাদেরকে দলিত মথিত করে। তার লোকদের মধ্যে তোষামোদ প্রিয়তা পরস্পরের মধ্যে হানাহানি, কাটাকাটি, একে অন্যের গোয়েন্দাগিরি করা, নিজের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে হেয় মনে করা, শক্তিশালী প্রতিবেশীদের তোয়াজ করা, তাদের সভ্যতা- সংস্কৃতিকে গোলামী দান করা এবং এমনিভাবে অন্যান্য নীচ ও ঘৃণিত গুণাবলী সৃষ্টি করা। ফলে তারা নিজেদের পবিত্রতম জিনিস বিক্রি করে দিতে ইতস্তত করে না।

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা : যখন কোন জনপদে অসৎ নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়, তখন দেশ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, অর্থ পাচার এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে সমাজকে ভঙ্গুর করে তোলে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করে দেয়। দেশের বাইরে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। ফলে দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়।

ধ্বংসকর অবস্থার সৃষ্টি : অসৎ নেতৃত্ব একটি সমাজ, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক, যা তাদের দুর্নীতি, অরাজকতা, অর্থনৈতিক পতন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মাত্রা থেকে জানা যায়। এ ধরনের নেতৃত্ব ক্ষমতার লোভ ও আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে জনগণের অধিকার হরণ করে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাঁধাগ্রস্ত করে, যার কারণে চারদিকে একটি ধ্বংসকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।

অধিকার বঞ্চনা : অসৎ নেতৃত্বের ফলে মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও ন্যায্য অধিকার ভুলুণ্ঠিত হয়, সমাজ জীবনের নিরাপত্তা কমে যায় এবং ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশের মানুষের ভাগ্য বদলায় না, বরং তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে জুলুমের শিকার হয়। জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধি নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

অযোগ্যদের আধিপত্য : কোনো রাষ্ট্রে যখন অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্ব পরিচালনার দায়িত্ব পায় তখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিজ্ঞ ও সৎ-যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে দালাল, অযোগ্য, চাটুকার ও দুর্নীতিবাজদের সমাবেশ ঘটে। দুর্নীতিবাজ সরকারের এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। অথচ যোগ্যদের প্রাধান্য বা মেধার মূল্যায়ন একটি সুষ্ঠু সামজ ও কর্মপরিবেশ তৈরির মূল ভিত্তি। সৎ, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিলে কাজের মান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

এর মাধ্যমে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়, যা অযোগ্যদের সুযোগ কেড়ে নিয়ে প্রকত মেধাবীদের সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু সরকার যদি নিজেই সৎ ও দেশপ্রেমিক না হয় ববং অসৎ ও দুর্নীতিবাজ হয় তাহলে তার চারদিকে দালাল ও চাটুকার শ্রেণী অযোগ্যদের সমাবেশ ঘটে।

সামাজিক অবক্ষয় : সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ হলো, অনৎ নেতৃত্ব, যা দুর্নীতি, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। নীতি-নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতার ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ, দখল বাণিজ্য, টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে উঠে। উল্লেখিত অপরাধ ছাড়াও এরা নেতাদের ছত্রছায়ায় এলাকায় খুন, রাহাজানি, মারামারি, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মেয়েদের শ্লীলতাহানির মতো সামজিক অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। সঠিক বিচারের অভাব ও রাজনৈতিক একাধিপত্য সামজিক অস্থিরতা ও অপরাধীদের সাহস যোগায়। ফলে সে সমাজ ব্যবস্থায় রাজ্যের জাহেলিয়াত নেমে আসে।

তরুণরা সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে ও অসৎ নেতাদেরও প্ররোচনায় মাদকাসক্তসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। নেতারা যখন মিথ্যা, দুর্নীতি বা অন্যায়ের আশ্রয় নেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে “সততার চেয়ে চতুরতা বড়” এমন ধারণা তৈরি হয়। ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে আইন ও বিচার ব্যবস্থা তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারায়। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় আর অপরাধীরা নির্বিঘ্নে অপরাধ চালিয়ে যায়। ফলে সমাজে নৈরাজ্য ও অস্থিরতা বাড়ে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিপন্ন: অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্বের মধ্যে সৃজনশীলতা না থাকার দরুণ বিশেষত নিজেদের মধ্যে দেশপ্রেম না থাকার কারণে দেশের যুব সমাজকে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান করতে পারে না। ফলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণে বর্তমান প্রজন্মের মানবিক মূল্যবোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে। তরুণরা বাস্তব জগত থেকে ছিটকে পড়ছে। হতাশা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে বিষণ্নতা। মাদক, ইয়াবার বিস্তার এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা নতুন প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিহাস ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা প্রজন্মকে দিশাহীন করছে।

আল্লাহর রোষানল : নেতৃত্ব ও ক্ষমতা আল্লাহর দেয়া আমানত। এই আমানত যারা যথাযথ স্থানে ব্যবহার করে না, তারা মূলত: খেয়ানতকারী। কেবলমাত্র অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্বই খেয়ানতকারী ও প্রতারণা করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা নিজেদের সাথে খেয়ানত ও প্রতারণা করে, তুমি তাদের সমর্থন করো না। আল্লাহ খেয়ানতকারী পাপীকে পছন্দ করেন না।” (সুরা নেসা : ১০৭) যারা আল্লাহর আমানতকে খেয়ানত করে, তদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হাঁ তোমরা এই অপরাধীদের পক্ষ থেকে দুনিয়ার জীবনেই বিতর্ক করে নিলে কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে তাদের জন্য কে বিতর্ক করবে? সেখানে কে উকিল হবে?” (সুরা নিসা : ১০৯)

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।