একথা কারো অজানা নয় যে, কতিপয় মৌলিক চেতনাকে ধারণ করে আমরা ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৫ দশক অতিক্রান্ত হলেও এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে। বস্তুত, পাকিস্তানী শাসকরা গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিসংগ্রাম, প্রভূত সংখ্যক প্রাণ ও অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এ মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা জানমালের সর্বোচ্চ কোরবানি করেছিলাম, সে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজও কলঙ্কমুক্ত হয়নি; পায়নি প্রাতিষ্ঠানিক রূপও। এজন্য বার বার আন্দোলন-সংগ্রাম, রক্তাক্ত পটপরিবর্তন, গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব ঘটলেও আমরা এসবের ফসল যৎকিঞ্চিৎ ঘরে তুলতে পেরেছি। স্বার্থান্ধ, নেতিবাচক ও ক্ষমতাকেন্দ্রীক অপরাজনীতি আমাদের এসব সাফল্য ধরে রাখতে দেয়নি। আমাদের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচনগুলো আজও বিতর্কমুক্ত হতে পারনি এবং ভোট চুরির একটা দুর্গন্ধও এখনো রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে আমরা বারবার সাফল্য অর্জন করলেও স্বার্থান্ধ ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণে তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। যা আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা মরণপন স্বাধীনতাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার নিজেরাই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলো না বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ক্ষমতাকেই অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছিলো। এর প্রতিফলন আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। মূলত, এ নির্বাচন থেকেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে তদানীন্তন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে। আর এটি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য নয় বরং বিশ্লেষকরাও এর সাথে একমত হয়েছেন। লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘তেহাত্তরের নির্বাচন’ নামক গ্রন্থে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে আওয়ামী লীগ তখন কী করেছিল তার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। নির্বাচনের সময়ের পত্রিকাগুলোর খবর ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এ নিয়ে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেছেন তিনি। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বহুল আলোচিত বিষয়।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করতো এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু এরপরও সে নির্বাচনে সারাদেশে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি একজন প্রার্থীকে জেতাতে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। স্বাধীনতার পর এভাবেই শুরু হয়েছিলো ভোট চুরির নির্লজ্জ মহড়া।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয় তৎকালীন কুমিল্লা-৯ আসনের নির্বাচনকে। সে নির্বাচনে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন সহযোগি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দাউদকান্দির রশিদ ইঞ্জিনিয়ার খুব জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। অপরদিকে খন্দকার মোশতাকের ইমেজ অতটা ভালো ছিল না। ভোটের দিন খবর আসতে শুরু করলো খন্দকার মোশতাক বিপুল ভোটে হেরে যাচ্ছেন। এ খবর পেয়ে তখন কুমিল্লা থেকে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নির্বাচন অফিসে নিয়ে আসা হয়’। এ গবেষকের ভাষ্য হচ্ছে, ভোটের দিন এটা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিশ্চিত হেরে যাচ্ছেন, তখন ব্যালট পেপার সেখানে গুনতেই দেওয়া হয়নি। সব ব্যালট নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫২ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর তার বিপরীতে মি. রশিদের ভোট ছিল ৩৬ হাজার ৬৩০। যা ছিলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
কুমিল্লার এ আসনের নির্বাচনটি যে কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা ছিল। ১৪টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তবে সে নির্বাচন কোনভাবেই বিতর্কমুক্ত ছিলো না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ওই নির্বাচনের পরে জাসদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনটি এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে তা কেউ ভাবেনি। যে কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা শুরু থেকেই জন্ম নিয়েছে’। অর্থাৎ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নাম ধারণ অনেক পরে হলেও ভিন্ন ফরম্যাট বা নামে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছিলো অতীতেও।
৩শ’ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন নিয়েও তদানীন্তন ক্ষমতাসীনরা সন্তষ্ট থাকতে পারেন নি বরং তারা নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ি করতে গণতন্ত্র হত্যার পথ বেছে নিয়েছিলো। কিন্তু গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা। সে সময় কথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা গণরায় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর আস্থা রাখতে পারেনি। সঙ্গত কারণেই তারা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় বাংকশালী শাসন কায়েম করেছিলে। এমনকি সরকারের অনায্য ও অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাতে কেউ প্রতিবাদ করতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্রায়াত্ত মাত্র ৪টি পত্রিকা বাদে সকল গণমাধ্যমের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিলো। ভিন্নমতের প্রতি চালানো হয়েছিলো নির্মম জুুলুম-নির্যাতন। কমরেড সিরাজ শিকদার ৩০ হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা করে পুরো দেশকেই বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়েছিলো। অথচ এরাই ছিলেন চেতনার সোল এজেন্ট ও ফেরিওয়ালা।
তবে জনগণের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ করার কারণে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি। যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলে তারা জনগণকে যুক্তিযুদ্ধে নামিয়েছিলো; যে আহ্বানে সারাদেশে আপমর জনগণ রণাঙ্গনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, স্বাধীনতা পরবর্তীতে তারা সেসব চেতনার কথা ভুলে গিয়ে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। দলীয় এজেন্ডা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে বানিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাই এক অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতায় হয়েছিলো ’৭৫-এর পট পরিবর্তন। মূলত, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই ক্ষমতাসীন লাগামহীন ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জনগণ একটা পটপরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করছিলেন। ১৫ আগস্ট সে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন হয়েছিলো। যদিও সে পরিবর্তনের পদ্ধতি মোটেই কাক্সিক্ষত ছিলো না বরং ছিলো অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। তারপরও দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এ পরিবর্তনের ফলে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সাময়িকভাবে রাহুমুক্ত হয়েছিলো। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশালের বিলুপ্তিতে দেশ বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করেছিলো। আর এক্ষেত্রে ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফলে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর কিছুদিন দেশ সামরিক শাসনের অধীনে ছিলো। দেশকে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ফেরাতে কিছুটা সময় লেগেছিলো। তবে ১৯৭৮ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে ৩ মে তিনি বিপথগামী সেনা অফিসারদের হাতে শাহাদাত বরণ করে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাত পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর নির্বাচনে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। হয়তো গণতন্ত্র বিরোধী শক্তিরা ওঁৎ পেতেই ছিলো। সে ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে উচ্চাভিলাষী সেনা শাসক হোসেইন মেহাম্মদ এরশাদ বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখল করে গণতন্ত্রকে আবারও শৃঙ্খলিত করেন। দেশ আবারো স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে দীর্ঘ ৯ বছর। মাঝে মাঝে নির্বাচনের নামে প্রহসন ও তামাশাও করা হয়। ফলে গণরোষ ক্রমেই দানা বেঁধে ওঠে এবং আবারো একটা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়।
শুরু হয় দুর্বার গণআন্দোলন। ৮ দল, ৭ দল, ৫ দল এবং জামায়াতে ইসলামীর যুগপৎ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের অধীনে একটি নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার গঠিত হয়। সে সরকারের অধীনেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের অধিকতর গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং জামায়াতের নিঃশর্ত সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করতে সমর্থ হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনে জামায়াতের এ অবদানের কথা স্মরণ রাখেনি।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মনে করা হয়েছিলো যে, আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিজ কক্ষে ফিরে এসেছে। জনগণের ভোটের জন্য রাজপথে আন্দোলন চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদেরকে নতুন করে অক্টোপাশের মত চেপে ধরে। বিএনপি সরকারের অধীনে উপনির্বাচনগুলোকে ব্যাপকভাবে ভোট চুরির ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে মাগুরার উপনির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকারের স্থায়ী বিধানের আন্দোলন। কিন্তু বিএনপির বিরোধী দলের সে দাবির প্রতি কোন কর্ণপাত করেনি। মূলত, দলটির নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের দাবিকে উপেক্ষা করে নিজেদের জন্ম পরিচয়ই অস্বীকার করে। কারণ, তারাই ছিলো কেয়ারটেকার সরকারের সরাসরি বেনিফিসিয়ারি। আর এ জন্য তাদেরকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছিলো।
উল্লেখ্য, সকল বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে জোর করেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একটি একতরফা নির্বাচন করে ফেলে। কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বেশিদিন টিকতে পারেনি বরং গণদাবি মেনে নিয়ে সংবিধানে নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের বিধান স্থায়ী বিধান করে পদত্যাগ করে এবং ১৯৯৬ সালে ১২ জুন নতুন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। উল্লেখ্য, নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের স্থায়ি বিধান সংবিধানে সংযোজনের পর মনে করা হয়েছিলো যে, দেশে গণতন্ত্র পুরোপুরি ফিরে এসেছে। একই সাথে ভোট চুরির সকল পথ রুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ভাগ্য আমাদের মোটেই সুপ্রসন্ন ছিলো না।
এরপর ২০০১ সালে একটি কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ৮ম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং পুরো মেয়াদে তারা ক্ষমতায় থাকে। আওয়ামী লীগ উপলদ্ধি করতে পেরেছিলো যে, জনগণের ম্যাণ্ডেট নিয়ে তাদের পক্ষে আর ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাই তারা ৪ দলীয় জোর সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে ধ্বংসাত্মক আন্দোলন শুরু করে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজপথে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ১/১১-এর প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়। ফলে একটি সাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের পরিবর্তে একটি অসাংবিধানিক জরুরি সরকার গঠিত হয়। নতুন করে শুরু হয় গণতন্ত্রের আর্তনাদ-আহাজারী।
এ অসাংবিধানিক জরুরি সরকার ২ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। রাজনীতিকদের নানাভাবে হয়রানি, চরিত্র হনন; মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা ও ফরমায়েসী দণ্ড দেয়া হয়ে। পরে ২০০৮ সালে সাজানো, পাতানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়।
আওয়ামী লীগ পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছিলো যে, গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ জন্য তারা প্রথমেই দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে বিশেষভাবে টার্গেট করে। আর সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও প্রতিবেশী দেশের সহায়তায় কথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে দেশপ্রেমী ও চৌকস ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা সহ অনেক সেনা সদস্যকে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অরক্ষিত করে তোলে। আদালতের দোহায় দিয়ে বাতিল করা হয় গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটের রক্ষাকবজ জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি। ফলে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কবর রচিত হয়। দেশকে বিরোধী দল মুক্ত করতে আয়োজন করা হয় কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন। ফরমায়েসী বাদী, সাজানো সাক্ষী ও দলীয় প্রসিকিউশনের মাধ্যমে জনপ্রিয় জাতীয় নেতাদের একের পর এক ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে দেশের পবিত্র ভূমিকে রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত করা হয়। দেশের আলেম সমাজের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ধ্বংস করার জন্য ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা আলেম-উলামাদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। উদ্দেশ্য নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ি করা। এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনই ছিলো নিলর্জ্জ প্রহসনমূলক। গণতন্ত্র নিয়ে এমন তামাশা ও ভাঁওতাবাজী বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে দ্বিতীয়টি দেখা যায় না।
আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছিলো যে, তাদের ক্ষমতা একেবারে চিরস্থায়ি হয়ে গেছে। দলটির উচ্চাভিলাষীরা নেতারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলো। কেউ কেউ শেখ হাসিনাকে আজীবন প্রধানমন্ত্রী বলতেও পুলকবোধ করতেন। খোদ শেখ হাসিনাও প্রায়ই বলতেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামামোর ক্ষমতা কারো নেই। কিন্তু তাদের সে দম্ভোক্তি বেশীদিন স্থায়ি হয়নি বরং ২০২৪ সালের সরকারি চাকুরীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনেই আওয়ামী একেবারে কুপোকাৎ হয়ে পড়ে। কিন্তু জাতির এ অর্জনটা মোটেই সহজসাধ্য হয়নি বরং এ জন্য দিতে হয়েছে প্রায় দু’হাজারের মত তরতাজা প্রাণ। আহত হয়েছিলেন হাজার হাজার জুলাই যোদ্ধা। এদের মধ্যে অনেকেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে স্থায়িভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ অন্ধত্বও বরণ করেছেন। আর এদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ ফিরে পেয়েছি।
প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসনে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের সকল কাঠামো ধ্বংস করে গিয়েছিলো। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিলো। তাই দেশের আপামর জনসাধারণ, সকল রাজনৈতিক দল ও জুলাই বিপ্লবীরা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের তাগিদ অনুভব করছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার সকলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য মোট ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং জাতীয় ঐক্যমত কমিশন গঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে কতিপয় সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। আর এসব অত্যাবশ্যকীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত হয় জুলাই সনদ এবং সে সনদে দেশের বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং পরবর্তীতে এনসিপি সহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করে। সে সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয় এবং সে মোতাবেক গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ক গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং এ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং হ্যাঁ বিজয়ী হয়।
ফলে জুলাই সনদ অনুযায়ি সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সে বাধ্যবাধকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের দু’টি শপথ গ্রহণ করার কথা। একটি হলো জাতীয় সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ আর অপরটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি জুলাই সনদে সাক্ষরকারী দল হলেও শুরুতেই তারা নানা খোঁড়া অজুহাতে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং শেষ পর্যন্ত শপথ না নিয়ে নিজেদের করা অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এমনকি তারা এখন জুলাই বিপ্লব নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে জুলাই সনদদের লিঙ্গ অনুসন্ধান করতে শুরু করে নিজেদের হীনমানসিকতা জাতির সামনে উন্মুক্ত করেছে। মূলত, বিএনপির নেতিবাচক অবস্থানের কারণেই জুলাই সনদ নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অবশ্য জামায়াত সহ জোটের শরীকরা দ্বিতীয় শপথ নিয়ে জুলাই বিপ্লব ও সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে রাজনীতিকরা বারবার জনগণকে রাজপথে নামিয়েছে। তারা সরল বিশ্বাসে রাজপথে নেমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। কাজ ফুরালে তাদেরকে আর কেউই মূল্যায়ন করেনি বরং তাদের রক্তের সাথে রীতিমত বেঈমানি করা হয়েছে। ফলে জনতার কোন বিজয়ের সুফল ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। নেতিবাচক রাজনীতির কারণে সবকিছুকেই শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে। আর জুলাই বিপ্লবীদের ফাঁকি দেয়ার কাজটা এগিয়ে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি। এটিই আমাদের দুর্ভাগ্য।
www.syedmasud.com