বাংলাদেশে রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে যে বিতর্কটি বহুদিন ধরে চলমান, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশগুলো সে বিতর্ককে এক নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। এ অধ্যাদেশগুলো আলাদা আলাদা আইনগত উদ্যোগ ছিল না; বরং এগুলোকে একসাথে দেখলে বোঝা যায়-রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ভিন্ন দর্শন এখানে কাজ করছিল। সে দর্শনের মূল কথা ছিল: ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না রেখে, সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করা এবং নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা। কিন্তু পরবর্তীতে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে-বিশেষ করে এসব অধ্যাদেশ বাতিল বা অকার্যকর করার উদ্যোগ-তা এ দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে এখন প্রয়োজন প্রতিটি অধ্যাদেশকে গভীরভাবে বোঝা-কী পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল, কেন তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং কেন তা বাতিল হওয়া একটি বড় নীতিগত পশ্চাদপসরণ।

এখানে বলা দরকার যে, সরকারের তরফ থেকে অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটির সদস্যবৃন্দ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধান, কমিটিতে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের মতামত, জনস্বার্থ, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি এবং শাসনকার্যের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার পরকমিটির নিকট প্রেরিত এবং সংসদে উপস্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ তাদের মূল রূপে বিল আকারে উপস্থাপনের জন্য; ১৫টি অধ্যাদেশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধিত রূপে বিল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য; ১৬টি অধ্যাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থাপন না করে আরও পর্যালোচনা, শক্তিশালীকরণ এবং নতুন বিল হিসেবে প্রণয়নের জন্য এবং ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও সুরক্ষার উদ্দেশ্যে বিল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করে। প্রসঙ্গত বলা দরকার, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে পেশ না করায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এগুলো বাতিল বলে গন্য হবে।

ইতিহাসের দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করার জন্য এটিও জানা থাকা দরকার যে, এ বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এবং গাজী নজরুল ইসলামÑসংযোজনী-‘ক’-এ উল্লিখিত ৫টি অধ্যাদেশ, সংযোজনী-‘খ’-এ উল্লিখিত ২টি অধ্যাদেশ, সংযোজনী-‘গ’-এ উল্লিখিত ১১টি অধ্যাদেশ এবং সংযোজনী-‘ঘ’-এ উল্লিখিত ৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তবে এর মধ্যে যে ৬টি অধ্যাদেশ বাতিল এবং সেখানে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সেগুলোর ওপর এই লেখনিতে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

১. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ: স্বাধীনতা বনাম প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক সমস্যায় ভুগছেÑএর কাঠামোগত নির্ভরশীলতা। বাস্তবে এটি একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি এ জায়গায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল। প্রথমত, কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত করাÑঅর্থাৎ কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। এটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কারণ মানবাধিকার কমিশনের কাজই হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর নজরদারি করা। যদি সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সার্চ কমিটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বাংলাদেশে অধিকাংশ সাংবিধানিক বা আধা-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়Ñএটি একটি ওপেন সিক্রেট। সার্চ কমিটি সে প্রক্রিয়াকে অন্তত আংশিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক করে, যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় আসে। তৃতীয়ত, অপসারণ প্রক্রিয়াকে কঠোর করা হয়েছিল-অনেকটা সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতিদের মতো। এর মানে, সরকার চাইলেও সহজে কাউকে সরিয়ে দিতে পারবে না। এটি কমিশনের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তদন্ত ক্ষমতা। কমিশনকে গুম, নির্যাতন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় একটি অংশই রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বাস্তবতায় এ ক্ষমতা ছাড়া কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয় থেকে যায়। এখন যদি এ অধ্যাদেশ বাতিল হয় তাহলে কী হবে? কমিশন আবার সে পুরোনো কাঠামোয় ফিরে যাবে-যেখানে এটি থাকবে, কিন্তু কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু তার কার্যকারিতা থাকবে না। দন্তহীন বাঘে পরিণত হবে।

২. গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ: দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশে গুম একটি রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। কিন্তু সমস্যাটা শুধু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যাটা হলো-এর বিচারহীনতা। এ অধ্যাদেশটি এ জায়গাতেই আঘাত করেছিল।

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল-গুমকে একটি “চলমান অপরাধ” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। এর আইনি গুরুত্ব বিশাল। কারণ এতে সময়সীমা বা সময়ের সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন আনা হয়নি। অর্থাৎ যতদিন ভুক্তভোগীর অবস্থান অজানা থাকবে, ততদিন অপরাধ চলমান ধরা হবে। ফলে পুরোনো ঘটনা হলেও তা তদন্তযোগ্য থাকে। দ্বিতীয়ত, একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব ছিল। সাধারণ আদালতে এসব মামলা কার্যকরভাবে এগোয় না-প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে। একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সে সীমাবদ্ধতা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্বাধীন তদন্তের বিষয়টি। এখানে সরকারের পূর্বানুমতির কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন। কারণ, যদি অভিযোগ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া মানে তদন্তকে শুরুতেই থামিয়ে দেওয়া। চতুর্থত, ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এটি শুধু বিচার নয়; এটি পুনরুদ্ধারের একটি মানবিক স্বীকৃতি। সরকার এখন এসে জাতীয় নিরাপত্তার যে যুক্তি দিচ্ছে তা আসলে নতুন কিছু নয়। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগও এ যুক্তিই দিয়েছিল। প্রশ্ন হলোÑএই যুক্তি কি দায়মুক্তির ঢাল হয়ে দাঁড়াবে? এ অধ্যাদেশ বাতিল মানে শুধু একটি আইন বাতিল নয়; বরং এটি এই বার্তাই দেয় যে, রাষ্ট্র নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে এখনো অনিচ্ছুক।

৩. পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ : রাজনৈতিক পুলিশিং থেকে পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা : বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলোÑএর রাজনৈতিক ব্যবহার। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের আচরণ পরিবর্তন-এটি একটি পরিচিত চিত্র। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল এবং তাদেরই সুপারিশমালার আলোকে প্রদত্ত এ অধ্যাদেশটি বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কাঠামোগত সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রথমত, একটি বহুপক্ষীয় কমিশন গঠন-যেখানে বিচারপতি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী এবং পুলিশ কর্মকর্তা থাকবেন। এর মানে, সিদ্ধান্ত একক কোনো গোষ্ঠীর হাতে থাকবে না। দ্বিতীয়ত, আইজিপি নিয়োগে এই কমিশনের ভূমিকা। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব নির্ধারণই পুরো বাহিনীর আচরণকে প্রভাবিত করে। তৃতীয়ত, নিয়োগ ও অপসারণে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা। এতে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদ পাওয়া বা হারানোর প্রবণতা কমতে পারে। এ কাঠামো কার্যকর হলে, পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারত। কিন্তু এটি বাতিল হলে, পুরোনো বাস্তবতাÑরাজনৈতিক প্রভাবÑঅবিকল থেকে যাবে।

৪. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ : বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার প্রশ্ন : বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই হয়, কিন্তু একটি মৌলিক বিষয় অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে-প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। যতদিন বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকবে, ততদিন বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীন হতে পারে না। এ অধ্যাদেশটি সে সমস্যার সমাধান দিতে চেয়েছিল। একটি পৃথক সচিবালয়, যা প্রধান বিচারপতির অধীনে পরিচালিত হবে, এবং যা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এখানে মূল বিষয়টি হলোÑক্ষমতার স্থানান্তর। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের হাতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দেওয়া। সরকারের যুক্তিÑএকজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে সেই ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে কেন্দ্রীভূত। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটা হওয়া উচিতÑকোনটি বেশি জরুরি ছিল: রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, নাকি বিচারিক নিয়ন্ত্রণ?

৫. দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ : কাঠামোগত শক্তিশালীকরণ বনাম নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি : দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের। এ অধ্যাদেশটি কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে চেয়েছিল-বিশেষ করে গোপন অনুসন্ধান, সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ, এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার ক্ষেত্রে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জবাবদিহিতাÑবার্ষিক প্রতিবেদন ও সংসদীয় পর্যালোচনা। এটি একটি দ্বিমুখী কাঠামো তৈরি করে: কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু তার কাজের মূল্যায়নও হবে। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। মূলত এটিই ছিল এ অধ্যাদেশের মূল রাজনৈতিক স্পর্শকাতর অংশ। অথচ এ স্পর্শকাতর পয়েন্টটাই পুরো অধ্যাদেশ বাতিলের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৬. সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত

সবশেষে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি। বাংলাদেশে বিচারপতি নিয়োগ সবসময়ই একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছিল। সংবিধানের ভাষা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাবই নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অধ্যাদেশটি সে বাস্তবতায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আনার চেষ্টা করেছিল-একটি কাউন্সিল, বাছাই প্রক্রিয়া, সুপারিশ, এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়োগ। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল-একক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। এই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়া মানে হলো-সে পুরোনো কাঠামোই বহাল থাকবে, যেখানে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকে।

অধ্যাদেশগুলো একসাথে দেখলে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন বোঝা যায়। প্রায় সবগুলোর লক্ষ্য ছিলÑরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সরাসরি প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করা। মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন করা, গুমের মতো অপরাধে সরকারের অনুমতি ছাড়াই তদন্তের সুযোগ দেওয়া, পুলিশ নিয়োগে বহুপক্ষীয় কাঠামো আনা, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক করা। অর্থাৎ, ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। কিন্তু যে সিদ্ধান্তগুলো এখন নেওয়া হচ্ছে, তা এই পুরো দর্শনের বিপরীত দিকে যাচ্ছে।

যেসব অধ্যাদেশ সরকারের ক্ষমতা কমায় বা নিয়ন্ত্রণে আনেÑসেগুলো বাতিল হচ্ছে। আর যেগুলো সরকারের হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেয়-যেমন জনপ্রতিনিধি অপসারণ বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বাড়ানো-সেগুলো টিকে যাচ্ছে বা আইনে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই দ্বৈততা আসলে একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে: আর তাহলো রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী অবস্থানে থাকলে যে সংস্কারের কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে সে সংস্কারই তাদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কারণ তখন তারা নিজেরাই সে ক্ষমতার সুবিধাভোগী।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এতে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না হয়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান যদি কার্যকর না হয়, পুলিশ যদি নিরপেক্ষ না হয়-তাহলে আইনের শাসন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে তখনই, যখন ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকে। এ অধ্যাদেশগুলো সে ব্যবস্থাগুলোর সূচনা হতে পারত। কিন্তু এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, তা সে পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্নটা তাই সরল নয় কিংবা কেবল আইন বাতিলের প্রশ্নও নয়। এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি ক্ষমতার কেন্দ্রিক একটি কাঠামোতেই আটকে থাকবে-এ অধ্যাদেশগুলোর ভাগ্য সে প্রশ্নের উত্তরের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে।